লোভ

শনিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

** ইসলাম তরিক **

পেশাগত জীবনে জাহিদ সাহেব একজন ব্যাংকার। বয়স পঁয়তাল্লিশ ছুঁই-ছুঁই। ব্যাংকার হিসেবে তিনি একজন সার্থক ব্যক্তিত্ব। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ব্যাংকার হিসেবে সবার কাছে পরিস্ফুটিত করেছেন। জাহিদ সাহেব রাশভারি লোক। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তিনি খুব সেনসিটিভ। অফিসে এসে তিনি কাজ ছাড়া কিছু বোঝেন না। একজন ব্র্যাঞ্চ-ম্যানেজার হিসেবে তিনি যেমন সচেতন, তেমনি স্টাফদেরও কাজ সম্পর্কে বারবার সচেতন করে তোলেন। কিন্তু একটি ব্যাপারে জাহিদ সাহেব খুব স্পর্শকাতর হয়ে পড়েন। হারিয়ে ফেলেন কর্মের খেই।

বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তার ব্যাংকটি অন্যতম হওয়ায় এ ব্যাংকের লেনদেনও প্রচুর। প্রতিদিন বহু লোকের সমাগম হয় এ ব্যাংকে। বিশেষ করে উচ্চশ্রেণির ব্যক্তিদের পদাচারণা এ ব্যাংকে বেশি। জাহিদ সাহেব মানসিক, শারীরিক এবং পোশাক-পরিচ্ছেদে একজন স্মার্ট ব্যক্তিত্ব হওয়ায় অনেক ধনীর দুলালিরা ব্যাংকে এসে বিভিন্ন অজুহাতে তার সঙ্গে খোশগল্পে মেতে ওঠেন।

তারা জাহিদ সাহেবের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলেও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গল্পে মেতে উঠতে পারেন না জাহিদ সাহেব। কারণ ব্যাংক মানেই কঠিন ব্যস্ততার একটি জায়গা। যেখানে তিলদণ্ড দাঁড়াবার ফুরসত নেই। জাহিদ সাহেবের অনেক সময় মনে হয় সেসব সুন্দরী ধনীর দুলালিদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠি। গল্পের তালে আলতো করে ছুঁয়ে দেয় তাদের মসৃণ শরীর। শুনিয়ে দেয় জীবনের অন্তঃগল্প। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও উপায় হয় না। এই ব্যস্ততার কারণে জাহিদ সাহেব মাঝে মাঝেই নিজেকে ধিক্কার দেন, বাংলাদেশে এত চাকরি থাকতে কেন যে ব্যাংক জবে পা বাড়ালাম?

দুই.

আজ সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই এক তরুণী জাহিদ সাহেবের রুমের দিকে আসতে লাগল। জাহিদ সাহেব কাচের দেয়ালের স্বচ্ছতা ভেদ করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। সুউচ্চ বুক, প্রশস্ত বাহুজোড়া, সিøমবডি, স্বাভাবিক উচ্চতা, ভরাট গাল, ডাগর-ডাগর চোখ, জেল মাখানো ভেজা ঠোঁট সব মিলিয়ে অপূর্ব ফিটনেস মেয়েটির। লম্বা, কালো এলোকেশের কিয়ৎভাগ সামনে বুকের ওপর ছড়ানো, এতে করে মেয়েটিকে আরো স্মার্ট লাগছে। এত সুন্দর আর এত নিখুঁত কোনো সৃষ্টি হয়? মেয়েটি দরজার সামনে এসে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইল। জাহিদ সাহেব মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

এই শীতের সকালে জানালা ভেদ করা সূর্যের মিষ্টি রোদের আদর মাখানো ক্ষণে জাহিদ সাহেবের সামনে বসে আছে এক অপ্সরা। তিনি ভাবতেই পারছেন না কী থেকে আজ কী হয়ে গেল? মেয়েটি যেন সূর্যস্নান করছে। কয়েকদিন ঘনকুয়াশা বাদে আজ যেন এই অপ্সরার জন্যই সূর্যটি মুচকি হেসে, তার পরশ সবাইকে বিলিয়ে দিচ্ছে।

জাহিদ সাহেব নীরব। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। মাঝেমধ্যেই এমন সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তিনি তার মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেন। ভেসে বেড়ান কল্পনার আকাশে। ক্লাইমের কোনো কথায় তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। আজো তাই হলো। মেয়েটি কিছু সমস্যার কথা উত্থাপন করল। জাহিদ সাহেব দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান করলেন। মেয়েটি এবার উঠে দাঁড়াল।

জাহিদ সাহেব তাকে চায়ের অফার করলে মেয়েটি তা নাকচ করল। জাহিদ সাহেব অবশ্য এমনটি আশা করেননি। মেয়েটি উঠে দাঁড়াতেই জাহিদ সাহেবের ভেতরটা খাঁ-খাঁ করে উঠল। মনের অজান্তেই তিনি বিড়বিড় করে বললেন আরে, বসো না দুদণ্ড। মেয়েটি কাচের দরজা পাস করে রুম ত্যাগ করল। জাহিদ সাহেবের দৃষ্টি এখন মেয়েটির নিতম্বের দিকে। ওয়াও! কী দেখছি ওটা! বডিফিটিং পোশাকে মেয়েটির সরু কোমরটিও যেন বিখ্যাত কোনো শিল্পীর কারুকার্য বলে মনে হচ্ছে।

তিন.

জাহিদ সাহেব ব্যাংকার হিসেবে সাকসিড হলেও পার্সোনাল লাইফে তিনি সাকসিড নন। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে একটি মাত্র নারীকে নিয়ে সন্তুষ্ট নন। এই পৌঢ় বয়সে উপনীত হয়েও তিনি কামনা করেন বহু নারীর সঙ্গ। সারাদিন নানান কাজার ভিড়ে একটি সুন্দরী নারী দেখলেই তার মনটা উতলা হয়ে ওঠে। নড়েচড়ে ওঠে দেহটাও। এই বয়সেও কেন যেন সব থেকেও অন্য কারো জন্য নিজের একাকীত্ব লাগে। নিজেকে অপূর্ণাঙ্গ মনে হয়। মনে হয় কোনো একটি তরুণী তার জীবনে এলে জীবনটা আবার ফুসকে উঠত। আবার ফিরে পাওয়া যেত নবযৌবন। দুম করে জ্বলে উঠত সকল কাজের স্পৃহা। পূর্ণ হতো দীর্ঘদিনের অপ্রকাশিত বাসনা।

কিন্তু জাহিদ সাহেবের সেই ভাবনা, ভাবনাই থেকে যায়। তার মনের তীব্র বাসনাটি যে কিছুতেই পূর্ণ করতে পারছেন না। মনটা কেন যেন না পাওয়ার সেই জটিল হিসাব মেলাতে গিয়ে বারবার নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। এক রাতে তিনি তার স্ত্রীকে ডানহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে, বামহাত দিয়ে স্ত্রীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে তিনি জাহানারা বেগমের লম্বা এলোকেশে হাতের আঙুল ঢুকিয়ে, পরম মমতায় খেলা করতে করতে মিষ্টি সুরে বললেন

-এই আমি যদি আরো একটি বিয়ে ক…।

বাক্যটি শেষ হতে না হতেই, জাহানারা বেগম প্রচণ্ড ক্ষোভে জাহিদ সাহেবের হাতের বাঁধন ছিটকে ফেলে দিয়ে, তড়িৎগতিতে শোয়া থেকে উঠে বসলেন।

টেবিল ল্যাম্পের মৃদ আলোতে জাহানারা বেগমকে খুব ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে। তিনি রেগে গেলে মুখমণ্ডলে একটি অদ্ভুত ছাপ পড়ে। কিন্তু আজকের সেই অদ্ভুত ছাপটি আরো অদ্ভুত মনে হচ্ছে। বীভৎস দেখাচ্ছে তার মুখটি। নাক দিয়ে যে নিঃশ্বাসটি বের হচ্ছে সেটা আস্ত কোনো ভয়ঙ্কর গোখরা সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দ ছাড়া আর অন্য কিছু নয়। কিছুক্ষণ নীরব থেকে জাহানারা বেগম জাহিদ সাহেবকে বললেন -তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। সুন্দরী কোনো মেয়ে দেখলেই তোমার মাথা বিগড়ে যায়। তখন ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতোগুঁতাগুঁতি শুরু করো। ইনিয়ে বিনিয়ে কথা লম্ব করো। ছলেবলে বিভিন্ন কৌশলে তাদেন সান্নিধ্যে থাকার চেষ্টা করো।

কথাটি একদম সত্য। তাই জাহিদ সাহেব কোনো প্রত্যুত্তর করল না। বরং নিজের মনকে প্রশ্ন করলেন- আচ্ছা, আমি কী খারাপ কিছু করি? আর করলেই বা কী? আমি তো মেয়ে নই। আমি পুরুষ। আমার শরীরের রক্ত তো শান্ত নয়। কোনো সুন্দরী যুবতিকে দেখে যদি কোনো পুরুষের মনে কোনো আকাক্সক্ষাই না জাগে তবে সে কেমন পুরুষ?

জাহানারা বেগমের কথায় জাহিদ সাহেবের ভাবনায় ছেদ পড়ল। তিনি আবার জাহিদ সাহেবকে কর্কশ স্বরে বললেন- এই বুড়া বয়সে তোমার ভীমরতি ধরেছে? হুঁশ নেই ছেলেমেয়ে দুটো বড় হয়েছে? ছেলের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু ঘরে তো একটি যুবতি মেয়ে আছে, তার কথা একবার ভাবো। মেয়েটিকে তো অন্যের ঘরে পাঠাতে হবে, না কি?

এক নিঃশ্বাসে জাহানারা বেগম কথাগুলো বলে, তিরস্কারের ভঙ্গিতে নাক সিটকে খানিকটা দূরত্ব অতিক্রম করে শুয়ে পড়লেন। এবারো জাহিদ সাহেব কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না। তিনি বন্দুকের গুলিতে আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটে পাশ ফিরে শুলেন। খানিকবাদে জাহানারা বেগমেন মৃদু নাক ডাকার শব্দে জাহিদ সাহেব বুঝলেন স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। রাজ্যের ভাবনা এসে উঁকি মারছে তার হৃদয়ডোরে। ভাবনাগুলো ইঁদুর ছানার মতো, যে কি না বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দ্যেশেই গর্ত থেকে একবার মুখ বের করছে আবার এদিক ওদিক চেয়ে অন্য কারো ভয়ে ভেতরে ঢুকছে। হৃদয়ের নোটিশ বোর্ডে সাঁটানো অসংখ্য ভাবনার মধ্যে তার মনোদৃষ্টি থমকে দাঁড়াল একটি বাস্তব ভাবনায়। সত্যই তো ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। তা ছাড়া আমারও সুন্দর একটি প্রফেশনাল লাইফ আছে।

চার.

বিকেল ৫.৩০ মিনিট। ব্যাংকের মেইন গেট বন্ধ। বাইরের কাউকে এখন আর ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। অফিসাররা অভ্যন্তরীণ কাজ করছেন। ক্যাশ ডিপার্টমেন্ট ডেভিট-ক্রেডিট নিয়ে ব্যস্ত। ব্যবস্থাপক হিসেবে জাহিদ সাহেব বিভিন্ন ঋণ সংক্রান্ত নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। পাহাড় সমান কাজের চাপ মাথায় নিয়ে তিনি কাজ করছেন। সবগুলো কাজ আজকেই সারতে হবে। দুএকদিনের মধ্যেই অফিস অডিট হবে। এর মধ্যে দারোয়ান মনজু মিয়ার উচ্চকণ্ঠ শুনে, সিগন্যাল বেল বেজে তিনি তাকে ডাক দিলেন।

-জি স্যার বলুন।

-বাইরে কী হয়েছে?

মনজু মিয়া আমতা আমতা করে বলল- স্যার, বাইরে দাঁড়ানো একটি মহিলা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। জাহিদ সাহেব মহিলাটিকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন। অন্য কেউ হলে এই বেটাইমে তিনি তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দিতেন না। কিন্তু মেয়ে বলে কথা!

জাহিদ সাহেব আবার কাজে মনোযোগ দিলেন। ঋণের একটি নথি কোথায় যে রাখলেন, এখন আর সেটি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। হন্য হয়ে খুঁজছেন নথিটি। এইতো কিছুক্ষণ আগেই নথিটি একটি ফাইল বক্সে দেখলাম। কোথায় রাখলাম ফাইলটি?

মহিলাটি অলরেডি জাহিদ সাহেবের রুমে প্রবেশ করেছেন। ফাইলটি খুঁজতে খুঁজতে, তিনি অনুমতি ছাড়া তার রুমে ঢোকার জন্য মহিলাটিকে থ্রেট করবেন বলে মহিলাটির দিকে দৃষ্টি দিলেন। ওয়াও! বিউটিফুল! মহিলাটিকে থ্রেট করার বদলে তার সুশ্রী মুুখখানা দেখে জাহিদ সাহেব বিশেষণগুলো মনে মনে উচ্চারণ করলেন। প্লিজ বসুন, বসুন। মনের সমস্ত দরদ মিশিয়ে তিনি মহিলাটিকে বসার জন্য অনুরোধ করলেন। মহিলাটি বসলেন। মহিলাটির বয়স ৩০-৩৫ হবে হয়তো। কিন্তু তার ফেসিয়াল করা ত্বক দেখে বয়সটি আরো কম বলে মনে হচ্ছে।

মহিলাটির চেহারা চেনাচেনা মনে হচ্ছে জাহিদ সাহেবের। কোথাও যেন দেখেছেন তাকে। কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছেন না। এই মহিলাটিকে দেখে আজো জাহিদ সাহেব কাজের মাথা খেয়ে বসলেন। মুখের ভাষাটাও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। কেবল চোখের দৃষ্টিটা ঠিক আছে। যা দিয়ে তিনি হাঁ করে মহিলাটিকে দেখছেন।

জাহিদ সাহেবের লোভাতুর দৃষ্টি দেখে মহিলাটি আগ বাড়িয়ে কথা বলতে শুরু করলেন-

-স্যার, ভালো আছেন?

-জি।

-আমাকে চিনতে পেরেছেন?

-চেনাচেনা মনে হচ্ছিল।

-স্যার, আমি অনামিকা। ওই যে হোটেল স্টার…।

আপনার বন্ধু এফ রহমানকে নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে…..

– হ্যাঁ, হ্যাঁ চিনতে পেরেছি। কিন্তু সেই কক্সবাজার থেকে এতদূর? তাছাড়া আমার ঠিকানা কোথায় পেলেন?

-আপনার বন্ধু এফ রহমান আপনার ঠিকানা দিয়েছেন। উনার সঙ্গে আমার মাঝে মাঝেই কথা হয়।

-ও আচ্ছা। ওর সঙ্গে অবশ্য অনেকদিন হলো কথা হয়নি।

-স্যার, আপনার কী সেই রাতের কথা মনে পড়ে?

কত্ত এনজয় করেছিলাম আমরা?

-হুম।

– স্যার, আপনার কী মনে আছে? সে রাতে আপনি আমার ঠোঁটে…?

জাহিদ সাহেব এবার নড়েচড়ে বসলেন। তিনি একটু ইতস্তবোধ করলেন। কিছুটা লজ্জা ভরা স্বরে বললেন- দেখুন অনামিকা এটা ব্যাংক। এখানে এসব কথা মানায় না।

বলুন কী খাবেন? চা না কফি?

-না স্যার। এখন চা, কফি খাওয়ার সময় আমার হাতে নেই। বরং আমার কিছু কথা শুনুন। আমি গতকাল এই শহরে এসেছিলাম জরুরি একটি কাজে। আজ আবার কক্সবাজার ফিরে যাব। রাত ন‘টার টিকেট কনফার্ম করেছি। তাই বলছি অহেতুক সময় নষ্ট না করে, আপনি যদি চান তাহলে চলুন আমরা হোটেলে গিয়ে একটু সময় উপভোগ করি।

দারুণ একটি সুযোগ। কিন্তু জাহিদ সাহেব কী করবেন, তা ঠাহর করতে পারছেন না। এই সুযোগ বারবার আসবে না। আবার হাতে অনেক কাজও জমা পড়ে আছে। মিনিটখানিক ভেবে তিনি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দুমিনিটে তিনি সব গুছিয়ে উঠে পড়লেন।

পাঁচ.

অনামিকার সঙ্গে অটোরিকশায় বসলেন জাহিদ সাহেব। দারুণ লাগছে তার। সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে রিকশায় বসার মজাটাই আলাদা। জাহিদ সাহেবের মনে পড়ল ভার্সিটির বান্ধবীদের কথা।

ইস কত আনন্দমুখর ছিল সেই সময়টা।

অনামিকার শরীর থেকে মিষ্টি পারফিউমের ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। তার শ্যাম্পু করা সিলকি চুলগুলো হালকা বাতাসে মাঝে মাঝে জাহিদ সাহেবের মুখের ওপর ঝাপটে পড়ছে। দুরন্তগতিতে চলছে অটোরিকশা।

হঠাৎ জাহিদ সাহেবের প্যান্টের পকেট ভারী ভারী মনে হলো। তিনি পকেটে হাত দিলেন। এ কী! তিনি এক কোটি টাকার ঋণের যে ডকুমেন্টটি ব্যাংকে খুঁজছিলেন, সেটা তো তার পকেটে। তিনি বিচলিত হয়ে উঠলেন। এত বড় অঙ্কের একটি ডকুমেন্ট ব্যাংকের বাইরে নিয়ে আসা একদমই ঠিক হয়নি তার। ডকুমেন্ট হাতে জাহিদ সাহেবকে চিন্তিত দেখায় অনামিকা তাকে চিন্তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। জাহিদ সাহেব সব খুলে বললেন। অনামিকা মুচকি হেসে বললেন-

এটা একটি চিন্তার বিষয় হলো? হোটেল থেকে ফিরে আবার ওটা ব্যাংকে রেখে যাবেন।

ছয়.

গতকাল ক্লান্ত শরীরে জাহিদ সাহেব বাসায় ফিরেছেন। ডকুমেন্টের কথাটি তার একদমই খেয়াল ছিল না। আজ প্যান্ট, জামাসহ সমস্ত বাসা তন্নতন্ন করে খুঁজেও ডকুমেন্টটা তিনি পেলেন না। অনামিকার কাছে ফোন করেও কোনো লাভ হলো না। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে তিনি আবারো হোটেলে গেলেন। সেখানেও পাওয়া গেল না ডকুমেন্টটা। ভাবনায় পড়ে গেলেন তিনি।

-এখন যে কী করি? হাতে সময়ও বেশি নেই। দুএকদিনের মধ্যেই অডিট আসবে। কী বলে বুঝাব তাদের? তা ছাড়া এক কোটি টাকার ব্যাপার। এখন দেখছি চাকরিসহ জীবন নিয়ে টানাটানি।

জাহিদ সাহেবের মাথা বোঁ-বোঁ করে ঘুরতে লাগল। আসমানের সূর্য যেন ঠিক মাথার ওপর অবস্থান করছে। পায়ের তলার মাটিগুলো যেন বালুচরের মতো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।

বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল তার মন। আজ বারবার নিজেকে বড় দোষী মনে হচ্ছে তার। কেন যে একটি মেয়ের কথায় তিনি না বুঝে তাড়াহুড়ো করে, অসময়ে ব্যাংক থেকে বের হলেন? আজ নিজের চরিত্রটাকেও অপবিত্র মনে হচ্ছে তার। নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কুৎসিত মনটাকেও তিনি আজ উপলব্ধি করলেন। জাহিদ সাহেব আর কিছু ভাবতে পারছেন না। তিনি জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে ঢলে পড়লেন।

:: সান্তাহার, বগুড়া

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj