দেহরক্ষী রহমত আলী চালক বিল্লাল গ্রেপ্তার : ধর্ষক নাঈম এখনো অধরা

মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০১৭

কাগজ প্রতিবেদক : রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় পলাতক দুই আসামি সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী রহমত আলীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাব রাজধানীর গুলশান ও নবাবপুর এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। তবে ঘটনার আরেক নায়ক নাঈম আশরাফ ওরফে আবদুল হালিম এখনো পলাতক রয়েছে। এই আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় ঘটনার সময় ধারণকৃত ভিডিও চিত্র ও শর্টগান উদ্ধার এবং ঘটনার ব্যাপারে সবিস্তার জানা যাবে বলে ধারণা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে ভিকটিম ও তাদের পরিবারের সদস্যদের আতঙ্কে সময় কাটছে। তারা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছেন।

বিল্লালের কাছে থাকা ভিডিও রেকর্ড মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। পলাতক অপর আসামি নাঈমকে গ্রেপ্তারে র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ির এলাকার থানা পুলিশকে এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যের সূত্রে গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পর তদন্ত সংশ্লিষ্টরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।

অপরদিকে রাজধানীর মিন্টো রোডের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে রিমান্ডে থাকা সাফাত ও সাদমান সাকিফকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।

ডিবি ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কর্মকর্তারা তাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। সাফাতের ৬ দিন ও সাকিফের ৫ দিনের রিমান্ডের গতকাল সোমবার ছিল তৃতীয় দিন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত অনেকটা ভড়কে গেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাদের রাতের পার্টিতে নিয়মিত সঙ্গী হিসেবে থাকতেন তার ২০ জন বন্ধু-বান্ধবী। যারা সমাজের বিত্তশালী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের সন্তান এবং মডেল তারকা।

এদিকে রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারনকারী সাফাতের গাড়ি চালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী রহমত আলীকে এ ঘটনায় মামলা দায়েরের ৯ দিন পর গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় র‌্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ রাজধানীর নবাবপুর ও গুলশান এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাব-১০ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) জাহাঙ্গীর হোসেন মাতব্বর জানান, রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার মামলা হওয়ার পর থেকেই র‌্যাবের গোয়েন্দারা পলাতক আসামীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তৎপর ছিল। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে র‌্যাব-১০ এর একটি বিশেষ টিম পুরান ঢাকার নবাবপুরের ইব্রাহিম আবাসিক হোটেলে গাড়িচালক বিল্লালের অবস্থানের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। এরপর র‌্যাব সেখানে অভিযান চালিয়ে বিল্লালকে গ্রেপ্তার করে।

ওদিকে রাজধানীর গুলশান এলাকায় অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ সাফাতের দেহরক্ষী রহমত আলীকে গ্রেপ্তার করেছে। ঢাকা মেটোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সন্ধ্যা ৭টার দিকে গুলশান এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় সেখান থেকে রহমতকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেয়া হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি শর্টগানও উদ্ধার করা হয়। আজ মঙ্গলবার রহমতকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেছেন, রিমান্ডে জ্ঞিাসাবাদে তারা যে তথ্য দিচ্ছে তা বাদী ও ভিকটিমের অভিযোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সহায়ক তথ্য দিচ্ছে রিমান্ডে থাকা সাফাত ও সাকিফ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম বলেন, অস্ত্র ও ভিডিও রেকর্ড উদ্ধারে অভিযান চলছে। সম্ভাব্য সব স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কর্মকর্তারা বলেছেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াও তদন্তে সহায়তা করছে ডিবি পুলিশ। তারা পলাতক আসামিদের ধরতে একাধিকস্থানে অভিযান চালাচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অনেক মডেল ও তরুণীর সঙ্গে সাফাতের অবাধ মেলামেলার সম্পর্ক। রাতে রুমপার্টি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে পছন্দের বান্ধবীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার তথ্য দিচ্ছেন সাফাত আহমেদ। এতে কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনা নেই তার। সাফাতের দাবি, তিনি বা তার বন্ধুরা জোর-জবরদস্তি কারো সঙ্গে মেলামেশা করেনি। সবই হয়েছে পরস্পর বোঝাপড়ার মধ্যে। প্রায় রাতে রাজধানীর কোনো না কোনো অভিজাত হোটেলে পার্টির কথাও বলছেন তিনি। সেখানে ছেলেমেয়ে বন্ধুরা অংশ নেয়। সবাই জেনে বুঝে সেসব পার্টিতে যায়। রেইনট্রি হোটেলে পার্টির আড়ালে যা হয়েছে তা নতুন কিছু নয় বলে সাফাত দাবি করছেন। সাফাতের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের গ্রুপে অন্তত ২০ জনের মতো বন্ধু রয়েছে। যারা সমাজের বিত্তশালী ব্যবসায়ী, মন্ত্রী-এমপি, রাজনীতিবিদ ও সরকারি আমলাদের সন্তান। সাফাত রিমান্ডে জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পরে তাদের যোগাযোগ এবং একত্রিত হওয়ার পর্ব চলে। মধ্যরাতের আগে সবাই একত্রিত হয়। শুরু হয় তাদের আসর। ডিসকোতে চলে মদের আসর। ছেলেমেয়েরা হাত ধরে নাচানাচি, আলিঙ্গন, চুমু খাওয়া তাদের পার্টির নিত্য ঘটনা। যাতে সবার সম্মতি থাকে। এ নিয়ে কেউ কোনোদিন কোনো অভিযোগ করেনি। কারো ভালো না লাগলে সে পরের পার্টিতে আসে না। কিন্তু রেইনট্রির ঘটনায় মামলা হওয়ায় ভড়কে গেছেন সাফাত। আপন ঘরে ওই তরুণীরা একাধিকবার বেড়াতে গেছে দাবি করে সাফাত বলেছেন, রেইনট্রির পার্টির ৯ দিন পরও তারা একসঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন। অন্তরঙ্গ সম্পর্কের অনেক ছবি রয়েছে তাদের।

অন্যদিকে রিমান্ডে সাকিফ গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করছেন, সাফাত তার বড়ভাই হলেও সম্পর্ক বন্ধুর মতো। সাফাতের সঙ্গে ‘র’ আদ্যক্ষরের ওই তরুণীর পরিচয় তিনি করিয়ে দিলেও অল্পদিনেই তারা ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। ঘনিষ্ঠ না হলে বারবার সেলফি তোলা ও রাতে জন্মদিনের পার্টিতে অংশ নেয়া নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলছেন। মদ পানের ব্যাপারে সাকিফ বলছেন, অভ্যেস না থাকলে মদ পান করে বমি হওয়ার কথা। ওই রাতে তরুণীরা কেউ বমি করেনি। মদ পান করে নাচ-গানের তালে সাফাত ও নাঈমকে দুই তরুণী আলিঙ্গন করেছে। তাদের সঙ্গে যাওয়া দুই বন্ধু (একজন ছেলে একজন মেয়ে) মদ পান করেনি।

এদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন, বনানীতে ধর্ষণের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে হবে। রাষ্ট্র পুলিশের মাধ্যমে এ নিরাপত্তা দিতে বাধ্য। নিরাপত্তায় গাফিলতি থাকলে তার দায় পুলিশকে নিতে হবে। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি এ কথা বলেন। কমিশনের আয়োজনে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার শেষপর্যায়ে সভার বাইরে গিয়ে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। বনানীর ধর্ষণের ঘটনাটি কমিশন আমলে নিয়েছে উল্লেখ করে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, অন্যান্য ঘটনায় কমিশন বক্তব্য দেয়। পরে আর ফলোআপ করে না। তবে এ ঘটনায় কমিশন আইনি লড়াইয়ে একটি পক্ষ হিসেবে কাজ করছে। কমিশনের নিজস্ব প্যানেল আইনজীবীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে। কমিশনের চেয়ারম্যান আরো বলেন, বনানীর ঘটনায় তদন্ত জোরদার করার জন্য কমিশনের গঠিত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিকে সাত সদস্যবিশিষ্ট করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ কমিটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে পারবে। এ কমিটির প্রাথমিক তদন্তে ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ঘটনায় কার কার কোন কোন ক্ষেত্রে গাফিলতি ছিল, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হবে।

বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে ৮ মে কমিশন তদন্ত কমিটি গঠন করে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কমিশন এ অভিযোগ আমলে নেয়। কমিটির আহ্বায়ক হলেন কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো. নজরুল ইসলাম, অবৈতনিক সদস্য নুরুন নাহার ওসমানী, এনামুল হক চৌধুরী, পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) মো. শরীফ উদ্দীন ও সহকারী পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) এম রবিউল ইসলাম। এতে যোগ হয়েছেন কমিশনের সদস্য আখতার হোসেন ও মেঘনা গুহঠাকুরতা।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ বন্ধুর সঙ্গে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই তরুণী। ওই ঘটনায় গত ৬ মে রাজধানীর বনানী থানায় অভিযুক্ত সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, বিল্লাল ও আজাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন তারা। পরে গত ১১ মে বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট থেকে অভিযুক্ত সাফাত ও সাদমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ সদরের বিশেষ টিম ও সিলেট পুলিশ। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাফাতকে ছয়দিন সাদমানকে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন মুখ্য মহানগর হাকিম। গতকাল ছিল রিমান্ডের তৃতীয় দিন। ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ডে থাকা সাফাত ও সাকিফের সঙ্গে পরিবারের কেউ এখনো দেখা করতে যায়নি।

সাফাত আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে। সাদমান সাকিফ রেগনাম গ্রুপের মালিকের ছেলে এবং ওই গ্রুপের পরিচালক। সাফাতের গ্রামের বাড়ি সিলেটে। নাঈম আশরাফ নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতার ছেলের বন্ধু বলে পরিচয় দিলেও তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজীপুর। তার আসল নাম আব্দুল হালিম।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj