শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে : সালাহউদ্দীন আহমদ

বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, যার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে, এটি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এটি ছিল এই বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের স্বাধিকার আন্দোলন, আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অমোঘ পরিণতি। পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে যতটা আবেগ ছিল ততটা যুক্তি ছিল না। ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা ভারতের যে কোনো অঞ্চলে বাস করুক না কেন, যেহেতু তারা এক স্বতন্ত্র ধর্ম ইসলামের অনুসারী, সুতরাং তারা এক স্বতন্ত্র এবং অভিন্ন জাতি, এক স্বতন্ত্র অভিন্ন মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক; অতএব এক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমেই তাদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ হওয়া, তাদের সার্বিক উন্নতি সাধন হওয়া সম্ভব। এই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের মূল কথা। কিন্তু এটা ছিল নেহাত আবেগের কথা; এর পেছনে যুক্তি ও বাস্তবতা ছিল অনুপস্থিত। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা এক সমসত্ব বা homogeneous সম্প্রদায় বা জাতি হিসেবে কখনো গড়ে ওঠেনি। আবহমানকাল থেকে তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় অমুসলমান জনসাধারণের সঙ্গে মিশে গিয়ে বাস করে এসেছে। বস্তুত ভারতের মুসলমানরা অধিকাংশই এদেশীয় প্রাচীন অধিবাসীদের বংশোদ্ভূত, দেশজ হিন্দু বৌদ্ধ জনসাধারণের ধর্মান্তরের ফলে উদ্ভূত। ভাষা ও সংস্কৃতি, আচার ব্যবহার ও জীবনযাত্রার দিক দিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের সঙ্গে ভারতীয় অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের খুব কমই পার্থক্য দেখা যায়। বস্তুত ভারতের মুসলমানরা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে উঠেছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে প্রাচীনকাল থেকে যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ দলে দলে এই উপমহাদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছে এবং কালক্রমে এদেশের জনগণের সঙ্গে মিশে গেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় :

“কেহ নাহি জানে কার আহবানে কত মানুষের ধারা

দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে সমুদ্রে হল হারা।

হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়-চীন-

শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।”

এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুসলিম কবি মুহাম্মদ ইকবাল তাঁর ‘তারানা-ই-হিন্দ’ কবিতায় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সুন্দরভাবে ঘোষণা করেছিলেন :

সারে জাহা সে আচ্ছা হিন্দুস্থান হাঁমারা

হিন্দী হাঁয় হাম্ ওয়াতন্ হ্যায় হিন্দুস্থান হাঁমারা।

এমনকি স্যার সৈয়দ আহমদ খান যাঁকে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের জনক বলা হয়ে থাকে তিনি ১৮৮৪ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন :

In the word `nation’ I include both Hindus and Mohammedans… with me it is not so much worth considering that their religions faiths differ, but that we inhabit the same land are subject to the rute of the same government. These are the grounds upon which I call both the races which inhabit India by the word `Hindu’ by which I mean that they are all the inhabitants of India.

যদিও অলীক ধারণা বা legend-কে ইতিহাস বলা যায় না, কোনো কারণে যদি কোনো অলীক ধারণা কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর মনের মধ্যে বদ্ধমূল হয় তাহলে সেটা ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে। পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনেও একটি অলীক ধারণা কাজ করেছিল। উনিশ শতকের শেষের দিক থেকেই ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকের মধ্যে নানাবিধ কারণে এই ধারণা শেকড় গাঁথতে থাকে যে ভারতের মুসলমানরা উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও তারা এক স্বতন্ত্র ও অভিন্ন জাতি বা nation এই মনোভাব থেকে দাবি উঠল স্বতন্ত্র স্বার্থ রক্ষা করার দাবি, স্বতন্ত্র নির্বাচনের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র আবাসভ‚মির বা রাষ্ট্র গঠনের অর্থাৎ পাকিস্তা প্রতিষ্ঠার দাবি।

যেসব কারণে ভারতের মুসলমানদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব ও স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগ্রত হয়েছিল সেগুলোকে এইভাবে চিহ্নিত করা যায় :

ক. উনিশ শতকে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করার ফলে মুসলমানরা অনগ্রসর সম্প্রদায় হিসেবে গণ্য হতে থাকে। পাশ্চাত্য তথা আধুনিক সভ্যতার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, অতীতমুখী মনোভাব, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করার ফলে মুসলমান সম্প্রদায়ের সার্বিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার ফলে মুসলমানদের মধ্যে হীনমন্যতার মনোভাব জাগ্রত হয়।

খ. অন্যদিকে হিন্দুরা যারা মুসলিম আমলেও ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মে সক্রিয় ছিল তারা ইংরেজ আমলের গোড়া থেকেই ইংরেজ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করে নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে সক্ষম হলো। তারা ইংরেজি শিক্ষা উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করল এবং এর ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজেদের অভ‚তপূর্ব উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হলো।

গ. উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের ‘সিপাহি বিদ্রোহের’ পরবর্তীকালে মুসলমানদের মধ্যেও নবজাগরণের সূচনা হলো। তারা নেহাত জাগতিক কারণে ইংরেজি শিক্ষা এবং আধুনিক জ্ঞান অর্জনে উৎসাহ দেখাতে শুরু করল এবং অচিরেই এক নতুন শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটল। এই শ্রেণির সঙ্গে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির তীব্র বিরোধ দেখা দিল। এই বিরোধের মূলে ছিল প্রধানত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিদ্ব›িদ্বতা। এ সময় শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে মুসলমানদের প্রতি উন্নাসিক মনোভাব পোষণ করার এবং তাদের তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া হিন্দুত্বের পুনরুত্থান আন্দোলনের প্রভাবে হিন্দু সমাজে মুসলিমবিরোধী সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব হয়। তেমনি মুসলমান সমাজে বিশেষ করে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও হিন্দুবিরোধী সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয়। বস্তুত উনিশ শতকের শেষের দিকেই ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিরোধ তীব্র আকারে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও ১৮৮৫ সালে স্থাপিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মূল আদর্শ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং বেশ কিছু সংখ্যক মুসলমান কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন, এটা অনস্বীকার্য যে কংগ্রেসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু নেতা ছিলেন- যারা ছিলেন সাম্প্রদায়িকভাবাপন্ন; তারা জাতীয়তাবাদকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সমার্থে ব্যবহার করতেন। এর প্রতিক্রিয়া মুসলমান সমাজে দেখা দিয়েছে তীব্রভাবে।

ঘ. ক্রমবর্ধমান হিন্দু মুসলিম বৈরিতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের অনুক‚লে ছিল। ইংরেজ সরকার সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রক্ষণশীল মুসলিম নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করল এবং এর ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ জোরদার হয়ে উঠল। এই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৬ সালে মুসলমানদের পক্ষ থেকে মহামান্য আগা খানের নেতৃত্বে একদল অভিজাত শ্রেণির মুসলমান নেতা বড়লাট লর্ড মিন্টোর কাছে একটা আবেদনের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন দাবি করেন। বড়লাট এই দাবি সহানুভ‚তির সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে প্রতিশ্রæতি দেন এবং ১৯০৯ সালে ভারতীয় সংবিধান আইনে মুসলমানদের এই দাবি মেনে নেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, ১৯০৬ সালেই মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৬ সালের স্বতন্ত্র নির্বাচনের দাবির সঙ্গে ১৯৪০ সালের পাকিস্তান দাবি অর্থাৎ ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভ‚মির দাবির মধ্যে একটা অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র ছিল বলা যায়।

সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে এই উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদ দুটি পরস্পরবিরোধী ধারায় বিভক্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রথমটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ, যার প্রতিভ‚ ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। যদিও কংগ্রেসের সদস্য ছিল অধিকাংশ হিন্দু, তা সত্তে¡ও কংগ্রসে সব সময় কিছু সংখ্যক মুসলমান সদস্য ছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ যেমন বদরুদ্দীন তৈয়বজী, মৌলানা মোহাম্মদ আলী, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ কংগ্রেসের সভাপতির পদ অলংকৃত করেছেন। কংগ্রেসের মুসলিম সদস্যরা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন, আধুনিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। তাঁরা মনে করতেন রাজনীতিকে ধর্মের সঙ্গে জড়ানো উচিত হবে না এবং ভারতে মুসলিম তথা যে কোনো সম্প্রদায়ের স্বার্থ কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় ধারার প্রবর্তক ছিল নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। ১৯০৬ সালে ঢাকায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয় নরওয়াব সলিমুল্লাহ প্রমুখ অভিজাত শ্রেণির কতিপয় নেতার উদ্যোগে। এটি ছিল প্রধানত রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠান এবং এটি বরাবর ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এসেছে। উল্লেখ্য যে, কংগ্রেস ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে এবং কংগ্রেসের বহু নেতা এর জন্য কারাবরণ করেছেন। অন্যদিকে মসুসলিম লীগ কখনই ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন করেনি বরং অধিকাংশ সময় ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এসেছে। তবে যারা মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই নানা কারণে বিশ্বাস করতেন যে মুসলমানদের স্বার্থ একমাত্র মুসলিম লীগের মাধ্যমেই স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তারা কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে মুসলিম লীগের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ফলে মুসলিম লীগ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে এবং ভারতের অধিকাংশ মুসলমান জনগণের সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়। বাংলার অধিকাংশ মুসলমানের মুসলিম লীগকে সমর্থন করার পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ ছিল। বাংলার অধিকাংশ জমিদার ও মহাজন ছিল হিন্দু স¤প্রদায়ভুক্ত এবং দরিদ্র কৃষক শ্রেণি, যার অধিকাংশই ছিল মুসলমানÑ তারা হিন্দু জমিদার ও মহাজনের শোষণের ফলে বিক্ষুব্ধ ছিল। তাছাড়া সামাজিক ক্ষেত্রে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মুসলমানদের প্রতি উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কিছুটা বৈরী মনোভাব হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পথে প্রধান অন্তরায় ছিল। অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ এবং বেশ কিছুসংখ্যক হিন্দু নেতা, যেমন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রমুখ সজাগ ছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের উদার ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গোটা হিন্দু সমাজকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি। এই ঐতিহাসিক পটভ‚মির পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের আবির্ভাব ঘটেছিল। বস্তুত জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান ছিল একটা অস্বাভাবিক ধর্মভিত্তিক, আধুনিকতাবিমুখ দুর্বল রাষ্ট্র। সুতরাং আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে এর সৃষ্টি ও ভাঙন আমাদের অনেকের চোখের সামনেই ঘটল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরই পাকিস্তানের অবাঙালি ক্ষমতাশীল গোষ্ঠী নানা ছল-চাতুরীর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার চেষ্টা করতে লাগল। তাদেরই প্রভাবে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত শুরু হলো। এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে বাঙালির স্বার্থের বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত সম্পর্কে বাঙালিদের বিশেষ করে বাংলার মুসলমানদের সজাগ করে তোলার ক্ষেত্রে এই বাংলাদেশেরই কয়েকজন কংগ্রেস নেতা যাঁরা আদর্শগত কারণে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন এবং পাকিস্তানকে একটি অসা¤প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেনÑ তাঁরাই অগ্রণী ভ‚মিকা নিয়েছেন। এদের মধ্যে, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬-১৯৭১)। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর পূর্ববঙ্গ থেকে অগণিত হিন্দু স্বদেশভ‚মি ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে চলে যায়। এর প্রধান কারণ পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের সাম্প্রদায়িক নীতির ফলে হিন্দুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। তাদের প্রতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। এই পরিস্থিতিতে বহু হিন্দু দেশত্যাগ করলেও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছেড়ে যাননি। অভিভক্ত বাংলার ব্যবস্থাপক সভার কংগ্রেস দলের উপনেতা ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ। দেশ বিভাগের পর যে সব কংগ্রেস নেতা পাকিস্তানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দ্বিমত দেখা দেয়।

কিছুসংখ্যক নেতা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তানে স্বতন্ত্রভাবে কংগ্রেস দলকে পুনর্গঠিত করার পক্ষে ছিলেন। তাঁদের মতে প্রচলিত স্বতন্ত্র নির্বাচনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের হিন্দুদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও কামিনী কুমার দত্ত প্রমুখ নেতা এই ধারণা পোষণ করতেন যে পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের মাধ্যমে পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না। তাঁদের মতে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় থেকে ছিন্ন হয়ে না থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিরোধ করার জন্য পাকিস্তানের সব ধর্মাবলম্বী জনগণের সঙ্গে মিলিত হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের কর্মসূচি গ্রহণ করে এক নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা আশু প্রয়োজন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উদ্যোগে ১৯৪৮ সালের ১৮ জুলাই কুমিল্লায় পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক কনভেনশন নামে একটি সম্মেলন ডাকা হয়। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে পাকিস্তান গণসমিতি বা Pakistan People’s Association নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা হবে যার দ্বার ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই দল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই ধীরেন দত্ত যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে প্রদেশব্যাপী প্রচারকার্যে লিপ্ত হন। কিন্তু এই নতুন দল উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি তার প্রধান কারণ কোনো মুসলমান এই দলে যোগ দেয়নি। বাঙালি মুসলমানরা তখনো সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ফলে পাকিস্তান গণসমিতি যেটা ১৯৫৪ সালে ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ পার্টিতে রূপান্তরিত হয়েছিল, সেটি একটি হিন্দু রাজনৈতিক দল হিসেবে থেকে যায়। ২

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছু দিনের মধ্যেই পাকিস্তান সরকারের বাঙালি বিরোধী কার্যকলাপের ফলে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের জনগণের মধ্যে বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রমহলে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এই আলোড়নের মূলে ছিল পাকিস্তান সরকার কর্তৃক উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্র ও যুবসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে দাবি উত্থাপন করে। ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে ঢাকায় এই আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ইতোমধ্যে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মনোভাব বেশ কিছুটা জাগ্রত হয়েছে এবং অনেকেই রাজনীতিকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারায় প্রবাহিত করার কথা চিন্তা করতে শুরু করেছেন।৩

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। পরিষদে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ দলের বিপক্ষে প্রধান বিরোধী দল ছিল পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস। গণপরিষদের অধিবেশনের প্রথম দিনই দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রথম প্রস্তাবটিতে দাবি জানান হয় যে, বছরে অন্তত একবার পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছিল যে উর্দু-ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার অধিকার দেয়া হোক। এই দুটি দাবি উত্থাপন করেছিলেন গণপরিষদের কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন দত্ত। উল্লেখযোগ্য যে, ধীরেন দত্ত এ প্রস্তাব দুটি করেছিলেন ব্যক্তিগতভাবে, আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে করেননি, যদিও কংগ্রেস দলের সব সদস্য এই প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ধীরেন বাবু এক চিঠিতে বদরুদ্দীন উমরকে জানিয়েছিলেন- “বাংলা ভাষা আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা হউক ইহাই ছিল আমার প্রস্তাব। ইহা আমার পার্টির প্রস্তাব ছিল বলিয়া মনে হচ্ছে না।”৪

ধীরেন বাবুর এই প্রস্তাবটি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত করা হলেও গণপরিষদে কংগ্রেস দলের সদস্য যাঁরা ছিলেন সকলেই হিন্দু, তাঁরা এটি সমর্থন করেন এবং কয়েকজন এর পক্ষে জোরালো বক্তৃতা দেন। কিন্তু অন্যদিকে গণপরিষদের বাঙালি মুসলমান সদস্যরা যারা ছিলেন মুসলিম লীগ দলের- তারা পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের সঙ্গে একযোগে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন।৫

উল্লেখ্য, ধীরেন দত্তের প্রস্তাব গণপরিষদে তুমুল উত্তেজনা ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। কেবল পাক প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান নন, গণপরিষদের বাঙালি-সহ-সভাপতি তমিজউদ্দিন খান এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী উর্দুভাষী খাজা নাজিমুদ্দিনও প্রস্তাবের বিপক্ষে বক্তৃতা দেন। নাজিমুদ্দিন তো বলে বসলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব যে একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।”৬

বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য ধীরেন দত্তের প্রস্তাব এবং তাঁর বিরুদ্ধে বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে মুসলিম লীগ সদস্যদের প্রতিক্রিয়ার খবর ঢাকায় পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলার ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়।৭

ঢাকার ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ধর্মঘট পালন করে এবং ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের গোড়ার দিকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এইভাবে শুরু হয়ে যায় ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই কালক্রমে জন্মলাভ করে এক নতুন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয় চেতনা। এই চেতনাই ছিল পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধিকার আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি ও চালিকাশক্তি। উল্লেখ্য যে, ভাষা আন্দোলনের সূচনা করলেও এর সঙ্গে ধীরেন দত্ত এবং কংগ্রেস দলের অন্য নেতারা সম্পৃক্ত হননি। এর প্রধান কারণ হলো তারা পাকিস্তান সরকারকে এ কথা বলার সুযোগ দিতে চাননি যে ভাষা আন্দোলনের পেছনে রয়েছে কতিপয় হিন্দু নেতাদের চক্রান্ত। বস্তুত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান, গজনফর আলী খান প্রমুখ মুসলিম লীগ নেতারা সব সময় এই ধরনের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন তাঁদের বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব উত্থাপন করার প্রায় এক মাস পরই অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বয়ং ঢাকায় এসে এক বিশাল জনসভায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন- “let me make it very clear to you that the state language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead you is really the enemy of Pakistan.৮

জিন্নাহর এই ঘোষণায় পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারা পূর্ব বাংলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হলো পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্রদের রক্তে। পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় ধীরেন দত্ত, বসন্ত কুমার দাশ, গোবিন্দলাল ব্যানার্জি প্রমুখ কংগ্রেস নেতা মুসলিম লীগ সরকারের দমননীতি এবং পুলিশের গুলির তীব্র নিন্দা করলেন এবং ছাত্রদের দাবির প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করলেন, কিন্তু তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে বা দলগতভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেননি। ভাষা আন্দোলনের পেছনে কংগ্রেস নেতাদের এবং কমিউনিস্টদের ও ভারতীয় অনুচরদের হাত আছে বলে মুসলিম লীগ সরকারের পক্ষ থেকে পর পর যে অভিযোগ করা হচ্ছিল সেটা খÐন করে পাকিস্তান গণপারিষদে কংগ্রেস দলের নেতা কামিনী কুমার দত্ত বলেন, The movement was nurtured by the Muslims and it was carried on by the Muslims alone unaided by any one from outside.৯

এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই কালক্রমে জন্মলাভ করল এক নতুন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয় চেতনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এই নতুন জাতীয় চেতনারই ফলশ্রæতি। পাকিস্তান গণপরিষদে ভাষা সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন সে জন্য বাঙালি জাতির কাছে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

১. উদ্ধৃতি The Muslim Chronicle, Calcutta, June 4, 1896

২. এ বিষয় সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন Muhammad Ghulam Kabir, Minority Palitics is Bangladesh, New Delhi, Vikas Publishing Home 1980, P-17-18

৩. বিস্তৃত বিবরণের জন্য দেখুন “বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি : প্রথম খÐ, ঢাকা মওলা ব্রাদার্স ১৯৭০, পৃষ্ঠা-১-৪৯।

৪. “বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি : প্রথম খণ্ড, ঢাকা মওলা ব্রাদার্স ১৯৭০, পৃষ্ঠা-৫০।

৫. “বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি : প্রথম খণ্ড, ঢাকা মওলা ব্রাদার্স ১৯৭০, পৃষ্ঠা-৫০-৫১।

৬. “বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি : প্রথম খণ্ড, ঢাকা মওলা ব্রাদার্স ১৯৭০, পৃষ্ঠা-৫২

৭. “বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি : প্রথম খণ্ড, ঢাকা মওলা ব্রাদার্স ১৯৭০, পৃষ্ঠা-৫২-৭৪।

৮. Quaid-a-Azam Mahamed Ali Jinnah, Speeches, as governer general of Pakistan 1947, 1948.

৯. Constituent Assembly of Pakistan (CAP) Debates, vol. 11 (3p. 22, 10 April 1952), উদ্ধৃতি Mahammad Ghulam Kabir-পৃষ্ঠা-২৫।

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj