অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : মানবপ্রেম-আমাদের পাথেয়

শুক্রবার, ৭ এপ্রিল ২০১৭

** রে জা উ দ্দি ন স্টা লি ন **

১৯৮৯ সালের এক দুপুরে আমি কানের ব্যথায় আক্রান্ত হই। হঠাৎ এ ধরনের ব্যথার কারণ বোধগম্য হচ্ছিল না। নাক কান গলার ডা. কয়েকজনের কাছে গেলাম। কিন্তু তেমন ফল লাভ না হওয়ায় এক বন্ধুর পরামর্শে ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের শরণাপন্ন হলাম। টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করার সুবাদে তিনি আমাকে অল্প-বিস্তর চিনলেন। একহারা গড়নের একজন মানুষ। মৃদুভাষী। চোখ দুটো তীক্ষè এবং উজ্জ্বল। তিনি আমাকে যতœ সহকারে দেখলেন এবং কানের নানাবিধ পরীক্ষা করলেন। আমার শ্রবণেন্দ্রীয়ের শক্তিসহ গলদেশ ও নাসিকার নিরীক্ষাও চলল। ওষুধ দিলেন। আমি পনেরো দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলাম। এই যে ভালো হলাম এবং ডা. প্রাণ গোপালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম তা আজ অবধি অটল। তখন থেকেই তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা। প্রায় ৩৫ বছর। মাঝে মাঝে কথা হয়, নানা শারীরিক সমস্যায় তার শরণ ও পরামর্শ পাই। তিনি এখন দেশের অন্যতম প্রধান ইএনটি চিকিৎসক। তার অর্জন বিপুল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তিনি যে দক্ষতা দেখিয়েছেন তা সত্যিই আনন্দের। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে শাহবাগ যাওয়ার সময় হঠাৎ চোখ পড়ল হাসপাতালটির দিকে। বিস্ময়করভাবে বদলে গেছে। নান্দনিক ও একাডেমিক একটা আবহ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। ফোন দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। বললাম স্যার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আপনার কল্যাণে বদলে গেছে, এত নান্দনিক হয়েছে যে আপনাকে ফোন না করে পারলাম না। তিনি বললেন যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। এখনো কাজ করছি। আমি বললাম সৎকর্মের ফল মানুষ একা ভোগ করে না তা সবার কাজে লাগে। এভাবেই মাঝে মাঝে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি নানা রকম নিবন্ধ রচনা করেন প্রকাশিত হলে আমি তার লেখা অভিনিবেশের সঙ্গে পাঠ করি এবং আনন্দিত হই। তাকে মাঝে মাঝে ফোন করি এবং আনন্দ প্রকাশ করি। তাকে মাঝে মাঝে ফোনে ধন্যবাদ জানাই। অনেকেই চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের বাইরে যান কিন্তু আমি কখনো ভাবিনি নাক কান গলার সমস্যার জন্য আমাকে দেশের বাইরে যেতে হবে। বরং যে কোনো সমস্যায় প্রফেসর ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের কাছে যাই। তার ব্যবস্থাপত্র আমাকে বারবার আরোগ্য দিয়েছে। আমার কন্যা তানজিলা রেজার অগাধ বিশ্বাস তাঁর প্রতি। তিনি দেশের বাইরে থাকলে আমরা তাকে দেখানোর জন্য অপেক্ষা করি।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হয়ে এসেছে অনেক আগেই। অনেক অর্জন আমাদের। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও অগ্রগামিতা কম নয়। যে ক’জন মানুষ চিকিৎসার ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করেছেন এবং আধুনিকতা দিয়েছেন তিনি তাদের একজন। তেজগাঁওয়ে নাক কান গলার চিকিৎসায় যে ফাউন্ডেশন তৈরি করেছেন সেটিও নান্দনিক এবং লোকবান্ধব। ‘রোগী’ গেলে সেবা ও আরোগ্য লাভের যথেষ্ট সুযোগ সেখানে আছে। রোগ নির্ণয়ের অপূর্ব কৌশল তার করায়ত্ত। অযথা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে রোগীদের হয়রানি বন্ধে তার পদক্ষেপ পছন্দ করি। এ দেশে যাদের কাশি-সর্দি হলে সিঙ্গাপুরে উড়ে যান, যারা বাইরের দেশ ছাড়া চিকিৎসকদের প্রতি বিশ্বাসই রাখেন না তাদের জন্য বলব প্রফেসর প্রাণ গোপাল দত্ত, প্রফেসর এ বি এম আব্দুল্লাহ, ডা. বরেন চক্রবর্তী, প্রফেসর এম এ সালাম, আলট্রাসনোলজিস্ট হায়দার আলী খান- এদের রোগনির্ণয় ক্ষমতা বিশ্বমানের। যদি নার্সিং এবং রোগীদের প্রতি একটু যতœশীলতা বাড়ত তাহলে আমরা চিকিৎসা ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য পেতাম। হৃদরোগ চিকিৎসায় ডা. প্রফেসর এম এ রশীদ কত যে আন্তরিক এবং মানবিক সেটি তার সংস্পর্শে বারডেম কার্ডিয়াকে গেলে বোঝা যায়।

বাংলাদেশের ডাক্তারদের সম্পর্কে ব্যাপক অভিযোগ। এমনকি এক পরীক্ষাপত্রে লোভী ডাক্তার হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু আমি অধিকাংশ চিকিৎসককে দেখেছি রোগীদের প্রতি সদয় থাকতে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, একটু বেশি সময় নিয়ে রোগীর সমস্যা জেনে প্রতিবিধান দেয়ার রেওয়াজ অনেকের মধ্যে নেই। অন্যদিকে অসংখ্য রোগীর চাপ। সারাদেশ থেকেই রোগী আসছে। দূর-দূরান্তের রোগীরা কত ভোগান্তির শিকার তা’ চিকিৎসকরাও অবহিত। ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের কাছে অসংখ্য রোগীর আনাগোনা। সবার মন রক্ষা করা কি যে কঠিন কাজ তা সহজেই বুঝি। একজন চিকিৎসক কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেন তা জানার আগ্রহ থেকেই পাঠ করলাম প্রফেসর ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের ‘আমার যত কথা বইটি’। অন্বেষা প্রকাশনীর এই বইটি ডা. প্রাণ গোপালের বিশেষ করে লেখক প্রাণ গোপালের সার্থক জীবনের নানা বিষয় জানতে সহায়ক। কৈশোরে জ্যোতিষীর কুষ্ঠির ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত করে প্রাণ গোপাল দত্ত শিক্ষা যশ খ্যাতি ও প্রতিপত্তি সবই পেয়েছেন। একজন দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবেও তিনি সবার আদরণীয়। তার আত্মকথা পড়ে এটুকুই বোঝা যায়, বুদ্ধের ‘কর্মই ফল’ এই কথাটি তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছেন। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব ও তাদের সেবার যে দৃষ্টান্ত তিনি দেখিয়েছেন তা প্রশংসার্হ। কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি সচেতন। তার দুঃখী মায়ের নিরামিষ জীবনের দুঃখ ঘুচিয়ে দিয়ে এক সনাতন প্রথার বিরুদ্ধে জিজ্ঞাসা রেখেছেন- বিধবা নারী-মাছ মাংস সব ছুঁতে পারবেন। কাটতে ধুতে ও রান্না করতে পারবেন কিন্তু খেতে পারবেন না- এ কেমন বিধান? তার মা আজীবন স্বামীর সংসারে থেকে আমিষাদি আহার করতে পেরেছিলেন দ্রোহী প্রাণ গোপাল দত্তের জন্য। তিনি তাঁর মায়ের পাথরের আংটি মমতাভারে বহন করেন মাতৃস্মৃতির প্রতি ভালোবাসা জানাতে। পিতার প্রতিও তার অগাধ শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে নানা কর্মকাণ্ডে। ছাত্রাবস্থায় তিনি তার জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার সংশ্লিষ্টতা সর্বজনবিদিত। নোবেল বিজয়ী স্যার চন্দ্র শেখর রমণের উক্তি, তিনি মর্মে রাখে- ‘ঞযবৎব রং ড়হষু ড়হব ংড়ষঁঃরড়হ ভড়ৎ ওহফরধহং ঊপড়হড়সরপ চৎড়নষবসং ধহফ ঃযধঃ রং ঝপরবহপব ধহফ সড়ৎব ঝপরবহপব ধহফ ংঃরষষ সড়ৎব ঝপরবহপব.’ বিজ্ঞানের মধ্যেই জাতির মুক্তি। বিজ্ঞানমনস্ক না হলে কোনো জাতির অগ্রগতি হয় না। বর্তমান সময়কালে ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত তার কাজের পরিধির মধ্যে সুশৃঙ্খলতা আনয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য কর্মস্থলে তিনি যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি তার অবিচল আস্থা দেখে প্রীত হই। তিনি তার গ্রন্থের এক লেখায় জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলামের প্রসঙ্গ এনেছেন। আমি ডা. নূরুল ইসলামের স্নেহভাজন ছিলাম। তিনি ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে আমাকে যুক্ত রেখেছিলেন, মাঝে মাঝে শরীর খারাপ হলে বলতাম স্যার অসুস্থ হয়েছি। তিনি বলতেন হাঁটবেন আর সবজি ও মটরশুঁটি খাবেন। এই মানুষটিও অসাধারণ মানবদরদি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব তার কাছে বড় ছিল। ডা. প্রাণ গোপাল এসব মানুষের সাহচর্য পেয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধা করেছেন। মাতৃজাতির জন্য তিনি নানা পরামর্শ দিয়েছেন। এই গ্রন্থে মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন যা প্রতিটি প্রসূতি মায়ের অবশ্য প্রতিপালনীয়। ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত জওহরলাল নেহেরুর উক্তি উদ্ধৃতি করেছেন- ‘জগতে দু’ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক কাজ করে। অন্য ধরনের লোক কাজ না করে প্রশংসা চায়’। লেনিন যেমন বলেন- তোমার কর্মই তোমাকে সুনির্দিষ্ট আসনে পৌঁছে দেবে। বঙ্গবন্ধুর বাণীও তাই- ‘মহৎ কাজের জন্য মহান ত্যাগের প্রয়োজন’। এই মনীষীদের উক্তি প্রাণ গোপাল দত্ত যথার্থভাবে নিজের জীবনে পালন করতে পেরেছেন। অযথা সময় বিনষ্ট না করে প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোর যে শক্তি তা আমাকে অভিভূত করেছে। এই গ্রন্থের একটি লেখা ‘ছয় হাজার একশ একান্ন ডাক্তার’ ‘কাঠগড়ায় আমি’- এটি তার বেদনাবোধ একই স্বার্থে শ্রমের সার্থকতার কথা আছে। লক্ষ্য স্থির থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতা যে থাকে না এই লেখার মধ্যে তার প্রকাশ দেখি। তিনি মনে করেন, প্রত্যেক ডাক্তারকে বছরে অন্তত একবার এবহবাধ ফবপষধৎধঃরড়হ পড়তে দেয়া উচিত। ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত পরিবেশ বিরূপতার প্রতি বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। রোগব্যাধির একটা বড় উৎস অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ঢাকার জনবহুলতা। এলার্জি থেকে শুরু করে ক্যান্সারের মতো মারণ ব্যাধির অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র এই পরিবেশ দূষিত ঢাকা মহানগরী। জনসচেতনতার মাধ্যমে দূর করাতে হবে এই বিপর্যয়। তৈরি করতে হবে সচেতনতা ও মূল্যবোধ। জাতি গঠনে একজন নেতা যেমন দরকার তেমনি দরকার পেশাজীবীদের দেশপ্রেম- যে কথাটি ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত নিষ্ঠার সাথে উল্লেখ করেছেন।

পরিশেষে দেশের বরেণ্য চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের নিবন্ধ সংকলন পাঠ করে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রবর্ধিত হলো। মানবজীবন যে মূল্যবান, জীবন যে শুধু দুঃখময় নয় তার মধ্যে আনন্দের সপ্রকাশও যে আছে তা’ প্রাণ গোপালকে জানলে বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ যে বলেছেন- জীবন আনন্দময়- তারও একটা যুক্তি আছে; জগতের এই আনন্দযজ্ঞে আমাদের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হবে সৎকর্মের মাধ্যমে। মানুষ হচ্ছে দেবতুল্য, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সেবার মানসিকতা জনসাধারণ্যে বিকশিত হোক- প্রফেসর ডা. প্রাণ গোপালের এই প্রার্থনা আমাদের চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে; বিশ্বাস করি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj