বিকার মুক্ত হোক বাংলাদেশ : সৈয়দ জাহিদ হাসান

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে এখন আমি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে গিয়ে মর্যাদা বোধ করি। আমার এই আত্মমর্যাদাবোধ আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। দুই দশক আগেও যেখানে দাঁড়ালে আমার পা টলতো, এখন সেখানে দাঁড়িয়ে আমি আমার স্বপ্নের কথা, দুর্লভ অর্জনের কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। আমার দেশ শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশালী হোক, আমার মাতৃমাটি, আমার ভূখণ্ড-মহিমান্বিত হোক- এ প্রত্যাশাই আমৃত্যু লালন করি। আমি পৃথিবীর সবদেশকেই ভালোবাসি, কিন্তু বাংলাদেশকে আমি শুধু ভালোই বাসি না, বাংলাদেশের সম্মানের জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত। আমি সব সময়ই বলি, হে প্রিয় স্বদেশ- তোমার মঙ্গলের জন্য, মুক্তির জন্য- তুমি আমার জীবনকে কবুল করে নাও। আমি বিশ্বাস করি প্রতি বাঙালি সন্তানই এমন ভাবনা ভাবেন।

অতীতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে যারা খাটো করে দেখেছেন, বাংলাদেশকে নিয়ে যারা দায়িত্ববোধহীন, নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন আজ তারা অনেকেই তাদের সেই বিবেচনাহীন মন্তব্যের জন্য লজ্জিত বলেই আমি মনে করি। বাংলাদেশ জমাটবাঁধা অন্ধকার ছিঁড়ে আলোর অভিমুখে যে গতিতে বর্তমানে এগিয়ে যাচ্ছে একজন নাগরিক হিসেবে তাতে আমি আনন্দিত। মৃত্যুশয্যার মুমূর্ষু পরিস্থিতি থেকে মুহ্যমান বাংলাদেশ বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ভেদ করছে একের পর এক লক্ষ্যবিন্দু, উচ্ছ¡সিত প্রশংসা পাচ্ছে বিশ্ববাসীর, এ মুহূর্তে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু নেই। বাংলাদেশ বিগত দিনে রুগ্ণ ছিল, অসহায় ছিল। বর্তমানে তাকে সবল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। দুই দশক আগের বাংলাদেশ আর বর্তমানের বাংলাদেশের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এই সময়ের বাংলাদেশের উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখলে অন্তত তা-ই মনে হয়।

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে বিকারের বেড়াজালে বন্দি। বিকারের এই জাল ছিন্ন করতে হবে। বিকার ব্যাধিকে দূর করার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ উন্নয়নের জন্যও এখন আমাদের কাজ করা জরুরি। শুধু কাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে আমরা আমাদের বাংলাদেশকে সাজাতে চাই না। সেই সঙ্গে মানুষের মানবিক সম্পর্কও নবায়ন করা দরকার।

আমরা দেখছি বাঙালি বর্তমানে ইতিহাস শুনতে ভালোবাসে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললে বিরক্তি বোধ করে। দেশদ্রোহী যারা, যারা নির্দয়, ঘাতক; তাদের জন্য আজো কতিপয় বাঙালির দরদের কোনো সীমা নেই। নষ্ট-ভ্রষ্টদের জন্য যারা সহানুভূতি দেখায় তাদের আমি বিকারগ্রস্ত বলেই মনে করি। একটি বিকারগ্রস্ত জাতি আর যাই পারুক হীনমন্যতার দুর্বলতাকে কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত কারো মনে দুর্বলতা কাজ করে ততক্ষণ তার পক্ষে শক্তিমান হওয়া, স্বাবলম্বী হওয়া অসম্ভব। আমরা বহু বছর ধরে ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসব দেখেছি। লিখিত প্রামাণ্য ইতিহাসকে কীভাবে কাটাছেঁড়া করে বিকৃত করা যেতে পারে এবং সেই বিকৃত ইতিহাস কীভাবে আবার প্রতিষ্ঠা পায় সেসব দেখে তাজ্জব বনে গেছেন বাংলাদেশের মানুষ। ইতিহাসের ধারাবিবরণী যারা বিকৃত করতে চায়, তারা ভুল করে। এই ভুল একদিন তাদের গলার ফাঁস হয়েই তাদের মৃত্যু রচনা করে। সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে যারা ফায়দা লুটতে চায় তারাই একদিন সাধারণ মানুষের পদতলে পিষ্ট হয়। এমনটাই আমরা বারবার দেখেছি। এখনো এই চিরচেনা নাট্যাংশ প্রতিমুহূর্তে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক সংকট নেই এমন নয়, অবশ্যই এ দেশে রাজনৈতিক সংকট বিদ্যমান। পৃথিবীর প্রায় দেশেই রাজনীতি এখন বিকলাঙ্গ আকার ধারণ করেছে। আমেরিকা বলি আর ভারতই বলি- সবদেশেই রাজনৈতিক প্রতিবন্ধিত্ব দৃশ্যমান। সেই তুলনায় আমাদের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। আমাদের দেশে এখন যে সংসদ চলছে সেই সংসদের সব অধিবেশনই সরাসরি দেখা যায়। টিভির পর্দায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন দেখে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সংসদ অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। কীভাবে আমি এমন কথা বলছি- আমাকে যদি এ প্রশ্ন করা হয় তাহলে বলবো- বিগত চার বছরে এ দেশের সংসদ অধিবেশনে যে শান্তি-শৃঙ্খলা ছিল তা আমি আগে কখনো দেখিনি। বিরোধী দল সংসদে যাবে আর ওয়াক আউট করে চলে আসবে- এটা কোনো কথা নয়। আমরা কার্যকর সংসদ যেমন দেখতে চাই, তেমনি রাজপথেও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ চাই। ছোট আকারে হোক আর যে আকারেই হোক বাংলাদেশের রাজনীতি এখন নতুন পথে চলতে শুরু করেছে। এই নতুনকে কে কীভাবে দেখছেন জানি না, তবে এ ধারাটুকু আছে বলেই প্রত্যাশায় বুক বাঁধতে পারছে বাংলাদেশ। আমরা কম ভালো চাই, অনেকখানি মন্দ চাই না।

ছোট্ট এই বাংলাদেশের বুকে আমরা যারা বাস করি- তাদের পক্ষেই সম্ভব বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন সাধন করা। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করি- ভুল না-করার ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা সতর্ক থাকি, তাহলেই পারবো সুখী-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। ব্যক্তি-ইমেজে বা দলীয় মোহে অন্ধ না হয়ে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করার মানসিকতাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। দলীয় নেতার ভুলগুলো শোধরানোর জন্য যদি সমালোচনা করা সম্ভব না হয়- তাহলে সেই দল ত্যাগ করাই সমীচীন। যে দলে সম্মান নেই, যে দলের সংস্রবে থাকলে জেলখানাই হবে আগামী দিনের ঠিকানা, সে দলে থাকার চেয়ে দলহীন থাকাও ভালো।

বাংলাদেশে মৌলবাদ এখন কিছুটা নিস্তেজ বলেই মনে হয়। মৌলবাদের এই নির্জীবভাব দেখে আমাদের উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পুঁজিবাদের স্বার্থেই দেশে দেশে মৌলবাদ টিকিয়ে রাখা হবে। সুতরাং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব মৌলবাদ ধ্বংস করা। এ ব্যাপারে জনতার সম্মিলিত ঐক্যই ভরসা।

চিন্তার বিকাশ আজ অনেক ক্ষেত্রেই বাধা পাচ্ছে বাংলাদেশে। এই বাধার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার চেয়ে ব্যক্তি নিজেই দায়ী বলে মনে হয়। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, ঘুষ খাওয়ার প্রবণতা, ধর্ষণ, খুন, লুট, সন্ত্রাস সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যক্তির দায়ই বেশি। ব্যক্তি ভালো হলে এসব এমনিতেই নির্মূল হয়ে যাবে। আর রাষ্ট্রকেই যদি এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হয়- তাহলে অন্যান্য খাতে উন্নয়ন ধীরগতিতে হওয়াই স্বাভাবিক।

দুর্বুদ্ধি বা দুষ্কর্ম দিয়ে ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে থাকা নীতিশাস্ত্রে পাপ বলেই গণ্য। যে লোকের যে পদে দায়িত্ব পালন করার দক্ষতা-যোগ্যতা নেই, সে লোককে সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়াই উত্তম। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি অব্যাহতি নিতে গড়িমসি করেন, তাহলে আমাদের উচিত তাকেই অব্যাহতি দেয়া। বাংলাদেশের সর্বত্র এই নিয়ম অনুসরণ করা দরকার। কারো জন্য বিশেষ সুবিধা নয়, সবার জন্য সমান সুযোগ চাই। বাংলাদেশ এমন রাষ্ট্র হোক, যে রাষ্ট্রে দুর্নীতি নয়, সুনীতির চর্চা দেখতে চাই। যে রাষ্ট্রে দুঃখ নয়, গøানি নয়- মানুষ শুধু সুখ ভোগ করবে। একটি সুখী রাষ্ট্র গঠন করা মোটেই অসম্ভব নয়- এ জন্য দরকার জনগণ ও সরকারের সদিচ্ছা। ব্যক্তি যদি অন্ধকার ভালোবেসে অন্ধকারে মুখ গুঁজে বসে থাকে, তাহলে কেউ তাকে আলোর দিশা দেখাতে পারবে না। চারদিকে আজ শুদ্ধতার আলো ছড়িয়ে পড়ছে, আমরা কি পারি না সেই অমল আলোতে অভিষিক্ত হতে?

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj