বর্জ্য পানি হতে পারে সম্পদ

বুধবার, ২২ মার্চ ২০১৭

গতকাল মঙ্গলবার ভোরের কাগজ কনফারেন্স রুমে ‘বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এন্ড ওয়াটার ফোরাম, ফ্রেশ ওয়াটার অ্যাকশান নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া (ফানসা) বাংলাদেশ , এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ, ওয়াটার সাপ্লাই এন্ড স্যানিটেশন কোলাবোরেশন কাউন্সিল (ডাব্লিউএসএসসিসি)-এর সহযোগিতায় ভোরের কাগজ এ গোলটেবিলের আয়োজন করে। দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড.মুজিবুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়া আলোচকদের বক্তব্যের চুম্বক অংশ দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের বিশেষ ক্রোড়পত্র।

গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকবৃন্দ

:: আনিসুল ইসলাম মাহমুদ

মন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়

স ড. জাফর আহমেদ খান

সিনিয়র সচিব, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়

:: ড. মো. মুজিবুর রহমান

অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট

:: তাকসিম এ খান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা ওয়াসা

:: লিয়াকত আলী

পরিচালক, পলিসি এডভোকেসি, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ

:: মনিরুল ইসলাম

ওয়াশ স্পেশালিস্ট, ইউনিসেফ

:: আবদুস শাহীন

কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ডব্লিউএসইউপি

:: ইয়াকুব হোসেন

ন্যাশনাল কনভেনার, এফএএনএসএ বিডি

:: ড. দিবালোক সিংহ

নির্বাহী পরিচালক, ডিএসকে

:: মিলন কান্তি বড়–য়া

প্রতিনিধি, ব্র্যাক ওয়াশ

:: শাহ মোঃ আনোয়ার কামাল

নির্বাহী পরিচালক, ইউএসটি

:: এস এম এ রশীদ

নির্বাহী পরিচালক, এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ

:: রেবেকা সানইয়াত

প্রতিনিধি, কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর

:: মারুফ হোসেন

প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ

:: অলক মজুমদার

কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ওয়াশ অ্যালায়েন্স

:: মোঃ মোস্তফা

প্রকল্প পরিচালক, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

শ্যামল দত্ত

সম্পাদক, ভোরের কাগজ

পানির সমস্যা আজ বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশে এত নদনদী থাকতেও সুপেয় পানির অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। সরকারের এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিশেষ প্রয়োজন। সেই সঙ্গে জনগণকে পানি ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করাও জরুরি। অনেক স্থানে বর্জ্য পানি বিশেষ করে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মৌচাক ও মালিবাগে স্যুয়ারেজের পানি রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে আজ ভোরের কাগজ বিশ্ব পানি দিবসের প্রাক্কালে এ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, যা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ

মন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়

আমাদের দেশে দিনে দিনে জনসংখ্যা বাড়ছে, সে জন্য পানির চাহিদাও বাড়ছে। তাই পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। তবে আমাদের পানি দিনে দিনে দূষিত হচ্ছে। আমাদের বর্জ্য বা নোংরা পানি সব গিয়ে পড়ছে খালে বা নদীতে। আমরা কোনো ধরনের পরিষ্কার না করেই তা নদীতে দিচ্ছি। যার ফলে নদীর পরিষ্কার পানিও দূষিত হয়ে যাচ্ছে। এগুলো বন্ধ করা দরকার। এছাড়া নদীগুলো মরে যাচ্ছে, নদীর নাব্য কমে যাচ্ছে। আমরা ড্রেজিং করছি। বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার পলিসি ও আইন করছে। আমরা একটা নীতিমালা তৈরি করছি। যাতে করে পানি যাতে অপচয় না হয় এবং পানির দূষণ কমানো যায়। এছাড়া শহরের মতো গ্রামের মানুষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। তাদের সুপেয় পানি যেমন সাপ্লাই দিতে হবে, তেমনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার ও কার্যকর করতে হবে। কেননা কোনো একটি গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। পানি নিয়ে আমাদের সমস্যা রয়েছে। বর্ষাকালে এখানে বন্যা হয় আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার। আমরা তিস্তা ব্যারেজ করেছি। যেখানে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি জমবে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি দেয়া যাবে কৃষিতে। নদী-খালগুলো সংস্কার করে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। আমরা পাংশীতে একটি ব্যারেজ তৈরির কথা ভাবছি। যেখানে পানি সংরক্ষণ করা হবে নদীর মাঝেই। এখানে ভূমি অধিগ্রহণ লাগবে না। পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ১৬৪ কিলোমিটার নদীতে পানি সংরক্ষণ করা যাবে। যার এক চতুর্থাংশ রয়েছে ভারতে। তাই আলোচনা চলছে উভয় দেশে। এই বিশাল নদীতে যদি বর্ষার পানি বা উজানের পানি সংরক্ষণ করা যায় তাহলে আমাদের শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব হবে না। ভবিষ্যতে পানি ওখান থেকে আসবে। দক্ষিণাঞ্চলের আর্সেনিক সমস্যা ও অতি লবণাক্ততা এর ফলে অনেকাংশে কমে যাবে।

ড. জাফর আহমেদ খান

সিনিয়র সচিব, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়

একটি দেশের উন্নয়নের সিংহভাগ নির্ভর করে পানির ওপর। কৃষি, শিল্প, পশু পালনসহ সবকিছুই নির্ভর করে পরিষ্কার পানি সরবরাহের ওপর। আমরা যদি ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে চাই বা ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাই তাহলে সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তবে পানির সুষ্ঠু ব্যবহার কিভাবে করা যায় তার জন্য আমরা ডেল্টা প্ল্যান করতে চলেছি। এই ডেল্টা প্ল্যানের ভেতরে সবকিছু বলা থাকছে। কিভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হবে তার নির্দেশনাও রয়েছে। এ বছরের জুলাই মাসের মধ্যে এটি শেষ হবে বলে ধরা হচ্ছে। পানিসম্পদমন্ত্রী এ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন। তার নির্দেশনায়, এক্সপার্টদের সহযোগিতায় এবং কনসালটেন্ডদের পরামর্শে এটি করা হচ্ছে। এ প্ল্যানের মধ্যে যেমন রয়েছে পার্বত্য অঞ্চল, তেমনি বরেন্দ্রভূমি, আরবান অঞ্চল, কোস্টাল এরিয়া সব অঞ্চলকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পানির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা চালু করা বিশেষ জরুরি। যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মিডিয়াকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রকৌশলী তাকসিম এ খান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা ওয়াসা

ঢাকা শহরে প্রথমে ওয়াটার ম্যানেজমেন্টে সমস্যা ছিল, কীভাবে মানুষের কাছে আমরা পানি পৌঁছাব। বর্তমানে আমরা এতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০১০ সালে আমরা তিনটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করি। স্যুয়ারেজ, ওয়াটার এবং ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান তৈরি করি। ওয়াটার মাস্টার প্ল্যান এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন আমরা স্যুয়ারেজ মাস্টার প্ল্যানে কাজ করছি। ঢাকা শহরকে আমরা ২০২৫ সালের মধ্যে পাইপ লাইন স্যুয়ারেজের মধ্যে আনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি। এ জন্য আমরা কাজও শুরু করে দিয়েছি। পাঁচটি স্যুয়ারেজ পাইপ লাইন করা হবে। আমরা একসঙ্গে এগুলোতে হাত দিয়েছি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সঙ্গে ১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছি। আমরা আশাবাদী ঢাকা শহর ২০২৫ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ স্যুয়ারেজ লাইনের মধ্যে আনা সম্ভব হবে। এছাড়া বস্তিগুলোকে আমরা বৈধ পানির আওতায় আনছি। যেখানে পানি নেই সেখানে স্যুয়ারেজের প্রশ্নই আসে না। আমাদের মাস্টার প্ল্যানে ঢাকা শহরের বস্তিসহ সব এলাকা পাইপ লাইন স্যুয়ারেজের মধ্যে আসবে। এছাড়া আমাদের ঢাকার বাইরেও স্যুয়ারেজ পাইপ লাইন করার প্ল্যান আছে। আমরা নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করতে চাই। ভিক্ষা বা দেনা করে কাজ করতে চাই না। কারণ আজ আপনাকে কেউ টাকা দেবে পরে আর কেউ দেবে না। আমরা ২০ মিলিয়ন মানুষের কাছাকাছি আমরা যাচ্ছি। এ সব লোকজনকে স্যুয়ারেজ সিস্টেমের মধ্যে এনে পাইপ লাইন স্যুয়ারেজ দেয়ার চেষ্টা করছি।

ড. মো. মুজিবুর রহমান

অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

এবারের বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা’। পানি সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যু ও চ্যালেঞ্জ কিভাবে উতরানো যায় তা নির্ধারণ করাই আজকের উদ্দেশ্য। পানিকে বর্জ্য বা ওয়েস্ট ওয়াটার বলা যাবে না, এটাকে রিসোর্সের মাধ্যমে রিচার্জ করে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। তাছাড়া পানি অপচয় কিভাবে কমানো যায়, পানির কিভাবে পূর্ণ ব্যবহার করা যায় এবং পানি দূষিত হওয়া কিভাবে কমানো যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। এখানে শিল্প-কলকারখানার পানিদূষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আমরা বৃষ্টি বা স্টর্ম ওয়াটারকেও দূষিত হতে দেখছি। তাছাড়া দূষিত পানিতে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থ থাকে যার ফলে আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। দূষিত পানিতে বিভিন্ন রকমের ভাইরাস, জীবাণু, ব্যাকটেরিয়াসহ নানাবিধ ক্ষতিকর জীবানু থাকে। এগুলো মুক্ত করতে হবে। তা না হলে নাগরিকরা এ পানি ব্যবহারের ফলে রোগাক্রান্ত হবেন। এসব ক্ষতিকারক জিনিস থেকে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। তা না হলে এর ফলে জনসাধারণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে, পরিবেশ দূষিত হবে, উৎপাদন কমবে ইত্যাদি। তাছাড়া দেশে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে।

বৈশ্বিকভাবে ৮০ ভাগ পানি দূষিত হয়ে পরিবেশে চলে যাচ্ছে। যা একদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। পৃথিবীর ১৮ বিলিয়ন মানুষ অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। তারা সুপেয় ও দূষণমুক্ত পানি পাচ্ছে না। ৬৬৩ মিলিয়ন মানুষের নির্দিষ্ট কোনো পানির উৎস নেই। বৈশ্বিকভাবে ৫০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করে। সে কারণে এই বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষ জরুরি। আমরা বর্জ্য পানি থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে জৈবসার, এনার্জি এবং পরিষ্কার পানি পেতে পারি। আর এগুলো যদি সঠিকভাবে করতে পারি তাহলে বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনার খরচ তেমন হবে না। পৃথিবীর মাত্র ৫৫টি দেশে বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা রয়েছে। অন্য কোনো দেশের এ বিষয়ে ডাটাও নেই। বাংলাদেশও এর মধ্যে পড়ে। দুঃখের বিষয় বর্জ্য পানির মাত্র ৯২ শতাংশ আনট্রিটেড হয়ে থাকে। তার জন্য পরিবেশের অনেক বেশি দূষণ ঘটে। ঢাকায় যে পরিমাণ বর্জ্য পানি হচ্ছে তার ২০ শতাংশ কভারেজ বললেও মূলত ২ শতাংশ সঠিকভাবে করা হচ্ছে। এসডিজি ১, ২ ও ৩ অর্জন করতে হলে পানি ও বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। বিশ্বের ৭ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র ২.৪ বিলিয়ন মানুষ স্যুয়ারেজ সিস্টেম ব্যবহার করে। যারা সবাই ধনী দেশের নাগরিক। বাংলাদেশে প্রায় সবাই অনসাইট স্যুয়ারেজ সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল। এই অনসাইট কিভাবে সাসটেইনেবল করতে পারি সে বিষয়টি ভাবতে হবে। এর সঙ্গে সøাশ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে কিভাবে সংযুক্ত ও সংহত করতে পারি তার জন্য কাজ করতে হবে। কিভাবে পানির অপচয় কমানো যায়, কৃষিতে কিভাবে কিভাবে বর্জ্য পানি রিসাইকেল করে ব্যবহার করা যায় তা ভাবতে হবে। বাংলাদেশে ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট পলিসি অনেক পুরনো। একে আধুনিক করতে হবে। পলিসিটিকে নরায়ন করা দরকার। পানি ব্যবস্থাপনা নীতি জরুরি। সেই সঙ্গে সবগুলো স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ও বিশেষ প্রয়োজন।

ইয়াকুব হোসেন

ন্যাশনাল কনভেনার, ফানসা-বিডি

গ্রামের দরিদ্র জনগণ এসডিজির ৬.২ লক্ষ মাত্রা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কারণ তারা সুপেয় পানি পাচ্ছে না। পানি না পাওয়ার পেছনের কারণ বিভিন্ন ওয়াটার সোর্স যা আছে সেগুলো বিভিন্নভাবে দূষিত হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে সরকারের কিছুটা গাফিলতি আছে। দেখা যাচ্ছে, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে গিয়ে ট্যানারি এখান থেকে সরানো হলো। সাধারণত এটা প্ল্যানিংয়ে করানো উচিত ছিল একটু ডাউন স্ট্রিমে নিয়ে যাওয়া। তার বদলে সেটিকে আরো আপ স্ট্রিমে নিয়ে গেল, যাতে আরো কিছু জনগোষ্ঠীকে নষ্ট করা যায়। ওখানে নিয়ে যাওয়ার পরে পলিটিক্যালভাবে বলা হলো, এখানে ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে। এখানে তোমাদের চাকরি হবে।

যখন ট্যানারি আংশিক চালু হয়েছে ওখানে কোনো মানুষ থাকতে পারছে না এখন। পুরো ধলেশ্বরী নদী পুরোটাই দূষিত হচ্ছে। এর পানি পরে বুড়িগঙ্গায়ও আসবে। শুধু পরিকল্পনার সমস্যার কারণে সেখনকার মানুষদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে রয়েছে ওখানকার মানুষ। ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য এখানকার মানুষকে পানি দেয়ার জন্য অন্য জায়গা থেকে পানি আনা হচ্ছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে একটি জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর জন্য অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে মারার যে নীতি ঠিক হয়েছে তা কী হিসেবে করা হয়েছে। এর ফলে এক সময় ওইসব এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী সেই পানি থেকে বঞ্চিত হবে এবং এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবে। এছাড়া অনেক নদীর পানি দূষিত হয়ে আমাদের দেশে আসছে, তাই সরকারকে ক‚টনৈতিকভাবে এর মোকাবেলা করতে হবে।

শাহ মো. আনোয়ার কামাল

নির্বাহী পরিচালক, ইউএসটি

সরকার যে ডেল্টা প্ল্যান তৈরি করছে, সেখানে ব্যাপকভাবে সিভিল সোসাইটির অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ডেল্টা প্ল্যানের আগে আরো অনেকগুলো প্ল্যান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তা তৃণমূলে যায়নি বা কোনো কাজে আসেনি। ফলে সরকারের কনসালটেন্সি ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে প্ল্যানিংয়ের ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি ইনভেস্টমেন্ট করা হচ্ছে। কিন্তু প্ল্যান কাজে আসছে না। এজন্য কোনো প্ল্যান করার আগে তৃণমূল স্তরের মানুষের মতামত নেয়া দরকার। যাতে ডেল্টা প্ল্যানটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় সেই বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে। টাঙ্গাইলেও এরকম কয়েকটি প্ল্যান করা হয়েছিল, কিন্তু একটা প্ল্যানও কোনো কাজে আসেনি। সেখানে পানির সমস্যা রয়েই গেছে। সেটা আমার নিজের এলাকা, তাই আমার খুব কাছ থেকে দেখা।

এস এম এ রশীদ

নির্বাহী পরিচালক, এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ

১৯৯৩ সালে ২২ মার্চকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। প্রতি বছরই বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয়ে আসছে। আমাদের জন্য আজকের দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির সঙ্গে আমাদের জীবন এবং জীবনচক্র নিবিড়ভাবে আবর্তিত। সব কর্মকাণ্ডের প্রধান হচ্ছে পানি। পানির বিকল্প শুধুই পানি। এর বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে না। আমরা পানি সংকটের দেশ নয়। তারপরও আমাদের পানি সংকটের মধ্যেই থাকতে হচ্ছে। কারণ দ্রুত নগরায়ন, মানুষ বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা স্থাপন ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ বেশ কিছু সমস্যার জন্যই আমরা পানি সংকটের মধ্যে পড়ছি। আমাদের দেশের জীবনধারা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ সবই পানিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা। সুতরাং প্রত্যেকটি দিক বিবেচনা করে আমাদের পানির বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে। বর্জ্য পানিও হতে পারে মূল্যবান সম্পদ। বর্জ্য পানি পরিশোধন করে কিভাবে আমরা কাজে লাগাতে পারি সে বিষয়টা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে। সরকারও বিষয়টি নিয়ে জোর দিয়েছে। এতে সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

লিয়াকত আলী

পরিচালক, প্রোগ্রাম ও পলিসি এডভোকেসি, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ

একটি শহর যখন তৈরি হয়ে যায় তখন তার নতুন প্ল্যানিং যতটা কঠিন কিন্তু নতুন শহরের প্ল্যান করা অনেক সহজ। ঢাকা শহর চারদিক দিয়েই নদী দিয়ে আবদ্ধ। এখানে সারফেস ওয়াটার ব্যবহার করা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার পানি আলকাতার মতো হয়ে যায়। ওটা ব্যবহারযোগ্য করা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্টের পক্ষে সম্ভব নয়। এ পানিতে যে পরিমাণ হ্যাভি ম্যাটাল থাকে কোনো ট্রিটমেন্টের পক্ষে এই ম্যাটাল দূর করা সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে ঢাকা ওয়াসাকে সায়েদাবাদে প্রি-ট্রিটমেন্ট ইউনিট বসাতে হয়েছে। তারপরও এর ফল কতটুকু পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। মনুষ্য বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে তৈরি করা সম্ভব। আর যে ওয়াটার আছে তাও আবার ব্যবহার করা সম্ভব। আমরা বড় আকারে না পারলেও সীমিত আকারে করা সম্ভব হয়েছে।

অলক মজুমদার

কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ওয়াশ অ্যালায়েন্স

দেশের ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশের নদীর পানির স্রোত না থাকায় তা সমুদ্রে মিশছে না। ফলে অতিরিক্ত এসব অঞ্চলে আগের চেয়ে ৩ গুণ বেশি লবণাক্ততা ও আর্সেনিক সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানির পুনঃব্যবহার এবং কম ব্যবহার করা প্রয়োজন। এ জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন যেমন দরকার, তেমনি জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে প্রতিটি বাসাবাড়িতে প্রতিনিয়ত পানি নষ্ট হচ্ছে। এর জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের মাধ্যমে পানির অতিরিক্ত খরচ কমাতে হবে। অতিরিক্ত পানি দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে জাতিও ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্প ও গার্মেন্টস কারখানার মালিকরা যত্রতত্র ভূগর্ভস্থ পানি উঠিয়ে নিচ্ছে। তার একটা প্রতিরোধ প্রয়োজন। যারা শিল্পের জন্য পানি তুলছেন, আবার অশোধিত পানি ফিরিয়ে দিচ্ছেন তাদের জন্য পানি নীতিমালা করা প্রয়োজন।

ড. দিবালোক সিংহ

নির্বাহী পরিচালক, ডিএসকে

দূষিত পানির কারণে জনস্বাস্থ্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। দেশে ৩৩ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি ও ওজন কমের শিকার। এ ছাড়া আমাদের পরিবেশ, পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে যাচ্ছে এবং এই পরিবেশ দূষণকে আমরা কোনো সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে না পারি তাহলে এটা আমাদের দেশের জন্য জাতিকে ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাবে। অর্থনৈতিকভাবে দেখলে অনেক আগে বিশ্বব্যাংক একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল, তাতে স্যানিটেশনের অভাবে প্রতি বছর জনগনের ২৯৫ বিলিয়ন টাকা ক্ষতি হচ্ছে। যথাযথ স্যানেটারি ব্যবস্থা না থাকার জন্য নানান রোগের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ থেকে জনগণকে উদ্ধার করতে হবে এবং সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে পানিনীতি আইন করা হয়েছিল তা এখনো ড্রাফট আকারে রয়ে গেছে। এ জন্য অবিলম্বে পানিনীতি অনুমোদন করা হোক।

মো. মোস্তফা

প্রকল্প পরিচালক, পল্লী অঞ্চল পানি সরবরাহ প্রকল্প, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

আমাদের দেশের ৯০ ভাগ পানি শিল্প ও কৃষিতে ব্যবহার হচ্ছে। মাত্র ১০ ভাগ পানি খাওয়া-দাওয়া ও বাসার কাজে ব্যবহার করা হয়। সময় এসেছে শহরের পাশের নদীর পানি ব্যবহার উপযোগী করার। যেভাবে নদীর পানি ব্যবহার করা যায় সে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এতে করে অনেক দূর থেকে পানি আনার খরচ যেমন বেড়ে যাচ্ছে তেমনি ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত তোলার ফলে ৪৭টি জেলার পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তা ছাড়া পানি দূষিত হওয়ার কারণে দেশ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এসব বন্ধ করার জন্য সুসংহত পানি ব্যবস্থাপনা পলিসি প্রয়োজন। যাতে করে শিল্পের মালিকরা দূষিত পানি সরাসরি নদীতে ফেলতে না পারে।

রেবেকা সানইয়াত

প্রতিনিধি, কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর

এখনো নগরের বেশিরভাগ জায়গা পানি দূষণের মধ্যে রয়েছে। নগরের দরিদ্র মানুষগুলোই এর কুফল বেশি ভোগ করছে। যত্রতত্র উন্মুক্ত টয়লেট ও বর্জ্য ত্যাগ করছে তারা। ফলে সরাসরি বর্জ্য ড্রেনে গিয়ে পড়ছে। এ পানি নদীতে যাচ্ছে। নদীর পানি অতিরিক্ত দূষিত হচ্ছে। নগর দরিদ্রদের ওয়াসার পানির আওতায় আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে এ গোষ্ঠীটি এখনো এ সুবিধা বঞ্চিত। বৈধভাবে পানির লাইন নিতে এক লাখ টাকা খরচ লাগার কারণে বস্তিবাসীরা ওয়াসার পানি পায় না। কিন্তু তারা অন্যভাবে পানি সংগ্রহ করে। যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। অথবা অবৈধ লাইনের মাধ্যমে ওয়াসার পানি সেখানে যায়। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও এলজিইডি কেউ এর দায়িত্ব স্বীকার করতে চায় না। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এটা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত পলিসি দরকার।

মো. মারুফ হোসেন

প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ডব্লিউবিবি

দেশে পানির অপচয় হচ্ছে অনেক গুণে। রিসাইক্যাল করা পানি দিয়ে আমরা নানা রকম কাজ করতে পারি। ওয়েস্ট ওয়াটার দিয়ে আমরা অনেক কাজ করতে পারি। আমাদের ব্যাপক আকারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই টেকসই উন্নয়নের দিকে যেতে চাই তাহলে পানির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকা শহরসহ গ্রাম অঞ্চলগুলোকেও ওয়াটার ট্রিটমেন্টের আওতায় আনতে হবে। পানি বা জলাধারকেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ধারাবাহিকভাবে করতে হবে। পানি ধরে রাখার জন্য গাইড লাইন ঠিক করতে হবে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে পানি আনার চেয়ে পানির অপচয় কিভাবে কমানো যায় সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নদীর পানি দূষণমুক্ত করতে সরকারকে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আবদুস শাহীন

কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ডব্লিউএসইউপি

দেশের বেশিরভাগ এলাকা নগরে পরিণত হচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ র‌্যাপিড আরবানাইজেশনে যাবে। এর মধ্যে অনেক স্বল্প আয়ের কমিউনিটির লোকজন বাড়বে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আমরা কি তাদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত! আমরা কিভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করব। আরবানাইজেশনের সঙ্গে সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রি এবং কৃষিজমিগুলোতেও প্রচুর পানি ব্যবহৃত হবে। এর ফলে প্রচুর পরিমাণে দূষিত পানি উৎপন্ন হবে। কিন্তু এই ওয়েস্ট ওয়াটার ব্যবস্থাপনা কিভাবে হবে তা আমরা বুঝতে পারছি না। আমাদের নানা রকমের পলিসি আছে তবে ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের প্রয়োজন আছে। নীতিনির্ধারণের পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন নীতি কারা কিভাবে বাস্তবায়ন করবে সে ব্যাপারে কাজ করতে হবে।

মনিরুল ইসলাম

ওয়াশ স্পেশালিস্ট, ইউনিসেফ

পানির অপব্যবহার রোধে, স্কুল-কলেজগুলোতে এ বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যাতে ছাত্রছাত্রীরা এ বিষয়ে সচেতন হয়। পরিবর্তন করতে পারে পানি ব্যবহারের নিয়ম। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমে আসবে। উপরের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশে পানি ব্যবস্থাপনা পলিসি তৈরি করা জরুরি। একমুখী স্যানিটেশনের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পরিবর্তন করে একটি কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা পলিসি চালু করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সবাই মিলে পানি ব্যবহারকারীদের অভ্যাস পরিবর্তন করার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। যাতে করে পানির অপচয় বন্ধ করা সম্ভব হয়।

মিলন কান্তি বড়–য়া

প্রতিনিধি, ব্র্যাক ওয়াশ

চট্টগ্রামে পানিদূষণের মাত্রা এত বেশি যে, কর্ণফুলী নদীর স্রোত কমে গেছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গারও একই পরিস্থিতি। সারাদেশের সব নদী ভরাট হচ্ছে, আর দখল হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে বর্জ্য আর বর্জ্য। ঢাকা শহরের চারদিক নদীবেষ্টিত। বিশেষ করে বছরে তিন মাস এখানকার পানি কালো হয়ে যায়। এজন্য আমাদের পরিবেশ মারাত্মক দূষণের দিকে যাচ্ছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা আর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহর ঝুঁকির মধ্যে থেকেই যাচ্ছে।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj