নাট্যালোচনা : কেন দেখবেন ‘নদ্দিউ নতিম’?

শনিবার, ১০ জুন ২০১৭

হেমন্ত প্রাচ্য : চারটি কারণে বিশেষত্ব তৈরি করেছে ‘ম্যাড থেটার’ প্রযোজনা ‘নদ্দিউ নতিম’। প্রথমত : এই নাটকে একজন মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর সত্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একজন কবি নিজেকে মৃত্যুর মুখে সমর্পণ করেন। দ্বিতীয়ত : এই নাটকে একটি কাল্পনিক পরিবারের গল্প বলা হয় যেটি মঞ্চে অভিনয় করে দেখায় তিনজন অভিনয়শিল্পী। বাস্তব জীবনেও এই তিন অভিনয়শিল্পী একই পরিবারের সদস্য। এটি বাংলাদেশে নাট্যাঙ্গনের একটি অন্যরকম ঘটনা। তৃতীয়ত : ‘নদ্দিউ নতিম’ নাটকে একটি শিশু কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছে। বাংলাদেশের মূলধারার থিয়েটারে এটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। চতুর্থত : ‘ম্যাড থেটার’ ২০১৫ সালের ৩০ অক্টোবর ‘নদ্দিউ নতিম’ নাটকের মাধ্যমে নাট্যদল হিসেবে যাত্রা আরম্ভ করে। বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে যুক্ত হয় নতুন একটি নাট্যদল। একই সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস যে মঞ্চসফল নাট্যপ্রযোজনা হতে পারে ‘ম্যাড থেটার’ সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্রটি তৈরি করেছে। নাটকটির সহজসরল বয়ান দর্শকের কাছে নাটকটিকে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘কে কথা কয়’ উপন্যাস অবলম্বনে এ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন আসাদুল ইসলাম। নাটকের সহযোগী নির্দেশক হিসেবে রয়েছেন আনিসুল হক বরুণ। সেট ও লাইট ডিজাইন করেছেন ফয়েজ জহির, পোশাক সোনিয়া হাসান এবং আবহসঙ্গীত আর্য মেঘদূত। নাটকটির দৈর্ঘ্য দুই ঘণ্টা। নাটকের কবি চরিত্রে রূপদান করেছেন আসাদুল ইসলাম, মুনা চরিত্রে সোনিয়া হাসান এবং কমলের চরিত্রে মেঘদূত।

নদ্দিউ নতিমের কাহিনী মতিন নামের একজন কবিকে কেন্দ্র করে। যে মনে মনে নিজেকে কল্পনা করে নেয়, সে একজন উজবেক কবি। মতিনের মধ্যে বাস করে অন্য এক মতিন। দিনে দিনে মতিন উদ্দিন হয়ে ওঠে নদ্দিউ নতিম। মতিনের হৃদয়ের সবটুকু দখল করে থাকে সহপাঠিনী নিশু। ভাবের ভেলায় ভেসে বেড়ালেও ভাবাবেগে মতিন ডুবে যায় না, বুঝতে পারে নিশুর মতো স্কলার মেয়ের যোগ্য সে নয়। একদিন মতিনের চোখে পড়ে পত্রিকার পাতায় তিন লাইনের ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপন- ‘একজন সার্বক্ষণিক টিউটর প্রয়োজন, টিউটরের সৃজনশীলতা ব্যক্তিগত যোগ্যতা হিসেবে ধরা হবে, বেতন আকর্ষণীয়।’ বেতনের আকর্ষণীয় ক্ষমতায় মতিন তার কবিসত্তাকে সাময়িকভাবে স্তিমিত রেখে কমল নামের একজন মানসিক প্রতিবন্ধী বাচ্চার শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করে। মতিনের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হওয়ায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু প্রতিবন্ধী বাচ্চাটি কবিকে ভুলতে পারে না। বাচ্চাটিও কবির সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু সে সুযোগ তো আর নেই। কবি চলে গেছে। বাচ্চাটি জিদ ধরে- সে কথা বলবেই বলবে। এক পর্যায়ে সুযোগ হয় কবির সঙ্গে কথা বলার। কমল মতিনকে তার জীবনের একটি গোপনীয় বিষয় জানায়, যার জন্য মতিনকে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়াতে হয়। হাসপাতালের এক হিমশীতল ঘরে শুয়ে তার মনে হয়, যেন অনন্তকাল সে এভাবেই শুয়ে ছিল। সেই ছোট্ট শিশুটি আবিষ্কার করে সে যাকে বাবা বলে জানে সেই ব্যারিস্টার সালেহ ইমরান সাহেব তার বাবা নয়। তার বাবা ফারুক আহমেদ। ফারুক আহমেদের সঙ্গে তার মায়ের গোপন সম্পর্কের জন্যই পৃথিবীতে এসেছে কমল নামের ছোট্ট মেয়েটি। এই মিথ্যা নিয়ে কমল আর পৃথিবীতে থাকতে চায় না।

উল্লেখ্য, আজ শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকটির আরো একটি শো রয়েছে।

এক কথায়

নাটকজুড়ে সেট-লাইট, কোরিওগ্রাফির কোনো চাকচিক্য নেই। পুরো নাটকটি সংলাপ প্রধান। অভিনয়শৈলী আর গল্পের টান টান উত্তেজনায় দর্শক পুরো সময়জুড়ে মোহচ্ছন্ন হয়ে নাটকটি দেখেন। তবে নাটকের শুরুর দিকে দীর্ঘ বর্ণনা কিছু বিরক্তির উদ্রেক করে। নির্দেশক চাইলেই সেখানে কিছু বর্ণনা বাদ দিতে পারেন। পুরো নাটকটিকে দেড় ঘণ্টার ব্যাপ্তির মাঝে আনলে দর্শকের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj