শুভ হোক নতুন বছর

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭

নতুন বছর ২০১৮-কে স্বাগতম জানাই। ঐতিহাসিক কারণে আমরা খ্রিস্টীয় শতাব্দীতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনেক ঐতিহাসিক সত্যের মধ্যে এটাও একটা যে আমরা এ এলাকার অধিবাসীরা বঙ্গীয় বর্ষ মেনে চলি দেশপ্রেমজাত সাংস্কৃতিক কারণে, আরবি বছর মেনে চলি ধর্মীয় কারণে, কিন্তু নিত্য জীবনযাপনের বেলায় খ্রিস্টীয় বর্ষ মেনে চলি। প্রথম দুইটা বর্ষপঞ্জি আমরা পোলাও-কোরমার মতো বিশেষ আহারের মতো ব্যবহার করি, নিত্য ডালভাত কিন্তু হয় খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি মোতাবেক। আবার ব্রিটিশদের কারণেই আমরা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বা খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারকে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বলে মনে করি। কিন্তু এটা নিয়ে বিবাদ করার কিছু নেই, কারণ আন্তর্জাতিকতাবাদ ব্যাপকভাবে পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা সুনির্দিষ্টিত হওয়াতে খ্রিস্টীয় বছরটাই বিশ্বব্যাপী মানা হয়। আমরাও তাই করি।

তবে প্রতিটা নতুন বছরের আগমনের সময় সামাজিক মানুষ যে কিছুটা অদৃষ্টবাদী তারও প্রকাশ ঘটে। নতুন বছরে তার জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে ব্যক্তি মানুষ যেমন সেটা জানতে চায়, তেমনি রাষ্ট্রীয় জীবনেও নতুন বছরটা কেমন যাবে তারও একটা অনুমাননির্ভর বিচার-বিশ্লেষণ চলতে থাকে। তাই নতুন বছর শুরুর আগে আগে পত্র-পত্রিকার দোকান ভরে ওঠে বিভিন্ন বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন ও সাময়িকীর সরবরাহে যাদের প্রকাশিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি পাঠকপ্রিয় ফিচার হলো, ‘নতুন বছর কেমন যাবে!’ একটা আগত বছরে কী কী ঘটতে পারে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সেটা জানার কৌত‚হল থাকার অর্থ হলো মানুষ পূর্বে প্রাপ্ত জ্ঞান অনুসারে ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিংবা ভবিষ্যৎকে নিজের ইচ্ছাধীনভাবে পরিচালিত করতে চায়। অর্থাৎ এটা শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, সজ্ঞানে ছাড় দেয়াও বটে। কিন্তু এ চাওয়াটার পুরোটাই হলো বালুচরে লেখা প্রিয়তমার নামের মতো, ঢেউ এসে এ নামটি মুছে দেবে কি দেবে না তার অনিশ্চয়তা থাকবেই, যেমনটি থাকবে নতুন বছরের সম্ভাবনার স্বপ্নগুলো কতটা টিকবে, কতটা টিকবে না সে সম্পর্কে দুশ্চিন্তা।

যে অর্থে মানুষ হাত দেখায় গণকের কাছে, যে অর্থে মানুষ পারলৌকিক জগত থেকে ইশারা পাওয়ার জন্য পীরের শরণাপন্ন হয়, সে অর্থে মানুষ নতুন বছরে তার জন্য কী জমা আছে, কিংবা রাষ্ট্রে কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠে। ঠিক সে কারণেই আগত বছরটা নিয়ে এ কলামটা লেখার সময় আমার মনোভাবও অনেকটা এরকম যে আসলেই কী ঘটবে এটা যদি সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে জেনে নেয়া যেত, তাহলে দুশ্চিন্তা- যদি খবর খারাপ হয়- স্বস্তি, যদি খবর ভালো হয়- এ দুধরনের মনোভাব নিয়ে থাকা যেত। কিন্তু দুশ্চিন্তা থাকত না, থাকত ভবিষ্যৎকে- সে যাই হোক না কেন- সহজভাবে গ্রহণ করে নেয়ার মনোভাব।

তবে ব্যক্তিজীবনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা না গেলেও রাষ্ট্রীয় জীবন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায় অতীত এবং বর্তমানের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে। যদিও এ বিচার-বিশ্লেষণই কতটা ঠিক কতটা বেঠিক হবে সেটা প্রমাণিত হবে ভবিষ্যতে। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য ২০১৮ সালটা আগের যে কোনো বছরের চেয়ে দোদুল্যমান হবে এটা ধারণা করা যায়। আশা করা যায় বছরের শেষ ভাগে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন জোট বড় একটা মাইলেজ হারিয়েছে বলে রাজনৈতিক নেতারা মতামত দিয়েছেন। আন্দাজ করা যাচ্ছে- যদিও এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে, এবারে বিএনপিসহ তার নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কথাটা অত সহজে বলা যাবে না। বিএনপির নেত্রী বলেছেন যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিলে তারা সে নির্বাচনে যাবেন না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে রয়েছে সাংবিধানিক যুক্তির শক্তি। দলীয় সরকারের আওতায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীনও প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিপরিষদও গঠন করবেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে, এটিই নতুন সাংবিধানিক আইন। এ আইনকে অমান্য করতে হলে বিএনপিকে সংসদে গিয়েই সে আইনটাকে রদ করার ব্যবস্থা করতে হবে। বিএনপির জন্য আরেকটা ঝামেলা হলো তাদের নেত্রী বর্তমানে একটি চলমান মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, কিন্তু ওই মামলার রায় তার বিপক্ষে গেলে হয়তো তার নির্বাচন করার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হবে। এটি বিএনপির জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হবে, নেত্রী ছাড়া তারা নির্বাচন করতে পারবে কিনা। এ বিষয়টা বাদ দিলেও বিএনপি সাংবিধানিক বিষয়টা মেনে নিলে ভালো, আর তা না হলে ২০১৪ সালের মতো একতরফাভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে আওয়ামী লীগ সরকার বাধ্য থাকবে। অনেকের মতে, বিএনপি প্লাস জোট সাংবিধানিক এ শৃঙ্খলটা ভাঙতে পারে না। যদি যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্যে এবং ভারতে (যে তিনটি দেশকে আমরা কথায় কথায় উদাহরণ হিসেবে টানি) দলীয় সরকারের আওতায় স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে, আমাদের এখানে কেন পারবে না!

তবে আশঙ্কা থাকছে যে নির্বাচন বর্জনমূলক হোক বা অংশগ্রহণমূলক হোক সমাজে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা থেকে সংঘাত-সংঘর্ষ বেড়ে যেতে পারে। ২০১৩ সালের শেষ অর্ধভাগে বিএনপি-জামায়াত জোট ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য ব্যাপক হত্যা, অগ্নি সন্ত্রাস, বৃক্ষ নিধন ও রেললাইন উপড়ানোর মতো মানবসমাজ বিরোধী কর্মসূচি নিয়েও শেষ পর্যন্ত সফলকাম হয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠিন অবস্থানের জন্য এবং এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত জনমত তৈরি হওয়ার জন্য। বর্তমান সরকারের সবিশেষ সচেতনতার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কাজেই আশা করা যায়, নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা যতই হুমকির মতো দেখা দেবে, ততই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আগের অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে পরিস্থিতি ভালোভাবে সামলাতে পারবে। বিশ্বের অগ্রগণ্য দেশগুলো চায় এবং আমাদের সমাজের মনস্তত্ত্ব হলো বাংলাদেশের আগামী সংসদীয় নির্বাচনটা অংশগ্রহণমূলক হোক। যদি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আগে অনুষ্ঠিত মেয়রের নির্বাচনগুলোর দিকে চোখ দেয়া যায়, কিংবা অতিসম্প্রতি অনুষ্ঠিত রংপুরের মেয়র নির্বাচনের দিকে চোখ দেয়া যায়, তা হলে ফলাফল দেখে বলা যাবে না যে নির্বাচন কমিশন বর্তমান সরকারের আমলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার আশা তাই মেয়র নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিচালনা থেকে করা যায়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে আগামী বছরটার বিরাট সমস্যা বস্তুত নির্বাচন নয়, বিরাট সমস্যা হচ্ছে স্থলভাগের যোগাযোগ সমস্যা। বাংলাদেশের মানুষের বিরাট শ্রম, মেধা ও সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে রাস্তায়। এবং এটা এমন একটা জটিল সমস্যা, এটা যে ২০১৮-এর মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়।

প্রথমে এ সমস্যাটার রূপটা একটু ব্যাখ্যা করি, তারপর সমাধানের কথা বলব।

বাংলাদেশ আয়তনে অতি ছোট একটা দেশ- যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ছোট একটি অঙ্গরাজ্য আরকানসাস- তার চেয়ে খানিকটা বড় : আরকানসাস ৫২ হাজার বর্গমাইল, বাংলাদেশ ৫৫ হাজার বর্গমাইল। কিন্তু ২০১৭ সালের এক খতিয়ানে আরকানসাসের লোকসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ, আর বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৩০ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ঘনত্বের হারে যদি বাংলাদেশের জনগণকে বিন্যাস করা যায়, তা হলে প্রতি বর্গমাইলে মাত্র ২৭ জন লোক বাস করার কথা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব একটি নতুন পরিবেশিত তথ্যে দেখলাম ২ হাজার ৮৮৯ জন প্রতি বর্গমাইলে, যেটা ঢাকা নগরীতে গিয়ে পৌঁছেছে প্রায় ৫০ হাজারে।

কিন্তু ম্যালথাসীয় সূত্রের বিপরীতে আধুনিক যুগের ধারণা হলো জনসংখ্যা কখনো সমস্যা নয়। জনসংখ্যা বরঞ্চ জনসম্পদ। ম্যালথাস জোর দিয়েছিলেন মানুষের সংহারী চরিত্রের ওপর, যার জন্য তার চোখে মানুষের মুখ ও পেট প্রধান সমস্যা হিসেবে ধরা পড়েছিল। কিন্তু মানবসম্পদতত্ত্ব ধারণকারীরা জানাচ্ছেন মানুষের মগজ এবং হাত-পা এগুলোই হচ্ছে মূল নিয়ন্ত্রক। তারা চীনের উদাহরণ দিয়ে থাকেন যে সর্বোচ্চ জনসংখ্যা নিয়েও পৃথিবীর অন্যতম আগুয়ান অর্থনৈতিক শক্তি এখন মহাচীন। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার অব্যাহত প্রচেষ্টায় নিয়োজিত এখন বিশ্ব অর্থনৈতিক চিন্তা।

তারপরেও জনসম্পদ তত্ত্বটার মধ্যে সৃজনশীলতা, মেধা, কর্মদক্ষতা ও সময়জ্ঞান এগুলোর সম্পৃক্তি থাকলেও আয়তনের সঙ্গে এর সম্পৃক্তি না থাকার ফলে মানবসম্পদ তত্ত্ব আমার কাছে ঘাটতিজনক তত্ত্ব মনে হয়। যেমন চীন, ভারত, ব্রাজিল কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, কিংবা পাকিস্তান বড় জনসংখ্যার দেশ হলেও এদের প্রচুর আয়তন- লোকদের ছড়িয়ে দেয়া যাবে বিভিন্ন এলাকায়। সে তুলনায় বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে দশম হলেও আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের ছয় ভাগের এক ভাগ। এ বিপুল জনসংখ্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো তো দখল করবেই, সুন্দরবনও দখল করবে। মানুষকে জায়গা দিতে গিয়ে নদী, জলাশয়, টিলা, অরণ্য সংকুচিত হয়ে আসছে।

তারপরও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটা প্যারাডক্স বা খাপছাড়া ব্যাপার আছে। ছোট দেশ কিন্তু বড় জনসংখ্যা- এটাও হয়তো সমস্যা হতো না, কিন্তু বাংলাদেশ যে দ্রুত উন্নয়নশীল একটি দেশে পরিণত হচ্ছে, এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যে হচ্ছে ৭ শতাংশের কাছাকাছি, ফলে কর্মব্যাপে মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়, আর তার সহায়ক হিসেবে নেমেছে গাড়ি। অর্থাৎ ঘরে বসে না থেকে মানুষ কর্মব্যাপে রাস্তায় নেমেছে এটা আসলে ইতিবাচক সংবাদ, কিন্তু নেতিবাচক হলো, রাস্তায় নেমে এ মানুষ তার গন্তব্যে নির্ধারিত সময়ের অনেক বিলম্বে পৌঁছাচ্ছে। ফলে তার শ্রম, মেধা ও সময় হারানোর সঙ্গে সঙ্গে যোগ হচ্ছে হতাশা। জনজীবনের এ নেতিবাচক প্রকরণটা বেশিদিন চলতে দেয়া ঠিক হবে না। এটা জাতীয় মেধাসম্পদের অপচয়, যার মাসুল আমাদের দিতে হবে।

আবার সমস্যাটার আরেকটা রূপ দেখুন। দুটো মহাসড়কের কথা বলি- ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম। ভাবা হয়েছিল যে চার-রাস্তা করে দিলেই সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু চার রাস্তা হওয়াটা যেন এ দুটো মহাসড়কের জন্য কাল হলো- কারণ রাস্তা বেড়েছে বলে গাড়ির সংখ্যা চারগুণ বেড়ে গেছে। ফলে সে একই যানজট। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক লোকালয়ে এখন যানজট একটি স্থায়ী বিষণœ ছবি। গাড়ি মানুষ কিনতে পারে দ্রুত, কিন্তু রাস্তা তো আর রাতারাতি বাড়ানো যায় না।

তবে সমস্যাটার সমাধানের রাস্তা কেমন কঠিন সেটা এখন বলি। কলকাতায় দেখলাম, সড়কগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির তেমন সরব উপস্থিতি নেই, বরঞ্চ বড় কর্মকর্তা, বড় শিক্ষক, বড় ব্যবসায়ীসহ সবাই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করছে- বাস, ট্রেন, ইয়েলো ক্যাব এবং সাম্প্রতিক সংযোজিত উবার। কলকাতার নগরজীবনের সঙ্গে আমাদের নগরজীবনের পার্থক্য জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে। কলকাতার লোক আমাদের চেয়ে কম ধনী নয়, বা কম স্বার্থান্বেষী নয়, কিংবা কম অর্থগৃধœও নয়, কিন্তু দীর্ঘকালীন নাগরিক জীবনচর্চার ফলে এদের অর্থনৈতিক জীবন পরিচালনার মধ্যে একটি সাশ্রয়ী ও সমাজ সচেতনতামূলক দিক লক্ষ করা যায়। ফলে ঝটপট গাড়ি না কেনে এরা ছোট ছোট বাড়ি কেনে। আর ভারতের তৈরি গাড়িগুলো গুণগত মানে বাংলাদেশের আমদানিকৃত জাপান-কোরিয়ার গাড়ির চেয়ে নিম্নতর হলেও এদের গাড়িগুলো ছোট ছোট, যা যানজট এড়াতে সহায়ক। কলকাতায় তেমন চোখে না পড়লেও দিল্লিতে প্রচুর ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় দেখা যায়, কিন্তু সবগুলোই ভারতের তৈরি হয়তো ১১০০, ১২০০ সিসির গাড়ি। বাংলাদেশের উঠতি মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে একাধিক গাড়ি রাখারও প্রবণতা বেড়ে গেছে, এবং তাও বড় গাড়ি। আইন করে কি সরকার কিছুদিন গাড়ি কেনার পলিসি বন্ধ রাখতে পারবেন, উপযুক্ত পরিসরের রাস্তা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত! বা আইন করে কি সরকার একদিন জোড় নম্বরের গাড়ি আরেকদিন বেজোড় নম্বরের গাড়ি রাস্তায় নামাতে জনগণকে বাধ্য করতে পারবেন! আর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট- বাস, ট্রেন, অটো, ওয়াটারবাস এগুলো করে যাতায়াতের সময় নিরাপত্তার ব্যবস্থা কি রাখা সম্ভব!

আরেকটা কঠিন অবস্থায় দেশ পড়ে যাচ্ছে যেটা ২০১৮ সালেও সচেতন মহলের জন্য অধিকতর বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করবে। সেটি হলো বিভিন্ন পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। এ ব্যাপারে আমার চিন্তাটা হলো এরকম :

একটি সরল সত্য হলো- লেখাপড়া যা হোক, সেটা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা সংগঠন যাই বলেন না কেন, নিজেকে শিক্ষিত করার দায় ব্যক্তির নিজের। মা যখন শিশুকে পিঠের ওপর একটি বই-বোঝা ব্যাগের ভার বহন করিয়ে স্কুলে পাঠান এবং স্কুল শেষে একাধিক কোচিং সেন্টারে পাঠান, তখন শিশুর মনস্তত্ত্বে লেখাপড়া করাটা নিজের কোনো বিষয় হিসেবে ধরা পড়ে না, পড়ে মা-বাবার চাপে রাতে ঠিক সময়ে ঘুমোতে যাওয়ার মতো কোনো ব্যাপার। লেখাপড়াকে স্কুলের বাচ্চারা আর নিজের জিনিস বলে ভাবে না, ভাবে দায়সারা গোছের রুটিন মানার মতো- মা, বাবার আবদার মেটানোর মতো। এ শিশুরা যখন বড় হয়, তারা সনদ পায় এবং সে সনদের ভিত্তিতে চাকরিও পায়, কিন্তু তাদের কোনো জীবনবোধ তৈরি হয় না, জ্ঞানের কোনো অন্বেষাও তাদের মধ্যে থাকে না। ফলে তারা মানসিকভাবে বড় শিশুর মতো থেকে যায়। আর এ জ্ঞানবিমুখতার ক্ষেত্রে বিরাট জোরদারি শক্তি হচ্ছে এমন একটা অধ্যাত্ম চিন্তা যাতে ইহজীবনের সব কিছুকে তুচ্ছ করে পরজীবনের প্রতি একটা মহালোভ তৈরি করে দেয়। এ ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যাত্মবাদের জন্য যেটা আমাদের সমাজে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করার মতো সেটা হলো যে ভাষায় একজন নিম্নপেশার অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত লোক কথা বলে সে একই ভাষায় শিক্ষিত ভদ্রজনও কথা বলেন। ভাষা যদি চিন্তার বাহন হয় এবং তাতে যদি এই বোঝা যায় যে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিতজন একই চিন্তা করছেন, তখন বুঝতে হবে সমাজ সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে।

তবে এ ভ্রমাত্মক অধ্যাত্মবাদ ব্যক্তিকে জ্ঞান-অন্বেষার প্রতি বিমুখ করে তোলে কিন্তু ইহজগতের বস্তুতান্ত্রিক পার্থিব জীবনের প্রতি তাকে উদাসীন করে তোলে না। স্কুলে বড় ব্যাগ বইয়ে নিয়ে যাওয়া শিশু যেমন লেখাপড়াকে নিজের মনে করে না, তেমনি প্রচুর অধ্যাত্মবাদে বিশ্বাসীজনও মনের কোণে সেটাকে স্থান দেয় না। ফলে তার অধ্যাত্মবাদ আসলে পার্থিব জীবনে কামিয়াব হওয়ার জন্য একটা ছুতো মাত্র।

পৃথিবীর সব রাষ্ট্রীয় সমাজই শিকড়ে শিকড়ে বস্তুতান্ত্রিক। আমাদেরটাও তাই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ ও দেয়ার পেছনে কারণটা হলো সামাজিক ও রাষ্ট্রিক পার্থিব প্রয়োজন মেটানোর জন্য উপযুক্ত জনগোষ্ঠী তৈরি করা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রাপ্তব্য সুবিধাদির চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যখন বহুগুণ হয়, তখন বাছাই পদ্ধতি বিপদগ্রস্ত হয়। পরীক্ষা প্রার্থীর উপযুক্ততা নির্ধারণ করার জন্য একটি পদ্ধতি। কিন্তু এ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে নিয়মিত- প্রচার মাধ্যমে এরকম খবর নিত্য আসছে, যদিও এর সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে আমি সন্দিহান। কারণ পরীক্ষা শুরু হওয়ার এক মিনিটের মধ্যেও যদি কেউ অভিযোগ করে যে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, সেটা আমলে নেয়া যাবে না। নতুন বছরে সবাই সুখে শান্তিতে থাকুক এ কামনা রইলো।

মোহীত উল আলম : অধ্যাপক, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

বিদায় ২০১৭ : স্বাগত ২০১৮'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj