হেজাবিরা জয় বাংলা বলবে না আমরা বলব : মুনতাসীর মামুন

মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০১৭

(গতকালের পর)

বাংলাদেশে মোল্লাতন্ত্র সব সময় শাসকদের প্রশ্রয় পেয়েছে দেখে আজ তারা সংগঠিত। সাধারণে তাদের প্রভাব এখনো যে বেশ তা অস্বীকার করা যাবে না। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এখনো মোল্লাদের ফতোয়া কার্যকর করা হয়। হাইকোর্ট এই ফতোয়ার বিরুদ্ধে রায় দেয়ার পরও সরকার তা কার্যকর করেনি। ‘ইসলামী’ অনেক দেশেই এই সমস্যা আছে। তবে লক্ষণীয় যে, সাময়িকভাবে এটি প্রভাব বিস্তার করলেও অন্তিমে এ বিষয়ে সাধারণের মোহ হ্রাস পেতে থাকে। ইরান বা ইন্দোনেশিয়া তার উদাহরণ।

এর সঙ্গে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নও চলে আসে যা আগে উল্লেখ করেছি। ধর্ম যে জাতীয়তার ভিত্তি হতে পারে না তার উদাহরণ পাকিস্তান (বাংলাদেশ)। ধর্মের অতি ব্যবহারের ফলেই বাঙালি ১৯৭১ সালে তিতিবিরক্ত হয়ে শুধু যুদ্ধ নয়, সংবিধানেই ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্ত করেছিল।

সফিউদ্দিন জোয়ারদারও একই যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ‘এটা যদি সম্ভব হ’ত তবে দুনিয়ার মুসলমানরা এতগুলি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রে বিভক্ত থাকত না বা মুসলিম দেশগুলি পরস্পরের সঙ্গে কলহ দ্ব›েদ্ব লিপ্ত থাকত না।’

আবু জাফর শামসুদ্দীনের উপন্যাস পদ্মা মেঘনা যমুনায় নায়ক দরিদ্র মুসলমান যুবক মামুন তার বন্ধুদের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনার সময় বলে, ‘এটা সাম্রাজ্যের যুগ নয়- জাতীয়তাবাদের যুগ। কওমি শাসনের যুগও নয়। ধর্মীয় সম্প্রদায় জাতি নয়। ধর্ম, ভাষা, আঞ্চলিকতা বোধ, সমষ্টিগত সাধারণ অর্থনৈতিক স্বার্থবোধ এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনা প্রভৃতি সবকিছু মিলিয়ে জাতি। ভারতীয় জাতি ভারতের স্বাধীনতা ভোগ করবে।’ সময় গত শতকের চল্লিশ দশক। সুতরাং এ বিষয়ে দ্ব›দ্ব বাংলাদেশে অনেককাল থেকেই চলে আসছে এবং এই চিন্তাকে মোল্লাবাদীরা হটাতে পারেনি।

জোয়ারদার বিভিন্ন ইসলামী দেশের অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রায় দু’দশক আগে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন এখনো তা প্রযোজ্য। তিনি লিখেছেন, প্রধান সমস্যা হলো ‘বিজ্ঞান শাসিত পৃথিবীতে যে কোনো ধর্মের মতো ইসলামেরও প্রধান সমস্যা এর মর্মবাণীকে মধ্যযুগীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে পৃথক করা।’ এবং মুসলিম দেশগুলোর জন্য কল্যাণকর কোনো মীমাংসায় যদি পৌঁছাতে হয়, তবে গণতন্ত্র, মানববন্ধন ও বিজ্ঞানের ভিত্তি ভূমিতে দাঁড়িয়ে ‘ইসলামী জীবন ব্যবস্থার পুনর্মূলায়ন করতে হবে।… এই কাজটি না করা হলে মুসলিম জগতের রাজনীতি একদিকে স্বৈরতন্ত্র ও অন্যদিকে মোল্লাতন্ত্রের মধ্যে দোলায়িত হতে থাকবে।’

এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচ্য। একটি বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে যে, জঙ্গিবাদের মূল পৃষ্ঠপোষক মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ, যার মধ্যে প্রধান সৌদি আরব এবং পাকিস্তান। জঙ্গিরা সৌদি আরবীয় সংস্কৃতি বা ওয়াহাবিবাদ দ্বারা প্রভাবিত। তারা এখানে বিভিন্ন চালু ফার্সি শব্দও বদল করছে। যেমন ‘খোদা হাফেজ’ এর পরিবর্তে ‘আল্লাহা হাফেজ’ বা নামাজ-এর পরিবর্তে ‘সালাত’। জামায়াতে ইসলামীও এসব শব্দ চালু করেছে। তারা এটাই বোঝাতে চাচ্ছে, ইসলাম আরবের। সুতরাং আরবি শব্দ ব্যবহারেই পুণ্য। লক্ষণীয় যে, নিকট বা মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশ ছিল গরিব উপনিবেশ সেখানেই এই মিলিটান্সি প্রবল। যেমন, সৌদি আরব, লিবিয়া বা সুদান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়ন এবং পাশ্চাত্যের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে ইসলাম/মুসলিম হচ্ছে সন্ত্রাস/সন্ত্রাসীদের সমার্থক। সুতরাং জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে। কিন্তু আমি আগেই উল্লেখ করেছি, এ দেশে আরবি থেকে ফার্সি সংস্কৃতির প্রভাব বেশি, ঐতিহাসিক কারণেই। ওয়াহাবি মতবাদও এখানে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এবং বর্তমানে এই দ্ব›দ্ব প্রবল এবং ওয়াহাবিবাদের বিরুদ্ধে অন্য ‘ইসলামপছন্দ’ দল/গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এই দ্ব›েদ্ব জঙ্গিবাদ/ওয়াহাবিবাদ খুব সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না। আর পাকিস্তান মানস তো আগেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

বাঙালি মানস সজীব। কখনো কখনো পিছু হটে গেলেও প্রতিরোধের যে শক্তির কথা আগে উল্লেখ করেছি তা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। প্রথমে যদি ধর্মের কথা আসে (ইসলাম) তাহলে বলতে হয় রাষ্ট্রীয় পোষকতা ছাড়া ইসলামকে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। সামরিক শাসকরা এটি করেছিল ধর্ম ও শক্তি (অস্ত্র) দিয়ে মানুষকে দমানোর জন্য। ২৭ বছর আগে সামরিক শাসকদের উৎখাত করে সংসদীয় গণতন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। নানা দোলাচালে থাকলেও সংসদ আর উৎখাত করার সাহস কেউ দেখায়নি এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানুষ তা মেনে নিয়েছে। সজীবতার ও জনমানুষের শক্তির এটি একটি উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় পোষকতা না পেলে এবং জঙ্গিদের (ও এর সহায়ক শক্তি) যথার্থ বিচার হলে জঙ্গিবাদও আর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। ধর্মের প্রবল প্রচারের কারণে অনেকে ধর্মীয় গোঁড়ামি মেনে নিচ্ছেন, মন থেকেই, কিন্তু দেখা যায় দৈনন্দিন জীবনে তা পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না। এখনো বিয়ের অনুষ্ঠানে আলপনা না থাকলে বিয়ে সম্পূর্ণ হয় না (জঙ্গি বা চরম ডানপন্থী ছাড়া)। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে আলপনা থাকেই। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন জারির পর ১৯৭৬ সালে তা বন্ধ ছিল কিন্তু পরের বছরই শিল্পী হাশেম খানের নেতৃত্বে গভীর রাতে শহীদ মিনারে আলপনা আঁকা হয় এবং বর্তমান ইসলামী জোট সরকারও তা বন্ধ করার সাহস দেখায়নি। জামায়াত সরকারে থাকলেও, প্রবল প্রতাপে দেশজুড়ে যে ফ্যাশন শো ও উৎকট পাশ্চাত্য সংস্কৃতির যে প্রদর্শন চলছে সে ব্যাপারে তারা নিশ্চুপ, ‘ইসলামী দেশগুলোর’ ওপর মার্কিনি আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তারা চুপ। পহেলা বৈশাখ পালন আইয়ুব আমলে শুরু হয়েছিল বাঙালির প্রতিবাদ হিসেবে আজ যা বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। জঙ্গিরা বোমা মেরে, মানুষ মেরেও তা বন্ধ করতে পারেনি। একুশ শোকের মাস হলেও তা সাংস্কৃতিক উৎসবের মাস। এখনো লৌকিক ইসলামের অনেক উপাদান যেমন, মিলাদ, মাজার, চেহলাম কিছুই উৎখাত করা যায়নি, এমনকি মাজারে, মেলায় বোমা মেরেও। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ভাষায় ‘বাংলাকে বদলাতে হলে এবং বাঙালি মুসলমানকে সমসাময়িক সময়ের মধ্যে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে হলে ইজতিহাদের পথে অগ্রসর হতে হবে।’

চার. ধর্ম যারা ব্যবহার করে তারা কখনো সত্য ঘটনা স্বীকার করে না। শাপলা চত্বরে ৫ মে কি হয়েছিল আমরা জানি। বাবুনগরী বলছেন- ‘আমরা রাসুলের (সা.) সম্মানার্থে শাপলা চত্বরে গিয়েছিলাম জায়নামাজ ও তসবিহ নিয়ে। আমাদের দাবি ছিল ১৩ দফা। হাঙ্গামা, দখল, সচিবালয় ঘেরাও কিংবা সরকারের সঙ্গে যুদ্ধ করার কোনো কিছুই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না।

-পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আপনারা জোহরের নামাজের পর জমায়েত সমাপ্তি ঘোষণার কথা বললেও, রাতেও হেফাজতের কর্মীরা শাপলা চত্বর ও পল্টনে অবস্থান নিয়ে থাকেন।

কথা ছিল জোহরের পর শেষ হবে। জোহরের নামাজের পর আমরা একটু দোয়া-দরুদ পাঠ ও মোনাজাত করি। কোনো কোনো মাওলানা একটু ওয়াজ করেন। এর পরই চলে আসার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশ ও সরকারের অন্যান্য বাহিনী জোহর থেকেই আমাদের লোকজনকে পেটাতে শুরু করে। এতে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। আমাদের লোকজনকে পিটিয়ে আহত ও নিহত করা হলে অন্যরা শাপলা চত্বর না ছাড়ার ঘোষণা দেন। তখন তাদের বলেও সেখান থেকে সরানো যায়নি। আমি নিজের চোখে চারজনের লাশ দেখেছি। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আমাদের কর্মীরা নিহতদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত শাপলা চত্বর ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।’

অর্থাৎ আমরা যুক্তি দিয়ে যাই বলি না কেন তাতে ধর্ম ব্যবসায়ীদের কিছু আসে যায় না। এটি ঠিক, সরকার একদিকে ধর্ম ব্যবহারকারীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের দাবিও ফেলে দিচ্ছে না। মানবতাবিরোধীদের বিচার বন্ধ হয়নি, ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকৃতি বিষয়ক আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত সংসদে সর্বসম্মতিভাবে পাস করা হয়েছে, ঢাকা বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে ৫৪ ফুট উঁচু মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য করা হয়েছে ইত্যাদি। মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি এ কারণে। শেখ হাসিনাকে নাকচ নয়, শেখ হাসিনাকে নিয়েই তারা হেজাবি/জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে চান। প্রধানমন্ত্রী যে তা চান না তা নয় কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও চান, হেফাজতিরা যেন তার তাঁবে থাকে, অন্তত নির্বাচনের আগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস না পান।

এতসব কথা বলার পরও মূল কথাটি থেকে যায়। তাহলো, ধর্মব্যবহারকারীদের আমরা কতটা প্রশ্রয় দেব। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারো তুলনা করে লাভ নেই। তিনি পৃথিবীর খুব সম্ভব একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি সাংবিধানিকভাবে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশে আলবদর রাজাকার পয়দা হোক তা তিনি চান না। তার সময়টাও ছিল অন্যরকম। দুজন সামরিক কর্মকর্তা জিয়া ও এরশাদ এ দেশটি আবার আলবদর রাজাকারদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন। তাদের আমলে যথেষ্ট আলবদর রাজাকার পয়দা হয়েছে। জেনারেল জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া আলবদরদের ক্ষমতার অংশীদার করেছিলেন এ কথা ভুললে চলবে না। এ কথা ভুললে চলবে না, শেখ হাসিনা সে ধারা রোধ করেছিলেন। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্রে, অর্থনীতিতে তারা এখন মুক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুলিং পার্টির অনেকে শেখ হাসিনার ডিকটাট অগ্রাহ্য করে তাদের প্রশ্রয় দিয়েছেন। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, কয়েক লাখ খাস হেজাবি এখনো সরকারি দলে সফলভাবে অনুপ্রবেশ করেছে। প্রধানমন্ত্রীকে তাও বিবেচনা করতে হচ্ছে। সবই সত্য, কিন্তু এটাও সত্যি এ ধরনের বারংবার প্রশ্রয় অন্তিমে তাকে শক্তিশালী করবে না, দুর্বল করে তুলবে প্রাতিষ্ঠানিভাবে। ধর্ম দিয়ে ধর্মকে সাময়িকভাবে প্রতিরোধ করা যেতে পারে কিন্তু অন্তিমে তাতে ধর্মের প্রভাবই পড়ে। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি যারা করেন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুক্তি তুলে ধরতে হবে। প্রশ্রয় দিয়ে বা ধর্মের ‘প্রগতিশীলতা’র যুক্তি দিয়ে নয়। যে ধারার তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন সে ধারাকেই তার শক্তিশালী করে তুলতে হবে। কারণ তারাই সব সময় তার পাশে ছিলেন। হেজাবিরা নয়। শুধু তাই, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেটিও নির্বাচনের আগে তাকে নিরসন করে এদের নিয়ে থাকতেই হবে। হেজাবিরা জয়বাংলা বলবে না, আমরা বলেছি এবং বলব।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj