খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি : মারুফ রসূল

রবিবার, ২৬ মার্চ ২০১৭

লেখার শিরোনামটি আমার নয়; বাংলা ব্লুগ যাঁদের হাত দিয়ে শুরু হয়েছিল, আরো স্পষ্ট করে বললে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বাংলা ব্লুগে যে ব্লুগাররা প্রথম কাজ শুরু করেছিলেন, তাঁদেরই একজন শ্রদ্ধেয় অমি রহমান পিয়ালের ব্লুগ প্রোফাইলে লেখা থাকত- “অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি”। এই বাক্যের একটি অংশ লেখাটির শিরোনাম হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্য ঋণ স্বীকার নয় বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ; কেননা, অমি রহমান পিয়াল, আরিফ জেবতিক, কুলদা রায়, নুরুজ্জামান মানিক এবং তাঁদের সহযোদ্ধাদের অনেকের হাতেই আমাদের ব্লুগিং জীবনের হাতেখড়ি। আমাদের ভাবনায় মুক্তিযুদ্ধকে একটি বড় ক্যানভাসে তাঁরা উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁদের উত্থাপিত নানা দলিল দস্তাবেজে আরেকটি নাম নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করত- এম এম আর জালাল; আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত আর্কাইভ।

বাংলা ব্লুগের বয়স খুব বেশিদিনের নয় সত্যি কিন্তু প্রভাবের কথা যদি বিবেচনা করি, তবে বাংলা ব্লুগ আমাদের মনস্তত্ত্বে অনেক বড় একটি প্রভাব বিস্তার করেছে। ব্লুগ মাধ্যমকে তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়ে। কাজটি কেবল ইতিহাস ছড়িয়ে দেয়াই ছিল না, এর সঙ্গে তৈরি হয়েছিল ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট নানা বিতর্ক। বস্তুত এর মাধ্যমেই আমাদের কাছে প্রথম প্রতিভাত হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল কতগুলো সাল তারিখ বা আলোকচিত্র, প্রামাণ্যচিত্রের বিষয় নয়; বরং এগুলোর বাইরেও কিছু কথা থেকে যায়। সে কথাগুলোই তৈরি করে একটি ইতিহাসের বয়ান। আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানাবিধ বয়ানের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। আমাদের প্রজন্ম পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস পড়েছি, পরীক্ষায় বিকৃত ইতিহাস লিখেই স্কুল জীবন শেষ করেছি। এই ঘৃণ্য কাজটি আমাদের মানসিক গড়নকে কী ভীষণভাবে আঘাত করেছে, তা বুঝতে পারি যখন অনর্থক কিছু বিষয় হঠাৎ আমাদের মনে প্রশ্নবোধক চিহ্নসহ আবির্ভূত হয়। এই ইতিহাস বিকৃতি একটি প্রজন্মকে এতবেশি দ্বা›িদ্বক করে তুলেছে যে, তার পক্ষে সঠিকভাবে চিন্তা করাটাই কষ্টকর। ঠিক এই পরিস্থিতিতে, যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু বিভ্রান্তিকর বয়ান হাজির হয়, তখন আমরা দিশেহারা হয়ে পড়তাম। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি মূলত দুটো পর্যায়ে ঘটেছে- এক, রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় এসে পাঠ্যপুস্তক ও সরকারি প্রচার মাধ্যমে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছে; দুই, স্বাধীনতাবিরোধী বুদ্ধিজীবী সমাজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু পূর্ব-পরিকল্পিত বয়ান নির্মাণ করেছে, যা প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। এই বিপদসঙ্কুল পরিবেশ থেকে আমাদের উজ্জ্বল উদ্ধার ছিল বাংলা ব্লুগ এবং এই লেখায় উল্লিখিত ব্লুগারদের লেখনি।

দুই

২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ তারিখে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি থেকে যখনই তারা খানিক সরে আসতে চেয়েছিল, তখনই তৈরি হয়েছে শাহাবাগ আন্দোলন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশের এক অনন্য উদ্বোধন। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল। সুতরাং তারা যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, তখনই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ঠাঁই পেয়েছে পাঠ্যপুস্তকসহ অন্যান্য মাধ্যমে। সুতরাং সাল-তারিখ-ঘটনাকেন্দ্রিক যে বিকৃতি স্বাধীনতাবিরোধীদের সময় আমরা লক্ষ করেছিলাম, তা আওয়ামী লীগ সংশোধন করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যে নানাবিধ বয়ান একাত্তরের পরাজিত শক্তি তৈরি করে আসছে, তা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ আওয়ামী লীগ নেয়নি। বরং, কখনো কখনো আওয়ামী লীগ নিজেই বিভ্রান্ত হয়েছে সেইসব বয়ানে। এই বক্তব্যের যুক্তিটি দেয়ার আগে একটু জানানো প্রয়োজন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দ-বন্ধ আসলে আমাদের কাছে কী অর্থ বহন করে? সকলের দায় নেয়া যেহেতু আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তাই নিজের ব্যক্তিগত বোধগম্যতার কথাই বলছি। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে একটি নতুন দর্শন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সাতচল্লিশের দেশভাগ পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য যে কয়টি আন্দোলন হয়েছিল, সেগুলো থেকে একেবারেই আলাদা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন। একটি নিখাদ অসাম্প্রদায়িক দর্শন মানবিক আত্মমর্যাদাবোধের প্রশ্নে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল। সেই দর্শন কতজন বুঝে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, সে প্রশ্নটি অবশ্য থেকেই যায়; কেননা পাকিস্তানি নিপীড়নের অন্যতম ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য, সুতরাং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত স্বাধীন দেশে আমলাতান্ত্রিক বা সেনাবাহিনীকেন্দ্রিক ক্ষমতার মালিক হতে পারবে, এ দূরভিসন্ধি তাদের মাঝে ছিল। ফলে স্বাধীন দেশের রাজনীতিকে জাতির পিতা ও তাঁর সহযোদ্ধারা যতই জনগণ-সংশ্লিষ্ট করতে চাইলেন, নব্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত আমলা-সেনাবাহিনী আর পাকিস্তানি ভাবাদর্শে আক্রান্ত খন্দকার মোশতাকরা তাকে ততোই আঁকড়ে ধরতে চাইল। এই ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের সঙ্গে একাত্তরের পরাজিত আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো তো ছিলই- ফলে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট আমরা জাতির পিতাকে হারিয়ে এক অভিভাবকহীন জাতিতে পরিণত হই। বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হয় অসাম্প্রদায়িক দর্শন। নির্বাসিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সেই অমর তিনটি প্রস্তাব- ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’। বস্তুত এই তিনটি প্রস্তাবের মাঝেই মুক্তিযুদ্ধের অমিত দর্শন নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে, সরল করে বলতে গেলে- সাম্যের অর্থনীতি, মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্রকাঠামো এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের শাসনযন্ত্র। এখন আমরা যদি নির্মোহ হই, তাহলে একটু অনুসন্ধান করতে পারি, স্বাধীনতার পর এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে আমাদের কোনো বুদ্ধিজীবী সমাজ গড়ে উঠেছে কি? কিছু কলমচি তৈরি হয়েছেন, বিবৃতিজীবী তৈরি হয়েছেন কিন্তু আক্ষরিক অর্থে একটি রাষ্ট্রের জন্ম-দর্শনভিত্তিক কোনো বুদ্ধিজীবী গড়ে ওঠেননি। ফলে রাজনৈতিক দল, যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তাদেরই নিজস্ব বুদ্ধিজীবী সমাজ ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো বুদ্ধিজীবী সমাজ বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এই বক্তব্যের সঙ্গে যাঁরা দ্বিমত পোষণ করছেন, তাঁদের সবিনয়ে জানাতে চাই- মুক্তিযুদ্ধের দর্শন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শন নয়- বঙ্গবন্ধুর আমলে থাকলেও এখন আর নেই। সুতরাং আওয়ামী বুদ্ধিজীবী সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুদ্ধিজীবী সমাজ ভাবার কোনো কারণ নেই।

তিন

বস্তুত এই বুদ্ধিবৃত্তিক অসম সংকটের জায়গায় আমাদের প্রজন্ম এসে দাঁড়িয়েছে। অসম বলছি কারণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক দর্শন চর্চা না হলেও, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপদর্শন চর্চা চলেছে নির্বিঘ্নে এবং এখনো চলছে। এর চেয়ে ভয়াবহ আর কিছুই হতে পারে না। বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা ইতিহাসের নানাবিধ বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করে ছেড়ে দিয়েছে। বিকল্প বয়ান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সমাজ তৈরি করতে পারছে না। আর পারলেও, তা অপ্রতুল। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক দর্শন চর্চা এখনো ইতিহাসের সাল-তারিখে আটকে আছে। আমাদের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বলয় মার্কসবাদকে মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের সঙ্গে একীভূত করতে ব্যর্থ হয়েছেন, ব্যর্থ হয়েছেন মার্কসবাদের বঙ্গীয় স্বরূপ দানেও। ক্ষমতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা সুবিধামতো বক্তব্য দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধের অসংলগ্ন নানা তত্ত্ব উপস্থাপন করেই চলছে। ১৯৭৬ সালে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ চালু’ থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে ‘বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ’- এই পর্যন্ত যা যা ঘটেছে; ধরা যাক, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, নিরীশ্বরবাদী-সংশয়ী বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হত্যাকে ভোটের রাজনীতির মোড়কে জায়েজ করা, পাঠ্যপুস্তকের নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকীকরণ ইত্যাদি সবই মুক্তিযুদ্ধের দর্শনবিরোধী। অবস্থা কতটা বেগতিক যে, আওয়ামী লীগের নেতারাই এখন মনে করছেন কষে মুসলমান হলে হেফাজত-জামায়াতও তাদের ভোট দেবে।

চার

এই বেগতিক অবস্থাতে আমাদের দায়িত্ব নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের দর্শনকেই সম্পূর্ণভাবে অবলম্বন করা এবং সেখান থেকেই রাজনৈতিক পাঠ পুনরুদ্ধার করে তার বিকাশ ঘটানো। বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের জায়গাটি আজ যতটা স্পষ্ট হচ্ছে, কাল, যদি কোনো কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকে (গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেটি হতেই পারে), আরো স্পষ্ট হবে। আন্তর্জাতিকভাবেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জঙ্গি সন্ত্রাসীরা তাদের অপ-আদর্শের বিষ ছড়াচ্ছে। তাকে প্রতিহত করতে হলে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দর্শনকেই তুলে ধরতে হবে। ইশতেহার রচনা করতে হবে লালনের গানে, রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, নজরুলের দ্রোহে; ঘোষণাপত্র তৈরি করতে হবে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতির ইতিহাস থেকে; জাতীয় চারনেতার জীবনযাপন প্রণালী থেকে উদ্ধার করতে হবে আমাদের কর্মপদ্ধতির তালিকা এবং আমাদের সকল কাজকে প্রকাশ করতে হবে বিজয় সরকার থেকে জর্জ হ্যারিসনের ভাষিক সীমারেখায়। স্বাধীনতা দিবসে এই দৃঢ় প্রত্যয়টুকুই হোক আমাদের আগামীকালের নতুন দিনলিপির প্রেরণা।

স্বাধীনতা দিবস : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj