বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিগ্রামটি কোথায় গেল? : মুনতাসীর মামুন

রবিবার, ২৬ মার্চ ২০১৭

১৯৯৯ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর নাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ গবেষণা ইনস্টিটিউট। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলাম আমি এবং তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে একটি খসড়া প্রস্তাবও পেশ করি। তিনি ও তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম এ পরিপ্রেক্ষিতে ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে এমফিল ও পিএইচডির সুযোগ রাখা হয়। এর অধীনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি জাদুঘর, একটি আর্কাইভ ও একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। গ্রন্থাগারে অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমদ ও নাজিমুদ্দীন হাশেম তাদের গ্রন্থ সংগ্রহ দান করেন। নিয়মিত সেমিনার, প্রকাশনা হতো এখানে। জার্নাল প্রকাশিত হতো। প্রথম ব্যাচের এমফিল ডিগ্রিও দেয়া হয়েছিল।

এরি মধ্যে অধ্যাপক দুর্গাদাশ ভট্টাচার্য উপাচার্যের পদ গ্রহণ করেন। তিনি আমাদের প্রতি বিরূপ ছিলেন। তারই ফলশ্রæতিতে আমি পদত্যাগ করি। ড. জাহাঙ্গীরও চলে আসেন। অধ্যাপক ভট্টাচার্যের সময়েই ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিএনপি-জামায়াত আমলে যারা উপাচার্য হয়েছিলেন তাদের সময় ইনস্টিটিউটের সবকিছু সিলগালা করে দেয়া হয়। তারপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে যারা উপাচার্য হয়েছিলেন তারাও ইনস্টিটিউটকে সিলগালা থেকে মুক্ত করেননি। এখনো তা বন্ধ। আমাদের অ্যাকাডেমিশিয়ানরা মুক্তিযুদ্ধকে কী চোখে দেখেন তা বোঝাতেই এই ছোট বিবরণ দিলাম।

জাদুঘরের জন্য আমি বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা যা টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে সব থানায় প্রেরণ করা হয়েছিল তার খোঁজ-খবর শুরু করি। অনেকেই এ ধরনের বার্তার কথা লিখেছেন, কিন্তু বার্তাটি দেখাতে পারেননি। অবিশ্বাস্য ভাগ্য আমার যে, আমি ঐ ধরনের একটি টেলিগ্রাম সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে হানাদার পাকি বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। অয়্যারলেসের মাধ্যমে তা সারাদেশে প্রচারিত হয়। অনেক জায়গায় তা লিফলেট আকারে ছেপে বের করা হয়। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে যে তার বার্তাটি পাওয়া যায় সরকারিভাবে তাই গৃহীত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে [দেখুন, মুক্তিযুদ্ধ : দলিলপত্র]। ঘোষণাটি ছিল নিম্নরূপ-

“ঞযরং সধু নব সু ষধংঃ সবংংধমব, ভৎড়স ঃড়ফধু ইধহমষধফবংয রং রহফবঢ়বহফবহঃ. ও পধষষ ঁঢ়ড়হ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ইধহমষধফবংয যিবৎবাবৎ ুড়ঁ সরমযঃ নব ধহফ রিঃয যিধঃবাবৎ ুড়ঁ যধাব, ঃড় ৎবংরংঃ ঃযব ধৎসু ড়ভ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ঃড় ঃযব ষধংঃ, ণড়ঁৎ ভরমযঃ সঁংঃ মড় ড়হ ঁহঃরষ ঃযব ষধংঃ ংড়ষফরবৎ ড়ভ ঃযব চধশরংঃধহ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ধৎসু রং বীঢ়ধষষবফ ভৎড়স ঃযব ংড়রষ ড়ভ ইধহমষধফবংয ধহফ ভরহধষ ারপঃড়ৎু রং ধপযরবাবফ.”

এই ঘোষণার কোনো প্রতিলিপি আমাদের চোখে পড়েনি। কোনো প্রচারপত্রেরও। যদিও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ অনেকে বলেছেন, চট্টগ্রামে তাঁরা প্রচারপত্রটি দেখেছেন এবং পড়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণার একটি অয়্যারলেস কপি পাওয়া গেল অবশেষে। পাবনায় শাহজাদপুরের ওসি ছিলেন তখন জনাব আবদুল হামিদ। তিনি ২৬ মার্চ সকাল আটটায় অয়্যারলেসের একটি কপি পান এবং তাতে তা গ্রহণের সময় ও তারিখ লিখে রাখেন। তাঁর স্বাক্ষর অনুযায়ী লিপিটি পেয়েছিলেন ২৬ তারিখ সকাল আটটায়। তাঁর বার্তাটিতে যা লেখা ছিল তা হলো-

“ঋৎড়স উধপপধ

ঞড় চবড়ঢ়ষব’ং ড়ভ ইধহমষধফবংয ধহফ ধষষ ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ.

চধশরংঃধহ ধৎসং ভড়ৎপবং ংঁফফবহষু ধঃঃধপশবফ ঊ.চ.জ. ড়ভ চববষশযধহধ ধহফ চড়ষরপব ভড়ৎপবং ধঃ জধলধৎনধম ভৎড়স ০০ যড়ঁৎং ড়ভ ২৬ঃয গধৎপয শরষষরহম ষধশং ড়ভ ঁহধৎসবফ ঢ়বড়ঢ়ষব [.] ঋরবৎপব নধঃঃষব মড়রহম ড়হ রিঃয ঊ.চ.জ. ধহফ ঢ়ড়ষরপব ভড়ৎপবং রহ ঃযব ংঃৎববঃ ড়ভ উধপপধ ধহফ ঢ়বড়ঢ়ষব ধৎব ভরমযঃরহম মধষষধহঃষু ভড়ৎ ঃযব ভৎববফড়স ড়ভ ইধহমষধফবংয. ঊাবৎু ংবপঃরড়হ ড়ভ ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ইধহমষধফবংয ধংশবফ-ধঃঃধপশ বহবসু ভড়ৎপব ধঃ ধহু পড়ংঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয. গধু অষষধয নষবংং ুড়ঁ ধহফ যবষঢ় রহ ুড়ঁৎ ংঃৎঁমমষব ড়ভ ভৎববফড়স.

ঔড়ু ইধহমষধ

ঝশ. গঁলরন.”

প্রথম ও বর্তমান বার্তাতে অমিল আছে। মনে হয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাতে তাঁর ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তা হয়তো খানিকটা বিস্তারিত ছিল। যিনি অয়্যারলেসে কোড সিগন্যাল পাঠিয়েছিলেন তিনি তা অনুবাদ করেছেন। এমনো হতে পারে বিদেশের জন্য প্রথমাংশ ইংরেজিতে আগে থেকেই করা ছিল। দ্বিতীয়াংশ বাংলায়। ইংরেজি বাক্য গঠনের জন্য এই মন্তব্য করছি। বা এমনো হতে পারে, বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন অংশ সুবিধামতো যে অয়্যারলেস অপারেটর পেয়েছেন তা পাঠিয়েছেন। মূল বক্তব্য কিন্তু দুটি বার্তারই এক।

মিল অমিল যা-ই থাকুক এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত [এবং এখন নথি দ্বারা] যে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ গ্রেপ্তারের আগে স্বাধীনতা সংক্রান্ত একটি বার্তা অয়্যারলেসে প্রেরণ করেছিলেন এবং তা বিভিন্ন থানা/অঞ্চলে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। না হলে শাহজাদপুরের ওসি অয়্যারলেসের এই বার্তাটি পেতেন না। আমার চোখে অন্তত এই বার্তার কোনো কপি এখন পর্যন্ত [এটি পাওয়ার আগে] চোখে পড়েনি। পাকি মনোভাবাপন্ন কেউ ছাড়া আর কেউ এখন হয়তো বিষয়টি অবিশ্বাস করবেন না।

জনাব হামিদ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। পরে এএসপি পদে উন্নীত হয়েছিলেন। অবসর গ্রহণের পর সরকারি লাল ফিতার কারণে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পেনশন না পেয়ে অশেষ কষ্ট পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। অয়্যারলেসের কপিটি তিনি যতœ করে সংরক্ষণ করেছিলেন। ২০০০ সালে মরহুমের স্ত্রী জীবননেসা হামিদ তাঁর পুত্র ইশতিয়াক আহমদের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউটে’ তা দান করেছেন। এটি ইনস্টিটিউটের জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছিল।

হাইকোর্টে কয়েক বছর আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কিত একটি রায় প্রদান করে। রায় দিয়েছিলেন বিচারপতি খায়রুল হক। রায় লেখার সময় তিনি এই বার্তার খবর পান এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন তা আদালতে পেশ করতে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানান, এটি তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।

এই অমূল্য দলিলটি কি বিএনপি-জামায়াত আমলে গায়েব করে দেয়া হয়।’ নাকি তা ভালো করে খোঁজা হয়নি। এটি কেন পাওয়া গেল না বা কেন পাওয়া যাচ্ছে না সে বিষয়েও কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করেনি।

এই হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের মনোভাব। উল্লেখ্য, এ আমলেও ইনস্টিটিউট খোলা যায়নি এবং সেই টেলিগ্রাম নিয়ে খোঁজ-খবরও করা হয়নি।

স্বাধীনতা দিবস : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj