শীতের তীব্রতার সঙ্গে বেড়েছে অসুখ-বিসুখ : হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড়

বুধবার, ১০ জানুয়ারি ২০১৮

নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ব্রংকাইটিস, সর্দি, জ্বর, শ্বাসকষ্টে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি >>

আফিফ ফারুকী অভি : রাজধানীসহ সারা দেশে মৃদু ও মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। শীতের দাপটে কাঁপছে সারা দেশের মানুষ। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ। এর মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার, ব্রংকাইটিসের প্রকোপ বেশি। এ ছাড়া হচ্ছে সর্দি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, পেটে ব্যাথা, চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধসহ সব শ্রেণির মানুষ থাকলেও শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। সরেজমিন দেখা গেছে প্রতিদিনই নগরীর প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভিড় বাড়ছে শীতজনিত রোগে আক্রান্তদের।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শুকনো মৌসুমে বাতাসে ধুলোবালির পরিমাণ বেড়ে যায়। তার ওপর তীব্র শীত বিরাজ করছে। এ দুইয়ে মিলে ঠাণ্ডাজনিত রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া প্রভাব বিস্তার করছে। সাইনোসাইটিস, ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে। তারা জানান, ঠাণ্ডায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় শিশুরা। বেশি ঠাণ্ডায় অনেক সময় শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই শীতকালীন রোগ-বালাই থেকে বাঁচতে বিশেষ সর্তকতা পালন করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় রোগীর বাড়তি চাপ। বেশির ভাগ শিশুই শীতকালীন রোগব্যাধির চিকিৎসা নিতে এসেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরুল হাসান। তিনি তার দুই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। এ সময় তিনি জানান, বড় মেয়ে জেরিন (৮) কয়েক দিন ধরেই জ্বরে আক্রান্ত। এ কারণে কিছুই খেতে পারছে না। শুধু বমি করছে। আর ছোট ছেলে ফরহাত হাসানের (৭ মাস) সমস্যাও একই রকম। সে দুই রাত কাউকে ঘুমাতে দেয়নি। শুধু কান্নাকাটি করেছে। তাই হাসপাতালে এসেছি।

হাসপাতালের সিনিয়র জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাকিম ভোরের কাগজকে জানান, প্রতি বছর এই সময়ে আমাদের হাসপাতালে রোগীর বাড়তি চাপ থাকেই। জানুয়ারির ১-৮ তারিখ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৫৮ জন ও ডায়রিয়ায় ৪৬ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া আউটডোরে গত ৩ দিনে চিকিৎসা নিয়েছেন ২হাজার ৯৭৮ জন রোগী।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সালাউদ্দিন মাহমুদ ভোরের কাগজকে জানান, অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সাধারণত শিশুদের সর্দি-কাশি ও ব্রংকিওলাইটিস রোগ বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে শিশুর চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া বেশি হয়। এ ছাড়াও ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, প্র¯্রাবে ইনফেকশন হয়ে থাকে। তিনি বলেন, শ্বাসকষ্ট হলে শিশু সারা রাত কান্নাকাটি করবে। শুয়ে থাকতে পারবে না, বসে থাকবে। নেবুলাইজার বা ইনহেলার ব্যবহার করলে শিশু ভালো থাকে। তবে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট শুধু শীতকালীন রোগ নয়।

হাসপাতালটির আর এক চিকিৎসক ডা. ধ্রæব জ্যোতি দেবনাথ জানান, শিশুরা এখন রক্ত আমাশা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। ডায়রিয়া গরম শীত দুটোতেই বেশি হয়ে থাকে। যেসব শিশুর ডায়রিয়া হালকা তাদের স্যালাইন দিচ্ছি আমরা। আবার জরুরি চিকিৎসার দরকার হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছে। তিনি আরো জানান, শিশুদের ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাতে বাবা-মারা তাদের গরম কাপড় পরান। এতে শিশু অনেক সময় ঘেমে যায়। পরে সেই ঘাম শরীরে বসে গিয়ে সর্দি-কাশি বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া বাচ্চাদের খালি পায়ে ঠাণ্ডা মেঝেতে হাঁটতে দেয়া যাবে না। গোসল করাতে হবে কুসুম গরম পানি দিয়ে। শীতের সময় ধুলাবালি বেড়ে যায়, সেই ধুলাবালি থেকে বাচ্চাদের মুক্ত রাখতে হবে। তাই শীতকালীন রোগগুলো থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্রও একই রকম। হাসপাতালটির বহির্বিভাগে বেশির ভাগ রোগীই ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। আজিমপুরের প্রান্তিক ইসলাম জানান, তার আগে থেকেই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়েছে। শীতকাল এলে সেটি একটু বাড়ে। গত রবিবার থেকে আমার জ্বর, কাশি ও গলাব্যথা হচ্ছে। এ কারণে হাসপাতালে এসেছি। কথা হয় যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আরিফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, গত সোমবার থেকে তার মেয়ে নাফিসার (৭ বছর) গলাব্যথা ও জ্বরের সঙ্গে হাঁচিকাশি। বাসায় মেয়েকে প্যারাসিটামল সাসপেনসন খাইয়েছেন। ওষুধ খাওয়ানোর পর জ্বর কমলেও বুকের ভেতর শব্দ হচ্ছে। শ্বাস ফেলতে সমস্যা হচ্ছে। কাশি কমছে না। মেয়ের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা না কমায় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে এসেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুদীপ কুমার রঞ্জন বলেন, শীতে বয়স্কদের রক্তচাপ বাড়ে এবং হৃদযন্ত্রের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তিনি বলেন, শীতকালের খুব দুষ্ট ও সংক্রামক ভাইরাস হলো পাকস্থলি ভাইরাস। সারা বছর এর গতি কম থাকে যা শীতকালে খুব তীব্র হয়। কাশি বা শ্বাসকষ্ট রোগের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ১ সপ্তাহের বেশি কাশি, বুকের ভেতর কফ জমে, সবুজ বা হলুদ হলে, বুকের ভেতর শব্দ হলে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বেশি অথবা শ্বাসকষ্টের যে কোনোটি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে বহির্বিভাগেও গতকাল রোগীর বাড়তি চাপ লক্ষ করা গেছে। বহির্বিভাগে কথা হয় ৫০ বছর বয়সী সামিনুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, শীত এলে আমার ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা বেড়ে যায় এবং মাথায়ও ব্যথা হয়। আমার সাইনোসাইটিসজনিত সমস্যাও রয়েছে। কিছুদিন ধরে আমার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ভোরের কাগজকে জানান, শীতকালে স্বাভাবিকভাবেই নড়াচড়া কম হয়। এতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জোড়াগুলো জমে যায় এবং ব্যথার উদ্রেক করে। শীতের প্রকোপে শরীরের রক্তনালির খিঁচুনি ও সংকুচিত হলে জোড়া, পেশি ও হাড়ে রক্ত চলাচল কমে যায় এবং ব্যথা বেড়ে যায়। শীতকালে স্নায়ুর সহ্যক্ষমতাও কম থাকে। এ কারণে ব্যথা বেশি অনুভূত হয়।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj