স্বর্ণের বাজার পাচার নির্ভর!

মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০১৭

কামরুজ্জামান খান : দেশে বৈধভাবে কোনো ধরনের স্বর্ণের চালান আমদানি করা না হলেও জুয়েলারি ব্যবসা চলছে রমরমা। চোরাচালানির মাধ্যমে আমদানি ছাড়াও বৈধভাবে বিদেশ ফেরত যাত্রীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণ ও অলঙ্কারে চলছে জুয়েলারি ব্যবসা। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে যে পরিমাণ স্বর্র্ণের চালান আটক হচ্ছে তার অধিকাংশই এ দেশে রুট হিসেবে ব্যবহার করে বিদেশে পাচার হচ্ছে। ভারতের একাধিক চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে আটককৃত স্বর্ণ চোরাচালান মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শুল্ক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিন সোনা চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে। দু-একটি চালান আটক হলেও ১৮টি সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে পার পাচ্ছে অনেক চালান। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), গোয়েন্দা বিভাগ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও শুল্ক কর্মকর্তারা বলেছেন, সোনা চোরাচালানে বিমান ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ সরাসরি জড়িত। তবে সোনা চোরাচালানে বিমানের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত আছেন কিনা, সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে চায়নি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, সোনা আমদানির ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তা তাদের জন্য ‘জটিল’ ও ‘অলাভজনক’। এ কারণে তারা অবৈধপথে আসা সোনার ওপর নির্ভর করেন। দেশের আইন অনুযায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে সোনার বার বা ‘বিস্কুট’ আমদানি করা যায়। তবে এ আমদানি বাবদ প্রতি ভরির দাম ৪০ হাজার টাকা ধরে (১১ দশমিক ৬৬ গ্রাম) এর ভ্যাট/ট্যাক্স দিতে হয় চার হাজার টাকার বেশি। ব্যবসায়ীদের দাবি, এই পরিমাণ ভ্যাট/ট্যাক্স দিয়ে গয়না আমদানি করে ব্যবসা করাটা অলাভজনক। তবে কোনো ব্যক্তি বিদেশ থেকে আসার সময় ২০০ গ্রাম সোনার বার ও ১০০ গ্রাম ওজনের সোনার গয়না সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেছেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানির কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। কিভাবে চলছে স্বর্ণের বাজার সে ব্যাপারে খোঁজখবর করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের যুগ্ম পরিচালক মো. শফিউর রহমান গতকাল সোমবার ভোরের কাগজকে বলেন, গত সাড়ে ৩ বছরে (গতকাল সোমবার পর্যন্ত) ঢাকা ও চট্টগ্রাম কাস্টমস ও গোয়েন্দা দপ্তর মিলে বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪ টন স্বর্ণের চালান আটক করেছেন। যেগুলো অবৈধভাবে দেশে আনা হয়েছিল। আটককৃত স্বর্ণের চালান বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে বৈধভাবে কোনো স্বর্ণের চালান আনা হয়নি। তারপরও জুয়েলারি বাজার চাঙ্গা থাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চোরাচালানিদের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, কিভাবে জুয়েলারি ব্যবসা চলছে তা খতিয়ে দেখতে কাজ শুরু করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ইউনিট।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২১০ কেজি স্বর্ণ আটক করা হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরে। ২০১২ সালে একই বিমানবন্দর থেকে পাঁচ কোটি টাকার সমপরিমাণ ১১ দশমিক ৬৯ কেজি সোনা উদ্ধার করেছিল শুল্ক কর্তৃপক্ষ।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্বরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ানের (এপিবিএন) কমান্ডিং অফিসার (সিও) রাশিদুল ইসলাম খান বলেছেন, বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানির বাজার এ দেশে নেই। আমদানির যে পলিসি আছে তা জটিল। দেশে স্বর্ণের চাহিদা খুবই কম। একজন সাধারণ যাত্রী বা টুরিস্ট বিদেশ থেকে ১০০ গ্রাম (১০ ভরি) স্বর্ণালঙ্কার ও ২০০ গ্রাম ওজনের সোনার বার বৈধভাবে আনতে পারেন। সেভাবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বার ও অলঙ্কার দেশে ঢুকছে, যা দালালদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে জুয়েলারি মার্কেটে। তিনি বলেন, সৌদি আরবে এ দেশের ১০-১২ লাখ মানুষ থাকেন। যারা আসা-যাওয়ার মধ্যে রয়েছেন। তারা যে অলঙ্কার ও বার আনছেন তা বিক্রি হচ্ছে বাজারে। দুবাইয়েও একই অবস্থা। একজন লোক ইচ্ছেমতো বিদেশে যাতায়াত করে স্বর্ণালঙ্কার বার আনছেন। পৃথিবীর কোনো দেশে এভাবে স্বর্ণ আনার বিধান নেই দাবি করে তিনি বলেন, স্বর্ণের যেসব চালান বিমানবন্দরে আটক করা হচ্ছে তা এ দেশের বাজারের জন্য আনা হয় না। এ দেশের বিমানবন্দরকে রুট হিসেবে ব্যবহার করেছে চোরাচালানিরা। রাশিদুল বলেন, এপিবিএন বছরে গড়ে ১০০ কেজি সোনার চালান ও জড়িতদের আটক করে থাকে।

সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে অস্থায়ী ভিত্তিতে যারা কাজ করে থাকেন, তারাই এসব সোনা উড়োজাহাজ থেকে নামানোর কাজ করেন। এরপর বোর্ডিং ব্রিজের পাশে টয়লেটে সোনা রেখে আসা হয়। আরেকটি দলের কাজ টয়লেট থেকে বিমানবন্দরের বাইরে সেগুলো নিয়ে আসা। অন্য একটি দল পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারসহ অন্যান্য স্থানে ক্রেতাদের কাছে সোনার চালান পৌঁছানোর কাজ করে থাকে। দুবাইয়ে বসবাসকারী কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে সোনা পাঠানোর কাজ করেন। সিঙ্গাপুর, দোহা, হংকং-এ এই পাচারকারী চক্রের লোকজন অবস্থান করে। মূলত এসব রুট থেকে যাত্রীকে দিয়ে টাকা অথবা বিমান টিকেটের বিনিময়ে নানা কৌশলে দেশে স্বর্ণ পাচার করা হয়।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj