নিয়তি

শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭

** ইব্রাহীম রাসেল **

শুঁটকি মাছ মায়ের খুব পছন্দের। কক্সবাজার থেকে মায়ের জন্য কয়েক ধরনের শুঁটকি কিনল রেজাউল। মাকে ফোন করে জানাল শুঁটকির কথা।

জানতে চাইল- মা, তোমার আর কিছু লাগবে? সামনেই তো শীত। এখানে রাখাইনদের তৈরি অনেক সুন্দর শীতের চাদর পাওয়া যায়। তোমার জন্য আনব মা? মা বললেন, কিছু লাগবে না বাবা। তুই ভালোয় ভালোয় ফিরে আয়।

বিয়ানীবাজারের ফতেহপুরে রেজাউলের বাড়ি। বিয়ানীবাজারেই তার স্টেশনারির দোকান। পড়াশোনা শেষে চাকরির জন্য অপেক্ষায় না থেকে ব্যবসা শুরু করে।

নিজ এলাকার জন্য তার বিশেষ মায়া। চাকরির সুবাধে যদি অন্য কোনো এলাকায় যেতে হয়। এ বিষয়টি সে কিছুতেই মানতে পারে না। এলাকায় রয়েছে তার আত্মার স্পন্দন বন্ধুরা। যাদের সঙ্গে রোজ সময় না কাটালে পেটের ভাত হজম হয় না। কী করে সে এদের ছেড়ে দূরে গিয়ে চাকরি করবে।

আর মা-বাবা তো আছেনই। সে জন্য চাকরির কথা সে কখনো চিন্তা করেনি। বন্ধুদের মধ্যে সিয়াম ও রাহেলের একই বাজারে কাপড়ের দোকান। আর রাতুল-রায়হান-তাজুল ওরা বড়লোক বাবার সন্তান। তিনজনের বাবাই লন্ডন থাকেন। নিজেদের আয়ের চিন্তা আপাতত তাদের মাথায় নেই। বন্ধুদের মধ্যে রেজাউলই একমাত্র বিয়ে করেছে।

দুবছরের একটি সন্তান রয়েছে তার। নিজ এলাকার ভালো-মন্দে বন্ধুদের নিয়ে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে রেজাউল।

সাম্প্রতিক মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনাটি নিয়ে কথা হয় বন্ধুদের মধ্যে। ফেসবুকে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন দেখে কেঁপে ওঠে রেজাউলের আত্মা। বিভিন্ন নির্যাতনের চিত্র দেখিয়ে বন্ধুদের বলে- মানুষ কত নিষ্ঠুর হতে পারে! বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী এসব অসহায় রোহিঙ্গার জন্য আমাদেরও কিছু করা উচিত।

বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত হয় রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাবে। মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে ছয় বন্ধু মিলে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে আসে কক্সবাজারে। ত্রাণ দেয়া শেষ করে বাড়ির ফেরার আগে ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল রেজাউল।

মায়ের সঙ্গে কথা শেষ করে দুবছরের শিশু মেয়ে রাইসার জন্য খেলনা কিনল।

স্ত্রীর জন্য নিল ঝিনুক আর মাটির কানের দুল। বিকেল ৩টায় কক্সবাজার থেকে বিয়ানীবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে তাদের মাইক্রোবাস। যাত্রাপথে রোহিঙ্গাদের করুণ চিত্র নিয়ে পরস্পর কথা হচ্ছিল। সিয়াম বলল, রোহিঙ্গা শিশুগুলোর দিকে সত্যিই তাকানো যায় না। কী মানবেতর অবস্থায় আছে! রায়হান বলল, নারী আর শিশুরাই সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে। ওদের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তাজুল বলল, সু কি তো শান্তির নোবেল পেয়ে চুপ করে আছেন। ক্ষোভের স্বরে বলল, তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করা উচিত। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাদের মাইক্রোবাস নরসিংদীতে আসে। কথা চলছিল পরস্পরের মধ্যে। হঠাৎ উল্টোদিক থেকে আসা বেপরোয়া একটি ট্রাক উঠে যায় তাদের মাইক্রোবাসের ওপরে।

রাত ৮টার দিকে নরসিংদীর সদর হাসপাতাল থেকে ফোন দেয়া হয় বিয়ানীবাজারে রেজাউলের বাসায়। রেজাউলের মা ফোন তুলে কানের কাছে ধরেন। ফোনের এপার থেকে বলা হলো, রেজাউলদের মাইক্রোবাসটি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।

ছয়জনের মধ্যে চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তাদের অবস্থা গুরুতর। বাকি দুজন স্পট ডেথ। একজনের নাম সিয়াম আর অন্যজন রেজাউল।

:: ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj