স্বাধীনতার স্থপতির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ

বুধবার, ১০ জানুয়ারি ২০১৮

কাগজ প্রতিবেদক : ‘স্বাধীনতাকামী ‘বাংলাদেশের’ পরিত্রাতা কে?/ সাড়ে সাত কোটি বাঙালির আজ ভাগ্য বিধাতা কে?/ একটি সুরেতে কে দিয়েছে বেঁধে বাঙালির অন্তর?/ সেতো শেখ মুজিবুর! ধন্য হে মুজিবুর!!’ আজ ১০ জানুয়ারি। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন। স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের এ দিনেই পাকিস্তানে দীর্ঘ কারাবাস শেষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সদ্য স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে আসেন বাঙালির অবিসংবাদিত এ নেতা। বাঙালির হৃদয়ে বাজে, ‘মৃত্যুর দুয়ার ভেঙে অমরত্ব লভিয়াছ/ তুমি জ্যোতির্ময়/ পূর্ণ করো স্বাধীনতা মুক্ত করো ভয়/ তোমারই আজ জয়।’

নয় মাসের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালির বিজয় পূর্ণতা লাভ করে। জীবন-মৃত্যুর কঠিন চ্যালেঞ্জের ভয়ঙ্কর অধ্যায় পার হয়ে সারাজীবনের স্বপ্ন, সাধনা ও নেতৃত্বের ফসল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মহান এ নেতার প্রত্যাবর্তনে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পূর্ণ হয়। স্বয়ং জাতির জনক তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা।’ আর সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জয়ধ্বনি করেছিল বিজয়গর্বে। নেতা এসেছেন বিজয়ীর বেশে, সোনার বাংলার আকাশে-বাতাসে তার আগমনী বার্তা। দিকে দিকে প্রাণের উৎসব। বাংলার সবুজ প্রান্তরে ঘাসে ঘাসে ছিল তারই রোমাঞ্চ। অনেক রাত্রির তপস্যা শেষে ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতার রক্তসূর্য পূর্ণতার মহিমায় উদ্ভাসিত। বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতা গেয়ে ওঠে, ‘দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়/ দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়/ বিন্দু তাহার নয়নজলে সপ্তমহাসিন্ধু দোলে কপোলতলে/ বিশ্বমায়ের আসন তারই বিপুল বাহুর পর/ হাঁকে ঐ জয় প্রলয়ঙ্কর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণার পর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অপরাশেন সার্চলাইট নামের এ অভিযানের শুরুতেই পাক হানাদাররা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির বাসা থেকে বন্দি করে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। এ ঘোষণার মাধ্যমে সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াই শুরু করারও ডাক দেন তিনি। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি করা হলেও বঙ্গবন্ধুর নামেই পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি যখন প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছে, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামি হিসেবে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সেলের পাশে তার জন্য কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতা, মুক্তির প্রশ্নে ফাঁসির আসামি হয়েও বঙ্গবন্ধু ছিলেন অবিচল, আপসহীন।

বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাকেই রাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে খ্যাত এ সরকারের নেতৃত্বে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোটা জাতি। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধে বহু ত্যাগ আর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতি বিজয়ের লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। দেশ স্বাধীন করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতেও বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেও বাঙালি জাতির মনে ছিল না স্বস্তি ও বিজয়ের আনন্দ। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি জাতির জনকের ভাগ্যে কী আছে- এ নিয়ে এ ভূখণ্ডের প্রতিটি মানুষ ছিল বিচলিত, আতঙ্কিত। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার পর বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সারাবিশ্বের চাপের মুখে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে পিআইয়ের একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনে পৌঁছে সাংবাদিকদের কাছে বিবৃতির মাধ্যমে বলেন, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে এক প্রহসন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শুনানি অর্ধেক সমাপ্ত হওয়ার পর পাক কর্তৃপক্ষ আমার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করে। আমি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে দেশদ্রোহীর কলঙ্ক নিয়ে মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু আমার বিচারের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, তার রায় কখনো প্রকাশ করা হবে না। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিচারের নামে প্রহসন করে আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানোর ফন্দি এঁটেছিলেন। আবেগজড়িত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের মতো এত উচ্চমূল্য, এত ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় জীবন ও দুর্ভোগ আর কোনো মানুষকে ভোগ করতে হয়নি। বাংলাদেশে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দায়ী। হিটলার যদি আজ বেঁচে থাকত, বাংলাদেশের হত্যাকাণ্ডে সেও লজ্জা পেত। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।

১০ জানুয়ারি বিজয়ীর বেশে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন বাঙালির নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লন্ডন-দিল্লি হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন বিজয়ের মালা পরে। সেদিন বাংলাদেশে ছিল এক মহা উৎসবের আমেজ। গোটা বাঙালি জাতি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কখন তাদের প্রিয় নেতা, স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি সদ্য স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখবেন। পুরো দেশের মানুষই যেন জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়। অবশেষে বন্দিত্বের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বিজয়ের বেশে নামলেন বিমান থেকে। পা রাখলেন লাখো শহীদের রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। গোটা জাতি হর্ষধ্বনি দিয়ে তেজোদীপ্ত ‘জয় বাংলা’ সেøøাগানে তাদের অবিসংবাদিত প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানায়। বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত রাস্তা ছিল লোকে লোকারণ্য। এদিকে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ নয় মাস পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের গণহত্যার সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দেন, ‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাব।’ কথা রেখেছেন জাতির পিতা। হিং¯্র পাক হানাদাররাও যার গায়ে আঁচড় দেয়ারও সাহস দেখাতে পারেনি, স্বাধীন দেশে বাঙালি নামক একশ্রেণির কুলাঙ্গার-বিশ্বাসঘাতকদের হাতেই সপরিবারে তাকে জীবন দিতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে বরাবরের মতো এবারো নানা কর্মসূচি আয়োজন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

কর্মসূচি : কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সকাল ৬.৩০ মিনিটে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারাদেশে সংগঠনের সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন। বিকাল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আয়োজিত সব কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের জন্য সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ সংগঠনের সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj