রাষ্ট্রভাষা ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত : কে এম সোবহান

বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭

‘বাঁচাটাও যেমন সত্যি, মৃত্যুও ঠিক তেমনি সত্যিÑ তোমরা ভয় পাবে না, শুধু বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওÑ বাংলাদেশ দেখবে।’ বাংলাদেশ যে একদিন বাস্তবায়িত হবে এই বিশ্বাস এতই গভীর ছিল তাঁর মনে যে, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও বলতে পেরেছিলেন, ‘শুধু বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওÑ বাংলাদেশ দেখবে।’ বাংলাদেশ দেখার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব।’ এরপর বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ বললেন, ‘এটা আমার শেষ আদেশ হতে পারে। বাঙালি ভাইবোন এবং বিশ্ববাসীর কাছে আমার আবেদন, রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প ও পিলখানা ইপিআর ক্যাম্পে রাত ১২টায় পাকিস্তানি সৈন্যরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে হাজার হাজার লোককে হত্যা করছে। হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে আমরা লড়ে যাচ্ছি। আমাদের সাহায্য প্রয়োজন এবং পৃথিবীর যে কোনো স্থান থেকেই হোক। এমতাবস্থায় আমি বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করছি। তোমরা তোমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে মাতৃভ‚মি রক্ষা কর। আল্লাহ তোমাদের সহায় হোন।’ যে সাহস ও শক্তি দিয়ে লড়াই করার কথা বললেন সেই কথারই পুনরাবৃত্তি হলো ‘বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওÑ বাংলাদেশ দেখবে।’ এই কথাগুলো বলেছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ২৮ মার্চ ১৯৭১। অর্থাৎ স্বাধীনতা আর তার সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধ ঘোষণার ২ দিন পর। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দেখে যেতে পারেননি বাংলাদেশ তাঁর সাহসের অভাবের কারণে নয়, দেখে যেতে পারেননি কারণ তাঁর জীবনের বিস্তৃতিকে ছোট করে দিয়েছিল পাকিস্তানের গণহত্যাকারী হানাদার বাহিনী। সেই রাতেই তাঁর বাড়ি আক্রান্ত হলো। তাঁকে ধরে নিয়ে গেল ওরা। তাঁর শেষ চিহ্ন তাঁর একপাটি জুতো পড়েছিল তাঁর বাড়ির গেটে। তাঁকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে অকথ্য অত্যাচার চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। কথিত আছে তাঁর হাত-পা সব ভেঙে দেয় ওরা। ১৪ এপ্রিল বাংলা বছরের শেষ দিনÑ বাংলার এক কৃতী সন্তান, একজন খাঁটি বাঙালি মারা গেলেন অজ্ঞাতে। যে বাংলাকে তিনি ভালোবেসেছিলেন, যে বাংলাদেশ দেখার জন্য যুবসমাজকে বুকে সাহস নিয়ে যুদ্ধ করতে বলেছিলেন, সেই বাংলাদেশ ধারণ করল তাঁকে। মাতৃভ‚মিতে ছড়িয়ে আছে তাঁর দেহাবশেষ। কেউ জানল না এমনকি তাঁর আত্মীয়-স্বজনরাও না, কেমনভাবে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, কি বলে গেলেন যেÑ বাঙালিরা বেঁচে থাকল তাদের জন্য। তাঁর শেষ কৃত্যও হয়নি।

ত্রিপুরার এক বর্ধিষ্ণু জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। তাঁর পূর্ব পুরুষরা ত্রিপুরা রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন। দেশ বিভাগের পর তাঁর অনেক আত্মীয় বন্ধু চলে গিয়েছিলেন দেশ ছেড়ে ভারতে। তিনি থেকে গিয়েছিলেন এই বাংলায়Ñ তার স্বাধীনতার জন্য, মুক্তিযুদ্ধ দেখার জন্য। জমিদার সন্তান হয়েও জমিদারি প্রথার প্রতি তাঁর অসীম ঘৃণা ছিল। এই প্রথা বিলোপের জন্য সংগ্রাম করেছেন। জমিদার পরিচয়টুকু নিজেও দেননি, তাঁর ঘনিষ্ঠদেরও দিতে দেননি। তিনি বলতেন জমিদারির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক কলঙ্ক, রক্ত আর লজ্জা। পেশায় ছিলেন আইনজীবী। তিনি নিজ শহর ছেড়ে রাজধানীতে আসেননি হাইকোর্টে আইন ব্যবসা করতে। এমনি ছিল কুমিল্লার মাটির প্রতি টান। তাইতো তিনি কুমিল্লাতেই রেখে গেলেন তাঁর নশ্বর দেহাবশেষ। ওকালতি পেশায় প্রসিদ্ধ লাভ করলে অর্থাগম হয় তবে সব সময় এই অর্থ স্বেচ্ছায় দেয় না মক্কেলরা। কে-ইবা দেয় নিজ অর্থ অপরকে। তবু দিতে হয় অনেককে তাঁদের কাজের বিনিময়ে। ধীরেন দত্ত আইনজীবী হলেও তাঁর মানসিকতা লোপ পায়নি। যে মক্কেল টাকা দিতে পারত না অক্ষমতার কারণে বা যে মক্কেল ন্যায্য ফিস ফাঁকি দিত উভয়েরই মামলা তিনি সমান আগ্রহে পরিচালনা করতেন।

অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন ছিলেন ধীরেন দত্ত। ২৫ মার্চেই বুঝতে পেরেছিলেন কি হতে যাচ্ছে দেশে। গণহত্যার কথা জানতে পারলেন ২৬ তারিখে। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁকে রেহাই দেবে না গণহত্যাকারীরা তবু তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ দেখার জন্য। তিনি তাঁর ছেলে-নাতনিকে ডেকে বললেন যে, সময় সীমিত। তিনি পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারেন কিন্তু তাঁকে যখন ধরে নিতে যেতে আসবে হানাদার বাহিনী তখন তাঁকে যদি না পায় তাহলে অকথ্য নির্যাতন চালাবে তাঁর প্রতিবেশীদের ওপর। অপরের ওপর যাতে নির্যাতন না করে সেই কারণে তিনি থেকে গেলেন দেশের মাটিতে এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফল ভোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে হয় তাঁকে গণহত্যাকারীরা ধরে নিয়ে গিয়ে মিথ্যা বিবৃতি দেয়ার চেষ্টা করবে এবং তা যদি করে তাহলে তিনি বলবেন, ‘স্টপ কিলিং দিজ আনআর্মড পিপল।’ নয়তো তাঁকে তাঁর বাসস্থানেই গুলি করে মারবে। তিনি জানতে না যে, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী কতখানি বর্বর হতে পারে।

ধীরেন দত্তের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পূর্ব বাংলার মন্ত্রী হন। আতাউর রহমান খান তখন মুখ্যমন্ত্রী। মন্ত্রী হওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন যে, অনুন্নত দেশে মন্ত্রী হওয়ার অর্থ হচ্ছে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করা। তিনি মেডিকেল, পাবলিক হেলথ এবং সোস্যাল ওয়েলফেয়ারের মন্ত্রী হন। মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি সংকল্প নেন ফলের আকাক্সক্ষা না করেই কাজ করে যেতে হবে। গীতারই কথাÑ শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ অর্জুনের প্রতি। তিনি গীতা থেকে প্রায়শই উদ্ধৃতি দিতেন উপদেশের জন্য। তিনি একান্তই ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। সে সময়ের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা একটা নির্দেশক ছিল। অনেক কিছুর মধ্যে এটা ছিল একটি রাজনৈতিক কমিটমেন্ট। পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হওয়া সত্তে¡ও সেখানে পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার প্রভাব প্রচÐ রকমের। অথচ মুক্তিযুদ্ধের পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে আজ রাজনীতিতে ধর্মের নামে নির্বাচনের ব্যবসা চলছে। এর থেকে মুক্ত খুব কম রাজনৈতিক দল আছে। গত ’৯১-এর নির্বাচনে দেখা গেছে ঘোর প্রগতিশীল নেতা মুখে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলছেন অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেনি বা আসতে সাহস পায়নি তার ভীতি প্রদর্শনের ফলে। দেশের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু দল থেকে মনোনীত প্রার্থীকেও দেখা গেছে ধর্মীয় সেøাগানে ভোট টানার প্রচেষ্টা চালাতে। কিন্তু সুফল হয়নি। বর্তমান রাজনীতিতে রাজনৈতিক কমিটমেন্টের অভাব, যার অভাব ছিল না ধীরেন দত্তের মধ্যে। মন্ত্রী হয়েও অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। তখন ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় একটি প্লট পাওয়া বিশেষ করে একজন মন্ত্রীর পক্ষে অত্যন্ত সহজ ছিল। কিন্তু ধীরেন দত্ত সে পথে যাননি। ’৫৮‘র সামরিক আইন যখন হয় তখন তিনি গণপরিষদের সভ্য এবং একজন মন্ত্রী। মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়ার পর তিনি ফিরে গেছেন নিজের বাড়ি কুমিল্লায়। আবার আইন ব্যবসায় মন দিয়েছেন। তাঁর আত্মজীবনীতে কি সহজভাবে তিনি বলেছেন, ‘৯ অক্টোবর তারিখে আমি আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি জনাব আব্দুল ওয়াহাব সাহেব এবং স্টেনোগ্রাফার জনাব ইসমাইল সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া চলিয়া আসিলাম।’

ধীরেন দত্তর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন বলে বোধকরি তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল কঠিন কয়েকটি স্তর অতিক্রম করা। তার একটি স্তর ছিল আইয়ুবী সামরিক আইনে সহজভাবে রাজনীতিতে শান্ত ভ‚মিকা গ্রহণ করা। সেই সামরিক আইন জারি করার পর পাকিস্তানের রাজনীতিতে আর স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। আইয়ুবী সামরিক আইনে প্রভাবান্বিত হয় এ দেশের রাজনীতি এবং রাজনীতিকরা। সেই সামরিক আইন শেষে আইয়ুবী গণতন্ত্র চালু করার চেষ্টা করেন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব। সেই মাপে সংবিধান তৈরি হয়। বাংলার মাটিতে সেই বুনিয়াদি গণতন্ত্র শিকড় ছড়াতে পারেনি, সংবিধান কাজ করেনি। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আইয়ুবকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের সামনে ছিল ৬ দফা, লক্ষ্য ছিল ৬ দফা বাস্তবায়ন করা। রাজনীতি উত্তাল হয়ে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, যাঁকে ‘জীবন রাষ্ট্রপতি’ করা হয়েছিল তিনি বিদায় নিলেন। এল আর এক জেনারেল, আর এক সামরিক আইন। সেই সামরিক আইনের অধীনে সাধারণ নির্বাচন হয়। নির্বাচনে ৬ দফার জয়জয়কার হয়। নির্বাচনের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান তৈরি করা। সেখানেই বিরোধ বাধল পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের। আলোচনা হলো। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা নামিয়ে আনলেন এক দফায়। ‘বাংলার স্বাধীনতা’ তার ফলে বাংলাদেশ আক্রান্ত হলো, বাঙালিরা ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে দেশ স্বাধীন করল। এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে মারা গেল ত্রিশ লাখ বাঙালি। লাঞ্ছিত হলো আড়াই লাখ নারী। সেই অগণিত শহীদের মধ্যে ধীরেন দত্ত ছিলেন একজন। দেখে যেতে পারেননি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তবে বিশ্বাস করতেন বাঙালির সাহস জয় করে আনবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।

বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হলো ভৌগোলিক সীমারেখায়, তার জাতীয় পতাকায়, জাতীয় সঙ্গীতে। তার ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হয় সেই দেশ বিভাগের পর থেকেই। নিজ ভাষায় কথা বলার, লেখাপড়া করার যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সংসদীয় পর্যায়ে তা শুরু করেছিলেন গণপরিষদের সদস্য বাঙালি ধীরেন দত্ত। বাংলা ভাষা প্রশ্নে যে সংগ্রামের সূত্রপাত হয় তাকে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ দেয় ছাত্ররা। তদানীন্তন ছাত্র নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা বাংলা একাডেমির ১৯৮১-তে প্রকাশিত একুশের সংকলনে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘… বুদ্ধিজীবী মহলে খানিকটা এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা হতো তবে এটাকে রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিবর্তিত করে ঢাকার ছাত্র সমাজ’। ১৯৪৮-এর ২৩ ফেব্রæয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। সেই অধিবেশনে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি ধীরেন দত্ত ভাষা বিষয়ে ২৫ ফেব্রæয়ারি একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি ছিল উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হোক। এই প্রস্তাব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্য স্থাপনের প্রচেষ্টা থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য খুব পরিষ্কারÑ হিন্দু ও মুসলমান দুই ভিন্ন জাতি তারই প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। ভুল ছিল শুধু এই যে, পূর্ব বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই অভিন্ন ভাষা বাংলা। উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই ভাষা ছিল না। ১৯৫১’র একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫৬.৪০ শতাংশ। লোক ছিল বাংলা ভাষাভাষী। অপরদিকে উর্দু ভাষাভাষীর সংখ্যা ছিল ৩.৫৭ শতাংশ। তবুও সেই ভাষাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের এলিট শ্রেণিকে সবার ঊর্ধ্বে স্থাপন করা। গণপরিষদের এই প্রস্তাব তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়। পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘পূর্ব বাংলার অধিকাংশ অধিবাসীরই মনোভাব যে একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করা যেতে পারে।’ গণপরিষদে মুসলিম লীগ সস্যরা বাংলাকে পরিষদের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ভোট দেন।

২৮ ফেব্রæয়ারি দৌলতপুর কলেজের সব সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রী এক প্রতিবাদ সভা করে তাতে নাজিমুদ্দিনের প্রতি তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে এবং ধীরেন দত্তকে অভিনন্দন করে একটি প্রস্তাব পাস করে। ধীরেন দত্ত এই প্রস্তাবটি ব্যক্তিগতভাবে উত্থাপন করেছিলেন। তিনি বদরুদ্দীন উমরকে এক চিঠিতে এ সম্পর্কে বলেন, ‘বাংলা ভাষা আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা হোক ইহাই ছিল আমার প্রস্তাব। ইহা আমাদের পার্টির প্রস্তাব ছিল বলিয়া মনে হচ্ছে না।’ কংগ্রেসের প্রস্তাব না হলেও কংগ্রেস সদস্যরা সবাই ওই প্রস্তাব সমর্থন করেন। উর্দুর সমর্থকরা বাংলার সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা শুরু করে বলে, ‘উর্দু আমাদের মজহাবী ভাষা, উর্দুর বিরুদ্ধে কথা বলা ধর্মদ্রোহিতারই নামান্তর।’

১৫ মার্চ ৪৮-এ পরিষদের কাজ আরম্ভ হওয়ার আগে ধীরেন দত্ত পরিষদের বাইরের বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর কোনো অত্যাচার হচ্ছে কিনা জানতে চান এবং তিনি, ফজলুল হক, তফাজ্জল আলী প্রমুখ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বাংলা ভাষা দাবির সমর্থন জানান। ৮ এপ্রিল পরিষদে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বক্তব্যে বলেন যে, প্রস্তাবের শেষ শব্দ ‘স্কলার’-এর জায়গায় ‘ছাত্র’ শব্দটি বসান হোক। ধীরেন দত্ত ওই বক্তব্যের সরকারি প্রস্তাবের ওপর চারটি সংশোধনী আনেন। ওই সংশোধনীতে ‘বাংলা’ পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা হতে হবে, ইংরেজির জায়গায় পূর্ব বাংলায় বাংলা প্রবর্তন করতে হবে, পূর্ব বাংলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মাধ্যমে হবে বাংলা, সব সরকারি ও আধাসরকারি ফর্মে বাংলা প্রচলন করতে হবে। কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে যোগদানের সব পরীক্ষায় বাংলা অন্যতম বিষয় হিসেবে প্রবর্তন করতে হবে বলে দাবি জানান। এই প্রস্তাবটির বিরোধিতার পর নাকচ হয়ে গেলে তিনি দ্বিতীয় প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এটিও নাকচ হয়ে গেলে তিনি তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। এতে কেবল পূর্ব বাংলার সর্বস্তরে বাংলা চালু করার কথা বলেন। ‘বাংলা’ প্রবর্তনের ব্যাপারে মুসলিম লীগ সদস্যরা এমন এক হিস্ট্রিয়নিক অবস্থার সৃষ্টি করেন যে, ধীরেন দত্তকে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য আনুষ্ঠানিকভাবে জ্ঞাপন করতে হয় কিন্তু তাতেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণা বন্ধ হয়নি। পূর্ব বাংলা পরিষদে ইংরেজির জায়গায় বাংলায় বক্তব্য রাখার দাবি করেন ধীরেন দত্ত। এতে অনেকেই উত্তেজিত হন। নাজিমুদ্দীন ধীরেন দত্তকে বলেন যে, তিনি ইংরেজি বলতে না পারলে বাংলাতেই বক্তব্য দিতে পারবেন। পূর্ববাংলা পরিষদে বিরোধী দলের সহকারী নেতা হিসেবে ধীরেন দত্ত বাংলা সম্পর্কে অনমনীয় মনোভাব নিয়ে সরকারি দলের সস্যদের বিরোধিতা করেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলা যে প্রসার লাভ করেছে তার পেছনে ধীরেন দত্তের এক অসীম দান ছিল, যেভাবে তিনি পরিষদে মুসলিম লীগ সদস্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং নাজিমুদ্দিন যেভাবে পরিষদে আক্রমণ চালিয়েছিলেন তা ওই সব সদস্যের সংকীর্ণতাই প্রকাশ করে। ধীরেন দত্তের প্রস্তাব যে কেবল সঠিক ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বর্তমানে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ হয়েছে তার উৎস খুঁজতে হলে যেতে হবে সেই আটচল্লিশে, ধীরেন দত্তর ‘বাংলা ভাষা’ প্রবর্তনের বিরুদ্ধে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছিল সেখানে। তবুও ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করতে বাধ্য হয়েছিল মুসলিম লীগ সরকার। এইখানেই ধীরেন দত্তের সবচেয়ে বড় বিজয় যে, তাঁর প্রস্তাব আজ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা।

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj