বাংলাদেশের ‘পুস্তশবিহীন’ ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায় : পাভেল পার্থ

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মান্দিকুসুকে (মান্দিদের আচিক ভাষা) অরণ্যকে বলে ‘ব্রিং’। অরণ্যের বললে ‘ব্রিং’-এর সাথে ‘নি’ যুক্ত হবে। ব্রিংনি মানে অরণ্যের। যেমন, ব্রিংনি বিবাল। মানে অরণ্যের ফুল। যেমন, গাজিনি সঙ মানে গাজির গ্রাম। গাজি মারাক নামে এক সাহসী মান্দি পুরুষের নামে বাংলাদেশের এক পাহাড়ি শালবনে এককালে গড়ে উঠেছিল এই মান্দি গ্রাম। নিদারুণভাবে গ্রামটি আর নেই। বাংলাদেশ বনবিভাগ এই জায়গা দখল গড়ে তুলেছে গজনী অবকাশ কেন্দ্র। একবার ২০০০ সালের ডিসেম্বরে ক্ষয়িষ্ণু সেই শালবনে পরিচয় হয় এক প্রবীণ কোচ নারীর সাথে। ঝরা শালপাতা কুড়িয়ে গ্রামে ফিরছিলেন তিনি। গজনী অবকাশ কেন্দ্রের ভেতর এক উঁচু ভিটা দেখিয়ে জানান, এককালে এখানে কোচদের খাঙখাঙি পূজাস্থল ছিল। জানান, কেবল মান্দি নয়; এখানে কোচ ও হাজং বসতও ছিল এককালে। অরণ্য জুড়ে ছিল সকলেরই নানা পূজাস্থল। সকল পূজাস্থল হারিয়ে কোচ সমাজে এখন আর নিয়মিত খাঙখাঙি পূজা আয়োজন হয় না। খাঙখাঙি কোচ আদিবাসীদের এক নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসের এক আরাধ্য দেবতা। খাঙখাঙির হারানো যন্ত্রণা নিয়ে দেশের নানাপ্রান্তে নানা জাতির নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস ও দর্শন বোঝার চেষ্টা করি। বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করি বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছেন যাদের কোনো ধর্মপুস্তক নেই, অথচ হাজার বছর ধরে তারা নিজ নিজ নানা ধর্মবিশ্বাস জীবন্ত করে রেখেছেন। দেশে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা, কিয়াং, গুরুদুয়ারা, আখড়া, ধামসহ নানা ধরনের স্থাপনা আছে। বিতর্ক আছে তারপরও রাষ্ট্র এ সকল ধর্মীয় স্থাপনার জন্য নানা সময়ে নানা বরাদ্দ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে। কিন্তু পুস্তকবিহীন ধর্মের স্বীকৃতি দূরে থাক রাষ্ট্র এসব ধর্মপালনকারীদের পূজাস্থলের জন্য কোনো সহযোগিতা বা বরাদ্দ দিতে উৎসাহী হয়নি কখনো। পুস্তকবিহীন ধর্মবিশ্বাসকারীদের পূজাস্থলগুলি সমসময় সর্বজনীন হয় এবং তা কোনো না কোনো প্রাকৃতিক বন, জলধারা বা বিশেষ বাস্তুসংস্থানে গড়ে ওঠে। কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের সংঘাত বা দখল নয়, উন্নয়নের নামে রাষ্ট্র নিজেও নিদারুণভাবে পুস্তবিহীন ধর্মবিশ্বাসীদের পবিত্র ধর্মস্থলগুলো নানা সময়ে চুরমার করে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। দেশজুড়ে নিরন্তর দখল ও ভাংচুর হওয়া এসব ধর্মস্থলের কোনো খবর দায়িত্বশীল ও অসাম্প্রদায়িক হিসেবে পরিচিত আমাদের গণমাধ্যমগুলো এসব খবর প্রকাশ বা প্রচার থেকে বিরত থাকে। উত্তরবঙ্গ জুড়ে প্রায়ই রাতবিরেতে সৗরি সারনা ধর্মপালনকারী সাঁওতালদের পবিত্র ধর্মস্থলগুলো ভেঙেচুরে দেয় কেউ, পার্বত্য চট্টগ্রামে দখল হয়ে যায় ¤্রােদের ধর্মস্থল। আশ্চর্যরকমভাবে এসব অপরাধ বিচারহীনই থাকে বছরের পর বছর। কিন্তু ২০১৮ সালে এক ‘অতি বিস্ময়কর’ ঘটনা ঘটেছে। আসলে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান অনুযায়ী এটিই হওয়ার কথা ছিল। যেহেতু হয়নি তাই ‘অতি বিস্ময়’ জাগে মনে। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ৪নং ভানগাছি ইউনিয়নের বাঁশাবাড়িয়া গ্রামে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহযোগিতায় সাঁওতালদের একটি মৗঞ্জহি থান তৈরি হয়েছে। গ্রামবাসী একটি মৗঞ্জহি থানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন করেন। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে তাদের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করে সরকার। গ্রামের রবি মার্ডী মৗঞ্জহি থানের জন্য প্রায় ২ শতক ভূমি দান করেন। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই মৗঞ্জহি থান উদ্বোধন করেন। আশা জাগে মনে হয়তো রাষ্ট্র সাঁওতাল গ্রামে গ্রামে জাহেরথান, দিশম জাহের, মৗঞ্জহি থানের জন্য দারুণ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। স্বপ্ন দেখি, টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের চুনিয়া গ্রামের প্রবীণ স্কুথং (দার্শনিক) জনিক নকরেকের শত বছরের সংগ্রাম স্বীকৃতি পাবে। চুনিয়া গ্রামে সাংসারেক ধর্মপালনকারীদের জন্য একটি মিদ্দিআসং নির্মাণে এগিয়ে আসবে সরকার। হয়তো রাষ্ট্র বাংলাদেশের পুস্তকবিহীন ধর্মের স্বীকৃতি, সুরক্ষা ও বিকাশে সাহসী হবে। ২০১৩ সালে ‘বাংলাদেশের পুস্তকবিহীন ধর্ম’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। আবারো সকলের কাছে লেখাটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এই চরতি আলাপখানি হাজির করলাম।

প্রবলের ‘ধর্মীয় অনুভূতি’

‘ধর্মীয় অনুভূতি’ বলে বেশ কিছু উন্মাদনা ও বাহাস আমরা সমসাময়িককালে প্রবলভাবেই টের পেয়েছি। কক্সবাজারের রামুতে যখন বৌদ্ধসভ্যতা ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হয় তখন একদিকে ‘মুসলিম’ এবং আরেকদিকে ‘বৌদ্ধ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুভূতি’ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে আমাদের জানা হলো। যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতকদের বিচার ও রায়ের ভেতর দিয়ে দেশব্যাপী হিন্দুদের ওপর যে নির্যাতন ও ভাঙচুর হয় সেখানে হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। আবার জামায়াত ও হেফাজতে ইসলাম শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ও বাংলা ব্লুগের কিছু লেখাকে ঘিরে ‘ইসলাম ধর্মের অনুভূতিতে’ আঘাত লাগায় এক ধরণের উন্মাদনা তৈরি হয়। সমসাময়িককালে বৌদ্ধ, হিন্দু, ইসলাম এ তিন ধর্মাবলম্বীদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাত লাগার কথা আমরা নানাভাবে জানতে পারি। এছাড়া ১৯৪৭, ১৯৬২ কি বিভিন্ন সময়ে ‘ দেশভাগ’, ‘সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা’ এসব ঘটনা ও প্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে আমরা বরাবরই ‘হিন্দু ধর্মের অনুভূতিতে’ আঘাত লাগার ঘটনা জেনেছি। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতেও’ আঘাত লাগার বিষয়টি আমাদের দেখতে হয়েছে। ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ প্রসঙ্গ টেনে আজকের আলাপে আমরা দেশে বহমান কিছু অনুচ্চারিত প্রশ্নহীন কায়দায় দাবিয়ে রাখা নিম্নবর্গের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে কথা তুলছি। কারণ আমরা হয়তো বরাবরের মতো ধরেই নিয়েছি, ইতিহাসে কেবলমাত্র ‘প্রাতিষ্ঠানিক পুস্তকি ধর্মেরই’ ধর্মীয় অনুভূতি আছে আর কারো ধর্মীয় অনুভূতি থাকতে নেই। বা আমরা হয়তোবা এই খোঁজখবর রাখবারও তাগিদ বোধ করিনি কোনোকালে, যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রবল ধর্মগুলো বাদে রাষ্ট্রে আর কি কি ধর্ম বহাল আছে কি নেই? কী তাদের সীমানা কী তাদের পরিসর। যদিও অধিপতি ব্যবস্থার প্রবল মতাদর্শ ও শিক্ষাই আমাদের ‘ধর্র্ম’ বলতেই বুঝিয়েছে, ইসলাম-খ্রিস্টন-বৌদ্ধ আর খুব তলানি খুঁজলে ‘সনাতন হিন্দু’। চলতি সময়ে যখন ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হিসেবে একটি প্রত্যয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গণ্ডি ও সীমানাকে প্রশ্ন করেছে, সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বাইরের অপরাপর মুমূর্ষু রক্তাক্ত ধর্মসমূহের গগণবিদারী চেপে রাখা আওয়াজ থেকেই আলাপটি শুরু হচ্ছে। আমরা নিঃসন্দেহে জানি কেবলমাত্র বিশ্বাস আর রীতিপ্রথা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মসমূহ বরাবরই ক্ষমতা, বাণিজ্য আর বাহাদুরিকেও তার টিকে থাকা ও বিস্তৃতির শর্ত হিসেবে আন্দাজ করে। ঐতিহাসিকভাবে তাই আমরা অনেকখানেই দেখতে পাই কেবল ধর্ম নয়, টিকে থাকছে ক্ষমতার গণিত ও শ্রেণি কি বর্গের ঐতিহাসিক দ্বা›িদ্বকতা। আমরা নিশ্চয় এমন কখনো শুনতে পাই না, হিন্দু মন্দির ভেঙেছে কোনো মুসলিম নারী কিংবা রামুর বৌদ্ধমূর্তি ভেঙেছে কোনো ‘মুসলিম জঙ্গি নারী’। মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন সাঁওতাল কি বাঙালি হিন্দু কি মুসলিম সকল নারীকেই পাকসেনা মুসলিম মরদেরা নৃশংসভাবে অত্যাচার করেছিল।

বিশ্বের সকল মুসলিম এক ধর্মীয় সম্প্রদায় কিংবা ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ব’ প্রত্যয়টির চাউর থাকলেও আমরা শ্রেণিবিভাজিত সমাজের দ্ব›দ্ব ও সংঘর্ষকে দুম করে উড়িয়ে দিতে পারি না। আবার একে আড়াল করে দাবিয়ে রাখাও অন্যায়। অরাজনৈতিক। নিম্নবর্গের ধর্মবোধের জায়গা থেকে এটি ‘ধর্মহীনতার’ শামিল। বিষয়টি বলছিলাম এ কারণে যে, একজন শহরের বাঙালি মুসলমান, গ্রামের একজন বর্গাচাষি, একজন পাঙাল মানে মণিপুরী মৈতৈ মুসলিম কি একজন মুসলিম বেদে কি একজন মুসলিম জোলা বা হাওরাঞ্চলের একজন মুসলিম জেলে মাইমল কখনোই কোনোভাবেই একই ধর্মীয় পরিচয়ের পরেও একই সীমানা ও সুরক্ষা নিয়ে বিরাজ করছে না সে জায়গাটিকে খোলাসার জন্য। তার মানে হলো ধর্ম সমাজের শ্রেণি, ক্ষমতা কাঠামো, অর্থনীতির বিন্যাস, উৎপাদনের রাজনীতি ও যাপিতজীবনের সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। আমরা ধর্মের নানান রূপকল্প কি তাত্তি¡ক মেজাজ তৈয়ার করতে পারি কিন্তু যাপিতজীবন থেকেই কিন্তু এখনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম কি অপ্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলো জিইয়ে আছে। তার মানে একজনের ধর্মীয় পরিচয়ই আজকে আর কেবলমাত্র কোনো একটি পরিচয় হিসেবে থাকছে না, এখানে জড়িত হয়ে পড়ছে ব্যাক্তি কি সমষ্টির শর্ত ও টিকাভাষ্যসমূহ।

পাশাপাশি নয়াউদারবাদী এ করপোরেট বিশ্বায়িত দুনিয়ায় যখন আযান কি গায়ত্রী মন্ত্র মোবাইলের রিং টোন হয়ে ওঠে তখন কিন্তু আমরা একে ‘পিৎজা হাট কি কোকোকোলা মানসিকতা’ থেকে আলাদাভাবে পাঠ করতে পারি না। সা¤প্রতিক সময়ে মূলত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছ থেকে আমরা ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ এক সমসাময়িক ব্যাখা পেয়েছি। ধর্মীয় পুস্তক এবং ধর্মসংশ্লিষ্ট মান্য ব্যক্তি ও পবিত্র ধারাকে অবমাননা, কট‚ক্তি, হেয় প্রতিপন্ন করা এবং বিরোধপূর্ণ উপস্থাপনকেই ‘ধর্মীয় অনুভূতির আঘাত’ হিসেবে সমসাময়িককালে বহুলভাবে উচ্চারিত হয়েছে। আর ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ এ সা¤প্রতিক ব্যাখাকেই সঙ্গী করে দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়িত ধর্মসূহের রক্তাক্ত সীমানা ও পরিসর বিষয়ে চলতি আলাপ শুরু হচ্ছে।

‘মহানুভব ধর্ম’ ও নিপীড়িতের ‘অধর্ম’

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মধারাগুলো কাল থেকে কালে, ভূগোল থেকে ভূগোলে একমাত্র ‘মহানুভব ধর্ম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে নিজেদের। পাশাপাশি সমাজস্তরে বিদ্যমান অপরাপর পুস্তকবিহীন ধর্মধারাগুলো বরাবরই ‘অধর্ম’ বা ‘ধর্মহীন’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আদিবাসী খাসিদের জেন্টিল বা ছোনং, মান্দিদের সাংসারেক, মৈতৈ মণিপুরীদের আপোকপা, সাঁওতালদের সৗরি সারনা ধরমসহ ‘নামহীন’ আরো অগণিত ধর্মধারা সম্পর্কে আমরা ক’জন জানি? পাশাপাশি মতুয়া, ভগবানিয়া, কর্তাভজা, ক্রামা ধর্মমতসমূহও কিন্তু প্রবল ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ বাইরেই টিকে আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে যতগুলো জনশুমারী হয়েছে সেখানে জনগণের পরিচয় কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পুস্তকি ধর্মের ভেতর দিয়েই নথিবদ্ধ হয়। অপরাপর ধর্মধারাসমূহ অধিকাংশ গণনা ও শুমারিতে ‘অন্যান্য’ হিসেবেই আখ্যায়িত হয়। কিন্তু স্মরণে রাখা জরুরী উলি­খিত প্রতিষ্ঠান ও পুস্তকবিহীন ধর্মধারাসমূহ যা এখনো দেশের অনেক আদিবাসী সমাজে বহমান তা কোনোভাবেই সেসব সমাজ ও ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে কোনোভাবেই কোনো ‘অন্যান্য’ বা ‘অপর’ বিষয় নয়। ধর্মকে যখন রাষ্ট্রের পরিচয় ও নিরাপত্তার সীমানা প্রাচীরের উপাদান ও উপলক্ষ করা হয়েছে তখনই এটা দেখা যায় ঔপনিবেশিক সব ক’টা দুয়ার খুলে দেয়ার আহ্বান জানায়। পুস্তকভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোর সাথে জাতিসমূহের নিজ নিজ ধর্মের অস্তিত্বগত বিরোধ ও সীমানা নির্ধারিত। পুস্তকি গবেষকদের ভেতর মূলত সাংস্কৃতিক ও ধ্রæপদী ঘরানার নৃবিজ্ঞানী এবং ফোকলোরবিদেরা পুস্তকভিত্তিক ধর্মের স্বকীয় অস্তিত্ব স্বীকার করলেও অপুস্তকীয় ধর্মীয় চৈতন্য ও পরিসরকে সব সময়েই ‘এনিমিজম বা সর্বপ্রাণবাদী’ নামে একপাক্ষিক পরিচয় দাঁড় করিয়েছেন। অধিকাংশ সময় বলা হয় এরা গাছ-পাথর-প্রাণী-নদী-পাহাড় মূলত প্রকৃতিকে ‘পূজা’ করে এবং এরা ‘জড়োপাসক’। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলো নিজেদের একধরনের ‘মহানুভব’ চরিত্র খাড়া করালেও প্রান্তিক জাতিদের নিজস্ব ধর্মগুলো ক্ষমতাকাঠামোর ধর্মীয় ডিসকোর্সে প্রান্তিক ও ‘অধর্ম’ হিসেবেই বিবেচিত হয়।

ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় (১৯৯৮) তাঁর ‘জাতি ও নিম্নবর্গের চেতনা’ শীর্ষক একটি লেখায় জানান, যে ধর্মমতগুলো সমাজে একটি প্রভুত্বকারী সর্বজনীন নীতিব্যবস্থা স্থাপন করতে সমর্থ হয়, তাদের দুভাবে দেখা যেতে পারে। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর জন্য এই ধর্মমত সামাজিক বিভাজনগুলোর আদর্শগত ন্যায্যতা প্রতিপাদন করে, যার ফলে এই বিভাগগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধহীন বলে মনে হয় এবং সমাজে সম্ভাব্য বিভেদ এড়িয়ে ঐক্য স্থাপিত হয়। অন্যদিকে নি¤œবর্গীয় মানুষের সাধারণবোধের মধ্যে এই ধর্ম ঢুকে পড়ে এমন এক উপাদান হয় যা তাদের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক জগতের প্রবেশপথ দেখায়। এই ধর্মীয় উপাদান তখন তাদের সাধারণ বোধের অন্যান্য আদি উপাদানগুলোর সঙ্গে আপাত স্ববিরোধহীনভাবে মিলেমিশে সহাবস্থান করে। চেতনাকে বুঝতে গিয়ে যখন ধর্মকে বিশ্লেষণ করতে হয়, তখনই সেই ধর্ম আবার যে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে, তাদের চিহ্নিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়’। যেমন বাংলাদেশের হাজং, কোচ, বর্মণ, লালেং, জৈন্তিয়া, ওঁরাও, সাঁওতাল, রাজবংশী, ত্রিপুরা, ডালু, কোল, মুন্ডা, খাড়িয়া, হদি, বানাই আদিবাসীদের ভেতর যারা এখনো নিজস্ব ধর্মধারা লালনপালন করে আসছেন; তাদের অধিকাংশ সময়ই ‘হিন্দু সনাতন’ পরিচয়ে আখ্যায়িত করা হয় বা ‘হিন্দু’ পরিচয় চাপিয়ে দেয়া হয়। বাংলা একাডেমি থেকে ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের রাজবংশী : সমাজ ও সংস্কৃতি’ বইতে অশোক বিশ্বাস এ সম্পর্কে জানান, রাজবংশীরা সমাজে-জীবনে-মননে যে ভিন্ন সংস্কৃতির ধারা ও ঐতিহ্য লালন করে আসছে তা এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। দীর্ঘদিন ধরে বর্ণহিন্দুদের পাশাপাশি অবস্থান, সংস্পর্শ, সংশ্লেষণ প্রভৃতি কারণে তারা এখন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হয়ে পড়েছে’।

পাশাপাশি এ তর্কটি আমরা হরহামেশাই শুনে আসছি যে, খ্রিস্টীয় মিশনারিদের জন্য ‘আদিবাসীরা আজ নিজস্ব ধর্মধারা ত্যাগ করেছেন’। আদিবাসী সমাজের পরিবর্তনশীলতা বিষয়ক গবেষণায় এই ধর্মীয় পরিবর্তনশীলতা অনেকের কাছেই এক কেন্দ্রীয় বিষয়। এ বিষয়ে অরুণ চৌধুরীর (২০০৬) ‘সাঁওতাল অভ্যুত্থান ও উপজাতীয়দের সংগ্রাম’ বইতে দেখা যায়, বিশ শতকের শুরু থেকেই বরেন্দ্র এলাকায় সাঁওতারদের ভেতর খ্রিস্টান মিশনারির কাজ শুরু হয়। খ্রিস্টান মিশনারির প্রচারে কিছু সংখ্যক উপজাতীয় মানুষের মনে কিছু প্রত্যাশা ও খ্রিস্টধর্মের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হলেও সামগ্রিকভাবে সাঁওতাল উপজাতির মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ভালোভাবেই দেখা দেয়’। ১৯/১২/১৯৭৬ সালে ‘বাংলাদেশ পরিষদ ময়মনসিংহ’ কর্তৃক আয়োজিত ‘গারো সংস্কৃতি বিষয়ক সেমিনারে’ উত্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, ধর্মান্তরিত বা ভিন্ন ধর্মে অভিবাসিত মান্দিদের ভেতর এখনো নিজস্ব সাংসারিক ধর্মের চৈতন্য বিরাজমান। বর্তমানে কিছু সংখ্যক গারো উচ্চতর ধর্ম যেমন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের অবচেতন মনে এখনো সংস্কারবদ্ধ এমন সব ধারণাও রয়ে গেছে যেজন্য তাদের উপজাতি বলে আখ্যায়িত করা চলে’। খ্রিস্টীয় মিশনারির পাশাপাশি নিম্নবর্গের ধর্মধারার ওপর ‘ইসলামীকরণের’ প্রভাবও আলোচনার বিষয়। মেসবাহ কামাল, ঈশানী চক্রবর্ত্তী ও জোবাইদা নাসরীন তাঁদের ‘নিজভূমে পরবাসী উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রান্তিকতা ডিসকোর্স’ শীর্ষক বইতে এ প্রসঙ্গে জানান, উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে ধর্মীয় সমস্যার প্রথমতম দিক হচ্ছে ধর্মাচরণের বাধারোপ। এক্ষেত্রে বাধাপ্রদানকারীরা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান। আদিবাসীদের ধর্মান্তরিতকরণের ক্ষেত্রে মিশনারির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যেমন স্পষ্ট তেমনি ইসলামি আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা বাঙালি দাপুটে মুসলিমদের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠছে’।

অধিপতিশীল প্রক্রিয়ায় ‘অধর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত পুস্তকবিহীন ধর্ম বিষয়ে রাষ্ট্রের সংবিধান বা রাষ্ট্রীয় শাস্ত্র নিশ্চুপ থাকে এবং কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মসমূহের ক্ষমতাবিন্যাসে পরিবর্তন আছে বলে ধর্মীয় বিস্তার চিন্তাকাঠামোর উল্লম্ব বা আনুভূমিক পরিসরে কেন্দ্রাতিগ বা বিকেন্দ্রিক হয় না। এভাবে পুস্তকবিহীন ধর্মবিশ্বাসীরা ঐতিহাসিকভাবেই তার আপন ধর্মের আবাস থেকে উদ্বাস্তু হয়, বিচ্ছিন্ন হয় এবং বহিরাগত চাপ ও উদ্বেগসমূহ তাকে ‘ভিন্ন পরিচয়ে’ টিকে থাকতে বাধ্য করে। পরিণামে আমরা রাষ্ট্রব্যাপী এরকম নিপীড়িত ‘ধর্মীয় উদ্বাস্তুদের’ ছায়া দেখতে পাই যাদের এক করুণ অভিবাসন মেনে নিতে হয়েছে, আর তাঁদের কোনো ধর্মীয় অনুভূতি কি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নেই ভেবে নিশ্চুপ বসে আছি।

পুস্তকবিহীন ধর্মের কি ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ নেই!

দেশের এক অনন্য জলপ্রপাত মৌলভীবাজারের বড়লেখার মাধবকুণ্ড। জলপ্রপাত ও জংগল ঘিরে আদিবাসী খাসিদের জীবন। খাসি আদিবাসীদের মোট জনসংখ্যার প্রধান অংশটাই আজ খ্রিস্টধর্মাবলম্বী হলেও আদি খাসি ধর্মধারা জেন্টিল কি ছোনং বিশ্বাস নিয়ে অনেকেই জীপনযাপন করছেন। জেন্টিল বিশ্বাস মতে, উব্লুাউ নংবউ নংথাউ বা উপ্রাই নংথিয়া নংথাউ দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন। জেন্টিলদের ভেতর বে-ডেইংখ্লাম, লককী রিইম, উপ্রাই সিয়েম সিনসার, উপ্রাই নংগুপ পথেই, উপ্রাই সিয়েম উম, উপ্রাই সিয়েম খ্লাউ, রিইম রাখাল, কিন্ন্যা খলাউ, থাউ রিইম, কিন্ন্যা থাউকি থাউকান নামের নানান ধর্মীয় কৃত্য পালিত হয়। মাধবকুন্ড জলধারার চারপাশ জুড়ে এক সময় জেন্টিল খাসিদের কিছু ‘থাউ কিন্ন্যা বা থাউ রিইম (ধর্মীয় পবিত্র স্থান)’ ছিল। এমনকি সনাতুনপুর মণিপুরীপাড়ার মৈতৈ মণিপুরীদের ‘চিঙ্গিলাই’ নামেও একটি ধর্মীয়স্থল ছিল মাধবকুন্ড ঝর্ণার পাশে জংগলের ভেতর। মাধবকুন্ড এলাকাটি বনবিভাগের অধীনে আসার পর এসব পবিত্র ধর্মীয় স্থানগুলো নিশ্চি?হ্ন হয়ে গেছে। পরবর্তীতে লাইফ নামের একটি কারখানা বাণিজ্যিকভাবে জলপ্রপাতের পানি বিক্রি করেছে, বনবিভাগ মাধবকুন্ড ঝর্ণা বেসরকারিভাবে ইজারা দিয়েছে। নির্দেশনাহীন বাণিজ্য ও পর্যটনের চাপে এসব ধর্মীয় স্থানের ‘পবিত্রতা’ সুরক্ষায় রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ পত্রঝরা বনভূমি টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবন। মধুপুর শালবনের আদিবাসী মান্দিদের প্রধান অংশটাই এখন খ্রিস্টান, কিছু গুরুসত্য ও মুসলিম হলেও অনেকেই আদি সাংসারেক ধর্ম নিয়মেও জীবনযাপন করছেন। সাংসারেকদের মতে, ব্রারা দুগনি দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন আর বাগবা বরম্বির চিপাং ফাকসা (তলপেট) থেকে দুনিয়ার সকল প্রাণ জন্ম নিয়েছে। ওয়ান্না, গালমাকদুআ, গুয়েরা আমুয়া, নকনিমিদ্দি আমুয়া, ব্রিংনিমিদ্দি আমুয়া, দেলাংসুআ, চুরাবুদি আমুয়া, গ্রীকা, রাক্কাসী আমুয়া, দুরাংসুআ, হাবামুয়া, গুদানীসুআর মতো নানান অবস্মিরণীয় ধর্মীয় রীতি ও কৃত্য নিয়েই সাংসারেক ধর্মবিধান। টাঙ্গাইল বনবিভাগের রসুলপুর রেঞ্জের এখন যেখানে লহরিয়া বীটের চিড়িয়াখানা সেখানেই ছিল ‘আমনসর মিদ্দি আসং’ নামের সাংসারেক মান্দিদের এক পবিত্র ধর্মস্থল। বিশাল বট, অশ্বত্থ, আজুগি, গিলা, হস্তীকর্ণপলাশ, কুচ এরকম গাছে ভরপুর ছিল তা। নানান পাখপাখালী আর ময়ূরের নিরাপদ আবাসও ছিল সেটি। মধুপুর শালবনে সাংসারেক মান্দিদের এরকম শতাধিক ধর্মস্থল ছিল। ১৯৫০ সনে রাষ্ট্রীয়ভাবে মধুপুরে জুমচাষ বন্ধ করা হয়, পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে মধুপুর বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয় এবং ২০০৩ সাল থেকে শুরু হয় ‘মধুপুর জাতীয় উদ্যান প্রকল্প যা ইকোপার্ক’ নামে বহুল পরিচিতি পায়। মধুপুর বনকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় উন্মাদনায় সাংসারেক মান্দিদের এসব পবিত্র ধর্মস্থল ‘রাষ্ট্রীয় বনভূমি সম্পত্তিতে’ পরিণত হয় এবং এসবের আর কোনো চি?হ্ন আজ আর নেই।

সিলেটের আদিবাসী লালেংদের বেশকিছু পবিত্র ধর্মস্থল হারাতে হয়েছে সেনানিবাস ও সিলেট বিমানবন্দর স্থাপনের ফলে। রাষ্ট্র যখন এশিয়া এনার্জিকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি কয়লাখনি উন্মুক্ত করে দিল, সেখানে ৬৭টি আদিবাসী গ্রাাম আছে। প্রতিটি আদিবাসী সাঁওতাল ও ওঁরাও গ্রামে জাহেরথান কি মৗঞ্জহিথান নামে নিজস্ব পবিত্র ধর্মস্থল আছে। এশিয়া এনার্জি যখন কয়লাখনির জন্য পুরো অঞ্চল বিপন্ন করে তুলল, রাষ্ট্র কিন্তু একটিবারের জন্যও জাহেরথান কি মৗঞ্জহিথানের ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ আমলে নেয়নি। দেশ জুড়ে পুস্তকবিহীন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব ধর্মস্থলগুলো হারিয়েছে মূলত রাষ্ট্রের নানান উন্নয়ন আগ্রাসনের ফলেই। কখনো তা সেনানিবাস স্থাপন, বিমাননবন্দর, বাঙালি অভিবাসন, কারখানা স্থাপন, নগরায়ন, বিমান বাহিনীর ফায়ারিং ক্যাম্প, জাতীয় উদ্যান প্রকল্প, আগ্রাসি প্রজাতির বাণিজ্যিক বাগান আর বনভূমি নিশ্চি?হ্নকরণের ফলে। রাষ্ট্র কখনো পুস্তকবিহীন ধর্মীয় স¤প্রদায়ের ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ কথা বিবেচনা করেনি। যেন সব ধর্মীয় অনুভূতির একমাত্র এখতিয়ার কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পুস্তকী ধর্মের। অথচ রাষ্ট্র প্রশ্নহীনভাবে সাংবিধানে দেশের সকল জনগণ এবং সকল জনগণের ধর্মের সুরক্ষার শপথ ঘোষণা করেছে।

উত্তরবঙ্গের আদিবাসী কোলেরা নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী প্রতিটি গ্রাম ও বাড়িতে একজন মারাংবোঙ্গার থান রক্ষা করেন। মারাংবোঙ্গাই গ্রাম ও ঘরের সুরক্ষা দেন। ‘কোল ধর্মবিশ্বাস’ অনুযায়ী এই মারাংবোঙ্গার নির্দিষ্ট কোনো রূপ তৈরিতেও নিষেধ আছে। আদিবাসী ওঁরাও এবং সাঁওতাল সমাজে কারাম বৃক্ষ পবিত্রভাবে সুরক্ষিত হয় বংশ থেকে বংশে। একটি গ্রাম কি পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়ার আগে পূর্বনিবাসের এক টুকরো কারাম বৃক্ষের ডাল কি চারা সাথে নিয়ে নয়াবসতিতে স্থাপন করে। প্রতিটি হাজং গ্রাম ও বাড়িতে একটি কামাক্ষ্যা স্থান থাকে। কামাক্ষ্যা স্থানই হাজংদের অপরাপর জাতি থেকে স্থানীয়ভাবে ‘হাজং পরিবার’ হিসেবে চি?িহ্নত করে। এখনো গাজীপুর ভাওয়াল শালবন এলাকার বর্মণ গ্রামগুলোতে দেবনাগরীতে লেখা কিছু প্রাচীন ধর্মদলিল পাওয়া যায়। এরকম হাজারো শত সহস্র অপুস্তকীয় ধর্মদর্শন ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে এখনও টিকে আছে দেশের বিশাল এক জনভূগোল। আমরা কোন জবরদস্তি আর ক্ষমতার মনস্তত্ত্বে একে অস্বীকার আর আড়াল করবো?

পাশাপাশি আমরা আরো কিছু নমুনা টানছি যাকে কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিরাজমানতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রা?হ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে এখনো কিছু মুসলিম ও হিন্দু পরিবার ভাদ্র মাসে পানির পীর খোয়াজখিজির ও জলের দেবতা গঙ্গাদেবীর নামে ‘বেড়াভাসান উৎসব’ আয়োজন করে। দুনিয়ার একক আয়তনের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন অঞ্চলের হিন্দু-মুসলিম বনজীবীরা বিশ্বাস করে বাদাবনের রক্ষাকবচ মা বনবিবি। তারা সকলেই জংগল ও জানের সুরক্ষায় বনবিবির মানত করে, মান্য করে এক বাদাজীবনের ধর্মধারা। নিম্নবর্গের মুসলিম কি হিন্দু জনগণের বিশ্বাসের ভেতর দিয়েই এখনো চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারে নরম খোলের কালো কাছিম, সিলেটের শাহজালাল মাজারে গজার মাছ আর বাগেরহাটের খান জাহান আলীর মাজারে টিকে আছে কুমীর। কিন্তু যখন সুন্দরবনে করপোরেট শেল কোম্পানিকে খননের অনুমোদন দেয় রাষ্ট্র বা স¤প্রতি যখন রামপালে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প করতে চাচ্ছে সুন্দরবনের কোলে তখন কিন্তু নিম্নবর্গের ধর্মধারায় তার আঘাত লাগে। যখন শাহজালাল মাজারে বিষ দিয়ে প্রবীণ গজার মাছ হত্যা করা হয় তখন কিন্তু নিম্নবর্গের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে। যখন অরণ্য ও আদিবাসী বসতি এলোপাতাড়ি উচ্ছেদ আর দখল করা হয় তখন কিন্তু একইসাথে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় পবিত্র বৃক্ষ ও পবিত্র ধর্মস্থলসমূহও। কারণ পুস্তকবিহীন ধর্মধারাগুলো টিকে থাকে বিকশিত হয় তার চারপাশকে বুকে আগলে, চারপাশের সাথে নিজেকে সঙ্গী করে। এখানে ধর্মবিশ্বাস মানে চলমান জীবনের গতিপ্রকৃতি। টিকে থাকবার সকল শর্ত ও কারিগরি পুস্তকবিহীন ধর্মধারার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে কোনোভাবেই ধর্ম যাপিতজীবনের রাজনীতি, অর্থনীতি, উৎপাদন সম্পর্ক, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আইন, নীতি, সমাজ, পরিবার কি ব্যক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রবলতার ভেতর এক অধিপতি করপোরেট রাষ্ট্রে এখনো টিকে আছে যেসব অপুস্তকীয় ধর্মধারা এটিই তার টিকে থাকবার রাজনীতি ও দুর্বিনীত লড়াই। আমরা তাহলে কিভাবে ‘একপাক্ষিকভাবে’ বলবো ‘ধর্মকে রাজনীতির সাথে যুক্ত করা ঠিক নয়’। কোন ধর্ম আর কোন রাজনীতি সাথে সেটিও কিন্তু আজকে ফায়সালা হওয়া জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক পুস্তকী ধর্মের চশমা আর ঔপনিবেশিক পশ্চিমি জ্ঞানকাণ্ড দিয়ে অপুস্তকীয় ধর্মের নিপীড়িত স্বর ও জাগরিত ভঙ্গি কোনোভাবেই কোনোকালে বোঝা সম্ভব নয়। তাই আমাদের প্রবল মনস্তত্ত্বকেও পাল্টাতে হবে। রাষ্ট্র কোনো ধর্মের অধীন হতে পারে না। রাষ্ট্র কোনো ধর্মের আচরণ ও ধারাকে দখল, বিনাশ কি সেটাতে একতরফাভাবে অভ্যস্থ হতে পারে না। রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ হওয়া জরুরি। রাষ্ট্র যদি আজ সত্যিকার অর্থে ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ হতে চায় তবে দেশের বিরাজিত সকল ধর্মধারার মর্যাদা ও সুরক্ষা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক অপুস্তকীয় ধর্মের সুরক্ষা ও আপন বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj