বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের উৎসব : শামসুজ্জামান খান

শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৭

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় উৎসব। আমাদের আরও উৎসব আছে। তার কিছু ধর্মীয় উৎসব আর কতক ঋতু উৎসব। আবার একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মাতৃভাষার উৎসব। সে উৎসব রাজনৈতিকও বটে। আমাদের তরুণেরা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে এই উৎসবের সৃষ্টি করেছেন। বাংলা নববর্ষ উৎসব আর একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাংলাদেশের সকল ধর্ম ও স¤প্রদায়ের মানুষের মহান উৎসব।

আজ আমরা আমাদের সব উৎসবের কথা বলবো না। শুধু নববর্ষ উৎসবের কথা বলবো। বাংলা নববর্ষ উৎসব কখন, কীভাবে শুরু হয়েছে তা ঠিকঠিক বলা কঠিন। ইতিহাসেও তেমনভাবে কিছু নেই। তবে প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামীণ বাংলাদেশে ‘আমানি’ নামে একটি পারিবারিক উৎসব চালু ছিল। প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তির দিনগত রাতে অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের আগের রাতে বাড়ির গৃহিণী একটি ঘটে পানি ঢেলে তাতে কচি একটি আমপাতার ডাল রেখে দিতেন। আর ঘটে কিছু আতপ চাল ছেড়ে দেয়া হতো। পহেলা বৈশাখের সকালে সেই আমপাতার ডালটি ঘটের পানিতে ডুবিয়ে সেই পানি বাড়ির সকলের শরীরে ছিটিয়ে দেয়া হতো। আর ঘটে ভেজানো চাল বাড়ির সবাইকে খেতে দেওয়া হতো। লোকবিশ্বাস ছিল- এতে সারাবছর সকলের মঙ্গল হবে। গৃহকর্তা এই ভেজা চাল খেয়ে ক্ষেতে হালচাষ করতে যেতেন। মনে করা হতো এতে ফসলের কোনো অমঙ্গল হবে না। এই বিষয়টি পরবর্তীকালে বাংলা নববর্ষের উৎসবের একটি অংশ হয়ে যায়।

আরেকটি বড়ো ব্যাপার ছিল- মেলা। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় চৈত্র সংক্রান্তির দিনে এবং পহেলা বৈশাখ সকালে মেলা বসতো। এই মেলার খুব প্রয়োজন ছিল। কারণ কৃষিভিত্তিক বাংলায় মানুষের হাতে কাঁচা পয়সা ছিল না। আর কাছেপিঠে এখনকার মতো এতো দোকানপাটও ছিল না। তাই চটজলদি প্রয়োজনের জিনিষটি কিনে এনে ব্যবহার করাও ছিল কঠিন। তাই প্রতি বছরের এই মেলা থেকেই গ্রামের মানুষ হাঁড়ি-কুড়ি, দা-কাঁচি থেকে শুরু করে সংসারের সারা বছরের যাবতীয় দ্রব্যাদি বা তৈজসপত্র এই মেলা থেকেই কিনে রাখত।

এই ছিল গ্রামীণ মেলার আদি উপায়-উপকরণ। আরো পরে ইংরেজ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে জমিদারি প্রথা চালু করা হয়। জমিদাররা খাজনা আদায়ের জন্য বছরের প্রথম দিনে তাদের বাড়িতে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব করতেন। সেই উৎসবে চাষি-প্রজারা জমিদারির খাজনা পরিশোধ করতো এবং মিষ্টিমুখে আপ্যায়িত হতো। তখন কিছু কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। অতএব দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিষ দোকানিরা বেচাবিক্রিও করতেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের হাতে তো নগদ পয়সা ছিল না। তাই তারা বাকিতে দোকান থেকে জিনিষ কিনতো। কিন্তু এই যে ধারে কেনা জিনিষ, এই ধার তো শোধ করতে হবে। ব্যবসায়ীরা তাই বছরের প্রথম দিনে হালখাতা করতেন। সেই হালখাতার দিনে ক্রেতারা দোকানির দেনা পরিশোধ করে মিষ্টিমুখ করে যেতেন। দোকানিরা তাদের দোকান সাজাতেন নানান রঙিন কাগজের ঝালর বানিয়ে। আর আগরবাতি-ধূপধুনো জ্বালিয়ে। একটা ছিমছাম, ছাপছুতরো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ক্রেতা-বিক্রেতার এই সম্মেলন বেশ আনন্দপূর্ণই হতো।

এই চারটি উপাদানে ছিল প্রাচীন বাঙালির পহেলা বৈশাখের মূল অঙ্গ। পরে ইতিহাস এগিয়েছে। মোগল বাদশাহরা দিল্লিতে চালু করলেন ইরানের নববর্ষ উৎসব ‘নওরোজ’-এর অনুকরণে উৎসব ও মীনা বাজার। সেও ছিল রাজরাজরা, অভিজাত ধনী বণিকদের নববর্ষের উৎসব। বাংলা নববর্ষ সেখান থেকেও কিছু প্রেরণা দান করেছে। এরও পরে ইংরেজ আমলে এসে কলকাতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারে ইংরেজদের নববর্ষ উদযাপনের আদলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের রীতি চালু হয়। ১৮৯৪ সালে বেশ ঘটা করেই ঠাকুর পরিবারে নববর্ষ উদযাপিত হয়। সেই থেকে নগরবাসী শিক্ষিত পরিবারে কলকাতা শহর এবং শান্তিনিকেতনসহ পশ্চিম বাংলার নানা শহরে নববর্ষ উদযাপনের রীতি চালু হয়।

বাংলাদেশে এই আধুনিক ধারার নববর্ষ চালু হয়েছে ১৯৫০-এর দশকের প্রথম দিকে। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার আমলে পূর্ববাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন। সেই সময় থেকে ঢাকাসহ পূর্ববাংলার বিভিন্ন শহরে নববর্ষ উৎসব চালু হয়। ঢাকার মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকের উদ্যোগে কার্জন হলে নববর্ষ উৎসব উদ্যাপন করা হয়। তখন ঐকতানসহ কয়েকটি সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এবং ওয়ারীর র‌্যাংকিন স্ট্রিটেও এই উৎসবের সূচনা করে। তবে বর্তমানে ঢাকা শহরে নববর্ষের উৎসব যে বর্ণাঢ্য অবয়ব, নব আঙ্গিক ও বিপুল আয়তনে চালু প্রচলিত হয়েছে তার ইতিহাস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের এই জাতীয় উৎসবটি পাকিস্তান সরকার করতে দিতে চাইত না। এই বাধার মুখেই বাঙালি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলার বাঙালি তার শিকড় অনুসন্ধান করে নতুনভাবে সাজায় বাংলা নববর্ষের উৎসবকে। এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা ‘ছায়ানট’ (১৯৬১)-এর। ছায়ানট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি রমনার বটমূলে ১৯৬৭ সাল থেকে চালু করে নববর্ষের এই উৎসব। এই উৎসব বাঙালির জাতিসত্তার সঙ্গে যুক্ত বলেই অতি দ্রুতই তা জনপ্রিয় হয়। এবং প্রতিবছরই বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের উৎসব হয়ে ওঠে। নানা রং ও ডিজাইনের রং-বেরংয়ের পাঞ্জাবি-পাজামা-শাড়িতে সজ্জিত বাঙালি পুরুষ-মহিলার বিপুল সমাগমে এই উৎসব এখন বাঙালির সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানের রূপ লাভ করেছে। এই উৎসব একসময় গ্রাম থেকে গ্রামে শুরু হয়েছিল কিন্তু পরে আর খুব বড় আকার গ্রহণ করেনি। এখন এই উৎসব গ্রাম থেকে বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত হয়ে রাজধানী ছাড়িয়ে বিভাগ, বিভাগ ছাড়িয়ে জেলা, জেলা ছাড়িয়ে উপজেলা এবং গ্রাম পর্যন্ত নব আঙ্গিকে এবং নব সাজে চালু হয়ে গেছে। এই উৎসব বাঙালি জীবনে যে আনন্দ বয়ে আনে তার তুলনা বিরল।

স্বাগত ১৪২৪ : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj