হৃদয়ের কথা

শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭

ভালোবাসার জন্য নিখাদ ও সুন্দর হৃদয়ের যেমন প্রয়োজন, তেমনি সুস্থভাবে জীবনের চলনেও দরকার সঠিক ছন্দময় হৃদযন্ত্রের। হৃদয়ের ভালোবাসার কথামালাগুলো প্রিয়জনকে জানাতে আমাদের কত ব্যাকুলতা। অথচ হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য আমরা সচেতন হই না। ভালোবাসার সম্পর্কে শুরু থেকে যেমন সতর্কতা অবলম্বন অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি হৃদযন্ত্রের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা চাই। ভালোবাসার মানুষকে যদি বেশিদিন হৃদয়ের কথা জানাতে চান এবং জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে চান, হৃদযন্ত্রের ছন্দময় ক্রিয়া স্বাভাবিক রাখা চাই। অন্যথায় ছন্দপতন ঘটলে অকালে এই সুন্দর প্রাণ হয়ে উঠবে জটিল, ভারসাম্যহীন এবং বেদনাময়। সুতরাং হৃদয় ও হৃদযন্ত্রের ওপর অত্যাচারী হওয়া চলবে না।

হৃদরোগ অনেক ধরনের আছে তন্মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকসনের ভয়াবহতা মারাত্মক। কোনো কারণে হৃৎপিণ্ডের রক্তবাহী নালি সরু বা বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকসন হয়। হার্ট অ্যাটাকের জন্য বেশ কিছু কারণ দায়ী। এর মধ্যে কতগুলোকে ইচ্ছে করলেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় আবার কিছু কারণ আছে যা অপরিবর্তনীয়। এগুলোর মধ্যে : করোনারি আর্টারি ডিজিজ, পূরবর্তী হার্ট অ্যাটাক, বুকে ব্যথা, বয়স বাড়া, নিকটাত্মীয়ের (বাবা, মা, চাচা, মামা) হৃদরোগের ইতিহাস ইত্যাদি।

জিনগত সমস্যা; যেসব জিন উচ্চ রক্তচাপের জন্য প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে দায়ী এবং শরীরে মন্দ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

আর ঝুঁকিপূর্ণ কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় যেমন- ধূমপান, বাড়তি ওজন/মেদবহুল স্থূলতা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের সুগার/ ডায়াবেটিস, খাদ্যাভ্যাসে (ট্রান্স আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট) পরিবর্তন এবং শারীরিক নৈষ্কর্ম, মদ্যপান প্রভৃতি। দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যক্তিগত জীবনে ও পারিবারিকভাবে কঠিন চাপের মধ্যে থাকা, সামাজিকভাবে বঞ্চিত বা নিগৃহীত হতে থাকলেও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

টাইপ-১ পারসোনালিটির মানুষের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক, দীর্ঘদিন অপর্যাপ্ত ঘুম শুধু মেজাজকে বিগড়ে দেয় না, এতে হার্টের ওপর চাপ পড়ে; ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং মৃত্যুর আশঙ্কা বেড়ে যায়। ঋতুবন্ধ (পোস্ট মেনোপোজাল ইস্ট্রোজেন ডেফিসিয়েন্সি) নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে থাকে।

যারা আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত তারা যদি সঠিক নিয়মে, নিয়মিতভাবে ওষুধ সেবন না করেন তাহলে যে কোনো মুহূর্তে জ্বলতে পারে লাল বাতি / সিগন্যাল।

হার্ট অ্যাটাক কখন, কোথায় এবং কীভাবে হবে এটা বলা মুশকিল হলেও কয়েকটা সতর্কীকরণ সংকেত আছে : হঠাৎ বুকে ব্যথা অথবা প্রচণ্ড চাপ অনুভব করা, বুকে অস্বস্তি বোধ করা এবং বুক ভারী হয়ে আসা, চোয়াল বা ঘাড়ে অস্বস্তি বোধ করা, হাতে (বিশেষ করে বাম হাতে) ব্যথা বা বিশেষ ধরনের অনুভূতি হওয়া, শ্বাস-কষ্ট বা শ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়া, বমিবমি ভাব। তবে হার্ট অ্যাটাক নিঃশব্দেও হতে পারে- রোগীর অজান্তে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে।

অনেক সময় হৃদরোগজনিত বুক ব্যথাকে ‘বুক জ্বালা’ (এসিডিটি, পেটের গ্যাস) বলে ভুল করেন। হার্টের রোগের উপসর্গ দেখা দিলেই যে সাবধান হবেন, তা নয়। এমন মনোভাব পরিবর্তন করা উচিত।

বয়স চল্লিশোর্ধ্ব হলেই দেহের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। যেমন- প্রয়োজনীয় কিছু রক্ত পরীক্ষা, রক্তে সুগারের, চর্বির পরিমাণ জানা, বুকের এক্স-রে, ইসিজি। রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় হার্টের ইকো, ইটিটি এমনকি এনজিওগ্রাম করার দরকার হয়। তবে অবশ্যই এগুলো হতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

হৃদরোগ প্রতিরোধে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যয়াম, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং উপদেশসমূহ মেনে চলা জরুরি।

১. উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা :

ওজন হ্রাস আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়, ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে সুগারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রেখে ওষুধ গ্রহণের মাত্রা কমায়, উচ্চ রক্তচাপ কমায়, রক্তে খারাপ চর্বির (এলডিএল) পরিমাণ কমায়, আরথ্রাইটিসের (হাড়ের রোগ) ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে যথেষ্ট পরিমাণে সবুজ শাক-সবজি, শসা, তাজা দেশি ফল, বেসন, বাজরা, মুড়ি, খৈ, বুট, কাউনের চাল, সব ধরনের ডাল, অঙ্কুরিত ছোলা ইত্যাদি বেশি খাবেন।

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে পাতে লবণ, বেশি লবণ জাতীয় খাবার যেমন- আচার, নোনতা বিস্কুট, বেশি মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।

দৈনিক ২ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া ঠিক নয়।

ডায়াবেটিস ধরা পড়লে শর্করাযুক্ত খাবার বা রিফাইন্ড শর্করা অর্থাৎ চিনি, মিষ্টি, গুড়, ময়দা প্রভৃতি খাদ্য তালিকা থেকে ছাঁটাই করুন।

খুব বেশি সম্পৃক্ত চর্বি- গরু, খাসি, মহিষের গোশত, ঘি, মগজ, মাখন, আইসক্রিম, ডুবো তেলে ভাজা খাবার, চকোলেট, ডিমের কুসুম বাদ দিন।

তবে উচ্চমাত্রায় এইচডিএল কোলেস্টেরল হৃদরোগ প্রতিরোধ করে।

আর কখনোই পেট পুরোপুরি ভরে খাওয়া উচিত নয় আর ভরপেট খেয়ে ভারী কাজ না করাই ভালো।

২. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন :

চিকিৎসকের পরামর্শ মতে নিয়মিতভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করুন। মনে রাখবেন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে যার সুস্থ জীবন তার।

৩. সকালে ঘুম থেকে উঠুন এবং বেরিয়ে পড়ুন প্রাতঃভ্রমণে :

হাঁটা হচ্ছে একমাত্র সহজ, নিরাপদ এবং আদর্শ ব্যায়ামকৌশল। হাঁটা বা শারীরিক ব্যায়াম না করলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, ওস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয়, ডিপ্রেশন, পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, যৌন ক্ষমতা হ্রাস প্রভৃতি রোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। সক্রিয় জীবন পদ্ধতি অনুসরণের জন্য হাঁটার যেমন বিকল্প নেই তেমনি, রাতে ভালো ঘুমের নিশ্চয়তার জন্য শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন।

৪. ওয়াকিং মেডিটেশন :

এই ধারণাটি নতুন হলেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং স্বাস্থ্যকর। ধৈর্যসহকারে স্বস্তিবোধ করেন এমন নিরাপদ ও দূষণমুক্ত স্থানে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটুন এবং আপনার চারপাশের শব্দ, গন্ধ ও দৃশ্যকে অনুভব করুন। নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে খেয়াল করুন, মনোসংযোগ ও শিথিলায়ন স্থাপন করুন, শ্বাস ছাড়ার সময় চার কদম, শ্বাস নেয়ার সময় চার কদম সামনে অগ্রসর হোন। এই সময় মনকে শান্ত রাখতে মনে মনে কোনো দোয়া, জিকির, ধর্মীয় বাণী স্মরণ করতে পারেন এমনকি মুখে আওড়াতে পারেন ‘আমি ভালো আছি, সব কিছু সুন্দরভাবে চলছে’ এই লাইনটি।

৫. দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা :

সর্বোপরি হাসিখুশি ও উচ্ছল থাকা হৃদরোগ তথা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করে।

এসব ঝুঁকিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে একই সঙ্গে কারণ এরা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। হৃদরোগ প্রতিরোধে নিজে যেমন সতর্ক হবেন তেমনি পরিবারকে সচেতন করুন। পরামর্শ ও চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। অবহেলা এবং সময়ক্ষেপণের দরুন চিরতরে হৃদয়ের ছন্দবন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সুস্থ থাকুন, ভালোবাসার ছন্দে আন্দোলিত হোক প্রতিটি হৃদয়।

ডা. মনিরুজ্জামান খান

মেডিকেল অফিসার (এডি)

বাংলাদেশ ব্যাংক মেডিকেল সেন্টার

মতিঝিল, ঢাকা

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj