সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল : উভয় পক্ষের রিভিউ আবেদন খারিজ

মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০১৭

তানভীর আহমেদ : ’৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায় পুনর্বহাল চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আর সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে দেয়া আমৃত্যু কারাদণ্ড থেকে খালাস চেয়ে সাঈদীর রিভিউ আবেদন শুনানি শেষে আদালত খারিজ করে আদেশ দেন।

আমৃত্যু কারাদণ্ডের চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে উভয়পক্ষের আবেদন খারিজ করে গতকাল সোমবার এ রায় দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সাঈদীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।

রিভিউ খারিজের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় তিনি ব্যথিত। রিভিউ খারিজ করে সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল রাখার পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ কথা জানান। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কারণেই সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা যায়নি। তিনি বলেন, সাঈদী ছিল যুদ্ধাপরাধীদের শিরোমনি। সাঈদী দেশ, সভ্যতা ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর কিন্তু এমন একজন মানুষের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় আমি ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত। সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনেই নিতে হবে। দুঃখ আমার রয়েই গেল।

অপরদিকে রিভিউ খারিজ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল রাখার পর তার প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ে ক্ষোভ, দুঃখ যাই থাকুক, সর্বোচ্চ আদালতের এ রায় সবাইকে মানতে হবে।

২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর আপিল মামলা দুটির ৬১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গত বছরের ১২ জানুয়ারি পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। ৩০ পৃষ্ঠার মূল আবেদনসহ ৬৫৩ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির দণ্ডাদেশ পুনর্বহালে ৫টি যুক্তি দেয়া হয়। এর পাঁচ দিন পর ১৭ জানুয়ারি করা ৯০ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে ১৬ যুক্তিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড থেকে খালাস ও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন সাঈদী।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সে সময়ের প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন। অন্য চার বিচারপতি হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে গঠিত ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি প্রমাণিত হয়। এই মামলায় আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের করা দুটি আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল আপিল বিভাগ রায় অপেক্ষমাণ রাখেন। এর ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় গত সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়। আপিলে ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। ১০ নম্বর অভিযোগ বিসাবালিকে হত্যার, ১৬ নম্বর অভিযোগ তিন নারীকে অপহরণ করে আটকে রেখে ধর্ষণের এবং ১৯ নম্বর অভিযোগ প্রভাব খাটিয়ে ১০০-১৫০ হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করার। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে ৬, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দেয়া হয়। ৬ নম্বর অভিযোগ লুণ্ঠনের, ১১ নম্বর হামলা ও লুণ্ঠনের এবং ১৪ নম্বর অভিযোগ ধর্ষণের। ৮ নম্বর অভিযোগের অংশবিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে সাঈদীকে খালাস দেয়া হয়। একই অভিযোগের অংশ বিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে তাকে ১২ বছর কারাদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। অষ্টম অভিযোগটি হত্যা ও অগ্নিসংযোগের। এ ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে ৭ নম্বর অভিযোগে সাঈদীকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। সপ্তম অভিযোগ নির্যাতন ও বাড়ি লুণ্ঠনের পর অগ্নিসংযোগ। তবে ৮ নম্বর (ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা) ও ১০ নম্বর অভিযোগের (বিসাবালি হত্যা) দায়ে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

তিন অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড- অভিযোগ-১০ : ১৯৭১ সালের ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার হানা দিয়ে ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। যার মধ্যে রয়েছে চিত্তরঞ্জন তালুকদার, হরেণ ঠাকুর, অনিল মণ্ডল, বিসাবালি, সুকাবালি, সতিশবালার ঘর। সাঈদীর ইন্ধনে তার সহযোগীরা বিসাবালিকে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে।

অভিযোগ-১৬ : স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জন সশস্ত্র রাজাকার পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোনকে অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। সেখানে তাদের আটকে রেখে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে ছেড়ে দেয়া হয়।

অভিযোগ-১৯ : স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সাঈদী জোর করে মধুসুদন ঘরামী, কৃষ্ট সাহা, ডা. গণেশ সাহা, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ পাল, অমূল্য হাওলাদার, শান্তি রায়, হরি রায় জুরান, ফকির দাস, টোনা দাস, গৌরাঙ্গ সাহা, হরিদাস, গৌরাঙ্গ সাহার মা ও তিন বোন মহামায়া, অন্যরানী ও কামাল রানীসহ ১০০/১৫০ জন হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করেন।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj