লেখকদের হলোকস্ট অভিজ্ঞতা

শুক্রবার, ৭ এপ্রিল ২০১৭

** দু লা ল আ ল ম ন সু র **

হলোকস্ট নিয়ে রচিত হয়েছে সাহিত্যের বেশ বড় একটা অংশ। অনেক না বলা কথা প্রকাশ করা হয়েছে হলোকস্ট সাহিত্যে। যে কথা যায় না বলা সে কথা দক্ষ লেখকদের হাতে অসাধারণ সাহিত্যের আকারে প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায়। লেখকদের কেউ কেউ নোবেলের মতো সম্মানজনক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। আর অনেকের ভাগ্যে নোবেল পুরস্কার না জুটলেও তাঁরা পাঠকদের কাছে বেশ সুপরিচিত। লেভি, উইজেল, বোরোস্কি এবং আরো অনেকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছেন। এছাড়া হলোকস্টের ছায়ায় উপন্যাস লিখেছেন পেরেক, বার্নার্ড, সেবাল্ড প্রমুখ। বিষয়বস্তু হিসেবে স্মৃতি, বিস্মৃতি, অনুপস্থিতি, ইতিহাসকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, অতীতের ঘটনার প্রেক্ষিতে মানুষের জীবন কীভাবে পনরাকারলাভ করছে- ইত্যাদি উঠে এসেছে হলোকস্ট সাহিত্যে। আবার অতি স¤প্রতি প্রকাশিত যোসুয়া কোহেনের উপন্যাস ‘উইটস’-এরও উল্লেখ করা যায়। এখানে ইহুদিদের অভিজ্ঞতার ভেতর অতি মাত্রার আবেগের উপস্থিতির কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে। তবু শেষ পর্যন্ত এই উপন্যাসও হলোকস্টের ছায়ায় বেড়ে উঠেছে বলা যায়। কেননা আমরা খুব দ্রুতই এমন একটা সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যখন আর হলোকস্টের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে এমন মানুষকে পাব না আমাদের মাঝে। এখানে আপাতত নোবেল পুরস্কারজয়ী কতিপয় লেখকের হলোকস্ট অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের লেখনীর সঙ্গে সে অভিজ্ঞতার সম্পর্কের কথা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

এ প্রসঙ্গে প্রথমে উল্লেখ করা যায় জার্মান কবি ও নাট্যকার নেলি সাখসের কথা। নেলি সাখসের জন্ম ১৮৯১ সালে জার্মানিতে। তিনি কবি, নাট্যকার এবং ইহুদিদের মুখপাত্র হিসেবে সুপরিচিত। ১৯৬৬ সালে তিনি ইসরায়েলি লেখক স্যামুয়েল ইউসেফ আগননের সঙ্গে যৌথভাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৪০ সালে ইউরোপে নাৎসিদের ক্ষমতা প্রসারের সময় তিনি জার্মানি থেকে তাঁর মায়ের সঙ্গে পালিয়ে সুইডেনে চলে যান। তবে নাৎসিদের ব্যাপক ইহুদি নিধনযজ্ঞ তাঁর মনের ওপরে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যায়। সে সময়ের অভিজ্ঞতা ও আবেগ তাঁর মানস সত্তা গড়ে দেয়। তাঁর লেখনীর মধ্যে সে সময়ের দগ্ধ স্মৃতির দাহ দেখতে পাওয়া যায়। মাত্র পনেরো বছর বয়সে ‘গোস্টা বর্লিং’ পড়ে তিনি মুগ্ধ হন এবং সুইডেনের নোবেল বিজয়ী কবি সেলমা লেগারলফের সঙ্গে তাঁর পত্র যোগাযোগ স্থাপিত হয়। জার্মানি থেকে সুইডেনে যাওয়ার সময় সেলমা লাগারলফ তাঁকে সাহায্য করেন। তবে নেলি সেখানে পৌঁছনোর আগেই সেলমা লাগারলফ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘ইন দ্য হাউস অব ডেথ’ প্রকাশ করেন ১৯৪৭ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থসহ ‘অ্যান্ড নো ওয়ান নোউজ হয়ার টু গৌ’ (১৯৫৭)-এর অনেক কবিতায় তাঁর হলোকস্টের বিভীষিকা এবং ইহুদিদের নির্বাসন নিয়ে শোক প্রকাশ করেন। আমরা দেখতে পাই তাঁর ‘মুক্তিপ্রাপ্তদের কোরাস’ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ :

আমরা মুক্তিপ্রাপ্ত-

আমাদেরকে তোমার সূর্য দেখাও; তবে ধীরে ধীরে। আমাদেরকে আস্তে ধীরে নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রের দিকে পথ দেখাও। আমাদেরকে পুনরায় বাঁচতে শেখানোর সময় আমাদের প্রতি সদয় থেকো।

আমাদের শূন্য হাড় থেকে মৃত্যু বাঁশি বাজানো শুরু করে দিয়েছে;

আমাদের পেশির ওপরে সে ধনুকের আঘাত করা শুরু করেছে;

অঙ্গহৃত সংগীতে আমাদের শরীর

অবিরত বিলাপ করে চলেছে।

আমরা মুক্তিপ্রাপ্ত,

তবু আমাদের ঘাড়ের জন্য ফাঁসির দড়ি ঝুলতে থাকবে

আমাদের চোখের সামনের নীল বাতাসে।

তবু আমাদের রক্তে ভরে যাবে বালিঘড়িগুলো।

আমরা মুক্তিপ্রাপ্ত,

তবু ভীতির পোকাগুলো আমাদের খেয়ে নধর;

আমাদের নক্ষত্রপুঞ্জ ধুলোয় চাপা পড়েছে।

আমরা মুক্তিপ্রাপ্তরা,

তোমার কাছে প্রার্থনা করছি- আমাদের তোমার সূর্য দেখাও। তবে ধীরে, অতি ধীরে।

আমাদের আস্তে ধীরে নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রের দিকে পথ দেখাও।

আমাদের পুনরায় বাঁচতে শেখানোর সময় আমাদের প্রতি সদয় থেকো।

পাছে একটি পাখির গান

কিংবা কুয়োর ধারের ভরা বালতি

আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে;

আমাদের গায়ে লেগে থাকা দৃষ্টিকটু বেদনাকে আবারো বিস্ফোরিত হতে দাও।

তোমার কাছে আমাদের প্রার্থনা-

কোনো রাগান্বিত কুকুর দেখিও না আমাদের, এখনও না।

নইলে হতে পারে, হতে পারে

আমরা তোমার চোখের সামনেই

ধুলোয় পরিণত হয়ে যেতে পারি।

কোন সে শক্তি যার বলে আমাদের গঠন কাঠামো একাত্ম হয়ে থাকে?

আমাদের নিঃশ্বাস আমাদের শরীরকে খালি করে দিয়েছে;

মুহূর্তের ভগ্নাশের ভেতরে

আমাদের শরীরকে উদ্ধার করার আনেক আগেই

আমাদের আত্মা তাঁর কাছে উড়ে গেছে সেই মধ্য রাতের ভেতর থেকে।

আমরা মুক্তিপ্রাপ্তরা,

তোমার হাত চেপে ধরি

তোমার চোখের ভেতরে তাকাই-

তবে আমাদের এক সাথে করে রেখেছে শুধুই বিদায় নিয়ে চলে যাওয়া,

ধুলোর ভেতরে চলে যাওয়া।

এই চলে যাওয়াই তোমার সাথে আমাদের বন্ধনে জড়িয়েছে।

সুইডেনে নির্বাসিত জীবনযাপনের পুরো সময় ধরেই নেলি তাঁর শত শত কবিতা এবং নাটকে প্রকাশ করেছেন নিজের ভেতরের যাতনার কথা। বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আগে বার্লিনের ইহুদি সমাজের বেশ উঁচু অবস্থানেই ছিল তাঁর পরিবারের মর্যাদা। ইহুদিসহ সমাজের আরো অনেক মানুষের সঙ্গেই তাঁর পরিবারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। খুব ছোটবেলায় তাঁর মধ্যে নৃত্যের প্রতি প্রবল টান লক্ষ করা যায়। তবে তাঁর বাবা মা চাননি তিনি নাচের জগতে আসুন। শেষে তাঁর আশ্রয়লাভ হয় কবিতায়।

হিটলারের উত্থানের আগে, জীবনের প্রথম পঞ্চাশ বছরের মতো সময়ে নেলি যে সব কবিতা রচনা করেন সেগুলোতে জার্মান রোমান্টিসিজমের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। সে কবিতাগুলোতে মামুলিত্ব আর গতানুগতিক আবেগের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। সতেরো বছর বয়সের এক রহস্যজনক প্রেম তাঁকে আজীবন তাড়া করে ফিরেছে। সে সূত্রে কবিতায় বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে হারানোর বেদনা আর বিপন্ন মানস। তবে সিরিয়াস কাব্য রচনা করেছেন তিনি বয়স পঞ্চাশ পেরুনোর পরে, স্পকহোমে বসবাসের সময়। লক্ষণীয় হলো, সুউডেনে থাকলেও তিনি কাব্য রচনা করেছেন জার্মান ভাষাতেই। আর কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে ইহুদিদের নির্যাতন আর কষ্টের কথা। তিনি ইহুদিত্বের মরমিবাদের সন্ধানলাভ করেন এবং কাব্বালা থেকে চিত্রকল্পও ব্যবহার করেন তাঁর কবিতায়। পরবর্তীতেও তাঁর কবিতার গীতধর্মিতা বজায় থাকে। তবে কবিতার শরীর জুড়ে থাকে টানটান ভরাট অর্থবহতা। তাঁর চিত্রকল্পের মধ্যে ধুলো, নক্ষত্র, রক্ত, পাথর, নিঃশ্বাস ইত্যাদির সরব আনাগোনা দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর কবিতা এবং নাটককে পরিণত করেন যারা মুক্তি পায়নি তাদের কণ্ঠস্বরে। জার্মানি এবং সুইডেন উভয় দেশেই তিনি ইহুদি নির্যাতনের পরিচিতি তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগে তিনি জার্মানিতেও অনেক পুরস্কারলাভ করেছেন।

২০০২ সালে নোবেল পুরস্কারলাভ করেন হাঙ্গেরির লেখক ইমরে কারতেশ। তাঁর ব্যক্তি জীবনের অতীত স্মৃতি হয়ে অনেকখানি জুড়ে আছে হলোকস্ট। তাঁর রচনাতেও হলোকস্টের ছায়া সুস্পষ্ট।

ইমরে কারতেশের বেলায় লক্ষণীয় বিষয়টি হলো হলোকস্ট নিয়ে আরো যাঁরা সাহিত্য রচনা করেছেন তাঁদের সবার রচনার সমষ্টিই যেন দেখতে পাওয়া যায় তাঁর উপন্যাসগুলোতে। কারতেশের মানসিকতার মধ্যে বেশ স্পষ্ট দেখা যায় দার্শনিকের উপস্থিতি। লেখক হিসেবেও তিনি অনুবাদ করেছেন নিটশে, ফ্রয়েড, ভিটগেনস্টাইন প্রমুখের মূল্যবান রচনা। তাঁর আখ্যান শৈলীর সীমার মধ্যেই কারতেশ ধারণ করেন বেকেটের সংগ্রাম এবং তাঁর শিল্পের পুরাণিক ক্ষমতার প্রকাশ করেন অ্যাডোর্নোর সন্দেহবাদী মানস। বিগত চল্লিশ বছর ধরে তিনি বেশ কিছু মেধাবী এবং দার্শনিক দৃষ্টিসম্পন্ন উপন্যাস রচনা করেছেন। সে উপন্যাসগুলো তুলে ধরেছে নীতিবিদ্যা, ইতিহাস, স্মৃতি, শিল্প এবং যথার্থতার মতো গুরুগম্ভীর বিষয়াদি। তাঁর উপন্যাস ‘ফেইটলেসনেস’-এ আউসভিৎস, বুছেনওয়াল্ড আর জিটসের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। কেউ কেউ মনে করেন এ উপন্যাসটি লেখকের বাস্তব জীবনের ডকুমেন্টারি উপস্থাপনা। তবে লেখক তাঁর উপন্যাসের সরাসরি এরকম তকমা নাকচ করে দিয়েছেন। হলোকস্টের ছায়ায় রচিত তাঁর আরেক উপন্যাস ‘কাডিস ফর আ চাইল্ড নট বন’। এখানে কথকের প্রথম পুরুষের বয়ানে তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসের বর্ণনা। কথকই উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র। উপন্যাসে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় তার এক সময়ের প্রেমিকার, তার এখন অন্যখানে বিয়ে হয়ে গেছে। তার সন্তানটিকে কথক নিজের দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করে : তার সঙ্গে প্রেমিকার বিয়ে হলে এই সন্তানটি তার নিজের হতে পারত। কিন্তু তার তো বিয়ে হয়নি। কেন হয়নি সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। হলোকস্ট তাড়িত জীবনে তিনি বিয়ে করে সন্তানকে বীভিষিকাময় জীবন উপহার দিতে চাননি। কাজেই বিয়ের পথে পা বাড়াননি। তবে প্রেমিকার সন্তানকে দেখে তার পিতৃহৃদয় নিজের হতে পারত এমন সন্তানের জন্য কাডিস বা মাগফেরাত কামনা করে।

আগে প্রকাশিত কারতেশের উপন্যাস এবং তাঁর ব্যক্তিগত বাস্তব জীবনের সঙ্গে উপন্যাসগুলোর সম্পর্ক নিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর পরবর্তী সময়ের আরেক রচনা ‘ডসিয়ার কে’-এর বিষয়বস্তু। বইটি প্রকাশ করেছেন ২০০৬ সালে। তাঁর উপন্যাসগুলোর কোনোটাই খুব সাদামাটা স্বাভাবিক নয়, তবু এই গ্রন্থটি সেগুলো থেকেও আরেক ধাপ বেশি অস্বাভাভাবিক বা আনন্য, কেননা তিনি নিজেই বলেছেন, এটি লেখা হয়েছে যতটা না ভেতরের চাপে, তার চেয়ে বেশি বাইরের চাপে। ‘ডসিয়ার কে’ রচনা করা হয়েছে সংলাপের সমন্বয়ে। এখানে কথোপকথনে ইমরে কারতেশের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন আরেকজন কথক। তাকে মাঝে মাঝে লেখকেরই আরেক সত্তা বলে মনে হয়, আবার মনে হয় তিনি পাঠকের প্রতিনিধি। তাদের আলোচনায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে উঠে আসে কারতেশের ওপরে প্রভাববিস্তারী লেখকদের নাম : কাফকা, মান প্রমুখ।

শুরুতে দার্শনিক আলোচনার প্রারম্ভেই উল্লেখ করা হয় ফিকশন এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্কের কথা। চৌদ্দ বছর বয়সে কারতেশ বিতাড়ন এবং আউসভিৎসের অভিজ্ঞতালাভ করেন। আউসভিৎস থেকে বুছেনওয়াল্ড। এখানে প্রশ্ন করা হয় তাঁর উপন্যাস ‘ফেইটলেসনেস’ থেকে জীবনের এই অংশটা বাদ পড়েছে কেন। উত্তরে কারতেশ বলেন, উপন্যাস তো ফিকশনের প্রায়োজনীয়তার ওপরে তৈরি। বাস্তবের ওপরে নয়। এর প্রেক্ষিতে কথক আবার প্রশ্ন তোলেন, কারতেশ নিজেই তো অন্যখানে বলেছেন, ফেইটলেসনেস’ দালিলিক বিষয়ের ওপরে তৈরি। ‘ডসিয়ার কে’-র শেষের দিকে হলোকস্ট পার হয়ে আসা জীবিত ব্যক্তির সামনে সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তাঁর মন্তব্য তুলে ধরেছেন কারতেশ : ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার মতো না হলেও এমন কিছু কঠিন কারণ আছে যেগুলোর জন্য আউসভিৎস থেকে বেঁচে আসা ব্যক্তির পক্ষে নিজের পরিচয় বয়ে চলা বেশ কঠিন এবং বেদনাদায়কও বটে। অন্যেরা সঙ্গতভাবেই আশা করে নেয় আপনি যেহেতু বেঁচে এসেছেন তাহলে আউসভিৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেয়া আপনার একটা কাজ। আপনাকে এখানে একজন অস্বাভাবিক ব্যক্তি হিসেবে দেখা হবে। যে কোনো রকমের বার্ষিকীতে আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে, আপনার অস্থির চঞ্চল মুখের ছবি ভিডিও করে রাখা হবে, আপনার ভাঙা ভাঙা কণ্ঠকে আপনার খেয়ালের আড়ালেই কোনো ফিকশনের আবেগী চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম করে ফেলা হয়েছে।

লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, আউসভিৎসের অভিজ্ঞতালাভ করার জন্য নিজেকে ভাগ্যবানও মনে করেন- এমন মন্তব্যও করেছেন ইমরে কারতেশ। এ প্রসঙ্গে তাঁর ব্যাখ্য হলো ওই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্যেও সুখের মুহূর্তের দেখা পেয়েছেন তিনি : কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের হাসপাতালে শুয়ে থাকার অভিজ্ঞতাটা তাঁর কাছে তেমনই সৌভাগ্যের। অবর্ণনীয় শ্রম থেকে হঠাৎ দুচার মিনিটের জন্য বিশ্রাম পাওয়াও কম ভাগ্যের কথা নয়। তাছাড়া মৃত্যুর খুব কাছে থাকাটা, মানে বেঁচে থাকাটা, অবশ্যই অতি মাত্রায় অসহনীয় রকমের সুখের ব্যাপার। সেরকম অবস্থা থেকে বেঁচে ফিরে আসা হচ্ছে সবচেয়ে বড় রকমের স্বাধীনতা লাভ করা। তাঁর দৃষ্টিতে হলোকস্ট ইউরোপের ইতিহাসে এক নতুন সংযোজন। এই সংযোজনের নাম সমগ্রতাবাদের স্বৈরাচার। এই পরিস্থিতিতে পুরোপুরি নতুন ধরনের মানবের সৃষ্টি হয়েছে ইউরোপে। সেখানে দুধরনের মানুষ ছিল : পরিস্থিতির শিকার এবং পরিস্থিতির হর্তাকর্তা। হয় মারতে হবে, নয়তো মরতে হবে। টিকে থাকার জন্য অনেকেই মনের বিরুদ্ধে হলেও শক্তিশালীদের সহযোগী হয়ে কাজ করেছে। তবে ইমরে কারতেশ বলেন, ১৯৮৯ সালের পরে পরিস্থিতি এমন হয়েছে, কেউই স্বীকার করেনি সে সহযোগী হয়ে কাজ করেছে। এক মিথ্যেকে ঢাকতে আরেক মিথ্যের আশ্রয়। এরকম সমস্যা নিয়েই চলতে হচ্ছে পূর্ব ইউরোপকে।

এবছর ২০১৪ সালে সাহিত্যে পুরস্কার পেলেন ফরাসি লেখক প্যাট্রিক মোদিয়ানো। তাঁর ব্যক্তি জীবনে এবং লেখনীতে হলোকস্টের প্রভাব এবং উপস্থিতি খুব সহজেই চোখে পড়ার মতো। হলোকস্টের অভিজ্ঞতা আর সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে পিছু ফিরে দেখা সাধারণ চিত্রের কথা দেখতে পাওয়া যায় মোদিয়ানোর লেখায়।

তাঁর তিনটি উপন্যাসের নির্বাচিত অংশ পাঠ করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

(১) ১৯৯০ সালে গালিমার্ড থেকে প্রকাশ করা হয় মোদিয়ানোর উপন্যাস ‘হানিমুন’। ১৯৯৫ সালে বারবারা রাইটের ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশ করা হয়। এ উপন্যাসে দেখা যায় একজন ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাতা তার স্ত্রী এবং পেশা ছেড়ে প্যারিসের বাইরে সময় কাটায়। তাকে তাড়া করে ফিরছে বিশ বছর আগে দেখা এক শরণার্থী দম্পতির স্মৃতি।

‘হানিমুন’: জুয়ান-লেস-পিনসে মানুষজন তাদের আচরণে বুঝিয়ে দিতে চাইত যুদ্ধের যেন কোনো অস্তিত্বই নেই। পুরুষরা পরিধান করত বিচ ট্রাউজার্স আর নারীরা হালকা রঙের পেরিউস। তাদের সবারই বয়স ইনগ্রিদ এবং রিগদের চেয়ে প্রায় বিশ বছর বেশি। তবে এ বিষয়টি খুব একটা নজরে আসার মতো ছিল না। তাদের রোদে পোড়া তামাটে ত্বক আর অ্যাথলেটিকদের মতো চালচলনের কারণে বয়স অল্প বলেই মনে হতো; তারা সবাই কৃত্রিমভাবে হলেও চিন্তাহীন চেহারার ভাব ধারণ করে থাকত।

গ্রীষ্মের শেষে ঘটনাপ্রবাহ কোনো দিকে গড়ায় সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। খাবারের আগে মদপানের সময়ে তারা একে অন্যের সঙ্গে ঠিকানা বিনিময় করেছিল। এবার শীতের সময়ে কি তারা মেগিভেতে থাকার জায়গা পাবে? কারো কারো কাছে বেশি পছন্দের ছিল ভালো-দে ইসিরে এবং তারা ইতোমধ্যে কোল দে ইসেরানে থাকার জায়গা ঠিক করে রাখার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। অন্যদের অবশ্য কোট দে আজুর ত্যাগ করার ইচ্ছে ছিল না। আবার এটাও সম্ভব ছিল, তারা সেইন্ট ট্রোপেজে পুনরায় আলটিটিউড ৪৩ চালু করতে যাচ্ছিল। কারণ প্লেজ দে লা বিলাবেইসের ওপরের দিকে পাইন গাছের ভেতর স্থাপিত সাদা হোটেলটি দেখতে বিমানের মতো। তারা ওখানে নিরাপদেই থাকতে পারবে।

তাদের রোদে পেড়া তামাটে মুখের ওপরে ক্ষণে ক্ষণেই নিদারুণ যন্ত্রণার ছাপ দেখা যেত : হয়তো তারা চিন্তা করছে যুদ্ধের থাবা যে জায়গাগুলো দখল করে নেয়নি তেমন কোনো জায়গার খোঁজে তাদের সব সময় এমন করে চলমান অবস্থায় থাকতে হবে। তাদের চিন্তার মধ্যে আরো ছিল- এ মরুদ্যানগুলো ক্রমশ কমে আসছে। কোটেতে রেশনের ব্যবস্থাও শুরু হতে যাচ্ছিল। মনোবল খাটো করে দিতে পারে এমন কোনো ভাবনা যেন কাউকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। এরকম অলস দিনগুলো তাদের মনে মাঝে মধ্যে গৃহবন্দি থাকার অনুভূতি জাগাত। তাদের মাথার ভেতর ফাঁকা জায়গা বের করতে হতো নিজেদেরই। সূর্যের তাপ আর বাতাসে দোল খাওয়া তালগাছের দুলুনিতে যেন নিজের ওপরে অনুভূতিহীনতা চলে আসে : তাহলে এবার চোখ বন্ধ হোক।

এই যে লোকগুলো যারা যুদ্ধ ভুলে যাচ্ছিল তাদের মতোই জীবনযাপন ছিল ইনগ্রিদ এবং রিগদের। তবে তারা ওদের থেকে দূরে নিজেদের মতো থাকার চেষ্টা করত এবং ওদের সঙ্গে কথাবার্তা এড়িয়ে চলত। প্রথম দিকে তাদের অল্প বয়সের কারণে সবাই বিস্মত হয়েছিল। তারা কি তাদের বাবা মাদের জন্য অপেক্ষা করছিল? তারা কি ছুটি কাটাতে এসেছে? রিগদ ওদের কৌত‚হলের উত্তরে সাদামাটাভাবে বলত, সে এবং ইনগ্রিদ মধুচন্দ্রিমায় এসেছে। প্রভেনসালের মেহমানরা তার এ উত্তরে বিস্মিত হতো না, বরং তাদের কৌত‚হল নিবৃত্ত হতো এ উত্তরে। অল্পবয়সীরা যদি মধুচন্দ্রিমায় এসে থাকে তাহলে বুঝতে হবে পরিস্থিতি অতোটা ট্র্যাজিক নয় এবং জগৎ সংসার ভালোই চলছে।

(২) মোদিয়ানোর আরেক উপন্যাস ‘মিসিং পারসন’। এটি প্রথম প্রকাশ করা হয় ১৯৭৮ সালে। ডানিয়েল ওয়েসবোর্টের ইংরেজি অনুবাদে এটি প্রকাশ করা হয় ১৯৮০ সালে। এখানকার কাহিনী গড়ে উঠেছে গাই রোলাঁ নামের চরিত্রকে ঘিরে। প্যারিস দখলের পরবর্তী সময়ে নিজের নিষ্পেশিত অতীত এবং আত্মপরিচয় খুঁজে ফেরে সে।

‘মিসিং পারসন’ : আমি কিছুই না, কেউ না। শুধু একটা ফ্যাকাশে অবয়ব। ক্যাফেটেরিয়ার চত্বরের পাশে পড়ে থাকা সন্ধ্যার ছায়ার মতো। বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় আছি এখানে। হুত্তে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সময়ই বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

কয়েক ঘণ্টা আগে শেষবারের মতো আবার আমাদের দেখা হয়েছিল এজেন্সির প্রাঙ্গণে। হুত্তে আগের মতোই তার বিরাট ডেস্কে বসেছিল; তবে গায়ে কোট ছিল বলে তার চেহারায় সত্যিই বিদায়ের একটা ছাপ লেগেছিল। ক্লায়েন্টদের জন্য রাখা আমাদের চামড়ার চেয়ারে আমি বসেছিলাম, ঠিক ওর মুখোমুখি। বর্ণিল বাতি থেকে ঠিকরে পড়া ঝাঁঝালো আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল।

হুত্তে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তাহলে হয়ে গেল, কী বলো?

ডেস্কের ওপরে কার যেন একটা নাম পরিচয়হীন ফাইল পড়ে আছে। এটা মনে হয় কালো বেঁটে লোকটার, লোকটার ফোলাফোলা সারা মুখে ভীতির চিহ্ন লেগে আছে; সে আমাদেরকে তার স্ত্রীকে অনুসরণ করার জন্য ভাড়া করেছে। বিকেলবেলা এভিনিউ পল-ডুমারের পাশে রিউ ভিতালের একটা আবাসিক হোটেলে মহিলা আরেকজন কালো বেঁটে ফোলা মুখের লোকের সঙ্গে দেখা করেছে।

চিন্তার ভেতর ডুবে থেকে হুত্তে ওর ছোট করে ছাটা ভালুকের পশমের মতো দাড়িতে আঙ্গুল বোলাতে থাকে। হুত্তের দাড়ি অবশ্য ওর থুঁতনির সবখানি জুড়ে আছে। ওর বড় বড় স্বচ্ছ চোখজোড়া যেন স্বপ্নের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। ডেস্কের বাম পাশে একটা পাতলা কাঠের চেয়ার; কাজের সময় আমি ওই চেয়ারটাতে বসতাম। হুত্তের পেছনে কাঠের কালো তাকগুলো দেয়ালের অর্ধেকটা জুড়ে আছে। তাকগুলোতে প্রায় বিগত পঞ্চাশ বছরের পঞ্জিকা আর রাস্তাঘাট এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের নির্দেশিকা রাখা হয়েছে সারি সারি বোঝাই করে। হুত্তে আমাকে মাঝে মধ্যে বলেছে ব্যবসায়ের জন্য এগুলো খুব অপরিহার্য এবং সে এগুলো হাতছাড়া করতে চায় না। তার মতে, এই নির্দেশিকা এবং পঞ্জিকাগুলো নাকি মূলবান চলমান লাইব্রেরি বলে কল্পনা করা যায়। কারণ এগুলোর পাতায় পাতায় তালিকাবদ্ধ আছে মানুষ, প্রয়োজনীয় জিনিস আর হারানো জগতের নামধাম। সেসবের একমাত্র সাক্ষীই হলো এই নির্দেশিকা এবং পঞ্জিকাগুলো।

(৩) প্যাটিক মোদিয়ানোর আরেকটি উপন্যাস হলো ‘ক্যাথারিন সার্টিটিউড’। ফরাসিতে প্রকাশ করেন ১৯৮৮ সালে এবং উইলিয়াম রডারমোরের অনুবাদে ইংরেজি প্রকাশ করা হয় ২০০১ সালে। এখানে একজন মায়ের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষ করে প্যারিসে কাটানো তার শৈশব কৈশোরের কথা।

‘ক্যাথারিন সার্টিটিউড’ : এখানে নিউ ইয়র্কে এখন তুষার পড়ছে। আমার ৫৯তম স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। আমি একটা নাচের স্কুল চালাই- রাস্তার ওপারে স্কুলটার বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। বড় বড় জানালার ওপাশে লিয়াটার্ড পরিহিত ছাত্রীরা জুতোর ডগায় ভর দিয়ে ব্যালে নাচের মতো করে পা ঘুরানোর কসরত থামিয়ে দিয়েছে। আমার মেয়ে আমার সহকারী হিসেবে কাজ করে। সে এখন ওদের পদক্ষেপের পরিবর্তন হিসেবে ওদেরকে জ্যাজের পদক্ষেপ দেখিয়ে দিচ্ছে।

কয়েক মিনিটের মধ্যে আমিও ওদের সঙ্গে যোগ দিব।

ছাত্রীদের মধ্যে একটা ছোট মেয়ে আছে; সে চশমা পরে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে মেয়েটা চশমা খুলে একটা চেয়ারের ওপরে রেখে দেয়। ওর মতো বয়সে আমি যখন ম্যাডাম দিসমোইলোভার ক্লাস করতাম আমিও এই কাজটিই করতাম। নাচের সময় চশমা পরা হয় না। মনে পড়ছে ম্যাডাম দিসমোইলোভার কাছে নাচ শেখার সময় দিনের বেলায় নাচের অনুশীলনে আমি চশমা খুলে রাখতাম। তখন মানুষজনসহ চারপাশের সবকিছুর অবয়বের তীক্ষèতা আমার চোখে পড়ত না। সবকিছু আবছা আবছা দেখতাম। এমনকি চারপাশের শব্দও মনে হতো কোনো কিছুর নিচে চাপা পড়ে আছে। চশমা চোখে না থাকলে চারপাশের জগতের কোনো কিছুর রুক্ষতা চোখে পড়ত না। মনে হতো সবকিছু ঘুমানোর আগে আমার কপোল রাখার বালিশের মতো কী কোমল মসৃণ হয়ে গেছে।

আমার বাবা জিজ্ঞেস করতেন, কিসের দিবাস্বপ্ন দেখছ, ক্যাথারিন? তোমার চশমা পরা উচিত।

বাবার কথামতো চশমা পরলেই দেখতে পেতাম সবকিছুর চেহারায় প্রাত্যহিক তীক্ষèতা আর সূ²তা ফিরে এসেছে। চশমা পরলে জগতের আসল চেহারা দেখতে পেতাম। আমি আর স্বপ্ন দেখতে পারতাম না।

ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করার মতো উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে প্যাট্রিক মোদিয়ানোর উপন্যাসও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে প্রধানত পাঠক হৃদয়ে সেগুলোর দাগ কেটে যাওয়ার মতো মনোস্তত্তি¡ক গুণের কারণে। মোদিয়ানো তাঁর উপন্যাসের জমিনে যে সময়টাকে হাজির করেন সেটা বর্তমান আর অতীতের সংমিশ্রণে তৈরি। তিনি বারবার অতীতে ফিরে যান। তিনি সোজাসাপ্টাভাবে অতীতের গল্প বলেন না; তাঁর প্রধান চরিত্র/কথককে থেকে থেকে কিংবা বারবার অতীতে নিয়ে যান। তারা উপাখ্যানমূলক স্মৃতিতে ভর করে বারবার সবিরামে অতীতে চলে যায়। উপন্যাসের টেক্সেটে তারা টানা প্রবাহে ভেসে যায় না। ‘ভয়েজ দে নোসেস’ এবং ‘ডোরা ব্রুডার’-এ এমনটিই দেখা যায়। কথক উপন্যাসের স্রোতে পুরোপুরি ডুবে না গিয়ে পাঠকের কাছাকাছি থাকে এবং তার অবস্থানটা কিছুটা মধ্যবর্তী কোনো ব্যক্তির মতো।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj