আপন জুয়েলার্স ও রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষকে তলব

মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০১৭

কাগজ প্রতিবেদক : আপন জুয়েলার্স এবং বনানীর রেইনট্রি হোটেলে অভিযান চালানোর সময় প্রাথমিকভাবে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি তারা। তাই আত্মপক্ষ সমর্থন ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে দুটি প্রতিষ্ঠানেরই কর্তৃপক্ষকে আগামী ১৭ মে সকাল ১১টার দিকে সদর দপ্তরে কাগজপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর কাকরাইলে নিজ কার্যালয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান এসব কথা বলেন। এদিকে গত রোববার সিলগালা করে দেয়া গুলশান ২ নম্বরের সুবাস্তু ইমাম টাওয়ারে অবস্থিত আপন জুয়েলার্সে গতকাল অভিযান চালিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দারা।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বনানীর রেইনট্রি এবং শীর্ষস্থানীয় অলঙ্কার তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান আপন জুয়েলার্সের গুলশান, উত্তরা, মৌচাক ও সীমান্ত স্কোয়ারে অবস্থিত ৫টি বিক্রয় কেন্দ্রে একযোগে অভিযান চালাই আমরা। সে সময় ৪টি বিক্রয় কেন্দ্র থেকে প্রায় ৮৭ কোটি টাকার ২৮৬ কেজি স্বর্ণ ও ৬১ গ্রাম ডায়মন্ড পাওয়া যায়। আর গুলশানে অবস্থিত আরো একটি বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ থাকায় আমরা তালাবদ্ধ অবস্থায় পাই। তখন সেখানে ওই তালার ওপরেই আমাদের গোয়েন্দারা তালা ঝুলিয়ে দেয়। ওই বিক্রয় কেন্দ্রটিতেই আজ (গতকাল) আমাদের শুল্ক গোয়েন্দারা আপন জুয়েলার্স কর্তৃক্ষের উপস্থিতিতে ইনভেন্ট্রির কাজ করেছে।

তিনি আরো বলেন, একইদিন রোববার রেইনট্রি হোটেলে অভিযান চালিয়ে ১০ বোতল মদ উদ্ধার করা হয়। হোটেল কর্তৃপক্ষ প্রথমে এসব জুস দাবি করলেও পরে দেখা যায় সাউদ অস্ট্রেলিয়ার স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি রেড ওয়াইন এগুলো। যাতে অ্যালকোহলের পরিমাণ ১৩ শতাংশ। মাদক আইনে (নারকোটিক্স কন্ট্রোল অ্যাক্টে) ৪ দশমিক ৫ এর বেশি শতাংশ অ্যালকোহল পাওয়া গেলেই সেটি মদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মইনুল খান বলেন, যদি কারো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বোতলগুলো রাখা হতো, তবে সেগুলো হোটেল কক্ষে বা একটি লুকানো জায়গায় থাকতো। তবে বোতলগুলো আমরা হোটেলের একটি গুদাম ঘরে পেয়েছি। যে অবস্থায় পেয়েছি তা দেখে মনে হয়েছে এখানে মদের সরবরাহ আগেও ছিল। যেহেতু আমরা ঘটনাটি ঘটার দেড় মাস পরে গেছি। এর আগেও অন্য সংস্থার কয়েকটি টিম সেখানে গিয়েছিল। এই সময়ের মধ্যেই মদ সরিয়ে ফেলার যথেষ্ট সময় পেয়েছে তারা। মদ পাওয়া থেকে একটি আলামত আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে, ওই হোটেলে ঘটনার সময় মদের একটা সরবরাহ ও ব্যবহার ছিল। তিনি আরো বলেন, যেহেতু হোটেল কর্তৃপক্ষ বারের কোনো অনুমতিপত্র দেখাতে পারেনি তাই আমরা মনে করি মদ পাওয়ার বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধ যারা তদন্ত করছে তাদের জন্য একটি ভালো আলামত হতে পারে। আমরা এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে সরবরাহ করব।

শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, আমারা আরো মনে করছি বনানীর ওই ঘটনার মূল কারণ ডার্টি মানি (অবৈধভাবে উপার্জন করা ও অনাচারের কাজে ব্যবহৃত অর্থ)। অবৈধ অর্থের বিষয়টি সামনে রেখেই আমরা তদন্ত শুরু করি। যেহেতু ওই প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আগে থেকেই অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের তথ্য আমাদের কাছে ছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যম আমাদের কাছে অভিযোগও করেছিল। দুটি বিষয় মাথায় রেখেই আমরা অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করি। প্রতীয়মান হয়েছে, আমাদের সন্দেহ ও অনুমান হয়তো সঠিক ছিল। কারণ গত রোববারের অভিযানে আমারা যে পরিমাণ স্বর্ণ ও হিরা এবং মদ পেয়েছি সেগুলোর বৈধ কাগজ তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের দেখাতে পারেনি। আমাদের কাস্টমের একটি উন্নত ডাটাবেজ রয়েছে। অভিযানে যাবার আগে সেটি আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি আপন জুয়েলার্স প্রতিষ্ঠান ও মালিকের নামে স্বর্ণ ও হিরার কোনো আমদানি নাই।

তিনি আরো বলেন, স্বর্ণ আমদানি যেহেতু নেই তা হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি যে এত বড় হয়েছে সেটির কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। অভিযানে সব বের হয়েছে। স্বর্ণ ও হিরা সাময়িকভাবে আটক করে আপন জুয়েলার্সের জিম্মায় রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারলেও আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে ১৭ মে কাগজপত্র দেখাতে তলব করা হয়েছে। কাগজপত্রে সেগুলো বৈধ প্রমাণিত হয় তাহলে স্বর্ণ ও হিরা আমরা ফেরত দেব। প্রমাণে ব্যর্থ হলে সেগুলো জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ভল্টে জমা দেয়া হবে।

বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারেলে কি শাস্তি হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে মহাপরিচালক মইনুল বলেন, এখানে একেক আইনে শাস্তির বিধান একেক ধরনের। শুল্ক আইনে মামলা হলে বলা আছে পণ্য মূল্যের ১০ গুন পর্যন্ত জরিমানা ও পণ্য বাজেয়াপ্ত করা, ফৌজদারি মামলা হলে ৭ বছর জেল হতে পারে, চোরাচালানসংক্রান্ত স্পেশাল পাওয়ার আইনে মামলা হলে ১২ বছরের জেল। মানি লন্ডারিং মামলা হলে ৪ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১২ বছর জেল হতে পারে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া জিনিস রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করবে। এখন আমাদের দেখতে হবে কোন কোন আইন ভঙ্গ হয়েছে ও কোন কোন আইন প্রমিনেন্ট। সেসব আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা প্রয়োগের চেষ্টা করা হবে সঠিক অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে। প্রসঙ্গত, বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ ও তার ছেলে শাফাত আহমেদের ডার্টি মানির তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এরপর শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj