অবেলার গল্প

শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭

** শ্যামল বালা **

হঠাৎ করিয়া মোবাইল বাজিয়া উঠিতে সবুজের তন্দ্রা ভাঙিয়া গেল। সে হাসপাতাল হইতে ফিরিয়া আসিয়া একটু গড়াইতেছিল। ফোনের পর্দায় একটি অজানা নম্বর! ফোনটা ধরিবে কি ধরিবে না ভাবিতে ভাবিতে সে ধরিয়াই ফেলিল, কিন্তু যে ফোন করিয়াছে তাহার পরিচয় পাইয়া সবুজ অবাক হইয়া গেল।

সুমিত- মাধবীদির ছোটভাই। সেই ছোট্ট সুমিত। সে বলিল, দিদি আপনার সাথে কথা বলবে। একটু পরে আবার একটা অজানা ফোন নম্বর পর্দায় ভাসিয়া উঠিল। সে ফোন ধরিতে যে গলাটা শুনিল, তাহাকে সবুজ চিনিতে পারিল না। তবুও চিনিল, চিনিতে হইবে বলিয়া। ফোনে যতটুকু আলাপ হইল, সবুজ বুঝিল- সমাজের বদান্যতায় এবং সংসারের চাপে দিদি আজ অনেকটাই পাল্টাইয়া গিয়াছে।

নইলে এত সহজে বলিতে পারিল কি করিয়া- তাহাদের ছেলেরা তাহাদের আর এক মায়ের কাছে থাকে। সবুজের সবকিছু তালগোল পাকাইয়া গেল। তবুও সে দিদিকে কথা দিল সে তাহার সঙ্গে অবশ্যই দেখা করিবে, কিন্তু একদিন গেল হাসপাতালের ব্যস্ততায়- আর একদিন গেল ভুল ট্রেনে উঠিয়া গ্যালপ করিয়া দিদির স্টেশন পার হইয়া চলিয়া যাওয়ায়!

স্মৃতিও গ্যালপের আশ্রয় লইল। দেশ স্বাধীন হইয়াছে। বাংলাদেশ। সবুজ অটোপ্রমোশন পাইয়া সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হইলেও অনেকেই প্রমোশন না লইয়া সেই শ্রেণিতেই রহিয়া গিয়াছে।

মাধবীদি তাহাদেরই একজন।

সে দিদি হইয়াও তাই সবুজের সাথে একই শ্রেণিতে পড়িতেছে। দিদি একেবারেই শান্ত, কদাচিৎ কাহারো সাথে কথা বলে।

সবুজ কেন জানি তাহাকে দিদি ছাড়া কোনোদিনই বন্ধু ভাবিতে পারিত না। যদিও মাধ্যমিক পাশের আগে সে দিদির সাথে কয়দিন কথা বলিয়াছে তাহা আজ আর মনে করিতে পারে না।

দৈব দুর্বিপাকে দিদিরই এক মাতৃহীন কাকাতো বোনকে সবুজের খুব ভালো লাগিত, তাহাকে ভালোবাসিতে ইচ্ছা করিত, কিন্তু মুখ ফুটিয়া তাহাকে সেই কথা কোনোদিন বলিতে পারে নাই।

সবুজ বিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকিত।

একদিন সে প্রচণ্ড জ্বরে পড়িয়া ক্লাসে যাইতে পারে নাই। মামা বাড়িতে মানুষ তাই দিদিমার কথা মনে করিয়া তাহার কষ্ট হইতেছিল; একসময় মায়ের কথাও মনে পড়িল।

তবে খোলা দরজা দিয়া যে প্রবেশ করিল তাহাকে দেখিয়াই তাহার ঘাম দিয়া জ্বর ছাড়িয়া যাইবার উপক্রম হইল।

তাহারই বন্ধুরা সেই মেয়েকে নাকি বলিয়াছে সবুজ তাহাকে ডাকিয়াছে! সেই ছোট্ট মেয়ে ভালোমন্দ কিছুই না বুঝিয়া চলিয়া আসিয়াছে। সেইদিন জ্বরের ঘোরে তাহাকে কী বলিয়াছিল সবুজের আজ আর তাহার কিছুই মনে নাই।

তবে তাহাকে ‘ভালোবাসিতে চাহে’- তাহা যে বলিতে পারে নাই তাহা মনে আছে।

একদিন কানাঘুষায় সবুজ জানিতে পারিল- সেই মেয়েটি আগামীকাল ভারতে তাহার বাবার কাছে চলিয়া যাইবে।

সবুজ সারাজীবনের সাহস সঞ্চয় করিয়া তাহারই সাথে পড়ে কিন্তু বয়সে বড় এক কাকাকে লইয়া তাহার সঙ্গে দেখা করিতে তাহাদের বাড়িতে গেল। ভাগ্যের পরিহাসে দিনটি ছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫।

অনেকক্ষণ হইল ভোর হইয়াছে।

সেই বাড়িতে ঢুকিতে না ঢুকিতে তাহারা শুনিতে পাইল, সকলে বলাবলি করিতেছে শেখ মুজিবকে নাকি একদল সেনাবাহিনী হত্যা করিয়াছে; দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হইয়াছে। সবুজ এই কথা বিশ্বাস করিবে কী করিয়া! ইহা যে কোনোদিন হইতে পারে তাহা চিন্তা করাও যে পাপ। তাহারা এই খবর শুনিয়াও যাইতেছে না দেখিয়া সেই মেয়েটির এক ঠাকুরদা বাহিরে আসিয়া দেশের পরিস্থিতি বুঝাইয়া তাহাদের বাড়িতে যাইতে বলিল।

সবুজের হঠাৎ মনে পড়িল, সেতো বিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক; দেশের পরিস্থিতি যাহাই হউক তাহার তো একটা কর্তব্য আছে। বেলাও মন্দ হয় নাই। সে দ্রুত বিদ্যালয়ে ফিরিয়া আসিয়া সকল ছাত্রছাত্রীদের লইয়া একটা মিছিল বাহির করিল ! সঙ্গে ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার চাই, বিচার চাই’ বলিয়া ¯েøাগান।

এমন সময় বড় গাঙ দিয়া সেনাবাহিনীর গানবোট যাইতে দেখিয়া সকল শিক্ষকরা বাহির হইয়া তাহাদের মিছিল বন্ধ করিতে বলিলেন এবং বিদ্যালয় যে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকিবে তাহা ঘোষণা করিয়া দিলেন।

এরপর যেইদিন বিদ্যালয় খুলিল সেই ছোট্ট মেয়েটিকে আর দেখা গেল না। একসময় মাধ্যমিক পাশ করিয়া সবুজ ঢাকা কলেজে ভর্তি হইল। রোজার বন্ধে বাড়িতে আসিয়াছে।

সে এখন তাহার সেই কাকুর ছায়াসঙ্গী। বাজারে একটি টিনের চালার ছোট্ট ঘরে কাকু থাকে; দিনে তাহারই একপাশে পোস্টমাস্টার মশাই তাহার চিঠি বাছাবাছির কাজ করেন, ডাকটিকিটও বিক্রি করেন। একদিন তাহাদের সাথে পরীক্ষায় বসে নাই এমন এক বন্ধু আসিয়া সবুজকে ইলেকটিভ ম্যাথ করানোর জন্য খুব করিয়া ধরিল।

সে রাজিও হইল। কয়েকদিনপর সবুজ কি মনে করিয়া তাহার কাছে মাধবীদিকে আসিবার জন্য খবর পাঠাইয়া দিল।

না আসিলেও সবুজের কিছুই করার ছিল না বলিয়াই বুঝি দিদি আসিল এবং তাহার বোনের ঠিকানাটা দিয়া গেল।

যথাসময়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করিয়া সবুজ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হইয়াছে। বাড়িতে অর্থের টানাটানি।

প্রেম তবুও তাহার পথেই চলিতে লাগিল, কিন্তু কতদিন আর চলিতে পারে। এক সময় সেই মেয়েটির বিবাহ হইয়া গেল। সবুজ তখনো ডাক্তার হয় নাই। একবার পূজার ছুটিতে বাড়িতে আসিয়া সেই কাকুর সঙ্গে পূজা দেখিতে যাইয়া সবুজ দিদিদের বাড়িতে গিয়া তাহারই হাতে নাড়ু খাইয়া আসিল। সেদিন দিদিকে সবুজের একটু যেন ভারিক্কি মনে হইল ?

সবুজ একদিন ডাক্তারীও পাস করিল- ইন্টার্নি চলিতেছে। তখনই শুধু নিজেদের গ্রাম নয় আশেপাশের গ্রাম হইতেও অনেকে ঢাকা আসিয়া তাহাকে খোঁজে চিকিৎসা পরামর্শের জন্য। এক দিন এক দাদা বউদিকে লইয়া ঢাকা আসিলেন তাহাদের বাচ্চা হইতেছে না বলিয়া।

বৌদিকে স্বনামধন্য চিকিৎসককে দেখানো হইল। তিনি জবাব দিয়া দিলেন- বৌদির কোনোদিনই বাচ্চা হইবে না। স্যারের ঘরে টাঙানো ছোট্ট দুই ভাইবোনের একখানি ছবি দেখাইয়া সবুজ বড় দুঃখে বৌদিকে সেইদিন বলিয়াছিল- সেই ছবিখানি লইয়া যাইতে!

তারপর একদিন চাকরিজীবন শুরু করিয়া সবুজ বড্ড ব্যস্ত হইয়া পড়িল। একদিন শুনিল দিদির বিবাহ হইয়া গিয়াছে।

ইহার বেশ কিছুদিন পর একবার বাড়িতে আসিয়া দিদির এক পিসিমার ছেলে অসুস্থ হওয়াতে তাহাদের বাড়িতে গিয়া ফিরিবার সময় সবুজ দিদিকে ডাকাডাকি করিলেও কেন জানি দিদি বাহির হইল না। পরে সে শুনিয়াছিল- দিদির বিয়েটা নাকি দোজবরের সঙ্গে হইয়াছে; দিদির শরীর-চেহারা দুই-ই ভাঙিয়া গিয়াছে।

এরপর মায়ের উপর অভিমান করিয়া সবুজ একদিন দেশান্তরী হইল। চাকরিও জুটাইল। বদলি চাকরিতে শহরান্তরে গিয়া সেই মেয়েটির সাথে দেখাও হইল; কিন্তু সেই আবেগ ততদিনে উধাও হইয়া গিয়াছে। সেও অনেকদিন হইল বিবাহ করিয়াছে। সংসারের কর্মক্ষেত্রের দাবিতে এখন ব্যস্ত মানুষ বৈকি।

তিনি দিন প্রায় পঞ্চাশ-পঞ্চাশ একশ কিলোমিটার যাতায়াত করেন। এরই মধ্যে দিদির ফোন- সবুজের বিশ্বাসই হইতেছিল না।

সবুজ একদিন হাসপাতাল হইতে আগে বাহির হইয়া নির্দিষ্ট স্টেশনে আসিয়া নামিল। ফোন করিতে দিদিই ফোন ধরিয়া পথের নির্দেশ দিতে মেয়েকে দিল।

সবুজ কিছু মিষ্টিও কিনিল। মাঠের পাশ দিয়া যাইতে যাইতে সে দেখিল- একখানি সাধারণ শাড়ি পরিয়া একজন মহিলা হাত নাড়িতেছে। হাত না নাড়িলে সবুজ ঠিকই তাহাকে পাশ কাটাইয়া যাইত। এ কী চেহারা হইয়াছে! রাজরানী না হইলেও দিদিকে সবুজ এই অবস্থায় দেখিবে তাহা কোনোদিন কল্পনাও করিতে পারিত না।

একখানি টালির ঘরের সামনে আসিয়া দিদি- দিদি বলিয়া ডাক দিতে যে মহিলা বাহির হইয়া আসিল সবুজ অনেককিছু ভুলিয়া গেলেও তাহাকে ভুলিবে কী করিয়া!

ঘরে ঢুকিয়া সবুজ তাহার হাত ধরিয়া কেমন আছো বলিতে সেই মলিনা দিদি অনেক কষ্টে তাহার চোখের জল সামলাইল।

দিদি তাহার দুই ছেলেমেয়েকে ডাকিয়া কাছে বসাইয়া পরিচয় করাইয়া দিতে বড়দিদি বলিয়া উঠিল- তোমারই কথামতো সেই ছবিখানি লইয়া আসায়াছি। দুইজনকে লইয়া আমি ভালোই আছি!

তারপর কত কথা!

কথা কি আর ফুরাইতে চাহে! দিদিরা কতপদের মিষ্টি খাইতে দিয়াছে; আমও দিয়াছে। সবুজ খাইতে আর পারিল কই! কেন জানি মনে মনে তাহার কান্না পাইতে লাগিল। এত মিষ্টি দেখিয়া তাহার গা গুলাইয়া উঠিতে লাগিল।

খাইতে হইবে বলিয়াই সে কোনোরকমে একটা মিষ্টি খাইল! এক সময় বিদায় লইয়া রওনা দিবে বলিয়া বাহির হইয়াছে; দিদি গেটের কাছের আমগাছ হইতে একটি পাকা আম পাড়িয়া সবুজকে আর একটু সময় বসিয়া আমটি খাইয়া যাইতে বলিল। সবুজ বসিল না।

সে দিদিকে আমটি একটি পলিথিনে পেঁচাইয়া দিতে বলিল- সে না হয় বাড়িতে লইয়া যাইবে- সকলে মিলিয়া খাইবে!

দিদি ছেলেকে সঙ্গে করিয়া তাহাকে অনেকদূর আগাইয়া দিল। স্টেশনে পৌঁছাইতেই সবুজ দেখিল ট্রেন ঢুকিতেছে। ফাঁকা ট্রেন সিট পাইতে অসুবিধা হইল না।

আষাঢ় মাস। আগে হইতেই আকাশ অন্ধকার ছিল। টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি শুরু হইল। কতকিছু চিন্তা করিবার ছিল- তবু কেন জানি তাহাকে ঝিমুনিতে পাইয়া বসিল। হঠাৎ কী কারণে দমদমের মেট্রো কারসেডের কাছে আসিয়া ট্রেনটি ব্রেক কষিতে সবুজের ঝিমুনি কাটিয়া গেল। তাহার মনে হইতে লাগিল সে বুঝি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখিতেছিল!

তাহার খুব জল খাইতে ইচ্ছা করিল, কিন্তু ব্যাগ খুলিয়া জলের বোতল বাহির করিয়া জল খাইতে গিয়া সে দিদির দেয়া আমটি দেখিতে পাইল। তাহার সবকিছু মনে পড়িয়া গেল।

সে বুঝিল আষাঢ় মাস হইলেও ঘটনাটি মিথ্যা নহে; তাহারই জীবনে ঘটিয়াছে! সবুজের ডানচক্ষু হইতে একফোঁটা জল তাহার দক্ষিণ হস্তে ঝরিয়া পড়িল একটি আমের জন্য…।

:: ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj