সুখকষ্ট…

শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭

** এম এ বাশার **

ফাহিমউদ্দিনের এখন সুখের জ্বালা। সুখ আর প্রাচুর্যের বৈভবে তার জীবনটা এখন একঘেয়ে ও প্যাচপ্যাচে। মোটেও সুখ সইতে পারছে না। ফাহিমউদ্দিন জীবন বদলাতে চায়। দুঃখের আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলতে চায় জীবন। কিন্তু দুঃখ কি চাইলেই মেলে? সে অনেক ভেবে দুঃখের খোঁজ না পেয়ে বাড়ির পুরনো কর্মচারী মনু মিয়াকে ডেকে গভীর আগ্রহে জানালো অসুবিধের কথা। তার সুখ ভালো লাগছে না। অসহ্য মনে হচ্ছে।

এরকম প্রশ্ন শুনে মনু মিয়ার চোখ ‘ছানাবড়া’। সে সারাটা জীবন সুখের নাগাল ধরার জন্য পড়িমরি করে ছুটছে। কিন্তু সুখ ডিগবাজি দিয়ে পলায়নরত। মনু মিয়া অনেকক্ষণ মাথা চুলকিয়ে কোনো ক‚ল কিনারা না পেয়ে বলল- ‘চাচাজান, আপনাকে এক কাপ গরম চা দেই।’

ফাহিমউদ্দিন অনেকক্ষণ চা খায়নি। চায়ের কথা শুনে ভাবলো চা খেতে খেতে দুঃখ নিয়ে ভাবা যাবে। ফাহিমউদ্দিন যাকেই দুঃখ নিয়ে জিজ্ঞেস করছে, সেই যেন কিছু অসম্ভব কথা শুনছে। কেউ বলছে- ‘লোকটার ভীমরতি ধরেছে।’

কেউ বা বলছে- ‘মৃত্যুর পূর্বে মানুষ এলোমেলো কথা বলে। তাই অমন পাগলামি শুরু করেছে।’

ফাহিমউদ্দিন সুখ-দুঃখের যতই বিশেষণ করতে চাচ্ছে তার আশপাশের প্রিয়জনরা তার কাছ থেকে ভয়ে সরে যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার চেকে সই করে ফাহিমউদ্দিনের মনে হচ্ছে চেকের পাতাগুলো ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দেবে। সেদিন গাড়িতে যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি বিস্ময়কর সাইনবোর্ড।

সে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলল। সাইনবোর্ডে লেখা আছে- ‘যাবতীয় জটিল সমস্যা নিরসন সংস্থা।’ ফাহিমউদ্দিন সাইনবোর্ড দেখে দারুণ খুশি। সে সটান চলে গেল অফিসের ভেতরে। অফিসরুমে ঢুকেই দেখল দুজন মহিলা। একজন সমস্যা আক্রান্ত, অপরজন সংস্থার প্রধান পরামর্শ প্রদানকারি মিসেস শিরিন সুলতানা।

সমস্যা আক্রান্ত এক নারী জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপা, আমার ভীষণ রাগ, রাগ থামাতে পারি না। আমি আমার স্বামীকে সহ্যই করতে পারি না। এখন কী করবো বলুন আপা ?’

শিরিন সুলতানা হেসে উত্তর দিলেন- ‘আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনি খুব জোরে জোরে চিৎকার করবেন। যখন হাঁপিয়ে উঠবেন, তখন ইজি চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দেবেন। আর মনে করবেন আপনি এতক্ষণ সিনেমা বা নাটকে অভিনয় করছেন। দেখবেন রাগ কমে গেছে।’

ফাহিমউদ্দিন পাশে বসে এরকম কথা শুনে বেশ আনন্দিত। মনে মনে ভাবল ‘বাহ! এ-তো সুন্দর সমাধান’। শিরিন সুলতানা আবারো বললেন- ‘তবে আপনি যদি কাজ করতে ভালোবাসেন তাহলে- রাগ উঠলেই অনবরত কাজ করতে থাকবেন। দেখবেন, আপনার রাগ পালিয়ে গেছে। এক সময় মনে হবে একটুও রেগে যাননি।’

মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠবে। ফাহিমউদ্দিনের মনে হলো তার জটিল সমস্যার আজ একটা সমাধান পেয়েই যাবে। মহিলা উঠে যেতেই ফাহিমউদ্দিন এগিয়ে গেল। শিরিন সুলতানা জিজ্ঞেস করল- ‘বলুন আপনি কী জানতে চান? আপনাকে তো ভীষণ সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।’

ফাহিমউদ্দিন কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললেন- ‘দেখুন ম্যাডাম, আমি দুঃখ পেতে চাই। কষ্টের ঠিকানা পেতে চাই। অতিরিক্ত সুখ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।’

ভদ্র মহিলা হেসে ফেললেন। তিনি এ জীবনে অনেক সমস্যা নিরসন করেছেন কিন্তু সুখের জ্বালায় অস্থির এমন সমস্যার কথা শোনেননি। বললেন- ‘দুঃখ তো হাট-বাজারের পণ্য নয় যে যখন তখন চাইলেই পাবেন। বরং আপনি মৃত্যুর কথা ভাবুন। পরকালের কথা চিন্তা করুন। তাহলে আপনি কষ্টের স্বাদ পেতে পারেন।’

ফাহিমউদ্দিন পরামর্শ শুনে আশ্বস্ত হলেন। তিনি ভদ্র মহিলাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাড়িতে ফিরে মৃত্যু ভাবনায় মেতে উঠলেন। কি পন্থায় সহজে মৃত্যু হবে এ নিয়েও নানাবিধ জল্পনা-কল্পনা শুরু হলো। সেদিনের সকাল।

ফাহিমউদ্দিন ঝিম মেরে বসে আছেন। হঠাৎ মনু মিয়ার ব্যস্ততা দেখে বিস্মিত হলো। মনু মিয়া দ্রুত ঘরের কাজকর্ম করছে আর অনবরত বকে চলেছে। এ অবস্থা দেখে সে মনু মিয়াকে কাছে ডাকল। জিজ্ঞেস করল- ‘কী ব্যাপার! এত ছোটাছুটি করে কাজ করছিস কেন? কী হয়েছে?’ মনু মিয়ার মুখ দেখে মনে হলো কিছু একটা বিপত্তি ঘটেছে। সে উত্তর দিল- ‘এখন আমার প্রচণ্ড রাগ চেপেছে, তাই বেশি কাজ করে রাগ থামাচ্ছি।,

ফাহিমউদ্দিন ওর কথা শুনে রীতিমতো চমকে গেল। মনু মিয়া কি তাহলে সমস্যা নিরসন সংস্থার সেই ভদ্র মহিলার পরামর্শ নিয়েছে? না হলে এ থিওরি সে জানল কী করে?

ফাহিমউদ্দিন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তার মনে হলো মনু মিয়া তারচেয়েও এডভান্স। সে মুষড়ে পড়ল। মনু মিয়াকে রাগত স্বরে বলল- ‘এ্যাই, তুই কাজে ফাঁকি দিয়ে সমস্যা নিরসন সংস্থায় গিয়েছিলি?’ মনু মিয়া এমনিতেই ক্ষেপে আছে।

এ কথা শুনে তার মেজাজ আরো বিগড়ে গেল। বলল- ‘চাচাজান, আপনার এখন তাড়াতাড়ি মরা উচিত। মরণের ডাক এসেছে।’ বলেই হনহন করে চলে গেল।

ফাহিমউদ্দিন এই প্রথম মৃদু হোঁচট খেল। হ্যাঁ, সে তো মরতে চায়। কিন্তু কিভাবে? দিশাহারা হয়ে পড়েছে। তার মনে হলো মৃত্যুর পূর্বে অন্তত একটিবার একমাত্র মেয়ে ঊর্বশীকে দেখে আসবে। ঊর্বশী এখন নিউইয়র্কে। ঊর্বশী তো আনন্দে আত্মহারা। এতদিনে বাবাকে পেয়ে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না।

তবু সে আমেরিকার বন্ধুদের নিয়ে এক পরিচিতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। রমরমা আমেজ। ঊর্বশী তার বাবাকে কিছু বলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানাল।

ফাহিমউদ্দিন বিষণœ। সে মৃত্যু চিন্তায় বিভোর। অনিচ্ছাসত্ত্বেও দাঁড়িয়ে অভ্যাগতদের উদ্দেশে বলল- ‘আমি ভালো নেই’ মৃত্যু চিন্তায় ভীষণ ব্যতিব্যস্ত। আমি এখনই মরতে চাই। প্রয়োজনে এই মুহূর্তেই আত্মাহুতি দিতে পারি। এমন অভাবনীয় ঘটনায় সবাই হতবাক। এ কী উদ্ভট চিন্তা?

উপস্থিত সবার জিজ্ঞাসা- ‘ঊর্বশীর বাবা কি উন্মাদ?’

ঊর্বশী হার্টের পেশেন্ট। সে তার প্রিয়তম বাবার আগাম মৃত্যু ঘোষণা শুনে চমকে উঠল। তার বুক ব্যথা প্রচণ্ড বেড়ে গেল। লজ্জায়-অপমানে তার শরীর কাঁপছে। বাবা বলে চিৎকার করার চেষ্টা করছে। এক সময় বাঁধ ভাঙা কান্না এলো- ‘বাবা, তুমি আমাকে শেষবারের মতো মার কাছে নিয়ে চল।’ ফাহিমউদ্দিনের চোখে দাউ দাউ করা কষ্টের আগুন। সেও হতভম্ব! ততক্ষণে সুখের পীড়নটা একটু একটু করে পালাচ্ছে।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj