সমর বাঁচতে চায়নি : শিতাংশু গুহ

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

অনেকদিন পর সমরের কথা মনে পড়লো। মাঝে মধ্যে সমরের কথা মনে পড়ে না তা নয়, মনে হলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। আবার ভুলে যাই। এবার যখন মনে এলো, তখন ভাবলাম, সমরের কথা লিখি না কেন? কি লিখবো? কিইবা বা আছে সমরকে নিয়ে লেখার? সেই একঘেয়ে ব্যর্থ জীবনের কাহিনী। এক তরুণের হারিয়ে যাবার গল্প। এ স্বেচ্ছায় হারিয়ে যাওয়া। হাল ছেড়ে দেয়া। মৃত্যুর মাঝে জীবনের শান্তি খোঁজা। ফাঁসির আসামি শুয়ে শুয়ে মাকড়সার জাল বুনে অপলক নেত্রে। শুধুই দেখে। তাকিয়ে থাকে। কিচ্ছু ভাবে না। ভাবার কথা মাথায় আসে না। সব ভাবনা এসে মিশে ফাঁসির রজ্জুতে। সমর ফাঁসির আসামি ছিল না, তবুও নিজের অজান্তেই ভাবতে ভুলে গিয়েছিল। বাঁচার সংগ্রামে জয়ী হবার কথা ওর মনে আসেনি। শুরুতেই ও হেরে যায়, হার মেনে নেয়। পরাজয়কে বেছে নেয়।

যে মরবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে বাঁচানো কঠিন। আমরা, অথবা সমরের বন্ধুরা চেষ্টা করেও সমরকে বাঁচাতে পারিনি। সমর বাঁচতে চায়নি। আর আমাদের সামর্থটাই কি ছিল যে সমরকে বাঁচাবো? সমর আত্মহত্যা করেনি। আত্মহত্যা করার সাহস ওর ছিল না। সমর বরং বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে ডেকে ডেকে চটজলদি নিয়ে এসেছে। ভয় পায়নি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে। সমরের যত ভয় ছিল জীবনকে। তাই জীবনকে ও বেছে নেয়নি। এ এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ। মৃত্যুর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া। রাগে-দুঃখে মানুষ অনেক সময় বলে, ‘মরলে বাঁচি’। সমর মরেই বাঁচতে চেয়েছে। সমর মরেছে। সমর বেঁচেছে। আমি তখন আমেরিকায় চলে এসেছি। একদিন সমরের বন্ধু রতন কল দিল। জানালো, সমর হাসপাতালে। অবস্থা আশঙ্কাজনক। সচরাচর প্রবাসীদের কাছে এমনতর কলের অর্থ হচ্ছে, এতদূর থেকে তোমরা তো কিছু করতে পারবা না, পরিবারকে কিছু টাকা পাঠিয়ে দাও। সমরের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তা ছিল না। তবু ওর জন্যে অনেকের মতো আমার মনের তাগিদ হয়তো তাই ছিল। সে যাত্রায় সমর বেঁচে যায়। ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু এসেই আবার শুয়ে পরে। শয্যা ও ছাড়েনি। সমর হয়তো মনে মনে চিতা-শয্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর কিছুদিন পর আবার ফোন। চাঁদপুর থেকে। এবার রতনের বড়ভাই মিলন। আমার বন্ধু। জানালো, ‘সমর নেই’। ছোট্ট দুটি শব্দ। অথচ কত গভীর বেদনার। সব শেষ। সমর অধ্যায়ের যবনিকা। সমর আমাদের বন্ধু ছিল না। আমারও না, মিলনেরও না। বরং ও ছিল আমাদের ছোটভাই, অথচ বন্ধুর মতো। পরে হয়তো বন্ধুই হয়ে গেছিল। তবু মনে হয়, একটা ফাঁরাক ছিল। সমর নিজেই সেই ফাঁরাকটা রেখেছিল। সময়ের ব্যবধানে সেটা বেড়ে যায়। আমার জন্যে সেটা ছিল দূরত্ব। মিলনের জন্যে তা ছিল না। সমর, মিলন, রতন, আমরা সবাই চাঁদপুরের। শহরের ছেলে। পড়াশোনার কারণে আমি ঢাকা থাকতাম। সমরের সাথে দূরত্ব তখনই বাড়ে। তারপর আমেরিকা চলে এলে সেটা হয়ে যায় বিশাল দূরত্ব, সুদূর। তার ওপর সমরের নিজেকে গুটিয়ে নেয়া দূরত্ব বাড়িয়েছে বৈকি। মিলনরা একই শহরে থেকেও সমরের সাথে দূরত্ব কমাতে পারেনি। ওরা চেষ্টা করেছে, পারেনি। সমর শামুকের ন্যায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। ও প্রতিজ্ঞা করেছিল, ‘এ জীবন রাখবে না, ও মরবে’। যে মরবে, তাকে বাঁচায় কে?

তখন আমি ঢাকায় পড়ি। ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাই। সমরের বাসায় ওকে দেখতে গেলাম। সাথে মিলন। তখন ভর-দুপুর। সমরের বৌদি ঘরে নিয়ে গেল। সমর কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। আমাদের দেখে উঠে বসলো। কথা হলো। অনেক কথাই বললাম। ওকে শারীরিক অসুস্থ মনে হয়নি। সমরকে জীবনের হাতছানি দেখতে চেষ্টা করলাম। বললাম, সমর তোর এখন যা বয়স, সেই বয়সে অর্থাৎ ১৮/১৯ বয়সে আমি মরতে বসেছিলাম। তুই টের পাসনি, মিলন পেয়েছে। জিজ্ঞাসা কর মিলনকে। মিলন সায় দিল। বললাম, তোর যে রোগ হয়েছে, আমি তার চেয়ে ঢের ডেঞ্জারাস রোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমি হার মানিনি। জীবনের ছন্দপতনও ঘটতে দেইনি। এখনো আমি সেই রোগের চিহ্ন বয়ে বেড়াই। কিন্তু আমি সুস্থ। বরং অনেকের চেয়ে আমি স্বাস্থ্যবান। স্বাস্থ্য সচেতন। আমি জয়ী। মৃত্যুর কাছে হার মানিনি, কারণ আমি জীবনকে বেছে নিয়েছি, মৃত্যুকে নয়! সমরকে বললাম, তুইও পারবি। ওঠ।

কবির ভাষায়, জীবন বড় সুন্দর। বললাম, সমর, তুই জীবনকে বেছে নে। বিছানা ছেড়ে লাফ দিয়ে ওঠ। তোর কিচ্ছু হয়নি। এই রোগে মানুষ মরে না। তুইও বাঁচবি। সমরকে আশান্বিত মনে হলো না। জিজ্ঞাস করলো, আপনার কী হয়েছিল? বললাম। শুনে বললো, আপনার রোগটা বাইরে থেকে দেখা যায় না, আমার অসুখের চিহ্ন দেহের সর্বত্র। এ চেহারা নিয়ে মানুষের সামনে যাই কী করে? যে সময়টায় আমরা সমরকে দেখতে যাই, তখন সমর সত্যি সত্যি শারীরিকভাবে সুস্থ ছিল। ওর চোখেমুখে তখন উনিশ-বিশ বছরের যুবকের ঔজ্জ্বল্য কমেনি। দেহে অসুখের ছাপ আছে ঠিকই, কিন্তু তখনো সেটা এতটা বিশ্রী নয় যে জনসমক্ষে বেরুনো যাবে না। চাঁদপুরের মতো ছোট মফস্বল শহরে তখনো ওটা যে একটা গুরুতর অসুখ সেটা বোঝার মত মানুষের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। তবু, সমরকে ঘর থেকে বের করানো যায়নি। ওর বিধবা বৌদি জানালো, সমর বিছানা থেকে ওঠেই না। নিত্যনৈমত্তিক কর্ম ছাড়া বিছানাই ওর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। বৌদি অনেকটা অনুনয়ের সাথেই বললো, আমরা যাতে চেষ্টা করি ওকে ঘরের বাইরে নিতে। আমরা পারিনি। আমরা ব্যর্থ। সমরকে আমরা বাঁচাতে পারিনি।

সমর অমনটা ছিল না। ইন্টারমেডিয়েট পাস করার পর সমর ঢাকায় অনার্সে ভর্তি হয়। অনেক আশা ওর বুকে। আমরা সবাই ভীষণ খুশি। সমর ঢাকায় পড়ে। কালাচাঁদ ওরফে বুধা তখন ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে পড়ে। ওর ওপর দায়িত্ব ছিল সমরের দেখভাল করার। আমি ঢাকা ভার্সিটিতে। কথা ছিল, বুধা না পারলে, প্রয়োজন হলে আমি তো আছিই। ভালোই চলছিল কিছুদিন। তবে খুব বেশিদিন নয়। সুখ যে সমরের কপালে লেখা ছিল না! চাঁদপুর এলে আমরা সবাই একসাথে আড্ডা মারতাম। আমি নিজের বাসা ছেড়ে প্রায়শ ঘুমাতাম মিলন অথবা সমরের বাড়িতে। এমনি একবার কোনো ছুটিতে আমরা সবাই চাঁদপুরে। সেদিন ছিল সরস্বতী পূজা। আমার স্পষ্ট মনে আছে। আগের রাতে আমি সমরের ওখানেই ঘুমাই। ভোরে উঠে স্নানটান সারি, অঞ্জলি দেবো, কারণ আমি তখনো ছাত্র। বিদ্যাদেবীর আশীর্বাদ তো চাই।

সমরদের বাড়ির ঘটে একটি বড় পুস্করণি ছিল। সেখানেই স্নান করি। শীতের সকাল, উঠান দিয়ে যাবার সময় দেখি, সমরের বড়দা গায়ে তেল মাখছে। আমি স্নান সেরে জামাকাপড় পরে বাইরে চলে যাই, সম্ভবত ওয়ান মিনিট মোড়ে বা সমরদের ওষুধের দোকান, ‘আমেরিকান হোমিও হল’-এ। ওয়ান মিনিট চাঁদপুরের সুবিখ্যাত মিষ্টির দোকান। আড্ডাকেন্দ্র। আমাদের দাদারা ওখানে আড্ডা মারতো, তারপর আমরা, এখনো সেটা আড্ডাস্থল। সমরের বাবার পর ওর দাদা ওদের ওষুধের দোকানে বসতেন। মাঝেমধ্যে সমরও বসতো। সেদিন সম্ভবত সমর বা অন্য কেউ দোকান খুলে। খুব সকালে আড্ডা না জমলেও আমরা যেয়ে বসতাম। সেদিনও যাই। সমরদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় দেখি ওর বৌদি পূজা নিয়ে ব্যস্ত। দাদা কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে তেল মেখে সূর্য্যের ঝলমলে আলোতে স্নানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এমনিতে সমরের দাদার সাথে কখনোই কথা হতো না। পারতো পক্ষে আমরা এড়িয়ে যেতাম। টুকটাক কথাবার্তা যা হতো, তা বৌদির সাথে। সেদিনও সকালে কারো সাথে কথা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। আমাদের বাড়িতে মা নেই, তাই পূজাও নেই। সমরের বাড়িতে পূজা ছিল। সমরও সম্ভবত পূজা, বা বাজার-টাজার নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমি একা সকালে কোন কাজ নাই, তাই খৈ ভাজছিলাম। প্ল্যান ছিল, পূজা হলে দশটা/ এগারোটার দিকে এসে অঞ্জলি নিয়ে যাবো। পূজার পর নাড়ু, পিঠা, সন্দেশ তো থাকেই। মিলনরাও আসবে। অপেক্ষা করছিলাম, কখন কেউ এসে খবর দেবে, পূজা শেষ, এবার অঞ্জলি নিতে যেতে পারি। যতদূর মনে পড়ে আমেরিকান হোমিও হলেই বসেছিলাম। আর পরিচিতদের সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলছিলাম। এমন সময় কে যেন, রিকশা করে এসে দ্রুত খবর দিলো, ‘কাবুলদা, জলদি সমরদের বাড়িতে যান’।

দ্রুত ওই রিকশাতেই উঠলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে? ‘সমরের দাদা মারা গেছেন’। কী কছ? কী করে? ঘণ্টা দেড়েক আগে তো দাদাকে দেখে এলাম স্নান করতে যাচ্ছেন? কী হয়েছে? উত্তরদাতা বললেন, ঠিক জানি না, তবে শুনেছি, পূজার পর দাদা প্রসাদ খাচ্ছিলেন, তখন কিছু একটা গলায় আটকিয়ে দাদা তৎক্ষণাৎ মারা যান। বঙ্গদেশে তখনো খাবার গলায় আটকিয়ে মানুষ মারা যায়না তা নয়, কিন্তু একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ এভাবে মারা যাবে তা ভাবতেই পারা যায় না। আমেরিকায় স্কুলে বাচ্চাদের শেখানো হয়, গলায় ‘চোক’ করলে কী করতে হবে। আমরা ওষুধের কোম্পানিতে কাজ করি, আমাদেরও তা শিখতে হয়েছে। এখন মনে হয়, তখন ওটা জানা থাকলে দাদাকে হয়তো অভাবে মরতে হতো না। আমরা দ্রুত সমরদের বাড়ি পৌছলাম। দূর থেকেই কান্নার রোল শোনা গেল। সব শেষ।

বাড়িতে মানুষের ঢল। অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। কিছুই করার নেই? মৃত্যু বড় নির্মম। নিষ্ঠুর। অন্যূন ছয় হাজার বছর আগে শ্রীগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘জন্মিলে মরিতে হইবে’। কিন্তু মৃত্যু শেষ কথা নয়। শিশুকাল, যৌবন, বার্ধক্যের মতো মৃত্যু একটি পর্যায়। মানুষ যেমনি পুরানো কাপড় পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমনি একদেহ ত্যাগ করে অন্যদেহ ধারণ করে। আত্মার মৃত্যু নেই। এতো গেল শাস্ত্রের কথা। যার যায়, বেদনা বুঝে সে। সমরের দাদার আত্মা হয়তো মরেনি, কিন্তু দাদা তো আর নেই! কবিগুরু হয়তো অনেক যাতনায় তাই বলেছিলেন, ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়’। সমরের দাদার নাম মনে নেই। কিন্তু তার মৃত্যুর কথা ভোলার মতো নয়। জলজ্যান্ত, সুস্থ-সবল, একজন মানুষ, কিছুক্ষণ আগেও যিনি ছিলেন, ঘণ্টাদেড়েকের ব্যবধানে তিনি নেই, তা মানা যায় না। আজো আমি ভাবি। এমন নয় যে এরআগে আমি মৃত্যু দেখিনি, দেখেছি। কিন্তু এই মৃত্যুর কোনো মানে হয় না।

কত বয়স হয়েছিল সমরের দাদার? জানি না। তবে বাচ্চাগুলো একেবারে ছোট ছিল বিধায় ধারণা করি চল্লিশের কোটায়, তবে নিচের দিকে। দাদার ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে আছে। ভুল না হলে ওর নাম ছিল ‘রিতা’। কারণ দাদার মৃত্যুর পরও কিছুদিন ওদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল। মিলন রিতাকে খুবই আদর করতো। বাপ্-হারা ছোট্ট রিতা। দাদার স্বাস্থ্য বলা যায় ভালোই ছিল। তখনকার সময়ে আমাদের দেশে ভালো স্বাস্থ্য বলতে যা বোঝাতো, তা হলো, মোটাসোটা, নাদুস-নুদুস। দাদা তাই ছিলেন। সমরও মোটাসোটা ছিল, তবে শক্ত গড়ন, নাদুস-নুদুস নয়। আমরা সমরকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করি। দাদার পরেই সমর। না, মাঝে বোধহয় আরো ২/১ভাই আছেন, তারা কোলকাতায় থাকেন। সমর তখন কী ভাবছিল জানি না, কিন্তু দাদার অবর্তমানে সংসারের গুরুদায়িত্ব সমরের ওপরেই পড়ার কথা? তাৎক্ষণিকভাবে সেদিন সমরের দাদার সৎকার করার দায়িত্ব সমরেরই। কোথা দিয়ে কিভাবে সব ঠিক হয়ে যায় মনে নেই, কিন্তু সন্ধ্যায় আমরা দাদার শবদেহ দাহ করি।

তখনকার সময়ে আমাদের সমাজে শবদেহ দিনাদিনেতে সৎকার করার নিয়ম। শবদেহ হিমাগারে রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখনো নেই। বড় শহরে হয়তো আছে, কিন্তু ধারণাটা একই। তখন ভাবতাম, এটা হয়তো মৃতের কল্যাণে। এখন মনে হয়, ব্যবস্থাটা জীবিতের কল্যাণে। জীবিত মানুষ মৃতকে দ্রুত সরিয়ে দেয়, ভাবটা যেন তিনি মরবেন না! আমার বাবা একটা গল্প বলতেন। গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। ত্রিশ বছর ঘর করার পর এক মহিলার স্বামী মারা যায়। গ্রামের বাড়ি। তখন বেশ রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাড়িতে শুধু মহিলা, তার মৃত স্বামী এবং এক দেবর। বাইরে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল। এতরাতে মৃতের সৎকারের ব্যবস্থা করার জন্যে লোকজন দরকার। দেবর বাইরে যেতে চাইলেন। মানুষজন খবর দিতে হবে। বৌদিকে বললেন, ‘বৌদি, তুমি কিছুক্ষণ দাদার সাথে থাক, আমি বাইরে গিয়ে লোকজন ডেকে নিয়ে আসি’। শুনে বৌদি বললেন ‘ঠাকুরপো, তুমি যেওনা, আমি একলা ঘরে থাকতে পারবো না’।

বাবা বলতেন, যাকে নিয়ে তিন দশক ঘর করলেন, সেই স্ত্রীও একদণ্ড একা মৃত স্বামীর সাথে থাকতে রাজি নন। এজন্যেই ধর্মে বলা হয়, ‘কা তব কান্তা’ অর্থাৎ ‘কেউ কারো নয়’। এবং হয়তো এ কারণেই মৃত্যুও পরক্ষণেই প্রিয়তমা স্ত্রীও স্বামীর মৃতদেহের সামনে নিজেকে একলা ভাবতে পারেন। এটাই বাস্তবতা। সমরের দাদার শবদেহের সৎকারও একই দিনে হয়। একই দিন কি, মাত্র বারো ঘণ্টার ব্যবধানে একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ পৃথিবী থেকে অপসৃত হয়ে যায়। কিশোর কুমারের সেই গান, ‘আমি নেই, ভাবতেও ব্যাথায় ব্যাথায় মন ভরে যায়’। সমরের দাদার শশ্মান যাত্রীদের মধ্যে আমি ছিলাম। মিলন ছিল। সমর তো ছিলই। স্বপন, রতন ছিল। আরো অনেকে ছিল, নাম মনে নেই। সেটা আমার জীবনের প্রথম শবযাত্রা ছিল না, কিন্তু ঘটনার আকষ্মিকতায় অনেক কিছুই আমার আজো মনে আছে। হয়তো, পুরোটা নয়, অনেকটা।

মুখাগ্নি কে করেছিল মনে নাই, হয়তো সমর বা অন্যকেউ? তবে তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। চিতায় সমরের দাদাকে শোয়ানো হয়েছে। স্নানটান আগেই সারানো হয়েছে। মৃতদেহ উপুড় করে শোয়ানো। জানলাম, চিতায় পুরুষের মৃতদেহ উপুড় এবং মেয়েদের চিৎ করে শোয়ানো হয়। শাস্ত্রীয় নিয়ম কি জানি না, তবে নিউইয়র্কে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে সৎকারের সময় কি এ নিয়ম কি মানা হয়? ক’বার গিয়েছি, লক্ষ্য করিনি। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন, এ দেশে তো সুন্দর ব্যবস্থা, বাক্সের মধ্যে যেভাবে শোয়ানো থাকে (চিৎ) সেভাবেই তো চুল্লিতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়’। তিনি বললেন, এ প্রশ্ন তো কেউ কখনো তুলেনি। আসলেই তো, এ স্থ’ূল দেহ পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে, সেটা যেভাবেই শোয়ানো হোক না কেন। প্রশ্ন সেটা নয়, মূল কথা হচ্ছে, ‘চিতাতেই সবশেষ’। সমরের দাদাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। আমাদের চোখের সামনে সমরের দাদার শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যেতে থাকে।

সমরের দাদার অধ্যায় শেষ। সমর ওদের ওষুধের দোকানে বসতে শুরু করে। চুলায় উঠে পড়াশোনা। ঢাকার পাট চুকে যায়। নিয়তি ওকে ডেকে নিয়ে আসে চাঁদপুরে। সবাই সমরকে পরামর্শ দেয়, চাঁদপুর কলেজে ভর্তি হয়ে যেতে। কিন্তু দোকানে বসবে কে? দোকানে না বসলে সংসার চলবে কী করে? জানি না সমর আবার ভর্তি হয়েছিল কিনা, মনে হয় হয়েছিলা এভাবেই চলছিল। কতদিন গেছে কে জানে। মনে নেই। আমি চাঁদপুরে এলে সমরের দোকানে আড্ডা দিতাম। সন্ধ্যায় অনেকেই আসতো। ওই সময় আমরা ওয়ান মিনিট বা ক্রিস্টক্যাফে আড্ডা দিতে কম যেতাম। সমরের ওষুধের দোকানে স্পিরিট জাতীয় নেশা করার একটি জিনিষ পাওয়া যেত। অনেকেই খেতো। চাঁদপুর থাকলে আমিও খেতাম। ভালো লাগতো না, তবু খেতাম সবার সাথে। সমর হতাশাগ্রস্থ। হতাশা থেকে স্পিরিট খাওয়া ওর দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়। এভাবেই দিন যাচ্ছিল।

একদিন দেখলাম সমরের গায়ে কালো কালো দাগ। হাতে, মুখে, শরীরের সর্বত্র। সেটাই যে প্রথম দেখা তা নয়, কিন্তু যতক্ষণ না মুখে দাগ দেখা যায়, ততক্ষণ সেটা বাইরের মানুষের কাছে অজানা থাকাই স্বাভাবিক। সমরকে আমরা পরামর্শ দিলাম, ভালো ডাক্তার দেখানোর। ও ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার কী পথ্য দেয়, আমরা জানি না। বেশ কিছুকাল সমর এক ডাক্তারের চিকিৎসাধীন থাকে। হোমিওপ্যাথি কি এলোপ্যাথি তাও মনে নেই। সমর প্রথম চেষ্টা করে দাগগুলো সারাতে। আমরা ওকে মুখে, হাতে, সারা শরীরে মলম লাগাতে দেখেছি। ফলে ওর মুখটা সবসময় তেল চটচটে থাকতো। ওর শরীরে রোগের স্পষ্ট চিহ্ন থাকলেও সমর শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিল না। সুস্থ, সবল ছিল। হাতে, মুখে, শরীরে দাগ দাগ, অথবা চামড়া শুকিয়ে উঠে যাওয়া ছাড়া ওকে অসুস্থ বলার কোন কারণ ছিল না।

সমরকে ঢাকা নিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে কথা হয়েছে। দু’চারবার চাঁদপুর-ঢাকা যাতায়াত হয়েছে। একসময় সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। সবকিছুর মূলে অর্থ। সমররা গরিব ছিল না, বিত্তবান তো নয়ই। বাড়ি-দোকান নিয়ে সংসার চলতো। কিন্তু নগদ পয়সা কোথায়? অর্থ থাকলে তো সমরের ঢাকায় পড়াশোনাটা বন্ধ হতো না। আসলে ওর দাদা যেদিন মারা যান, সমরও সেদিনই হারিয়ে যায়। দাদার মৃত্যুর পর সংসারের ঘানি টানতে টানতে সমর হারিয়ে যায়। তবু হয়তো, আর পাঁচটা ছেলের মতো সমর দুঃখেকষ্টে বেঁচে থাকতো, কিন্তু অসুখটা ওকে মেরে ফেলে। এক উঠতি যুবা যখন রঙিন স্বপ্ন দেখবে সমর তখন সংসারের জোয়াল টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের কিছু করার ছিলোনা।

আমরাও তো তরুণ। ছাত্র। আস্তে আস্তে পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করছি। তদুপরি, আমরা কেউই ধনাঢ্য পরিবার থেকে আসিনি, আসলেও কি কিছু করার ছিল?

আমি যে সময়টার কথা বলছি, সেটা ১৬/১৭ বছরকাল। এরপর আমি আমেরিকা চলে আসি। যোগাযোগ কমে যায়। একেই হয়তো নিয়তি বলে। নিয়তির বেড়াজালে সমর আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়ে যায়? ও মৃত্যুর মাঝে এ থেকে মুক্তি খুঁজে। সমরের অসুখটা কী ঠিক আমরা এখনো জানি না। সর্বাঙ্গে দাগ, চামড়া শুকিয়ে সাদা হয়ে উঠে যাওয়া, সাথে চুলকানি। সাধারণভাবে লোকে একে ‘এক্সিমা’ বলে থাকে। বলা বাহুল্য, সমরের অসুখটা এক্সিমার চেয়ে বেশি ছিল। হয়তো উন্নত দেশে এটাকে ‘স্কীন ক্যান্সার’ বলে থাকে। আমার মনে আছে, ঢাকায় আমি প্রায়শ একটি ছেলেকে ভিক্ষা করতে দেখতাম, যার পুরো শরীরটা দাগযুক্ত, চামড়া শুকানো সাদা সাদা, কিন্তু শ্বেতী নয়। শেষদিকে সমরের অবস্থা ওইরকম হয়েছিল কিনা জানি না, কারণ আমি তখন সুদূর আমেরিকায়। কাউকে জিজ্ঞাসাও করিনি। একথা জিজ্ঞাস করাও যায় না।

২০১২-র জানুয়ারিতে আমি সমরদের বাড়িতে যাই। সাথে মিলন। সমরের বৌদি প্রথমে চেনেননি। মিলন আমার নাম বলাতে চিনলেন। কতদিন হয়ে গেছে। রিতা বাড়ি ছিল না। দেখা হয়নি। বৌদিকে দেখলাম, ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে মানুষ করেছেন। স্বামীহারা, দেবরহারা একজন মহিলা সারাটা জীবন সংসার টানতে টানতে পৌঢ়ত্বে পৌঁছেছেন। এইতো জীবন। ক’বছর সংসার করেছেন জানি না, কিন্তু দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেননি। বাঁচার সংগ্রামে সমরের বৌদি, ভাস্তে, ভাতিজি প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেছেন। হার মানেননি। সমর হার মেনে পালিয়েছে। সমর নেই। ওর দাদাও নেই। সমরদের বাড়িটা ঠিক আগের মতোই আছে। আছে সেই উঠানটা। সেই উঠান, যেখানে সমরের দাদাকে সকালে আমি তেল মাখতে দেখেছিলাম। সেই উঠান থেকেই সন্ধ্যায় আমি তার শবযাত্রায় অংশ নিয়েছিলাম।

না, ওদের বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। দ্রুত চলে এসেছি।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj