তিনি…

শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭

** জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ **

সহকর্মী হিসেবে মিতু ম্যাডামকে খুব বেশি জানি না বললেই চলে। যতটুকু জানি; এ অফিসে তার পদবিটা উচ্চ এবং এই বয়সে এসেও সে দিব্যি একা। তাকে দেখে যতটা না ব্যথিত হই তারচেয়ে বেশি অবাক হই। মন ভার থাকে সারাক্ষণ। সময়ে সময়ে অবশ্য মন ভালোও দেখা যায়। ঠিক পূর্ণিমার চাঁদের মতোই।

তবে সেটা দিনে একবার হতে পারে; সপ্তাহে একবার হতে পারে; মাসে একবার হতে পারে; আর খুব বেশি করে যদি বলি তবে সেটা বছরেও একবার হতে পারে। তার এমন স্বভাব কাকতালীয় বটে।

এই বয়সে এসে একজন নারী বা পুরুষ পরিবার পরিজন নিয়ে কি দারুণ সময় কাটাবে, অথচ মিতু ম্যাডাম তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে; তার কাছে গিয়ে দু’দণ্ড কথা বলি কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারি না। আর এমন শুকনো স্বভাবের; মন খারাপ করে রাখা মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে মনে; ভয় লাগে; যদি অন্য কিছু হয়ে যায়। তারপরও মিতু ম্যাডামকে জানতে ইচ্ছে করে। তার সময়, ব্যক্তিত্ব, জীবন, আর সব কেনই বা এমন?

আমাদের সমাজে এই বয়সের পুরুষ হলে অন্য কথা ছিল কিন্তু তিনি তো পুরুষ নন; একজন নারী। তার জীবন এমন হবে কেন!

২.

সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল আজ। শুক্রবার। বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম কোনো এক বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে। পুরো সপ্তাহের কাজের চাপটাকে যেন একটু হলেও হালকা মনে হয়। একঘেয়ে সময় যেন কাছে না ঘেঁষে। ছুটির দিনের বিশেষ রুটিন আমার। নিজেকে চাপমুক্ত আর স্বতঃস্ফ‚র্ত রাখতে ভালোবাসি।

বন্ধুদের কাছ থেকে সাময়িকভাবে বিদায় নিয়ে রিকশায় উঠে বসি। ভেতরে এক ধরনের ভালো লাগা চেপে বসেছে। আমি চাই; এই ভালোলাগা; এই ভালো থাকা; দিনমান থাকুক।

হুটতোলা রিকশায় নিজেকে মনে হলো ডানাভাঙা শঙ্খচিল। অনর্থক সব ভাবতে ভাবতে পথ ছুটছি। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাবার বৃথা চেষ্টা করলাম; আর কিছু নয়; চিন্তার চর জুড়ে মিতু ম্যাডামের আনাগোনা। সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলেই তাকাতে থাকি চারপাশ।

হঠাৎ চোখে পড়ে রঙ্গপুলের এক পাশে মিতু ম্যাডামের আবছায়া। রিকশাওয়ালাকে ওদিকেই যেতে বলি। চোখের দেখা আর মনের দেখা দুটোই বেশ সামঞ্জস্য রেখে গেল। এত সত্যি সত্যি মিতু ম্যাডাম!

সন্ধ্যার আকাশে মিতু ম্যাডাম উদাস দৃষ্টি ছড়িয়েছে। তার অভিমুখে দাঁড়ানোর সাহস হলো না। বেশ দূরত্ব নিয়ে নির্জীব দাঁড়িয়ে রইলাম। সে যখন আমাকে দেখবে তখন না হয় কথা বলা যাবে; ততক্ষণ নিজেকে নীরব রাখার চেষ্টায় থাকি।

খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। ভেবেছিলাম; আমাকে দেখে হয়তো চমকে যাবে কিন্তু না; অবাক; বিস্ময়ের কোনো ছায়া তার মুখ জুড়ে নেই।

কি ব্যাপার ইমন সাহেব, আপনি এখানে?

রিকশা নিয়েই যাচ্ছিলাম; আপনাকে দেখে নেমে পড়লাম। কি করছেন এখানে?

রাতের আকাশে তারাদের ছোটাছুটি দেখছিলাম।

রাত হয়ে এল বাসায় ফিরবেন না?

বাসায় ফেরার কথা শুনে তার ঠোঁটে ভেসে ওঠে কালো বর্ণের হাসি।

বাসার কথা বলছেন, হুম; ফিরব; মন যখন চাবে; এখানে দাঁড়িয়ে বেশ লাগছে। আপনি তো বাসায় ফিরছিলেন; গেলেই পারতেন।

না; ভাবলাম; একা দাঁড়িয়ে আছেন আপনি, একটু কথা বলে যাই।

কি কথা বলবেন? বলুন।

কি কথা বলব ভেবে পাই না।

না; ম্যাডাম, তেমন কিছু না।

ও আচ্ছা।

আপনি অভয় দিলে একটা কথা জানতে চাই।

কি কথা বলুন?

অবশ্যই আপনার ব্যক্তিগত কথা।

আমার কথা কিছুটা নাড়িয়ে দিল তাকে। জায়গা বদল করে নেয়।

ব্যক্তিগত! আমার ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই ইমন সাহেব। যা আছে; তার সব তো আপনাদের নিয়েই।

বললে; ভীষণ খুশি থাকব আপনার প্রতি।

জি বলুন।

জীবনের এত সময় পেরিয়েও একা কেন আপনি? সংসারী হননি কেন?

ইমন সাহেব; আপনি তো আমার কলিজায় হাত দিয়ে ফেলেছেন।

এমন প্রশ্ন শুনে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল মিতু ম্যাডাম।

কিছু মনে না করলে; আমি শুনতে চাই আপনার ব্যক্তি বৈভব।

খুব স্বাদ নিয়ে ভালোবেসেছিলাম একজনকে। কোনো এক সন্ধ্যারাতে আমার সব নিয়ে গেছে সে।

তার জন্য জীবনের ওপর এমন নিখাঁদ অভিমান; মন থেকে তাড়িয়ে দিলেই পারতেন তাকে?

সে একা চলে গেলে আমার কোনো অভিযোগ ছিল না। আমার রূপ, রস; আমার দেহের ভাঁজ খুলে গন্ধ শুঁকে গেছে; আমায় শূন্য খাঁচার মতো ফাঁকা করে দিয়ে গেছে। তাই ভেবে নিয়েছি; জীবনের বাকি সময়টা একা কাটিয়ে দেব; একদম একা। চোখের সামনে যুগল কাউকে দেখলে আমার খুব ঈর্ষা কাজ করে আমার মনে। খুব সহজভাবে নিতে পারি না তাদের।

মিতু ম্যাডামের কথা শুনে পাথর হয়ে যাওয়ার উপক্রম আমার। নিজেকে সহজ রাখার চেষ্টায় থাকি। তার পুরনো ক্ষতটাকে আবার জাগিয়ে তুললাম। নিজেকে অপরাধী মনে হলো কিছুটা।

তারপরও তো পারতেন গুছিয়ে নিতে নিজেকে।

আর ইচ্ছে হয়নি নিজেকে গোছানোর। তাই সব কাজের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখি। যেন কিছু হলেও মুক্তি মেলে।

কথা না বাড়িয়ে বিকারগ্রস্ত মনে খোলা হাইওয়ে রাস্তার মাঝখানে দিয়ে অকস্মাৎ হাঁটতে থাকে মিতু ম্যাডাম। কোনো জনমানব নেই। কোনো যান নেই। আমি তার চলে যাওয়া দেখি। ফেরাতে পারি না। লাম্পপোস্টের নিয়ন ছেড়ে আঁধারের শরীরের মিলিয়ে যায় সে।

আকাশ নিচে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখি। ভাবতে থাকি; জগতে এমন মিতু ম্যাডাম কত আছে; ক’জন খোঁজ রাখে এদের।

কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দ ভেসে আসে কানে। দৌড়ে যাই সামনে। আঁধারে কিছু দেখা যাচ্ছিল না তেমন। খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে যাই; চোখে পড়ে রক্তাক্ত মিতু ম্যাডাম।

:: সিরাজগঞ্জ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj