কোথায় দৃশ্যমান উন্নয়ন : ইসহাক খান

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

কারো কারো চোখে সরকারের উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। আবার কারো কারো চোখে অভাবিত দৃশ্যমান। তারা তাদের রাজনৈতিক বিবেচনায় এমনভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে থাকেন। একদল কিছুই দেখেন না। আরেক দল বেশি দেখেন। যারা সাধারণ মানুষ, তারা যা খোলা চোখে দেখেন, সেটাকেই ধ্রæব বলে মানতে চান। এটাই প্রকৃত সত্য। এটাই বাস্তব। সাধারণ মানুষ খোলা চোখে যা দেখেন সেটাই আসল দেখা। তারা বেশিও দেখেন না। কমও দেখেন না। যা ঘটমান ঘটনা তাই দেখেন।

খোলা চোখে আমি যা দেখেছি সেই বয়ানে বলা যায়, সরকারের মোটা দাগে উন্নয়নের যে চিত্র এবং আমাকে যে চিত্রটি বেশি আলোড়িত করেছে, তা হলো প্রযুক্তি উন্নয়ন।

আমরা পৃথিবীর পথে হাঁটতে চাই। তার জন্য আমাদের তেমন বাহন দরকার। সেই বাহন হলো যোগাযোগের মুক্ত পথ। আমরা সহজে যা বুঝি তা হলো নেটওয়ার্ক। এ প্রসঙ্গে মোবাইলের কথা বলা যায়। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার হলো এই মোবাইল। কত সহজে, কত দ্রুত আমরা প্রাপককে পেয়ে যাই। ঘরে বসে কিংবা ক্ষেতের আঁলে বসে যখন কোনো কৃষক তার শহরে বা বিদেশে থাকা পুত্রের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলেন তখন পৃথিবীর তাবৎ বিস্ময় বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে।

এই দেশে মোবাইলের আগমন ঘটে নব্বই দশকে। যদিও এর প্রচলন উন্নত দেশগুলোতে অনেক আগেই শুরু হয়েছে। কিন্তু আমরা শুরু করেছি পড়ে। কারণ সব কিছুতে আমাদের সংশয়। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তারা তাদের একজন নেতাকে এই মোবাইল কোম্পানি খোলার অনুমতি দিয়ে মনোপলি কারার শুরু করে। সেই কোম্পানির নাম সিটিসেল। সেই সময় মোবাইল ফোন বিরাট বিস্ময় হয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হয়। মোবাইলের সংযোগ নেয়ার জন্য তখন অনেক টাকা গুনতে হতো। সাধারণের জন্য সেই মোবাইল ছিল বিলাসিতার নামান্তর। অনেকে মজা করে বলেছেন, মোবাইল ব্যবহার আর হাতি পালা সমান খরচ। নিদেনপক্ষে এক লাখ টাকা খরচ করে সিটিসেলের সেট নিতে হতো। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আরো কয়েকটি কোম্পানির হাতে মোবাইলের লাইসেন্স তুলে দেয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজার শুরু হয়। মোবাইল তারপর মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১০ কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করছেন।

এবার আসা যাক আধুনিক বিজ্ঞানের জটিল আবিষ্কার ইন্টারনেট প্রসঙ্গে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তখন বিশাল একটা সুযোগ এসে যায় আমাদের সামনে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সাইবার-ক্যাবল চলে গেছে, জাপান কর্তৃপক্ষ আমাদের সেই ক্যাবলের সংযোগ বিনে পয়সায় দিতে চেয়েছিল। তদানীন্তন বিএনপি সরকার সেই সংযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। তারা যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার হয়ে যাবে। এমন উদ্ভট হাস্যকর যুক্তির পর আমরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলাম। পিছিয়ে গেলাম পাঁচ বছর। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে টাকার বিনিময়ে ইন্টারনেট ক্যাবলের সংযোগ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে আমরা পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। যেটা আমাদের বিনে পয়সায় পাওয়ার কথা, সেই জিনিস ৫ বছর পর পেলাম টাকার বিনিময়ে। কথায় বলে গাধা পানি ঘোলা করে খায়। আমরাও তেমনি পানি ঘোলা করে খেয়েছি।

বর্তমান সরকারের এই অবদানকে অনেকে অস্বীকার করলেও তাতে সরকারের উন্নয়নের ঘাটতি কমে যাবে না। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলা যেতে পারে। আমি কাঁচা বাজারের যেখান থেকে মাছ কিনি সেই মাছ বিক্রেতার গল্প। ভদ্রলোক একটি চৌবাচ্চা তৈরি করেছেন। সেখানে তাজা মাছ পাওয়া যায় বিধায় আমি তার নিয়মিত ক্রেতা। সমস্যা হলো মাছ বিক্রেতা আমাকে পেলেই রাজনৈতিক কথাবার্তা শুরু করেন এবং তীব্রভাবে বর্তমান সকোরকে আক্রমণ করে কথা বলেন। আমি বুঝতে পারি না, তিনি আমাকে পেলে এমন ধরনের কথা কেন বলেন? তার কথা শুনে প্রথমে মনে হয়েছিল তিনি বোধহয় আমার সঙ্গে মজা করছেন। পরে দেখলাম উনি বেশ সিরিয়াস। সেই থেকে আমি তার কোনো কথারই জবাব দিতাম না। জবাব না দেওয়ার আরো একটি কারণ, আমি নিজে যেহেতু কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই তাই অযথা এবং অর্থহীন কোনো রাজনৈতিক আলোচনায় বিরক্তবোধ করতাম। আমি তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ভাইজান, আপনি আমাকে দেখলে রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা বলেন কেন? উনি হেসে বললেন, আপনাকে বলতে ভালোলাগে। আপনি জ্ঞানী মানুষ। তাই দুকথা বলে মনে ভাবটা দূর করি। আমি নিশ্চিত, উনি ধরে নিয়েছেন আমি তার সমমনা। হেসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি রাগ করেন? আমি জবাব না দিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে প্রশ্ন করলাম, আপনি বিএনপি না জামায়াত, কোনটা সমর্থন করেন? উনি বললেন, কোনোটাই করি না।

তার জবাবটা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। তার বেশভুষা জামায়াতের আদলে। মুখে কদমছাঁট দাড়ি। মাথায় খাড়া ধরনের টুপি। পুরোটাই জামাতী ঢং। যা হোক, সেদিন আমাদের আলোচনা সেখানেই ইতি ঘটে। আমার অনাগ্রহে সেই আলোচনা আর বেশিদূর এগোয়নি। একদিন রাতে বাসায় ফেরার পথে বাজারে ঢুকেছি। মাছ বিক্রেতা আমাকে দেখে হেসে বললেন, স্যার, বড় একটি মাছ আছে, নিয়ে যান। আমি দেখলাম, চৌবাচ্চায় বড় একটি কাতল মাছ চারপাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাছটি দেখে আমার ভীষণ লোভ হয়। যেহেতু তাজা মাছ তাই দাম একটু চড়া এবং একদাম। ভদ্রলোক দামাদামি পছন্দ করেন না। মাছটি ওজন করার পর দাম গিয়ে দাঁড়ালো আড়াই হাজার টাকার মতো। আমার কাছে অত টাকা নেই। কিন্তু মাছটি নেয়ার লোভও সামলাতে পারছি না। আমার ইতস্তত দেখে বিক্রেতা আমাকে বাকি দেয়ার কথাও বললেন। আমি তার কাছ থেকে বাকিতে মাছ নেব না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আশপাশে বিকাশের দোকান আছে কিনা? উনি হাত উঁচিয়ে দেখালেন, কাছেই একটি বিকাশের দোকান। আমি বাসায় ফোন করে বললাম, আমার নম্বরে কিছু টাকা বিকাশ করো। এখনই। বাসা থেকে টাকা বিকাশ করার পর আমি বিকাশের দোকানে গিয়ে টাকা তুলে দোকানিকে টাকা দিলে তখন ওই বিক্রেতা বললেন, বিকাশ হওয়ায় মানুষের অনেক সুবিধে হয়েছে। আমি তখন সুযোগ পেয়ে হেসে বললাম, এবার তাহলে শেখ হাসিনা একটু হলেও ধন্যবাদ দেয়া যায়, কি বলেন?

আমার এই কথার জন্য ভদ্রলোক প্রস্তুত ছিলেন না। বলা যায় আমার কথা শুনে হকচকিয়ে গেলেন। কোনো জবাব খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তার ভঙ্গি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল আমাকে তিনি তার সমমনা ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন ভাবছেন উল্টো। তিনি বুঝতে পারছেন না, এর সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দেয়ার কি সম্পর্ক? আমি তাকে ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বললাম, আপনার মোবাইলে যে ইন্টারনেট চালাচ্ছেন, সেটা শেখ হাসিনার অবদান। আপনার প্রিয় দেশনেত্রী এই নেট দেশে ব্যবহার করতে রাজি হননি। তাহলে নাকি দেশে তথ্য পাচার হয়ে যাবে। আচ্ছা আপনি বলেন, দেশের কি বা গোপন তথ্য আছে আর পাচারই বা হবে না কি? এই অজুহাতে আপনার দেশনেত্রী এই নেটের সংযোগ নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। শুনলে আপনি অবাক হবেন, আপনার নেত্রী এখন নিজেও ফেসবুক ব্যবহার করেন। তখন কি তার অতীত মনে পড়ে না? লোকটি ফ্যাল ফ্যাল করে আমারে নির্বাক তাকিয়ে আছেন। কথা বলতে পারছেন না। তার সব কথা যেন হারিয়ে গেছে।

এই লোকটিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। অনেক বিদ্যান ব্যক্তি সাদা চোখে সরকারের উন্নয়ন দেখতে পান না। তারা মনের চোখে টিনের চশমা পরে থাকেন। তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর থেকে এই শ্রেণি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আমরা যতটা খুশি, তারচেয়ে কয়েক গুণ মানুষ অখুশি। এই কারণে শেখ হাসিনা তাদের খুব অপছন্দের মানুষ। তাতে আমরা অবশ্য মোটেও ভাবিত নই। ভাবনা অন্য জায়গায়। সরকার নিজের গোয়াল সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সে আলোচনা অন্য একদিন। আজ আরো একটি ইন্টারনেট বিষয়ক গল্প বলে লেখাটা শেষ করতে চাই। গত ৪ ফেব্রুয়ারি লন্ডন থেকে আমার একজন পরিচিত মানুষ, নাম সুজা মাহমুদ, আমাকে ম্যাসেঞ্জোরে ফোন করে বললেন, ৪ তারিখ বিকেল ৩টায় আপনি ফেসবুকে থাকবেন। লন্ডন থেকে প্রচারিত ‘বেতার বাংলার’ জন্য আমরা আপনার একটি ইন্টারভিউ নেব।

ব্যাপারটা সম্পর্কে তখনো আমার কোনো ধারণা ছিল না। কারণ এই ধরনের ইন্টারভিউ এর আগে কখনো আমি দেইনি বা দেয়ার সুযোগ হয়নি। আমি এক ধরনের টেনশন ফিল করছিলাম। যা হোক বেলা ৩টা নাগাদ সুজা মাহমুদ আমাকে ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কল দিলেন। আমি ফোন রিসিভ করতেই সুজা মাহমুদের চেহারা মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো। আমার ৩০ বছরের পরিচিত সুজা মাহমুদকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। তিনি বললেন, আপনার সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেবেন কবি শামীম আজাদ। কবি শামীম আজাদের নাম শুনে আমি আরো উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। কবি শামীম আজাদের সঙ্গে আমার পরিচয় সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায়। সেখানে তিনি চাকরি করতেন। আমরা সেখানে লিখতাম। সেই থেকে তার সঙ্গে পরিচয় এবং সম্পর্ক।

একটু পর মোবাইল স্ক্রিনে শামীম আজাদের চেহারা ভেসে উঠলো। আমরা দুজনই আনন্দে হ্যালো বলে উঠলাম। তারপর শুরু হলো আমাদের আলাপচারিতা। শামীম আজাদ আমাকে প্রশ্ন করছেন, আমি তার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। আমাদের সেই কথা প্রচার হচ্ছে লান্ডন থেকে প্রচারিত ‘বেতার বাংলা’ রেডিওতে। অদ্ভুত ব্যাপার। সেই রেডিও আবার শ্রোতারা শুনছে। তারা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছে। সেই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন সুজা মাহমুদ। প্রায় ঘণ্টা দুই আমাদের আলাপচারিতা চলল। শেষে আমরা পরস্পরের কাছ থেকে মোবাইলের লাইন অফ করে বিদায় নিলাম।

এই যে ঢাকায় বসে সুদূর লন্ডনের রেডিওতে সাক্ষাৎকার দিলাম সেটা কার দৌলতে? কার অবদানে? এই সত্য যারা স্বীকার করতে চান না তারা কোনোদিন সত্যকে স্বীকার করার সাহস পাবেন না। তারা মিথ্যার চোরাগলিতে সারা জীবন ঘুরপাক খাবেন। তাদের জন্য করুণা করা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। আমরা যা সত্য তা বলবোই। এই অবদান নিঃসন্দেহে এই সরকারের এবং মোদ্দা কথা মূল অবদান শেখ হাসিনার। আমি তার সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj