দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন্সের সম্ভাবনা : নিতাই সেন

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

মানুষ প্রকৃতিগতভাবে ভ্রমণবিলাসী। আদিমকাল থেকে প্রকৃতি থেকে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য মানুষ সব সময় অতিক্রম করেছে তার নিজস্ব গণ্ডি। সৃষ্টি রহস্য, মানুষ ও প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ দর্শনের মাধ্যমে মানুষ যেমন নিজেকে জানে, তেমনি বিশ্বজ্ঞানও লাভ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ আজো জীবন ও জীবিকার প্রধান পেশা। শিক্ষাকে পরিপূর্ণতা প্রদানের জন্য ভ্রমণের বিকল্প নেই। ভ্রমণ যেমন মানুষকে আত্মনির্ভরশীলতা শেখায়, তেমনি স্রষ্টার সৃষ্টি-রহস্যও মানুষের সামনে তুলে ধরে।

প্রাক কথন

১৯৮২ সালে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি যখন মহকুমা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে খাদ্য ক্যাডারে যোগদান করি, তখন সারা দেশের অনেকগুলো মহকুমায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদ খালি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব অমূল্য প্রসাদ চক্রবর্তী যখন আমার পছন্দের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন, তখন আমি কোনো কিছু না ভেবেই কক্সবাজারের কথা বলেছিলাম। সাগর, দ্বীপ, পাহাড়- আমার চৈতন্যের মগ্নডালে বসেছিল সেই শৈশবকাল থেকেই। সম্ভবত অন্তর্গত রক্তের অবিনাশী টানেই জীবনের প্রথম পোস্টিং হিসেবে তাই অবচেতনভাবেই কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছিলাম। তাছাড়া ততদিনে লেখালেখির রক্তবীজও শরীরের শিরা-উপশিরায় ঢুকে গিয়েছিল। এ জন্য কর্মজীবনের প্রথম পোস্টিং হিসেবে কক্সবাজারের দায়িত্ব প্রাপ্তিকে সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসেবে মনে করেছি। আর সেই কারণেই কক্সবাজার আমার কাছে আজো স্বপ্নের শহর, স্মৃতির শহর। বাসা ও অফিস দুটোই সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়াতে সকাল-বিকাল দুবেলার জন্যই আমি হয়ে যাই সৈকতের সাথী। কক্সবাজার মহকুমা ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়। ১৮৬৯ সালে কক্সবাজার পৌরসভা গঠিত হয়। ১৮৫৪ সালে কক্সবাজার থানা গঠিত হয়। বর্তমানে ৭টি থানা/উপজেলার মোট আয়তন ২৪৯১ বর্গ কি.মি.। জেলার উত্তরে চট্টগ্রাম জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বান্দরবান ও মায়ানমার, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর।

প্রাচীন নিদর্শনাদি ও প্রতœসম্পদ :

আদিনাথ মন্দির (মহেশখালী), শাহ উমরের মাজার (চকোরিয়া), মানিকপুরে ফজল কিউকের সাতগম্বুজ মসজিদ, হাঁসের দীঘি, বীর কমলার দীঘি, মাথিনের ক‚প (টেকনাফ), কালারমা মসজিদ, কুতুব আউলিয়ার মাজার (রামু), রামকোটে হিন্দু মন্দির, রামকোট বৌদ্ধ কেয়াং, লামারপাড়া বৌদ্ধ কেয়াং (উখিয়া) উল্লেখযোগ্য।

ঐতিহাসিক ঘটনাবলি :

খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে বাণিজ্য ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আরব বণিক ও ধর্মপ্রচারকগণ প্রাচীন সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম ও আকিয়াবে আগমন করেন। ফলে উক্ত সমুদ্রবন্দর দুটির মধ্যবর্তী সমুদ্র উপক‚ল ও দ্বীপাঞ্চল কক্সবাজারের সঙ্গে আরব মুসলমানদের যোগাযোগ ঘটে। খ্রিস্টীয় নবম শতকে কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম হরিকেলের রাজা কান্তিদেবের শাসনাধীন ছিল। ৯৫৩ সালে আরাকানের রাজা সুলত ইঙ্গ চন্দ্র (৯৩০-৯৭৫) চট্টগ্রাম জয় করেন এবং তখন থেকে দুদীর্ঘকাল কক্সবাজার আরাকান রাজ্যের অধীন ছিল। ১৬৬৬ সালে মোগলদের চট্টগ্রাম অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত কক্সবাজার আরাকানীদের দখলে ছিল। চট্টগ্রাম বিজয়ী মোগল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরস্থ মগ দুর্গ দখল করলে আরাকানীরা পলায়ন করে রামু দুর্গে অবস্থান নেয়। পরে আরাকানীদের বিতাড়িত করে মোগলরা রামু দুর্গ দখল করে নেয়।

আরাকানী মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের অত্যাচার ও লুণ্ঠনের ভয়ে তখন কক্সবাজার এলাকায় তেমন জনবসতি ছিল না। কোম্পানি কর্তৃক চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব লাভের পর বহু মুসলমান জমিদার তাদের প্রজাদের নিয়ে বঙ্গোপসাগারের দ্বীপসমূহে বসতি স্থাপন করেন। এই অঞ্চলে জনবসতি বৃদ্ধির জন্য কোম্পানি খাজনা ছাড়া বা নামমাত্র খাজনায় কৃষকদের ভূমিদানের নীতি গ্রহণ করে। ফলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন অংশ থেকে এবং আরাকানের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর লোক কক্সবাজার অঞ্চলে বসবাসের জন্য আসতে থাকে। ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া (১৭৮২-১৮১৯) আরাকান দখল করে আরাকানীদের ওপর নৃশংস অত্যাচার চালান। বর্মীদের অত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আরাকানীরা দলে দলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। জঙ্গলাকীর্ণ এলাকাকে আবাদযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে কোম্পানি উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয়। ১৭৯৯ সালে আরাকানী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি প্রতিটি উদ্বাস্তু পরিবারকে ১ হেক্টর জমি বন্দোবস্ত দেন এবং ছয় মসের রসদ বাবদ ২৬ মণ করে খাদ্যশস্য ঋণ প্রদান করেন। কিন্তু আরাকানী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কাজ শেষ করার আগেই হিরাম কক্স মৃত্যুবরণ করেন (১৭৯৯)। ক্যাপ্টেন কক্সের স্মৃতি রক্ষার্থে তার নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই থেকেই কক্সবাজার নামের উৎপত্তি।

কক্সবাজারে যখন চাকরির বয়স সবেমাত্র এক মাস তখন হঠাৎ করে একদিন খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ এলো সেন্টমার্টিন দ্বীপে যেতে হবে, কারণ অনুসন্ধানে জানতে পারলাম অবজারভার পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে- সেন্টমার্টিনে লোক না খেয়ে মারা যাচ্ছে। বিষয়টি তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদের নজরে আসায় তিনি সরেজমিন পরিদর্শনপূর্বক বাস্তব অবস্থা এবং করণীয় কর্তব্য উল্লেখ করে প্রতিবেদন পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। স্থির করলাম উখিয়ার অভিজ্ঞ থানা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মতিউর রহমান সাহেবকে নিয়ে পরদিনই সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করব। বিষয়টি টেলিফোনে তৎকালীন টেকনাফের ইউএনও মোহাম্মদ হাসানের সাথে আলাপ করি। তিনি জানান, সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকেও বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। তিনি আগামী পরশু উপজেলা পরিষদের অন্য কর্মকর্তাসহ সেন্টমার্টিনে যাবেন। অগত্যা তাঁর সাথে একত্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

সেন্টমার্টিন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১-৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু একটি প্রবাল দ্বীপ। যাতায়াতের একমাত্র বাহন ছিল ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ১৯৮৪ সালে আমরা যখন সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করি, তখন ওটা ছিল টেকনাফের একটি ওয়ার্ড, লোকসংখ্যা প্রায় ২,৫০০। ওখানে গিয়ে জানা গেল সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য পরিদর্শনের জন্য নৌবহিনীর একটি জাহাজে করে ঢাকা থেকে বিভিন্ন পত্রিকার একদল সাংবাদিককে সেন্টমার্টিনে পাঠানো হয়েছিল। কদিন ধরে বর্ডারে কড়াকড়ি থাকায় বার্মা থেকে কোনো চাল আসছিল না, তাই লোকজন সাংবাদিকদের কাছে না খেয়ে আছি বলে ওভাবে রিপোর্ট করেছিল।

দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পর পুনরায় সেন্টমার্টিনে ভ্রমণের সুযোগ এলো প্রশাসন একাডেমি শাহবাগের উদ্যোগে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিগত ২৯ মার্চ ২০০৭ থেকে ১ এপ্রিল ২০০৭ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাডারের পঁচিশজন উপসচিবকে সেন্টমার্টিনে শিক্ষা সফরে পাঠানো হয়েছিল।

ভ্রমণ পর্ব

এক.

আমাদের ভ্রমণ কমিটির আহ্বায়ক হলেন শিক্ষা ক্যাডারের ড. মো. আবদুল হক তালুকদার। শিক্ষকতা জীবনে একাধিকবার ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা ভ্রমণের আয়োজন করে এ বিষয়ে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। আমরাও তার মেধা ও অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের ভ্রমণকে যথার্থ অর্থেই অর্থবহ করেছি। টিম লিডার ছাড়াও একাডেমির পক্ষ থেকে আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর মো. এমদাদুল হক সর্বক্ষণ আমাদের গাইড ফিলোসফার এবং বন্ধু হিসেবে আনন্দময় সঙ্গ দান করে আমাদের ভ্রমণকে অর্থবহ এবং প্রাণবন্ত করে তোলেন।

নির্দিষ্ট দিনে সকাল ৮টায় চৈত্রের ধূলি উড়িয়ে রাজারবাগ থেকে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। গ্রিন লাইনস-এর ‘স্কেনিয়া’ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসযোগে। সারা পথ হাস্যরঙ্গ, কৌতুক, গান, আবৃত্তি করতে করতে বেলা ২টা নাগাদ আমরা চট্টগ্রামে পৌঁছলাম। সিটিবির প্যাকেট ট্যুরের গাইড মো. খালেদ মাঝেমধ্যেই আমাদের প্রােজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করে আমাদের সহযোগিতা করছিলেন। চট্টগ্রামে আমরা মধ্যাহ্নভোজ সারলাম ‘ক্যাফে জামান’-এ চট্টগ্রামের রূপচাঁদা মাছ সহযোগে।

বিকেলে বক্সবাজারের পথে লোহাগড়া হারবাং-এ আমরা থামলাম নয়নাভিরাম, বাঙালি ঐতিহ্যে সাজানো পান্থশালা ইনানী রিসোর্টে। পূর্বে বক্সবাজার রুটে পর্যটকদের যাত্রা বিরতির আধুনিক কোনো পান্থশালা ছিল না। জানা যায়, বিগত ১ জানুয়ারি ১৯৮৭ থেকে এটি বেসরকারি উদ্যোগে চালু হয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষত কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিনের ভ্রমণশিল্প বিকাশে ‘ইনানী রিসোর্ট’ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। সন্ধ্যার পরপরই আমরা কক্সবাজার পৌঁছলাম এবং উঠলাম সৈকতের পাশেই কলাতলীতে ‘লেছিম হোটেলে’। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীরে নেমে এলো অবসাদ। হরেক রকম শুঁটকি ভর্তা সহযোগে রাতের আহার শেষে আমাদের জানিয়ে দেয়া হলো আগামী দিনের পরিকল্পনা।

পরদিন ভোর ৫টায় শুরু হলো হক ভাইয়ের ডাকাডাকি। কারণ ভোর ৬.৩০ মিনিটের ভেতরই যাত্রা শুরু করতে হবে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যেতে বাসে লাগে প্রায় দুঘণ্টা। ৮.৩০ মিনিটের ভেতর টেকনাফ পৌঁছতে না পারলে ৯টায় সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ‘ঈগল’ জাহাজটি ধরতে পারবো না। সময়ের ব্যাপারে বাঙালির যথেষ্ট বদনাম থাকলেও আমরা যথাসময়েই টেনাফ রওনা হলাম। নাস্তাপর্ব বাসের ভেতরেই সমাধা করতে হলো। পথে চৈত্রের ঘন কুয়াশা এবং লবণ পানির ভেজা রাস্তা থাকা সত্ত্বেও যথাসময়েই আমরা টেকনাফ পৌঁছলাম। আবহাওয়ার বৈরী আচরণ আমাদের অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করল।

দুই.

নাফ নদীতে ভাসিয়ে রাখা ‘ঈগল’-এ উঠেই নদীর ফুরফুরে হাওয়ায় মনটা ভরে উঠল। মনের ভেতর নেচে উঠল আমার ভেতরের অন্য এক শিশু মন। আগে সাগরের ভয়ে শুধুমাত্র ইঞ্জিন নৌকাকে ভরসা করে পর্যটকের ইচ্ছা থাকলেও সেন্টমার্টিনে যাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছাটাকে সে মনের ভেতর ঘুম পাড়িয়ে রাখতেন। আর এখন কক্সবাজার ভ্রমণ মানেই টেকনাফ সেন্টমার্টিন ভ্রমণ। যে কারণে এই চৈত্রের কড়া রোদ উপেক্ষা করেও অফসিজনে দেখা গেল প্রায় পাঁচশর ওপর পর্যটক চেপে বসেছে ত্রিতল বিশিষ্ট এই জলযানে। জাহাজ ছাড়ার আরো মিনিট পনেরো বাকি। আমরা এক্সিকিউটিভ ক্লাসে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে নাফ নদী এবং নদীর উপারে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ানমারের সারি সারি পাহাড়ের বুকে মেঘ রোদের লুকোচুরি খেলা দেখতে লাগলাম। তখন কুয়াশা কেটে গেছে। রোদ ঝলমল তরতাজা সকাল। সূর্যের তাপ তখনো ততটা বাড়েনি। কর্মব্যস্ত বন্দরে কুলিদের হাঁক-ডাক। শান্ত নাফ নদীর বুকে কাঁপন উঠিয়ে মাছধরা নৌকাগুলো এগিয়ে যাচ্ছে সাগরের পানে। তীরে অনেক দূর পর্যন্ত ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ-বন ও পাহাড়ের তলাতে নাফ নদীর লুকোচুরি খেলা। মনে হলো গেয়ে উঠি ‘হৃদয় আমার নাচেরে…’। কিন্তু আমি তো গায়ক নই, তাই দ্বারস্থ হলাম সরাফ উদ্দিনের কাছে। আমাদের টিম লিডার হক ভাই, মোছাদ্দেক আলী ভাইও এ বিষয়ে কম কিসে।

বেলা নয়টা পনেরো মিনিটে ‘ঈগল’ ছাড়ল সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৪২ কিলোমিটার। ২৫ কিলোমিটার নাফ নদী আর বাকি ১৭ কিলোমিটার খোলা সাগর- যা সেন্টমার্টিন চ্যানেল নামেই পরিচিত। যেতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। ঢেউহীন শান্ত নাফ নদী। ডানে গভীর বনরাজিতে ঢাকা টেকনাফের পাহাড়-শ্রেণি, বাঁয়ে মায়ানমারের টিলা-উপটিলা ঢাকা আরাকনের মংডু শহর। নাফ নদী বাংলাদেশ-মায়ানমারের সেতুবন্ধন।

শাহপরী দ্বীপ ছাড়িয়ে ‘সিন্দবাদ’ এগিয়ে গেল সাগরের দিকে। বদর মোকাম হলো বাংলাদেশের সর্বশেষ সীমানা। নাফ নদীর মোহনায় দেখলাম ছোট ছোট চর জেগে উঠেছে। ১৯৮৪ সালে ভ্রমণের সময় এখানে কোনো চর দেখিনি। নদী ড্রেজিং না হওয়ায় ভরাট হয়ে ছোট ছোট চরের সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশে এটা একটা বড় অন্তরায়। জাহাজ সাগরে পড়তেই কিছুটা দুলুনি শুরু হলো, তবে তা বর্ষাকালের মতো ততো তীব্র নয়। সাগরে ঘণ্টাখানেক চলার পরই সামনে ডানদিকে সাগরের বুকে ভেসে উঠলো নারকেল সুপারি গাছে ঘেরা নারকেল জিনজিরা বা সেন্টমার্টিন দ্বীপ। বাঁয়ে মায়ানমারের পাহাড়গুলো এত কাছে মনে হলো যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৫ কিলোমিটার লম্বা ও চওড়া কোথও ২, কোথও ১ কি. মি. বা তার চেয়েও কম। দক্ষিণ দিকে সামান্য দূরে শুয়ে আছে আরেকটি ‘ছোট্ট দ্বীপ’ নাম ছেঁড়া দ্বীপ’ সম্ভবত মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে বিধায় তার এই নমকরণ করা হয়েছে। এক্সিকিউটিভ ক্লাসের আরাম কেদারায় ততক্ষণে আমাদের ঘুমকাতুরে সতীর্থ আলতাফ ভাইয়ের এক ঘুম হয়ে গেছে। এবার নামার প্রস্তুতি। লিডার সবাইকে ডেকে পরবর্তী গন্তব্য স্থান এবং করণীয় সম্পর্কে অবহিত করলেন। সূর্য তখন প্রায় মধ্যগগনে। ‘ঈগল’ ভিড়লো নতুন জেটিতে। পাশেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মচারী মাইকে ঘোষণা করছিলেন- পর্যটকরা যেন সেন্টমার্টিনে ভ্রমণের সময় পরিবেশ বিপন্ন করে এমন কিছু না করে বা সঙ্গে না নিয়ে যায়।

তিন.

আমরা উঠলাম সিটিবির রিসোর্ট ‘শ্রাবণী’তে। কিছুটা ভ্যানে, কিছুটা পায়ে হেঁটে ওখানে পৌঁছে দেখলাম গত দিনের পর্যটকরা এখনো কক্ষ ছাড়েননি। তারা ৩টায় জাহাজ ধরে ফিরে যাবেন টেকনাফে, তাই অন্তত দুই ঘণ্টা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। নিজস্ব কক্ষ পাওয়ার অপেক্ষায় আমরা এক কক্ষে কয়েকজন মিলে গল্প আড্ডায় মেতে উঠলাম। এরই মধ্যে আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর এমদাদ স্যারের নেতৃত্বে একটা দল ফিরে এসেছে সমুদ্রস্নান করে। শুক্রবার বিধায় অন্যরা ছুটলেন জুমার নামাজ পড়ার জন্য। পশ্চিমে সমুদ্রের দিকে মুখ করা সমুদ্রের প্রায় পাড়েই আমাদের এ দ্বিতল রিসোর্টটি। রিসোর্টটির নিচতলায় বসে বসে সমুদ্রের দৃশ্য দেখতে দেখতে সমুদ্রের বাতাস আমাদের ক্ষুদাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলেছিল। একটু পরেই খাবারের ডাক এলো। টাঙ্গাইলের হাস্য রসিক ম্যানেজার তালুকদার সাহেব- যখন মোটা চালের ভাতের সাথে কোরাল মাছের ঝোল আর টম্যাটোর চাটনি পরিবেশন করলেন- তখন তৃপ্তির সাথে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতোই গো-গ্রাসে গিলছিলাম সেই আহার্য।

খাবার টেবিলেই টিম লিডার ঘোষণা করলেন- বিকেলে সমুদ্রের বেলাভূমি পরিদর্শনে বের হওয়ার প্রোগ্রাম। সূর্যের প্রখরতা তখনো কমেনি। কিন্তু আমাদের ভেতরের উচ্ছ¡াস এবং শিশুসুলভ কৌতূহল মেটাতে একটু পরেই নেমে পড়লাম সমুদ্রের তীরে। সোজাসুজি হাঁটতে হাঁটতে প্রবাল, পাথর ঝিনুক, কেয়াবন, সমুদ্রগুল্ম দেখতে দেখতে সেই বিকেলে আমরা চলে এলাম দ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত। এখানে স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইউএনডিপির সহযোগিতায় তৈরি করেছে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রকল্পের মূল গেটে তালা থাকায় বাইরে থেকে দেখতে হলো নতুন স্টাইলে নির্মিত এর ঘর বাড়ি। এখানে সেন্টমার্টিন খুবই অপ্রশস্ত মনে হলো মাত্র অর্ধ কিলোমিটারের কম প্রশস্ত।

এবার ফেরার পালা। আমরা সূর্যান্ত দেখলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। সূর্য ডুবে ধীরে ধীরে চাঁদ জেগে উঠলো আমাদের মাথার ওপর। আমাদের ভ্রমণের সময় পূর্ণিমা ছিল। তাই জ্যোৎস্নাস্নাত সেন্টমার্টিনকে মনে হয়েছিল আশ্চর্য এক স্বপ্নপুরী। সমুদ্রের জোয়ার বারবার আছড়ে পড়ছিল তীরে। গর্জন কক্সবাজারের মতো তীব্র তীক্ষè না হলেও সেন্টমার্টিনের ঢেউয়ের গর্জন, কেয়াপাতার মর্মরধ্বনি, টুনটুনি পাখির ক‚জন আলাদা একটা অপার্থিব ধ্বনি সৃষ্টি করেছিল। জ্যোৎস্না রাতে ঢেউয়ে ভেসে ভেসে সমুদ্র স্নান-নতুন মাত্রা স্বাদ যোগ করেছে আমাদের এ ভ্রমণ পর্বে। এর পরে বের হই কিছু তথ্য সংগ্রহের কাজে। দ্বীপে বিদ্যুৎ নেই। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের জেনারেটর এবং ঈশ্বর প্রদত্ত চন্দ্রালোকই একমাত্রা ভরসা। ১৯৯৩ সালে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ছিল। যেটি বর্তমানে অচল।

রিসোর্টে ফিরে আমাদের প্রস্তুতি শুরু হলো বার বি কিউ আয়োজন করা নিয়ে। রাতে আহারের পরে পরেই নেমে গেলাম নিচে। এবার মুখ্য ভূমিকায় জিকরুর রেজা খানম। ৮২ ব্যাচের খ্যাতিনাম রম্য লেখিকা এবং শিশুসাহিত্যিক জিকরুর রেজার স্বভাবসুলভ হাসি এবং প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অনুষ্ঠান হলো- ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে…’ কোরাস গানের মাধ্যমে। লটারির মাধ্যমে নির্বচিত আবৃত্তি, গান, কৌতুক পরিবেশনের মাঝে রাত গভীর থেকে গভীরতর হলো। এমদাদ স্যারের স্মৃতি জাগানিয়া দেশাত্মবোধক গান- নতুন করে করে চেনালো দেশ, মাটি ও মানুষকে। ঝলসানো মাছে চামচ লাগাতে লাগাতে হক স্যার স্মরণ করে দিলেন আগামীকাল ভোরে ছেঁড়া দ্বীপে অভিযানের কথা।

পরদিন ভোরে খিচুরি এবং ডিম ভুনা সহযোগে প্রাতঃরাশ সারার পর পরই যাত্রা শুরু করলাম ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশে। এবারের বাহন ইঞ্জিন নৌকা। যদিও আমাদের দলনেতা একবার প্রস্তাব করেছিলেন ভোরবেলায় হেঁটে যাওয়ার। এক ঘণ্টার ভেতরেই আমরা ছেঁড়া দ্বীপে পৌঁছালাম। সমস্যা হলো ট্রলার তীরের কাছে যেতে পারবে না। পানি কম। প্রবাল লেগে তলা ফেটে যেতে পারে। তীর থেকে ৩০-৩৫ গজ দূরে নোঙর ফেলা হলো। এখান থেকে ছোট ছোট ডিঙি করে কয়েকবারে যেতে হলো তীরে। ছেঁড়া দ্বীপে এসেই প্রবাল দেখার ইচ্ছে ভালোভাবেই পূরণ হলো। আমরা এসেছি ভাটার সময়। দ্বীপ থেকে পানি অনেক দূরে শিলাস্ত‚পের পাশাপাশি প্রবালও জেগে আছে অনেক। এখানকার পানি একেবারে স্বচ্ছ। অনেক নিচ পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা গেল। প্রবাল এবং শিলাস্ত‚পের ফাঁকে ফাঁকে দেখা গেল রঙিন মাছের ঝাঁক। স্বচ্ছ পানিতে স্নান করার লোভ সামলাতে পারলাম না। তবে শিলার আঘাতে হোঁচট খেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে থাকলাম কিচুক্ষণ। ছেঁড়া দ্বীপের একমাত্রা বাসিন্দা, যিনি পর্যটনের মৌসুমে ৩-৪ মাস এখানে থাকেন- বিভিন্ন দোকান নিয়ে বসেছেন। আমরা ডাবের পানি খেয়ে আমাদের সহকর্মী ভোম ভোলানাথের ধ্যান ভাঙিয়ে ছোঁড়া দ্বীপ ঘুরে ঘুরে দুপুর নাগাদ সেন্টমার্টিনে প্রত্যাবর্তন করলাম। এবার কেনাকাটার পালা। সবাই ব্যস্ত হযে পড়লো সেন্টমার্টিন থেকে কিছু না কিছু কিনে নেয়ার জন্য। কেউ শুঁটকি, কেউ আচার, কেউবা বার্মিজ লুঙ্গি, স্যান্ডেল, শাড়ি ইত্যাদি সাধ্যমতো কেনাকাটা করলো। রিসোর্টে ফিরতে ফিরতে বেজে উঠলো বিদায় সুর।

চার.

অন্তরায় সমূহ এবং প্রস্তাবনা :

ঢাকা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সরাসরি ভালো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চালু করা আবশ্যক। কক্সবাজারের মতো টেকনাফে ও সেন্টমার্টিনে বিলাসবহুল ও বিদেশিদের বসবাসের উপযোগী হোটেল/মোটেল থাকা বাঞ্ছনীয়।

নাফ নদীর চরা পড়া অংশগুলোতে প্রতি বছর ড্রেজিং প্রয়োজন।

আরো বিলাসবহুল সমুদ্রগামী নৌযান তৈরি করা এবং সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানানো।

সেন্টমার্টিনে বিদ্যুৎ সার্বক্ষণিক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি/বেসরকারি উদ্যোগে স্থানীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা আবশ্যক।

রাস্তাঘাটসহ সেন্টমার্টিনের অবকাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

ছেঁড়া দ্বীপে একটি জেটি নির্মাণ করা আবশ্যক।

বিদেশিদের আকর্ষণ করার জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপে একটা হেলিপ্যাড বা ছোট সাসনা বিমান উড্ডয়ন/অবতরণ উপযোগী গ্রাউন্ড নির্মাণ আবশ্যক।

হাসপাতাল, পুলিশ ফাঁড়ি, টেলিফোন, ফায়ার সার্ভিসসহ জরুরি অত্যাবশ্যক সার্ভিসসমূহ আরো জোরদার করা আবশ্যক।

কুটিরশিল্প সমৃদ্ধ আধুনিক বিপণি বিতান, স্থানীয় সাংস্কৃতিক উপাদান বিদেশিদের কাছে তুলে ধরার জন্য একাডেমি প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।

বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, স্থানীয় জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক।

সামুদ্রিক বিভিন্ন ধরনের মাছ আস্বাদনের জন্য প্রয়োজন নাফ নদীর মোহনায় একটা ভাসমান রেস্তোরাঁ তৈরি করা।

পাঁচ.

পর্যটনের অমিত সম্ভাবনার অপর নাম সেন্টমার্টিন। পৃথিবীর বহু দেশের মতো কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, ছেঁড়া দ্বীপকে বিশেষ পর্যটন জোন হিসেবে ঘোষণা করে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরাও অর্জন কতে পারি লাখ লাখ বৈদেশিক মুদ্রা। যে দেশে রয়েছে বিপুল জলরাশি, পাহাড়, সমতলভূমি, সবুজের সমারোহ এবং বৃক্ষরাজি, সে দেশের মানুষ কিভাবে এত দরিদ্র থাকে? সে দেশের মানুষ কিভাবে না খেয়ে মরে? আমাদের সম্পদ, প্রজ্ঞা এ প্রকৃতিকে যদি সত্যিকার অর্থে পর্যটন ক্ষেত্রেও সামান্যতম প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে আমরা হতে পারি পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দেশের সুখী নাগরিক। আমরা সে দিনের অপেক্ষায় রইলাম।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj