এপার ওপার মেলবন্ধনের ৪০ বছর

শনিবার, ১০ জুন ২০১৭

ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণের ৪০ বছর পূর্তি হলো ২০১৬ সালে। ১৯৭৬ সালে আলমগীর কবির ‘সূর্যকন্যা’ নির্মাণ করে চলচ্চিত্রে দুই দেশের মধ্যে অংশীদারিত্বের শুভসূচনা করেন। কেমন কেটেছে যৌথ প্রযোজনার চার দশক- বিস্তারিত জানাচ্ছেন মাহফুজুর রহমান

১৯৭৬ সালে আলমগীর পিকচার্সের প্রযোজনায় বাংলাদেশের বুলবুল আহমেদ ও ভারতের জয়শ্রী রায়কে নিয়ে আলমগীর কবির পরিচালনা করেন প্রশংসিত ছবি ‘সূর্যকন্যা’। এই ছবির মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার শুরু হয়। আলমগীর কবিরের হাত ধরে যাত্রার সূচনা হলেও যৌথ প্রযোজনা প্রাণশক্তি নেয় এহতেশামের কাছ থেকে। ১৯৮০ সালে এহতেশাম ‘দূরদেশ’ পরিচালনায় অংশ নিয়ে যৌথ প্রযোজনাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যান, যে বিশাল ক্যানভাসে ছবি নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন নির্মাতারা। বোম্বে, লাহোর ও ঢাকার তারকাদের সমাবেশ ঘটিয়ে হুলস্থ’ল বাধিয়ে ফেলেন এহতেশাম। পাকিস্তানের সঙ্গেও আলোচিত কিছু জয়েন্ট ভেঞ্চার করেন এহতেশাম। ১৯৯৯ সালে এহতেশাম তার শেষ যৌথ প্রযোজনাটি নির্মাণ করেন। ‘পরদেশি বাবু’ ছবিতে অভিনয় করেন ঢাকার ফেরদৌস ও কলকাতার রচনা ব্যানার্জি। এহতেশামের পথ ধরে সৈয়দ হাসান ইমাম যুক্ত হোন শক্তি সামন্তের সঙ্গে, ১৯৮৫ সালে নির্মাণ করেন দুই দেশের তারকাদের নিয়ে জনপ্রিয় ছবি ‘অবিচার’। বোম্বের বাঙালি পারফর্মার, বাঙালি মিউজিশিয়ান আর বাঙালি টেকনিশিয়ানদের নিয়ে দুই বাংলায় গ্রহণযোগ্য ছবি ‘অবিচার’। শশী কাপুর, শর্মিলা ঠাকুর, ববিতা ও ফয়সাল অভিনীত ‘দূরদেশ’ কিংবা মিঠুন, রোজিনা, উৎপল দত্ত অভিনীত ‘অবিচারে’র মতো বড় ক্যানভাসে, হিন্দি ভাষায় গোটা ভারতে প্রদর্শিত ছবি না হলেও, পরবর্তী সময়ে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনা অব্যাহত থাকে।

বিশেষ কয়েকজন নির্মাতা যৌথ প্রযোজনায় বেশ আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে থাকেন। যাদের মধ্যে অন্যতম প্রযোজক-পরিচালক আজিজুর রহমান বুলি। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে একাধিক সফল প্রজেক্ট শেষে যোগ দেন ভারতের সঙ্গে প্রযোজনায়। কলকাতার তাপস পাল, ইন্দ্রানী হালদার ও ঢাকার অঞ্জু ঘোষকে নিয়ে ১৯৯৫ সালে বুলি নির্মাণ করেন ‘রঙিন প্রাণসজনী’। ১৯৯৮ সালে কলকাতার শতাব্দী রায় ও ঢাকার শাকিল খানকে নিয়ে বুলি নির্মাণ করেন ‘রাজা রানী বাদশা’। এ সময়ে আরো একজন নির্মাতা যৌথ প্রযোজনায় বিরাট সাফল্যের দেখা পান। মনোয়ার খোকন চিত্রনায়িকা শাবানার এস এস প্রডাকশন্স থেকে ১৯৯৭ সালে নির্মাণ করেন ‘স্বামী কেন আসামী’। ১৯৯৮ সালে খোকন নির্মাণ করেন ‘মেয়েরাও মানুষ’। জসীম, শাবানা ঢাকা থেকে এবং কলকাতা থেকে ঋতুপর্ণা ও মুম্বাই থেকে চাঙ্কি পান্ডে এই দুটি ছবিতে অভিনয় করেন। বাদল খন্দকার ১৯৯৮ সালে নির্মাণ করেন ‘সাগরিকা’। ঋতুপর্ণা ও আমিন খান অভিনয় করেন এই ছবিতে। ২০০৪ সালে বাদল নির্মাণ করেন ‘প্রেম করেছি বেশ করেছি’। ওখান থেকে ঋতুপর্ণা ও চাঙ্কি পান্ডে এবং এখান থেকে রিয়াজ ও পপি অভিনয় করেন এই ছবিতে। ছবিটি টিভি চ্যানেলে প্রিমিয়ার হয়। কলকাতার বাসু চ্যাটার্জি ১৯৯৯ সালে যৌথ প্রযোজনার ইতিহাসে সবচেয়ে দর্শকনন্দিত ও রুচিশীল ছবি ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ নির্মাণ করে আলোচনায় আসেন। ২০০০ সালে তিনি একই ছবির পাত্র-পাত্রী ফেরদৌস ও প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদীকে নিয়ে ‘চুপিচুপি’ নির্মাণ করলেও আগের ছবির মতো সাফল্য পাননি। ফেরদৌসকে নিয়েই ২০০১ সালে ‘চুড়িওয়ালা’ নির্মাণ করে সাফল্য পান শাহ আলম কিরণ। এরপর তিনি আরো দুটি যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ করেন। ২০০২ সালে ঢাকার মান্না ও মুম্বাইয়ের মমতা কুলকার্নিকে নিয়ে কিরণ নির্মাণ করেন ‘শেষ বংশধর’। বড় বাজেটের ছবি হলেও সফলতা পায়নি ছবিটি। কিরণ ২০০৩ সালে তখন ঢাকায় ব্যস্ত কলকাতার নায়িকা ঋতুপর্ণা এবং ঢাকার চাহিদাসম্পন্ন নায়ক আমিন খানকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘আগুন জ্বলবেই’। এ ছবিটিও কিরণের আগের মতো ব্যর্থ হয়। আর তাকে যৌথ প্রযোজনায় ছবি করতে দেখা যায়নি। এফ আই মানিক ২০০৮ সালে কলকাতার স্বস্তিকা মুখার্জি এবং ঢাকার শাকিব খানকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘সবার উপরে তুমি’। ওপারে ‘আমার ভাই আমার বোন’ নামে মুক্তি পায় ছবিটি। সম্প্রতি ছবিটি হিন্দি ডাবিং করে ইউটিউবেও প্রকাশ করা হয়েছে। ২০০৪ সালে সালে এফ আই মানিক আরো একটি ছবি নির্মাণ করেন। ‘মায়ের মতো ভাবী’ ছবিটি ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র মতো টিভি প্রিমিয়ার হলেও সাড়া ফেলতে পারেনি। ২০০৩ সালে মতিউর রহমান পানু প্রযোজনা করেন ‘নসীমন’। ঢাকার রিয়াজ-শাবনূর জুটি অভিনীত ছবিটি এ দেশে ভালো ব্যবসা করতে সক্ষম হয়। ২০০৩ সালে মতিউর রহমান পানু পরিচালনা করেন এ যাবৎকালের সবচেয়ে সফল যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘মনের মাঝে তুমি’। বাংলাদেশের রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটির এই ছবিটি অনেক ব্যবসায়িক রেকর্ড ভেঙে ফেলে। অত্যন্ত দুর্দিনে মুক্তি পেয়ে ছবিটি ব্যাপক সাড়া জাগায়। যৌথ প্রযোজনায় শিল্পসম্মত ছবি নির্মাণ করে বরাবর প্রশংসা অর্জন করেছেন গৌতম ঘোষ। ১৯৯৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন যৌথ উদ্যোগে নির্মিত সর্বাধিক নন্দিত ছবি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। এপারের রাইসুল ইসলাম আসাদ ও চম্পা এতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ২০১০ সালে গৌতম ঘোষ নির্মাণ করেন ‘মনের মানুষ’। এতে অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, পাওলি দাম ও ঢাকার চঞ্চল চৌধুরী। গৌতম ঘোষ ২০১৬ সালে নির্মাণ করেন ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘শঙ্খচিল’। প্রসেনজিৎ ও ঢাকার কুসুম সিকদার এতে অভিনয় করেন। প্রযোজক রুহুল আমিন বাবুলও দুটি ছবি নির্মাণ করেছেন। ১৯৯৯ সালে প্রসেনজিতের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেন ‘আমি সেই মেয়ে’। মুম্বাইয়ের জয়া প্রদা, কলকাতার ঋতুপর্ণা ও ঢাকার আলমগীর অভিনয় করেন। ১৯৯৯ সালেই বাবুল প্রযোজনা করেন ‘শত্রু ধ্বংস’। এ ছবিতে অভিনয় করেন মুম্বাইয়ের এক সময়ের ঝড়তোলা ভাগ্যশ্রী ও ঢাকার হার্টথ্রব শাকিল খান। অনন্য মামুন কলকাতার অশোক পাতির সঙ্গে ‘আমি শুধু চেয়েছি তোমায়’ নির্মাণ করেন ২০১৩ সালে। ২০১৪ সালে ‘রোমিও জুলিয়েট’ নির্মাণের শুরুতে তিনি পরিচালক হিসেবে থাকলেও পরে বাদ পড়েন। এখন তিনি যৌথভাবে একটি ছবি নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছেন। প্রযোজক আব্দুল আজিজ তার ব্যানারের প্রতিটি যৌথ প্রযোজনার ছবিতেই পরিচালক হিসেবে নিজের নাম ব্যবহার করছেন। আব্দুল আজিজের নির্মাণে ‘রোমিও জুলিয়েট’, ‘অগ্নি টু’, ‘আশিকী’, ‘শিকারী’, ‘হিরো ৪২০‘ ‘অঙ্গার’, ‘রক্ত’, ‘বাদশা দ্য ডন’, ‘প্রেম কি বুঝিনি’, ‘নিয়তি’ ছবিগুলো যৌথ প্রযোজনার ছবি হিসেবে প্রচারিত হয়েছে এবং সেন্সর সার্টিফিকেট পেয়েছে। এবারের ঈদুল ফিতরেও তার প্রযোজনায় ‘বস টু’ এবং ‘নবাব’ ছবি দুটি যৌথ প্রযোজনার মোড়কে মুক্তি পাচ্ছে। ২০১৬ সালে যৌথ প্রযোজনার ৪০ বছর পূর্তির বছরে কোনো একক বছরে সর্বোচ্চসংখ্যক যৌথ প্রযোজনার ছবি মুক্তি পেয়েছে। যার মধ্যে আব্দুল আজিজের প্রযোজনায়ই মুক্তি পেয়েছে আটটি ছবি।

১৯৭৬ সালে যে প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনা শুরু হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপট ২০১৬ সালে আমূল বদলে গেছে। সাংস্কৃতিক সৌজন্য, সংস্কৃতি বিনিময়, পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন থেকে পুরোপুরি ব্যবসায়িক মুনাফা হাসিলই যৌথ প্রযোজনার উদ্দেশ্য বলে প্রতিভাত হয়েছে। এফডিসিতে উৎপাদিত ছবির সংখ্যা কমে যাওয়ার হাহাকার সামনে রেখে হিড়িক পড়েছে যৌথ প্রযোজনার। অতীতে যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা কঠোর হলেও ২০১১ সালে নিয়মে শিথিলতা এলে নীতিমালা ভঙ্গের প্রবণতা দেখা দেয়। যৌথ প্রযোজনার ফাঁক গলে ভারতীয় শিল্পী-কলা-কুশলীদের এ দেশে প্রতিষ্ঠার বিতর্ক ওঠে। ভারতীয় একক প্রযোজনাকে যৌথ প্রযোজনার চেহারায় প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে। যৌথ প্রযোজনাকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক-আলোচনা-সমালোচনা যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। মাঝখানে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ পুরোপুরি স্তিমিত হয়ে এসেছিল। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কোনো যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মিত হয়নি। আর এখন যৌথ প্রযোজনা ছাড়া দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পের কথা ভাবা যাচ্ছে না। বাংলাদেশি প্রযোজকদের চেয়ে ভারতীয় প্রযোজকদের যৌথ উদ্যোগে ছবি নির্মাণে আগ্রহ বেশি। এক-দুজন প্রযোজকের মধ্যে যৌথ প্রযোজনা আর সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রশাসনিক নজরদারি বাড়লে, নির্মাণে সমতা এলে যৌথ প্রযোজনা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে এমনটা ধারণা করা যায়। গত ৪০ বছরে যেখানে দুই দেশের যৌথ প্রযোজনায় ৪০টির মতো ছবি হয়েছে, সেখানে বর্তমান ধারা বজায় থাকলে আগামী চার বছরে আরো ৪০টি ছবি নির্মাণ হয়ে গেলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। যৌথ প্রযোজনাই এখন চলচ্চিত্রের মূল ট্রেন্ড, যা একসময় ছিল নিছক দর্শকতুষ্টির স্বার্থে। বাজার সম্প্রসারণের বাসনায় কোনো কোনো প্রযোজক অনেকগুলো ছবি নির্মাণ করে ফেললেও দুই অঞ্চলের স্ব-স্ব বাজারের সুরত আগের মতোই আছে। চার দশক পেরিয়ে যৌথ প্রযোজনাকে এখন বাজার সম্প্রসারণের হাতিয়ার ভাবা যেতেই পারে। যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ছবির জোয়ার বলছে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল, নানা পটপরিবর্তনের পর তা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে। চলচ্চিত্র শিল্পের দাবি অনুযায়ী, যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা শতভাগ মেনে ছবি নির্মাণ হলে, ভারত-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করবে এটা অনায়াসে বলা যায়।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj