পাটের সোনালি দিন ফিরেছে : প্রধানমন্ত্রী

শুক্রবার, ১০ মার্চ ২০১৭

কাগজ প্রতিবেদক : পাটের তৈরি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, পাটের সোনালি দিন ফিরেছে। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগেও পাটের অমিত সম্ভাবনা রয়ে গেছে। পাট পরিবেশবান্ধব, এর থেকে আর উন্নত কিছু হতে পারে না। পাট উৎপাদন ও সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাট থেকে বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করে তা আমরা রপ্তানি করব। জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে পাটপণ্য মেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পরে পাটপণ্যের ফ্যাশন শো এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী এবং পাট পণ্যের মেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখেন।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজউদ্দিন প্রামাণিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এক সময় পাটই বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বৃহৎ খাত ছিল। পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার পর দেশে যে হত্যা, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয় সেখানেই পাটেরও কপাল পোড়ার শুরু হয়। লোকসান দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেয়া পাটকলগুলোকে। ওই সময় পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৮৭টি পাটকলের মধ্যে ৬০টি বিক্রি করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকারের উদ্যোগের ফলে পাটের সোনালি দিন আবার ফিরে এসেছে। পাট হচ্ছে একটি কৃষিপণ্য এরসঙ্গে আমার হাজার হাজার কৃষকের জীবন জড়িত এবং জমিতে পাট চাষ হয় তা প্রাকৃতিকভাবেই শস্যবর্তনের কারণে জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। কাজেই আমাদের পাটের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহার এবং পাটের উন্নত চাষাবাদের জন্য আমাদের গবেষকরা কাজ করছেন। আমাদের বিজ্ঞানী মরহুম ড. মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে পাটের জিন রহস্য উদ্ভাবন করা হয়েছে। ফলে পাটের উন্নত চাষাবাদের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা পাটের মেধাসত্ত্ব অধিকার অর্জন করেছি। এখন থেকে পাট বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পলিথিনের ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পচনশীল পাটের ব্যাগ আবিষ্কৃত হয়েছে। পাটের সোনালি দিন ইনশাআল্লাহ ফিরে এসেছে। অনুষ্ঠানে পাটের শাড়ি পড়ে আসা এবং পাটের হাতব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পাটের শাড়ি না হলে কিন্তু এক সময় বাংলাদেশে বিয়ে হতো না। পাট পণ্য আমাদের সব কাজে লাগে। পাটের সব কিছুই লাগে- পাটখড়ি থেকে শুরু করে পাট শাক আমাদের কাজে লাগে।

পাট থেকে পণ্য উৎপাদনে গবেষণার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন শুধু ৩৫ রকম পণ্য উৎপাদন করা যায় পাট দিয়ে। পাটের জিন রহস্যের উদ্ভাবক মরহুম বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলমের অবদানের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, তার থাকাটা খুব দরকার ছিল। ২০০৯ সালে সরকারে আসার পর খুব গোপনীয়তার সঙ্গে আমরা এই গবেষণাটি করেছিলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা এর ফলাফলটা পেয়েছিলাম; ততক্ষণ প্রচার করিনি। ফলে পাটের উন্নত চাষাবাদের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা পাটের মেধাসত্ত্ব অধিকার (চধঃবহঃ ৎরমযঃ) পেয়েছি। পাট এখন বাংলাদেশেরই সম্পদ।

পাটকল নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিএনপি সরকারের চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ’৯১ সালে বিএনপি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের পরামর্শে একটা চুক্তি সই করে। এই চুক্তিটা ছিল বাংলাদেশে একে একে পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়ার। ’৯৩ সাল থেকে এই বন্ধের কাজ শুরু হবে এবং গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের নামে পাটকলগুলোর শ্রমিকদের তারা বিদায় দেবে। ঠিক একই সময়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ভারতের সঙ্গে চুক্তি করল; ভারতকে তারা টাকা দেবে নতুন নতুন পাটকল তৈরি করার। একই সময়ে করা চুক্তিতে ভারত লাভবান হলেও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই চুক্তির কারণে প্রায় আড়াই লাখ বেল পাট রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আর ভারতে যে পাটকল তৈরি হবে, তারা আড়াই লাখ বেল পাট বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে। ২০০২ সালের ৩০ জুন এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী মিল বন্ধ করে দেয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এতে প্রায় ২৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক বেকার হন।

তিনি বলেন, সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে আমরা বন্ধ থাকা বস্ত্র ও পাটকলগুলো চালুর উদ্যোগ নিই। আমরা বন্ধ থাকা খুলনার খালিশপুর জুটমিল, সিরাজগঞ্জের কওমি জুটমিলসহ ৫টি পাটকল ও ২টি বস্ত্রকল চালু করেছি। এতে প্রায় ২১ হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যবহার ও চাহিদা বৃদ্ধির জন্য ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’ এবং ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বিধিমালা ২০১৩’ কার্যকর করেছে। ইতোমধ্যে ১৭টি পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে সরকার অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহারের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। জুট ডাইভার সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের মাধ্যমে এ লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা ‘জুট জিও টেক্সটাইল’ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি। দেশে ও বিদেশে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় জুট জিও টেক্সটাইল আমাদের পাটের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

পুরস্কৃত হলেন যারা : পাটের বহুমুখীকরণে বিশেষ অবদান রাখার জন্য দশটি ক্যাটাগরিতে দশ জনের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পুরস্কৃতরা হলেন- পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোবারক আহমেদ খান (পলিথিনের ব্যাগের বিকল্প পাটের শপিং ব্যাগ এবং পাট থেকে ঢেউ টিন আবিষ্কার), এইচ এম ইসমাইল খান (পাট পাতা থেকে পানীয় উদ্ভাবন), পাটচাষি খিতীশ চন্দ্র রায় (উচ্চ ফলনশীল উফশী বিজ উদ্ভাবক), আবদুর রশীদ (সেরা পাট বীজ উৎপাদনকারী), সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী (বহুমুখী পাট পণ্য উৎপাদনকারী সেরা পাটকল), ঢাকা ট্রেডিং হাউজ লিমিটেডের টিপু সুলতান (সেরা কাঁচা পাট রপ্তানিকারক), জনতা জুট মিলস লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহমুদুল হক (সেরা পাট পণ্য রপ্তানিকারক), মেসার্স আজিজ জুট মিলস্ লিমিটেডের চেয়ারম্যান শেখ নাসির উদ্দিন (সেরা পাট সুতা রপ্তানিকারক), রাশেদুল করিম মুন্না (সেরা বহুমুখী পাট পণ্য রপ্তানিকারক) এবং খুলনার মেসার্স তাসরিয়া জুট ট্রেডিংয়ের কুতুবউদ্দিন হাওলাদার (সর্বোচ্চ পাট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান)।

এ ছাড়াও পাট নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী স্কুলের শিক্ষার্থীদের হাতেও পুরস্কার তুলে দেন শেখ হাসিনা। আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণের পর প্রধানমন্ত্রী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখেন এবং বহুমুখী পাট পণ্যের মেলা উদ্বোধন করে তা ঘুরে দেখেন।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj