সংকটে সাত কলেজ : বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনে সেশনজটের শঙ্কা

মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০১৭

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য : দীর্ঘদিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর বড় সাতটি সরকারি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় গিয়ে সংকটে আটকে পড়েছে। গত রোববার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ¯œাতক সম্মান পর্যয়ের শেষ বর্ষের ফলাফল প্রকাশ হলেও এই সাতটি কলেজের ফলাফল এখনও প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি এখনও সম্পন্ন হয়নি ব্যবহারিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনে করে, এখানে সংকটের কিছু নেই। একটু দেরি হলেও তারা পাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, সংকট না পরিবর্তন যাই চলুক, সে বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। এর ফলে এক প্রকার হতাশায় পড়েছে অপেক্ষারত পরীক্ষার্থীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গত রোববার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫ সালের ¯œাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের ফল প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত ওই ফলাফল অনুযায়ী এক লাখ ১৯ হাজার ৩২৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৮ হাজার ১২৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়া ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের ফল এদিন প্রকাশিত হয়নি। তাদের ফলাফল পেতে কমপক্ষে আরো একবছর অপেক্ষা করতে হবে।

জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বদরুজ্জামান বলেন, ফলাফল প্রকাশ না হওয়া এই সাতটি কলেজে ¯œাতক চূড়ান্ত বর্ষে প্রায় ১৫ হাজার পরীক্ষার্থী রয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় চলে যাওয়ার আগে ওই কলেজগুলোর পরীক্ষার্থীরা সম্মান শেষ বর্ষের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিলেও ব্যবহারিক এবং মৌখিক পরীক্ষা দিতে পারেননি। এতে করে তাদের ফল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ করা হয়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক গতকাল সোমবার ভোরের কাগজকে বলেন, এখানে সংকটের কিছু নেই। পরীক্ষা শেষ না হলে পরীক্ষার্থীদের ফলাফল প্রকাশ করা হয় নাকি? তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের সময় কিছু কারিগরি প্রক্রিয়া থাকে। বর্তমানে এই প্রক্রিয়াগুলোর কাজ শেষ করা হচ্ছে। কাজগুলো শেষ করে শিক্ষার্থীদের মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়া হবে। এরপরই ফল প্রকাশ করা হবে। তার মতে, ফল প্রকাশে একটু দেরি হলেও শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পাবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই বলে জানান তিনি।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এসব কলেজের প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী উদ্বিগ্ন তাদের পরীক্ষা, ক্লাসসহ সার্বিক লেখাপড়া নিয়ে। কিন্তু অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকেই সংকটে পড়েছে এসব কলেজে অধ্যয়নরত প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী। এরমধ্যে ¯œাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন প্রায় ১৫ হাজার। এ ছাড়া অন্যান্য শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীরই রচনামূলক পরীক্ষা শেষ হলেও কয়েকমাস ধরে আটকে রয়েছে ব্যবহারিক পরীক্ষা। এ ছাড়া নতুন করে বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষারও কোনো তারিখ ঘোষণা করা হচ্ছে না। এমনকি এই সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গেলেও এখনো সিলেবাস বা পাঠক্রমে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে সিলেবাসবিহীন অবস্থায়ই পড়ালেখা করছে এসব শিক্ষার্থীরা। ফলে এই দুই লাখ শিক্ষার্থীর সেশনজটে পড়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদ ভোরের কাগজকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর সাত কলেজ অধিভুক্ত হয়েছে। তাই পুরো কাজটা তাদেরই, এখানে আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই। তারা বলেছে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবো না। আমরাও যাইনি। বরং এই সময়ের মধ্যে তারা যে যে চাহিদাপত্র দিয়েছিল আমরা সিডি আকারে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন যদি বলে, শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র দিতে, আমরা তাও দিতে পারবো। যেহেতু তারা বলেছে, এই সাত কলেজের সবকিছু তারা দেখবে, এজন্য তারাই দেখুক, আমরা এ বিষয়ে কিছু বলবো না।

জানা যায়, অনার্স (¯œাতক) প্রথম বর্ষের লিখিত পরীক্ষা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই শেষ হয়। কিন্তু ব্যবহারিক শুরুর আগেই এই সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় থাকা অন্যান্য কলেজের এই ব্যবহারিক শেষ হলেও এই সাত কলেজের হয়নি। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের নিয়মিত ও প্রাইভেট (নতুন সিলেবাস) এমএ, এমএসএস, এমবিএ, এমএসসি ও এম মিউজ শেষ পর্ব পরীক্ষার রুটিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করলেও এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছেন। ২০১৬ সালের ডিগ্রি পাস ও সার্টিফিকেট কোর্স পরীক্ষার সময়সূচিও ঘোষণা করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। এ ছাড়া ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স শেষ পর্ব পরীক্ষার সময়সূচিতে রাখা হয়নি রাজধানীর সাত কলেজ। ইতোমধ্যে মাস্টার্সের একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও এই সাত কলেজের শিক্ষার্থী এতে অংশ নিতে পারেননি। এমনকি এসব কলেজের শিক্ষার্থীর তথ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকেও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এই সাত কলেজের অধ্যক্ষই এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে রাজি হননি। তাদের মতে, এটা সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমাদের এখানে কিছুই বলার নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেকে এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হয়ে পরের বর্ষে উত্তীর্ণ হয়েছেন। চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষার আগেই পূর্বের বর্ষের অনুত্তীর্ণ বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ না হলে ফল স্থগিত থাকে। এ ধরনের শিক্ষার্থী যারা একাধিক বর্ষে বিভিন্ন বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা কোথায় এবং কোন সিলেবাসে পরীক্ষা দেবেন তা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সহসাই এসব শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানও সম্ভব নয়।

এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কলেজে ¯œাতক ভর্তি প্রক্রিয়া চলছে। এতোদিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই সাত কলেজে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে ¯œাতক শ্রেণিতে ভর্তি করবে তা এখনো ঘোষণা করেনি। সাধারণত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে থাকে। তাই এই সাত কলেজেও যদি ভর্তি পরীক্ষা নিতে হয় তাহলে অনেক বড় আয়োজন করতে হবে। আর এখনই যদি ভর্তি পরীক্ষার ঘোষণা দেয়া না হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রস্তুতিও নেয়া সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা ভর্তি নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তায়। এ ছাড়া বিভিন্ন বর্ষের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, তারা এখনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস পড়ছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই সিলেবাস রাখবে না নতুন করে দিবে তা এখনো বলেনি। আর একজন শিক্ষার্থীর অর্ধেক পড়ালেখা শেষে তাদের জন্য নতুন সিলেবাসে পড়ালেখা করাটা কঠিন। তাই সবমিলিয়েই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী নিয়েই হিমশিম খাচ্ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে আরো সাত কলেজের দুই লাখ শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়া, খাতা দেখা, ফলাফল প্রকাশ, রেজিস্ট্রেশন, ভর্তি, ফরম পূরণ, একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের বড় ধরনের জনবল দরকার। কিন্তু এই আয়োজন এখনো শুরুই করতে পারেনি তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, হয়তো শুরুতে একটু জটিলতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। একটু অপেক্ষা করেন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।

রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিভাগীয় প্রধান বলেন, সাধারণত কোনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণার দিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এই সাত কলেজের ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হয়েছে। কিন্তু মনে রাখা উচিত ছিল এই সাত কলেজে দুই লাখ শিক্ষার্থী। তাদের বিভিন্ন ধরনের কোর্স রয়েছে। ফলে এতো শিক্ষার্থীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে বেশ বেগ পেতে হবে। যদি ঘোষণার পরবর্তী বর্ষে যারা ভর্তি হবে তাদেরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হতো তাহলে এমন সমস্যা হতো না। তাদের জন্য সহজেই সিলেবাস, পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হতো। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহজেই এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কোর্স শেষ করতে পারতো।

২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সরকারি কলেজগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা প্রায় দুই হাজার ১৫০টি কলেজে ২১ লাখ শিক্ষার্থী থাকলেও সরকারি ১৮৪টি কলেজেই অধ্যয়ন করে ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। সরকারি কলেজ পৃথক করার এই সিদ্ধান্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আপত্তির পরও গত বছরের ২৮ অক্টোবর এক সভায় অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৮৪টি কলেজকে ভাগ করে দিতেও সুপারিশ করে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি। কিন্তু ১৭৭টি কলেজ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভাগ করা না হলেও গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর সাত কলেজ দেয়া হয়।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj