নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে : রণেশ মৈত্র

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

ফেব্রুয়ারি তারুণ্যের এক মহাজাগরণের মহাকাব্য। বাঙালি জাতির গৌরবদীপ্ত পদচারণায় সে দিন তো গোটা দেশের রাজপথ হয়েছিল প্রকম্পিত। কেঁপে উঠেছিল করাচি, লাহোর, পিন্ডির রাষ্ট্রীয় সিংহাসনারোহী দ্বিজাতিতত্ত্বের সাম্প্রদায়িক নেতাদের উপেক্ষা করে এল এর মহাজাগরণের মহোৎসব- যে মহোৎসব একাত্তরের নিশানায় হাঁটতে বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল, দিকনির্দেশনাও দিয়েছিল। এবারে যে ফেব্রুয়ারি এল সে কি তেমনই একটা ফেব্রুয়ারি? যে ফেব্রুয়ারিতে বাঙালি জাতি জীবন-মরণ পণ করে খালি হাতে হাজারে হাজারে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য, বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেয়ার তাবৎ পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রকে রুখে দেয়ার জন্য, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-বিদ্যাসাগর-জীবনানন্দ-সুকান্তকে ভুলিয়ে দেয়ার সব অপপ্রচেষ্টাকে বানচাল করে দিয়ে তাদের হৃদয়ে আরো শক্তি-আরো মজবুত করে ধারণ করার জন্য। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান ও সমাধিস্থ করার লক্ষ্যে ও সব মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ও সব প্রকার শোষণ-নির্যাতন বন্ধ করার লক্ষ্যে, সাম্প্রদায়িকতার কবর রচনা করে ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষ্যকে ধ্রæবতারার মতো শিক্ষার সব পর্যায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে?

সে দিনের সেই ফেব্রুয়ারিতে ঘোর সাম্প্রদায়িক ও বর্বর শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় থেকে শুধুমাত্র দেশটা সাম্প্রদায়িকতার উগ্র এক আবহই সৃষ্টির চেষ্টায় মেতে উঠেছিল তাই নয়, বরং তারা ইসলামের নামে কোটি কোটি মুসলমানকে চরম এক বিভ্রান্তির বেড়াজালের আবরণে আটকে রেখে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে দেশটাকে একটি অসভ্য; বর্বর, ধর্মান্ধ, চির অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ একটি দেশে পরিণত করে বাঙালি জাতিকে তার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সুসমৃদ্ধ পথ থেকে বিচ্যুত করে এক ক‚পমণ্ড‚ক জাতিতে পরিণত করার ষড়যন্ত্র জালের বিস্তার ঘটিয়েছিল।

কিন্তু বাহান্নর ইতিহাস রচনাকারী ফেব্রুয়ারিতে বাঙালি জাতি লৌহদৃঢ় একতা গড়ে তুলে ওই ষড়যন্ত্র জাল ছিন্ন করে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষদাঁতকে ভাঙার লক্ষ্যে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেশটিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির লালন করার মাধ্যমে এক সুখী, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত এবং বাংলাদেশ গড়ার চেতনায় ঢাকার ও সমগ্র বাংলাদেশের রাজপথগুলো জনতার সংগ্রামী পদভারে কাঁপিয়ে তুলেছিল।

তরুণ-তরুণীরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে, হাজারে হাজারে কারাজীবন বরণ করে জানিয়ে দিয়েছিল সে দিনের শাসকগোষ্ঠীকে যে ‘বাঙালি জাতি মাথা নোয়াবার নয়’। শুধুই শিক্ষার্থী তরুণ-তরুণী নয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও-সাংবাদিকরাও নির্বিবাদে কারাবাস বরণ করেছিলেন- অগণিত মিছিলে শামিল হয়েছিলেন স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে।

সে আন্দোলন দমানো যায়নি, দমাতে পারেনি হাজারো নির্যাতনে লাঠি-গ্যাস-টিয়ারশেলে বা মুসলিম লীগের গুণ্ডাবাহিনীর লাঠ্যাঘাতেও। ভাষা আন্দোলনকারীদের যতই বলা হয়েছে ‘এরা মুসলমান নয়- হিন্দু’, ‘এরা পাকিস্তানের দুশমন’, ‘এরা ইসলাম বিরোধী’ বা ‘এরা ভারতের দালাল’, ‘ধুতি পরে এরা ঢাকার রাস্তায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলে স্লোগান দিয়েছে- ততই বেশি বেশি করে মুসলিম সন্তান এ আন্দোলনে যোগদান করেছে- আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।

এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রছাত্রীরাও দলে দলে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছেন। সমগ্র হিন্দু সমাজের সমর্থন তো এ আন্দোলনের পেছনে ছিলই, তবে সক্রিয় আন্দোলনে অংশ নিতে সাহসী হয়েছেন তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যকই। এভাবেই এটি একটি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। সর্বজনীন রূপ পেতে সমর্থ হয়।

জাতীয় নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিষদে বামপন্থি দলগুলোর নেতারাও ছিলেন।

তেমনই আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয়েছিল, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মতিন (যিনি পরবর্তী সময়ে ভাষা-মতিন হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন), ওলি আহাদ, তোয়াহা, গাজীউল হক প্রমুখ বামপন্থি ছাত্রনেতারা যাদের নেতৃত্বেই একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা অমান্য করার সিদ্ধান্ত নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র ঢাকা শহরের ছাত্র সমাজ। ছাত্রছাত্রী নির্বিশেষে সে মিছিলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। এতে সাধারণ কর্মচারী-দোকানদার-রিকশা শ্রমিকের মতো দরিদ্র পেশাজীবীরাও অংশগ্রহণ করেন। মিছিলে গুলিবর্ষণের ফলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শাফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেকে শহীদ হন, আহত হন শতাধিক, গ্রেপ্তার হন অনেকেই।

খবর দ্রুতই পৌঁছে যায় নিকটবর্তী প্রাদেশিক আইন সভার অধিবেশনে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রবীণ নেতা মওলানা আবদুর রশিদ অধিবেশনে ছিলেন। খবর পাওয়া মাত্র তিনি উঠে দাঁড়িয়ে স্পিকারকে লক্ষ্য করে বলেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বের হওয়ার মিছিলে পুলিশ বেধড়ক গুলি চালিয়েছে, লাঠিচার্জ করেছে। ফলে আমাদের সন্তানরা মৃত্যুবরণ করেছে, আহত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কারো পক্ষে বসে অধিবেশন চালানো উচিত নয়। অধিবেশন স্থগিত করে চলুন, আহত-নিহতদের দেখে আসি। প্রস্তাব নাকচ হয়। তর্কবাগীশ বেরিয়ে চলে আসেন ঘটনাস্থালে- সংহতি জানান আন্দোলনের সঙ্গে। এভাবে সে দিন মুসলিম লীগের অভ্যন্তরেও বিভক্তি আসে। তর্কবাগীশ মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন প্রতিবাদস্বরূপ।

আসলে সে দিনটি ও তখনকার ঘটনাবলি এমনই ছিল যাকে প্রকৃতই স্মৃতি-জাগানিয়া বলে মনে করা হয়। আবেগও ঘিরে ধরে মনকে। তবে উপরের কথাগুলো কিছুটা যদিও দীর্ঘ হলো তবুও বলে নিতে চাই, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখার জন্য আমি নতুন করে কলম ধরিনি। বই-পুস্তকে সে ইতিহাস ও তার পর্যালোচনা বিস্তর হয়েছে। এই নিবন্ধের খাতিরে দিনটি যে কত উজ্জ্বল ছিল তারই কিছুটা ছবি ফুটিয়ে তুলতেই খানিকটা প্রয়াস পাচ্ছি মাত্র।

বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলে স্বীকার না করে পারেনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। দিনটিকে অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন বলে ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার ১৯৬৫ সালে।

ভাষা আন্দোলনের সীমাহীন তাৎপর্য ও প্রতিক্রিয়া বাঙালির জাতীয় জীবনে পড়তে শুরু করে। গড়ে ওঠে শহীদ মিনার এবং দেশের সর্বত্র বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনার গড়ে তোলার হিড়িক পড়ে যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতি বছর ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে মিছিল করে (প্রভাত ফেরি) শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা বাৎসরিক এবং স্বতঃস্ফ‚র্ত রেওয়াজে পরিণত হয়।

ধীরে ধীরে শহীদ মিনারের পাদদেশে আলোচনা সভা, সঙ্গীত-নৃত্যানুষ্ঠান প্রভৃতি চালু হয় এবং এগুলো আজো দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ঘোষণা দিলেন, সব সাইনবোর্ড নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে বাংলায় লিখতে হবে। তখন বেশিরভাগ সাইনবোর্ড লেখা হতো ইংরেজিতে, কিছু কিছু আরবিতে এবং সামান্য কিছু বাংলায়। কিন্তু ছাত্রনেতাদের ওই আহ্বান জানানোর পর ধীরে ধীরে সব দোকানপাট-অফিস-আদালত ব্যাংক-বিমা প্রভৃতির সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা হলো। মেয়েরা একুশে ফেব্রুয়ারির দু’একদিন আগে থেকেই শহীদ মিনারের চারদিকে এবং রাজপথগুলোতে আলপনা আঁকতে শুরু করে।

বাঙালি সংস্কৃতি, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যার অপমৃত্যু ঘটাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল, তা যেন বহুগুণ শক্তি অর্জন করে তীব্র গতিসম্পন্ন হয়ে এক রেনেসাঁর আবির্ভাব ঘটাল। বাঙালি সংস্কৃতি নতুন করে তার প্রাণ ফিরে পেল। বিয়ে বাড়ির সাজসজ্জায় কলাগাছ পুঁতে মাটির হাঁড়ির ওপর আম পাতার পল্লব, নানাবিধ আলপনা ও আলোকমালার সাজানো, গেটে শুভ বিবাহ এবং (বর ও বরযাত্রীদের উদ্দেশে স্বাগতম) লেখা শুরু হলো শাদি মোবারক প্রভৃতির স্থলে। অর্থাৎ আরবি বা ইংরেজি নয়- বাংলার প্রচলন নতুন মাত্রা পেল যেন।

সাম্প্রদায়িকতা সব ক্ষেত্র থেকেই অপসারিত হতে শুরু করে দ্রুতই। পূর্ব পাকিস্তান প্রথম অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন হিসেবে জন্ম নেয় বামপন্থি প্রগতিশীল চেতনার ধারক পূর্ব পাকিস্তান

ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৫২ সালেই। ১৯৫৩ সালে জন্ম নেয় পাকিস্তান-উত্তর প্রথম অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল’ নামে (বর্তমানের ‘গণতন্ত্রী পার্টি’ নয় ধীরে ধীরে এই ঢেউ আঘাত করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগেও। এ দুটি সংগঠনই ক্রমে তাদের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে নেয়- অতঃপর আর কোনো সাম্প্রদায়িকতার চিহ্ন ধারণ করে রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়নি। ১৯৪৮ সালে গঠিত হয় অসাম্প্রদায়িক পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, রেলগাড়ি, বাস, লঞ্চ, স্টিমার এবং সংবাদপত্রগুলোও বাংলা নাম ধারণ করতে শুরু করে। ইত্তেফাক ও ইনকিলাব ছাড়া আর কোনো বাংলা সংবাদপত্রের নাম বাংলা ভাষা ছাড়া আরবি-উর্দু বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় রাখা হয়নি বা হচ্ছে না। চারদিকে শুরু হয় বাংলা ভাষার জয়জয়কার স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী শঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়ে। ষাটের দশকে তারা নতুনভাবে আঘাত হানতে উদ্যত হয় রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মাধ্যমে। কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত কাগজেই থেকে যায়। বাস্তবে জনগণ বা বাঙালি জাতি এই আদেশকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে বহুগুণ উৎসাহ নিয়ে ১৯৬১-তে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী মহাসমারোহে কোথাও তিনদিন, কোথাও সাতদিন, কোথাওবা মাসব্যাপী নাচ, গান, আলোচনা সভা, আবৃত্তি, নাটক প্রভৃতির মাধ্যমে উদযাপন করেন। রবীন্দ্র চর্চা বেড়ে যায় বহুগুণ। কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত যেন একটি বুমেরাং হয়ে তাদেরই আঘাত করে আর জনগণকে নতুনভাবে রবীন্দ্র প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে।

কিন্তু দিন পেরোয়, বছর পেরোয়- ভাষা আন্দোলনের তাপদগ্ধ বাংলা বিপুল প্রেরণার অপ্রতিরোধ্য শক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বান ১৯৭১-এ সমগ্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই শক্তি আরো শক্তিশালী হয় বিদেশের তথা ভারত, সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এবং গোটা পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষের অতুলনীয় নৈতিক ও বৈষয়িক সহযোগিতা ও সমর্থনে। পরিণতিতে নয় মাসের মধ্যেই অর্জিত হয় গৌরবোজ্জ্বল বিজয়- যা বাহান্নর ফেব্রুয়ারিতে সূচিত হয়েছিল। গৃহীত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই নতুন দেশটির মৌলনীতি হিসেবে।

কিন্তু শত্রুরা ওঁৎ পেতেই ছিল। তারা অকস্মাৎ রাতের অন্ধকারে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে এবং একই বছরেরও নভেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের অপর চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করে। ধীরে ধীরে মেঘ জমতে থাকে অর্জিত বিজয়গুলো একে একে ছিনতাই হতে থাকে। হতে থাকে ইতিহাস ও আদর্শের বিকৃতি। তারই জের চলছে বিকৃতি এবং আদর্শ বদল হাত ধরাধরি করে বাংলার আকাশকে পুনরায় মেঘাচ্ছন্ন করে তুলেছে। তমসায় আবৃত করে চলেছে চতুর্দিক। পরিত্যক্ত হচ্ছে মহান আদর্শমালা। চার মৌলনীতি অপমৃত। জিয়ার বিসমিল্লাহসহ বেআইনি পঞ্চম সংশোধনী এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবলিত এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নবতর উৎসাহে ১০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার পুনঃসন্নিবেশিত করে কলঙ্কিত করেছে আমাদের আদর্শিক বিজয়কে।

অতঃপর সংবিধানকে অগ্রাহ্য করে ‘মদিনা সনদ’ অনুসারে দেশ চলবে বলে সদম্ভ ঘোষণাও অবাক বিস্ময়ে শুনল বাঙালি জাতি। পর পর হত্যালীলা ঘটতে থাকল ‘নাস্তিক’ অভিযোগ এনে আইনকে নিজ হাতে তুলে নিয়ে পুরোহিত, ইমাম, শিক্ষাবিদ, প্রকাশক একের পর খুন হতে থাকল। রাষ্ট্রের নিষ্পৃহতা খুনিদের প্রশ্রয় দিল- তারা উৎসাহিত হলো। সেই উৎসাহে ঘটতে থাকল নাসিরনগর, গাইবান্ধা, যশোর, দিনাজপুরসহ সারাদেশে অজস্র সাম্প্রদায়িক একতরফা আক্রমণ হত্যা, লুট, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ… প্রভৃতি মারাত্মক অপরাধ। বিচার নেই, কোনোটারই শাস্তিও নেই কারো। গড়ে উঠল বিচারহীনতা নামক এক অপসংস্কৃতি।

শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হলো শিশু-কিশোরদের পাঠ্যবইতে। হিন্দু ও প্রগতিশীল খ্যাতনামা লেখক, কবি-সাহিত্যিকদের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ পাঠ্যসূচি থেকে তুলে দিয়ে বইগুলোরও ইসলামি বা পাকিস্তানিকরণ করার মাধ্যমে। তাই এ মেঘ মুক্তিযুদ্ধের আবরণে আসা তাই বিভ্রান্তিতে ভুগছেন অনেকে। বিভ্রান্তি কাটিয়ে আদর্শ বাঁচাতে, নীতি বাঁচাতে, মুক্তিযুদ্ধ বাঁচাতে, বাহান্নকে বাঁচাতে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুনরায় দাঁড়ানোর বিকল্প নেই।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj