ফিরে দেখা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি:দায়িদ হাসান মিলন

বৃহস্পতিবার, ১ জুন ২০১৭

শুরু হতে যাচ্ছে ক্রিকেটের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ আসর আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। গুরুত্বের দিক থেকে বিশ্বকাপের পরই এই টুর্নামেন্টের স্থান। আজ থেকে ১৯ বছর আগে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি সাধারণত আন্তর্জাতিক এক দিনের ম্যাচের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। অর্থাৎ এখানে প্রতিটি ম্যাচ ৫০ ওভারের। তবে সব সময় এই নীতিটি ঠিক রাখতে পারেনি ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এই প্রতিযোগিতা ১৯৯৮ সালে ঢাকায় আইসিসি নক আউট টুর্নামেন্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং এরপর থেকে প্রায় প্রতি ২ বছর পর পর আয়োজিত হয়ে আসছে পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় এ ক্রিকেট আসর। ২০০২ সালে নক আইউ টুর্নামেন্ট পরিবর্তন করে এর নাম রাখা হয় আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি।

এ টুর্নামেন্টে কারা অংশগ্রহণ করবে সে বিষয়টি নিয়ে শুরুতে বিভিন্ন মতপার্থক্য তৈরি হয়। এই সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত টিকেনি। ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে সহযোগী দেশগুলোকেও এর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর আবারো অংশগ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। ২০০৯ সাল থেকে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ আটটি দল চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলার সুযোগ পাবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বর্তমানে এ সিদ্ধান্তটিই বলবৎ আছে। এ কারণেই টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো খেলার সুযোগ পেল বাংলাদেশ। এর আগে ২০০৬ সালের আসরে অংশগ্রহণ করেছিল টাইগাররা। বর্তমানে র‌্যাঙ্কিংয়ের ৬-এ থাকলেও আগে সপ্তমে অবস্থান করায় কোনো রকম অনিশ্চয়তা ছাড়াই শীর্ষ এ আসরে জায়গা করে নিল মাশরাফি বাহিনী। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১১ বছরের খরা ঘুচল বাংলাদেশের। অন্যদিকে এই প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শীর্ষ আটের বাইরে থাকায় বিরূপ এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো ২ বারের ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ীদের।

২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সপ্তম আসরের আগে আইসিসি থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, এটাই হবে প্রতিযোগিতাটির শেষ আসর। কারণ, ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পরিকল্পনা ছিল, এরপর থেকে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরিবর্তে আইসিসি টেস্টে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আয়োজন করা হবে। কিন্তু ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে পরিকল্পনাটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করা আসরটিতে সেই পুরনো পদ্ধতিই বহাল থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে শুরু হতে যাচ্ছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ষষ্ঠ আসর আয়োজিত হওয়ার কথা ছিল ২০০৮ সালে পাকিস্তানে। কিন্তু নিরাপত্তা শঙ্কায় পাকিস্তান থেকে এটা দক্ষিণ আফ্রিকায় সরিয়ে নেয়া হয়। পাশাপাশি ২০০৮ থেকে টুর্নামেন্টটি ২০০৯ সালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকেই দুই বছরের পরিবর্তে বিশ্বকাপের মতো প্রতি চার বছর পর পর আয়োজিত হয়ে আসছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। বিশ্বকাপ আসরের সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির নানা ধরনের পার্থক্য রয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি দুই সপ্তাহ কিংবা তার চেয়ে কিছুটা বেশি সময় ধরে চলে কিন্তু আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ মাসব্যাপীও চলতে পারে। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ১২টি দল চারটি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। চারটি গ্রুপের প্রতিটির শীর্ষে থাকা দল সরাসরি সেমিফাইনালে জায়গা পৌঁছায়। এই প্রক্রিয়ায় শিরোপা জিততে একটি দলকে মাত্র চারটি ম্যাচ খেলার প্রয়োজন হতো। দুটি গ্রুপ পর্বে, একটি সেমিফাইনাল এবং বাকিটা ফাইনাল। ২০০৬ সালে আটটি দল দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সেই বার প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সেমিফাইনাল খেলার সুযোগ পায়। তবে শুরুর দিকে যখন আইসিসি নক আউট নামে টুর্নামেন্টটি শুরু হয় তখন খেলার ধরন ছিল নকআউট। সে কারণে প্রথম আসরে সব মিলিয়ে মাত্র ৮টি ম্যাচ এবং দ্বিতীয়টিতে ১০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

এখন পর্যন্ত একবার করে হলেও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে অংশ নিয়েছে এমন দেশ সব মিলিয়ে ১৩টি। সাতটি দল সব কয়টি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে এর মধ্যে ছয়টি পেয়েছে শিরোপার স্বাদ। প্রথম আসরে শিরোপা ঘরে তুলে দক্ষিণ আফ্রিকা। ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া দুবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ড শ্রীলঙ্কা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ একবার করে শিরোপা ঘরে তোলে। শিরোপাধারী দলগুলোর মধ্যে কেবল অস্ট্রেলিয়াই টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখায়। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে, ইংল্যান্ড এবং পাকিস্তান এখনো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন থেকে বঞ্চিত রয়েছে। তবে শিরোপা জিততে না পারলেও ইংল্যান্ড দুবার ফাইনালে পৌঁছায় (২০০৪ ও ২০১৩ সালে)। অন্যদিকে পাকিস্তান শেষ চারে পৌঁছায় তিন বার (২০০০, ২০০৪ ও ২০০৯ সালে)। তারপরেও তাদের খালি হাতে ফিরতে হয়। আয়োজক দেশ হিসেবে প্রথমবার ট্রফি জিতে শ্রীলঙ্কা। সে বার অবশ্য ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন হয় দেশটি। ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত এ টুর্নামেন্টে শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচটি দুই-দুইবার বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার কারণে অবশেষে দুটি দলকেই চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়।

প্রথম আসর : বর্তমান আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রথম আসর আইসিসি নকআউট ট্রফি-১৯৯৮ সালের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ। তবে আয়োজক হওয়া সত্ত্বেও আসরটিতে খেলা হয়নি টাইগারদের। এতে চ্যাম্পিয়ন হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪ উইকেটে হারিয়ে প্রথম আসরের প্রথম শিরোপা জয়ের স্বাদ নেয় তারা। ফাইনাল ম্যাচে ক্যারিবীয়রা প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে ৪৯.৩ ওভারে ২৪৫ রানে অলআউট হয়ে যায়। জবাবে ৩ ওভার বাকি থাকতেই ৬ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

দ্বিতীয় আসর : আইসিসি নকআউট ট্রফি-২০০০ এর আয়োজন করে কেনিয়া। তারাও বাংলাদেশের মতো নিজেদের দেশে খেলতে পারেনি। বাছাইপর্বে হেরে যাওয়ায় মূল পর্বে মাঠে নামা হয়নি দলটির। এই আসরে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় নিউজিল্যান্ড। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ভারতকে ৪ উইকেটে হারিয়ে উল্লাসে মাতে কিউইরা। এদিন শুরুতে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ২৬৪ রান করে ভারত। জবাবে ২ বল বাকি থাকতেই ৬ উইকেট হারিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ব্লু্যাক ক্যাপরা।

তৃতীয় আসর : তৃতীয় আসর থেকেই টুর্নামেন্টটি আনুষ্ঠানিক চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি নাম ধারণ করে। ২০০২ সালে এই প্রতিযোগিতার আয়োজক ছিল শ্রীলঙ্কা। আয়োজক হিসেবে প্রথমবারের মতো তারা শিরোপা জেতে; তবে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে। এ টুর্নামেন্টের ফাইনাল দুবার বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় ফাইনালে উঠা দুটি দলকেই চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়।

চতুর্থ আসর : চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির চতুর্থ আসর আয়োজন করে ইংল্যান্ড এবং এতে ট্রফি জিতে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফাইনালে স্বাগতিকদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা উল্লাস করে ক্যারিবীয়রা। এতে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে ৪৯.৪ ওভারে ২১৭ রান করে অলআউট হয়ে যায় ইংলিশরা। জবাবে ২১৮ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৭ বল বাকি থাকতেই ৮ উইকেটের বিনিময়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

পঞ্চম আসর : চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পঞ্চম আসর বসে ভারতে। এতে প্রথমবারের মতো শিরোপা উল্লাস করে অস্ট্রেলিয়া। এ আসরের ফাইনালে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে ৩০.৪ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ১৩৮ রান করে ক্যারিবীয়রা। জবাবে বৃষ্টির কারণে ডাক ওর্থ লুইস পদ্ধতিতে ২৮.১ ওভারে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ১১৬ রানের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়া।

ষষ্ঠ আসর : চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ষষ্ঠ আসর বসে দক্ষিণ আফ্রিকায় এবং এতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ঘরে তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া। এবারের ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড। শুরুতে ব্যাট করতে নেমে কিউইরা নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২০০ রান করতে সমর্থ হয়। জবাবে মাত্র ৪৫.৫ ওভারেই ৪ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় অজিরা।

সপ্তম আসর : আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গত আসরটি বসে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে। এতে স্বাগতিকদের হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করে ভারত। এই আসরটি অবশ্য টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হয়। টুর্নামেন্টের ফাইনালে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১২৯ রান করে ভারত। জবাবে খেলতে নেমে ৮ উইকেটে ১২৪ রান করতে সমর্থ হয় ইংলিশরা। ফলে মাত্র ৫ রানের জয় তুলে নেয় মহেন্দ্র সিং ধোনির দল।

আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি-২০১৭'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj