মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সাহিত্য-সংস্কৃতির উপাদান : তপন পালিত

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় চিহ্নিত করণের ইতিহাস। এ ইতিহাস সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রণীত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নির্মম ও নৃশংস অত্যাচারের কাহিনী। তাদের সেই নৃশংস অপরাধের বিচারের দাবিও সেই সাথে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পেশার মানুষ স্ব স্ব পরিমণ্ডল থেকে মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখালেখি শুরু করেন। এর পাশাপাশি শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবি ও তাদের অপকর্ম সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজ। এই লেখনিগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক ও মানবতাবিরোধীদের অপরাধের বিভিন্ন চিত্র স্বতন্ত্র মহিমায় ফুটে উঠে। যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী লেখকগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে মূল্যায়ন করেছেন। তাই পরবর্তীকালে তাদের লেখালেখি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা, চেতনা বিকাশ ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলনে প্রণোদনা দান করে এবং গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা ও চেতনা বিকাশে উপাত্ত হিসেবে যেসব উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সরকারি বেসরকারি দলিলপত্র, দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকার, বধ্যভূমি-গণকবর, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা অন্যতম। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক জাদুঘর, স্মৃতি সংগ্রহশালা, পোস্টার, আলোকচিত্র, অডিও-ভিডিও এবং ডাকটিকিট, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা এ ইতিহাস রচনা ও চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সহায়ক মুক্তিযুদ্ধের অনেক গান, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপাত্ত যেমন পাওয়া যায় তেমনি এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার আন্দোলনে প্রণোদনা দানেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে শিক্ষক, শিল্পী, কবি, সাংবাদিক, নাট্যকার, সাংস্কৃতিক কর্মী, চিত্রশিল্পীর অবদান অনস্বীকার্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার আন্দোলনে সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান প্রণোদনা দান করেছে। আমার বর্তমান আলোচনায় আমি মানতাবিরোধী অপরাধ বিচার আন্দোলনে সাহিত্য-সংস্কৃতির যে উপাদানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপাদান নিয়ে আলোচনা করব।

সৃজনশীল সাহিত্যের ভূমিকা

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে বাংলাদেশের সৃজনশীল সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া চলচ্চিত্রও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কবিতা

গত চার দশক ধরে বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন; স্মৃতি ও স্বপ্ন, বাস্তবতা আবর্তিত হয়েছে একটি আবেগকে ঘিরে এবং রচিত হয়েছে বাঙালির মহত্তম কিংবদন্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোন বিমূর্ত ধারণা নয়। যে আবেগ, বিশ্বাস, চিন্তা একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখায়, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে শেখায়, ধর্মান্ধতা ও সা¤প্রদায়িকতামুক্ত, ভবিষ্যৎমুখি, অভিন্ন জাতিসত্তায় প্রণোদিত করে তাকেই বলা যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনার একটি ধারাবাহিক ইতিহাস আছে; আছে হাজার বছরের সংগ্রাম এবং লক্ষ মানুষের রক্তে রাঙানো কাহিনী। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রথম নিজেদের ‘আমরা বাঙালি’ আত্মপরিচয়ে সনাক্ত করতে পেরেছিল। এই আত্মপরিচয় বাঙালিকে অস্তিত্ব সচেতন করে তোলে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। এই চেতনাই পরবর্তীকালে সকল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটকে ও চলচ্চিত্রে প্রগতিশীল এবং প্রগতিবিরোধী ধারার মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং স্বাধীনতাবিরোধী দুটি ধারা পরিলক্ষিত হয়। গত চারদশকের সমাজ ও সৃজনশীল সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও অসা¤প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অন্যদিকে এর বিপরীত চিন্তাই পশ্চাৎগামীতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা। এই দুটি ধারার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল ধারাটির শুরু হয়েছে আগে সা¤প্রদায়িক দ্বিজাতিতাত্তি¡ক পাকিস্তানবাদ থেকে। অন্যদিকে সমকালীন সমস্ত বেদনা ও বিক্ষোভ, উত্তাপ ও সন্তাপকে অঙ্গীকার করে গণমুখি ধারায় বিকশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বাংলাদেশের কবিগোষ্ঠীর কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল স্পষ্ট। ফলে কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে নানাভাবে। যুদ্ধকালে রচিত কবিতা এবং তার অব্যবহিত সময়ের পরের কবিতার বিষয় ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নি করা যায় এভাবে-

হানাদার বাহিনীর হত্যা, লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞের চালচিত্র

মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও স্বপ্নময় আকাক্সক্ষা

স্বজন হারানোর বেদনা, মুক্তির উল্লাস, বিজয়ের পতাকা ইত্যাদি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বাঙালি জনতা সংগ্রামী ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কবি সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন একজন রাজনীতি সচেতন কবি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে তিনি তাঁর ‘বাঙলা ছাড়ো’ কবিতায় নয়া ঔপনিবেশিকদের এদেশ ছাড়ার জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই কবিতা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরিতে প্রণোদনা দান করে। কবিতায় তিনি লিখেন-

‘রক্ত চোখের আগুন মেখে ঝলসে-যাওয়া

আমার বছরগুলো

… … …

তুমি আমার আকাশ থেকে

সরাও তোমার ছায়া

… … …

তুমি আমার জলস্থলের

মাদুর থেকে নামো,

তুমি বাঙলা ছাড়ো।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা ছিলেন পাকিস্তানি ঘাতকদের নির্মম বর্বরতার শিকার। ভয়, আতঙ্ক, ত্রাসের মধ্যে বসবাস করেও তারা কবিতা রচনা করেছেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা এদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র শহর, গ্রাম ও জনপদ চিনতো না। তাদের নিয়ে এসেছে এদেশিয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী ও শান্তিকমিটির সদস্যরা। একাত্তরে হানাদারদের আক্রমণে বাংলাদেশের ছায়াঘন, স্নিগ্ধ গ্রামগুলো কিভাবে দগ্ধ হয়েছে, মানুষের ওপর কি রকম অত্যাচার, নির্যাতন চালানো হয়েছে, তারই একটি বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে জসীমউদদীনের ‘দগ্ধগ্রাম’ কবিতায়। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেন-

‘এইখানে ছিলো কালো গ্রামখানি, আম কাঁঠালের ছায়া

টানিয়া আনিত শীতল বাতাস, কত যেন করি মায়া।

কিসে কি হইল, পশ্চিম হতে নরঘাতকেরা আসি

সারা গাঁও ভরি আগুন জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি।

সারা গাঁওখানি দগ্ধ শ্মশান, দমকা হাওয়ার ঘায়

দীর্ঘ নিঃশ্বাসে আকাশে পাতালে ভষ্মে উড়িয়া যায়।’

স্বাধীনতার অল্প কিছুকাল পরেই জনজীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্যোগ, হতাশা, ভাঙচুর, ক্ষুধা, দারিদ্য, সুবিধাভোগীদের দাপট প্রভৃতি। জাতি স্বাধীনতার সুফল পায়নি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঠিক বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ দিবসে বিবৃতি, বক্তৃতা, আবৃত্তি, কথামালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয়-

‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই

আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি

… … …

এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী

স্বাধীনতা- একি তবে নষ্ট জন্ম?

একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?

জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে পুরোনো শকুন।’

কবিতা এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেছে এবং কবিতায় নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে এই অসঙ্গতিগুলো এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাঙালি যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় স্বাধীনতাই অর্জন করেছিল ১৯৭৫ সালের পর তা ক্রমেই হারাতে থাকে। পঁচাত্তর-উত্তর সময় থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়টিতে প্রবল হতাশায় নিমজ্জিত ছিল বাংলাদেশ। সৃষ্টি হয়েছিলো চরম রাজনৈতিক সংকট। এই প্রেক্ষাপটে সংকটকালের সাথে আন্দোলনরত রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কবিরাও একাত্মতা ঘোষণা করেছেন কবিতার মাধ্যমে। এই সময়ের কবিতায় উঠে এসেছে-

বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা

সাম্যবাদের স্বপ্নবয়ান

সা¤প্রদায়িকতাবিরোধী চেতনা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে পাকিস্তানিরা ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর মানুষ প্রত্যাশা করেছিল ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনী বিল পাশের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের কবিরা তাঁদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘রাজদ ’ কবিতায় অসা¤প্রদায়িক প্রগতিশীল শক্তি ও জনগণের ঐক্যবদ্ধতার আহ্বান জানিয়ে লিখেন-

‘যদি নির্বাচন হয় আমিও দাঁড়াবো, ইনশাআল্লাহ?

… … …

১৯৭৫-এ আমি হারিয়েছি আমার প্রতীক,

… … …

আমার ধর্ম নিয়ে কোনদিন প্রশ্ন করো না, যদি চাও

মাতামুহুরি ও ব্রহ্মপুত্রের নামে, বঙ্গবন্ধুর নামে

গারো পাহাড়ের ঐ উদ্দাম বুনো বাতাসের নামে, রবীন্দ্রনাথের নামে

রাজদ হাতে নেবো। যদি ভোট দাও তোমাদের দুঃখ হবো

ভালোবাসা হবো, স্বচ্ছলতা হবো, ধর্মনিরপেক্ষ হবো।’

স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা জাতীয় ক্ষেত্রে যে নৈতিক মূল্যবোধের বিনষ্টি ঘটে তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা খুবই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধারণ করার প্রত্যয় নিয়ে পরবর্তী সময়ের কবিতাগুলো লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। এই কবিতাগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত রেখে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রণোদনা দান করেছে এবং করছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে উপন্যাস

বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঐতিহ্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী প্রমুখের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক স্বরূপে পাওয়া যায়। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাজাত উপন্যাসের ঐতিহ্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঐতিহ্যের মতোই সাতচল্লিশ-উত্তর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে। আহমদ শরীফ ‘মুক্তিযুদ্ধ চেতনা: আমাদের শক্তির ও সংগ্রামের উৎস’ প্রবন্ধে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমাদের মানুষ ও সমাজ গড়ার কাজে নামতে হবে।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস এই চেতনাকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে। সামাজিক-রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে কথাশিল্পিরা একাধিক উপন্যাস লিখেছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হলো- শওকত ওসমানের ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ (১৯৭১), ‘নেকড়ে অরণ্য’ (১৯৭৩), আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ (১৯৭৩), সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ (১৯৮১), রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারী সূর্য’ (১৯৭৪), রশীদ হায়দারের ‘নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য’ (১৯৮২), আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ (১৯৭৫), সেলিনা হোসেনের ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ (১৯৭৬), হুমায়ুন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৮৬), মঈনুল আহসান সাবেরের ‘পাথর সময়’ (১৯৯০), মঞ্জু সরকারের ‘তমস’ (১৯৮৪), ‘প্রতিমা উপাখ্যান’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। উপন্যাস রচনার মাধ্যমে সামাজিক অসঙ্গতি এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্ভর উপন্যাসগুলো পড়ে তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতাবিরোধীদের অপকর্ম সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করে এবং তাদের প্রতি মনের মধ্যে ঘৃণার সৃষ্টি করে। এই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম ১৯৯২ সালের গণআদালত এবং ২০১৩ সালের গণজাগরণমঞ্চ তৈরি করে মানবতাবিরোধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিচার ও শাস্তি কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কিশোর উপন্যাস

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিশুতোষ গ্রন্থের প্রকাশনায়ও এসেছে বৈচিত্র্য। একসময় ছিল শিশু কিশোর গ্রন্থ মানেই রূপকথা বা রূপকথার অবিশ্বাস্য কাহিনীর ছড়াছড়ি। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিবছরই রূপকথা, সায়েন্সফিকশান, আবিষ্কার, জীবনীগ্রন্থ প্রভৃতি একাধিক বৈশিষ্ট্য ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাজনৈতিক উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে। এই উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম বুঝতে পারে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ, সময়ের প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে যে ফসল বাঙালির ঘরে উঠেছে তা কিভাবে মূল্যবোধ বহন করতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাসগুলো যেমন- শওকত ওসমানের ‘পঞ্চসঙ্গী’, পান্না কায়সারের ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’, রাবেয়া খাতুনের ‘একাত্তরের নিশান’, শাহরিয়ার কবিরের ‘ভয়ঙ্করের মুখোমুখি’, মঞ্জু সরকারের ‘যুদ্ধে যাবার সময়’, মমতাজউদ্দীন আহমদের ‘সজল তোমার ঠিকানা’ ফরিদুর রহমানের ‘দিনবদলের ডাক’ প্রভৃতি স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে রচিত উল্লেখযোগ্য কিশোর উপন্যাস যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে ভূমিকা পালন করে। এসব উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম খুঁজে পায় স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও স্বদেশ প্রেম। বিষয়ের রূপান্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কিশোর উপযোগী উপন্যাস সৃষ্টি, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন, যা তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত করে মানবতাবিরোধী অপরাধী বিচার আন্দোলনে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে নাটক

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের যে সূচনা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ তার ভিত্তিমূলে অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা রচনা করে। শহীদ মুনীর চৌধুরী তাঁর কবর নাটকে সংলাপ ও চরিত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের যে চিত্র অঙ্কন করেছেন মুক্তিযুদ্ধের নাটক সেই চেতনাকে অঙ্গীকার করেই বিকশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্প রচনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা যায়, সেটা হচ্ছে আমাদের গল্পকারেরা মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা করেছেন তাদের স্মৃতি বা শ্র“তি থেকে। অধিকাংশ গল্পই মুক্তিযুদ্ধের পরে রচিত। এই গল্পগুলোতে হানাদারদের নির্যাতনের ছবি ফুঁটে উঠেছে। তবে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের চিহ্ন বা সম্মুখ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা গল্পে কম উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্প সংকলনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘বাংলাদেশ কথা কয়’ (১৯৭১), আবিদ রহমান সম্পাদিত ‘প্রেক্ষাপট ৭১’ (১৯৭৯), আবুল হাসনাত সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ (১৯৮৩), হারুন হাবিব সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প’ (১৯৮৩) প্রভৃতি সংকলন। এছাড়াও একক গল্পগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- শওকত ওসমানের ‘জন্ম যদি তব বঙ্গে’ (১৯৭৫), বশীর আল হেলালের ‘প্রথম কৃষ্ণচূড়া’ (১৯৭২), হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’ (১৯৭৫), আবু বকর সিদ্দিকের ‘মরে বাঁচার স্বাধীনতা’ (১৯৭৭), সাদেকা শফিউল্লাহর ‘যুদ্ধ অবশেষে’ (১৯৮৩), খালেদা সালাউদ্দিনের ‘যখন রুদ্ধশ্বাস’ (১৯৮৬) প্রভৃতি।

নাটককে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের একটি সমৃদ্ধ ও বিকশিত সাতিহ্যশাখা বলা যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের নাটকে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবহুল জনজীবন, হানাদার বাহিনীর নির্যাতন প্রভৃতি উঠে এসেছে। এছাড়াও দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবক্ষয়িত চিত্র, একাত্তরের পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান, রাজাকারদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি। নাটকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে নানাভাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে প্রণোদনাদানকারী কয়েকটি নাটক হলো- মমতাজউদ্দীন আহমদের ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ (১৯৭২), ‘একটি জাতি একটি ইতিহাস’ (১৯৭২), আবদুল্লাহ আল-মামুনের ‘এখনও ক্রীতদাস, সৈয়দ শামসুল হকের ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ (১৯৮৭), নীলিমা ইব্রাহিমের ‘যে অরণ্যে আলো নেই’ (১৯৭৪), মান্নান হীরার ‘জননী বীরাঙ্গনা’ (১৯৯৬), মামুনুর রশীদের ‘জয় জয়ন্তী’ (১৯৯৭), প্রদীপ দেওয়ানজীর ‘দাবি’ (২০০৪), দীপক চৌধুরীর ‘স্বাধীনতার ময়নাতদন্ত’ (২০০২) ইত্যাদি।

নাটকগুলোতে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবক্ষয়িত চিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের বিপর্যস্ত অবস্থা, স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্থান, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল প্রভৃতি উঠে আসে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উদ্ধুদ্ধ হয়ে উঠে এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্পর্কে জানতে পারে। তারা স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। এক সময় রাজাকার কথাটি উচ্চারণ পর্যন্ত করা নিষেধ ছিল। সেই সময়ে হুমায়ুন আহমেদ তাঁর নাটকে পাখির মুখ দিয়ে ‘তুই রাজাকার’ কথাটি উচ্চারিত করে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে পথনাটক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সভাসমাবেশ, মিছিলের পাশাপাশি পথনাটকের মাধ্যমে মানবতাবিরোধীদের অপকর্ম মানুষের সামনে তুলে ধরে তাদের বিচারের দাবি জানানো হয়। ১৯৯৬ সালের ৪ ডিসেম্বর আমিনুল হক মন্টুর সভাপতিত্বে শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক পথনাটোৎসব। অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন মধুদার পুত্র অরুণ কুমার দে, রামেন্দু মজুমদার ও ডাঃ নীলিমা ইব্রাহিম। অনুষ্ঠানে সবাই শপথ করেন, ’৭১-এর রাজাকার, আলবদর, জামায়াতীদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক তারা রাখবেন না সামাজিকভাবে। জামায়াত-রাজাকার পরিবারে মেয়ে বিয়ে দেবে না কেউ। আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবেন তারা।’ এ দিন উদীচী মঞ্চস্থ করে ‘স্বাধীনতার লড়াই’ এবং সময় মঞ্চস্থ করে ‘গণরায়’। ‘গণরায়’ নাটকটি ছিল স্বাধীনতার পরে রাজাকার-আলবদরদের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের প্রতিষ্ঠা ও সর্বশেষে তাদের বিচারের দাবীতে জাহানারা ইমামের গণআদালত গঠনের বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে। ‘বাবাকে তো পাব না। কিন্তু তাঁর হত্যাকারীদের বিচার তো চাইতে পারব। সুতীব্র চিৎকারে ফরিয়াদ করছি ৩০ লাখ বাঙালি হত্যার সহযোগী রাজাকারদের শিরোমণি গোলাম আযমের শাস্তি দেয়া হোক ফাঁসি।’ সাক্ষী হিসেবে এক শহীদ পিতার সন্তানের এই আবেদনের মধ্য দিয়ে নাটকটি শেষ হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে প্রণোদনাদানকারী গান

মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন গায়ক-গায়িকা ও ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার’ কর্মীবৃন্দ শরণার্থী শিবিরে অর্থ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান পরিবেশন করেন। সেই গানগুলো মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত সকল স্তরের মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণার সঙ্গী হিসাবে কাজ করে। স্বাধীনতা উত্তরকালে মুক্তিযুদ্ধের আবেগমাখা গানগুলো আবার মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তি সংগ্রামের বাস্তব চিত্রে। কালের ব্যবধানে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চিত্র আমাদের সামনে মলিন হয়ে গেলেও গানগুলো সেই স্মৃতিকে আগলে রাখে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে সহায়তা করে যার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই ১৯৯২ সালের গণআদালত ও ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণমঞ্চে।

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে এই গানগুলো মানুষের মনে মুক্তিযুদ্ধ দিনের স্মৃতি এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি ঘৃণার সঞ্চার করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গায়ক-গায়িকারা সম্মিলিতভাবে ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ গড়ে তুলে নানা ধরণের গান পরিবেশন করেন। এ ধরণের গানের সংখ্যা প্রায় ৫০টির মতো হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে ২৬টি পূর্ণাঙ্গ গানের তালিকা পাওয়া যায়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- ‘আমি এক বাংলার মুক্তিসেনা’, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, ‘নোঙর তোল তোল সময় হোল হোল’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ প্রভৃতি। এই গানগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন উদ্ধুদ্ধ করেছে তেমনি সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এই গানগুলো সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশে উদ্দীপ্ত করে।

১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণআদালতে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গঠিত গণআদালতে গোলাম আযমের বিচারকে কেন্দ্র করে কিছু গান লেখা হয়েছিল। সেই গানগুলো মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত করে। নিম্নে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও রাজশাহী সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব এস এম আবুবকরের সেই সময়ে রচিত কয়েকটি গানের উল্লেখ করা হলো-

‘খবর এলো মার্চে

গণআদালত বসছে ঢাকাতে।।

চলো চলো ঢাকা চলো,

ঘাতক ধরো দালাল ধরো,

ধরে ধরে বিচার করো।’

‘এসেছে এসেছে ২৬ শে মার্চ এসেছে,

বসেছে বসেছে কাছারি বসেছে,

তাই দেখতে এলাম ঢাকা শহরে

দিয়ে গেলাম হাজার সেলাম

জাহানারা ইমামেরে।।’

এই রকমের অসংখ্য গান মুক্তিযুদ্ধে এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে প্রণোদনা যুগিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ এবং স্মৃতিকে জাগরুক করে রাখার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ। এগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা, ইতিহাস ও নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ভাস্কর্যগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে রক্তভেজা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাবলি। এই ঘটনাবলি জানার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগরিত হতে উৎসাহিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগরিত রাখার জন্যই এই ভাস্কর্যগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এই ভাস্কর্যগুলো যুদ্ধাপরাধী বিচার আন্দোলনেও প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে- জাতীয় স্মৃতিসৌধ (সাভার, ঢাকা), বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ (মিরপুর, ঢাকা), শহীদস্মৃতি (জগন্নাথ হল, ঢাকা), শিখা অনির্বান (সেনানিবাস, ঢাকা), রায়ের বাজার স্মৃতিসৌধ (ঢাকা), স্মৃতি অম্লান (ভদরা মোড়, রাজশাহী), সাবাশ বাংলাদেশ (রাজশাহী), দুর্জয় বাংলা (সিরাজগঞ্জ), বিজয় বাংলা (চট্টগ্রাম), মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ (মুজিবনগর), প্রজন্ম (রংপুর), স্মারকবেদি (সিলেট)। এই ভাস্কর্যগুলো নির্মাণের পিছনে কারণ ছিল রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। তাই ভাস্কর্যগুলো মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য বহন করে এবং চেতনা বিকাশে কাজ করে।

চিত্রকলা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে প্রণোদনাদানকারী অন্যান্য উপাদানের মতো একটি অন্যতম উপাদান। এ মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের জন্য অনেক কাজ হয়েছে। যে চিত্রকলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে কয়েকটি হলো- কামরুল হাসানের পোস্টার ‘এই জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে’, জয়নুল আবেদিনের ‘মুক্তিযোদ্ধা রমণী’ ও ‘বীরাঙ্গনা’, এস এম সুলতানের বিশাল মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক দেয়ালচিত্র, রশীদ চৌধুরীর স্কেচ ‘বাংলার বিদ্রোহ’। এছাড়াও হাশেম খানের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাভিত্তিক ড্রইং ও স্কেচ, কাইয়ূম চৌধুরীর ‘জয়বাংলা’ শাহাবুদ্দিন আহমেদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাছাড়াও শিল্পী নিতুন কু ু, আমিনুল ইসলাম, মর্তুজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, আবু তাহের, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, রফিকুননবী ও আবদুস সাত্তার প্রমুখের শিল্পকর্মে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অনেক চিত্র স্থান পেয়েছে যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধী বিচার আন্দোলনে প্রণোদনা দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আলোকচিত্র ও অডিও-ভিডিও

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে আলোকচিত্র এবং অডিও ও ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আলোকচিত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ‘হাজার বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসের এ্যালবাম’, ‘১৯৪৮-১৯৭১ আলোকচিত্র সংকলন’, বাংলা নামের দেশ ও বাংলার মুক্তিসংগ্রাম সিরাজউদ্দৌলা থেকে শেখ মুজিব’সহ অনেক গ্রন্থের আলোকচিত্র এবং অডিও-ভিডিওতে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ছয়দফা কর্মসূচি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যাসহ দীর্ঘ নয় মাসের অপকীর্তির নানা চিত্র ফুটে উঠে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অডিও-ভিডিও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অমূল্য উপাত্ত। এই উপাত্ত মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রণয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ডাকটিকিট ও পোস্টার

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকার মোট আটটি ডাকটিকিট বের করেছিল। এর মাধ্যমে শুরু হয় আমাদের ডাকটিকিটের যাত্রা। এই ডাকটিকিটগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা ও চেতনা বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এগুলোর মধ্যে দশপয়সার ডাকটিকিটে বাংলাদেশের মানচিত্র, বিশপয়সার ডাকটিকিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকাে র প্রতীক, পঞ্চাশ পয়সার ডাকটিকিটে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রতীক, এক টাকার ডাকটিকিটে বাংলাদেশের পতাকা, দুই টাকার ডাকটিকিটে আওয়ামী লীগের ৯৮% ভোটে বিজয়ের প্রতীক, তিন টাকার ডাকটিকিটে স্বাধীন সরকারের ঘোষণার প্রতীক, পাঁচ টাকার ডাকটিকিটে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি, দশ টাকার ডাকটিকিটে বাংলাদেশের পক্ষ সমর্থনের জন্য আবেদনের প্রতীক। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিবীজী, জাতীয় নেতা, বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে ডাকটিকিট ও পোস্টর বের করা হয়। এই ডাকটিকিট ও পোস্টর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিকাশে অবদান রাখে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিষয়ক বই

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রায় ৪৬০০ বই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধী বিষয়ে বইয়ের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। কিন্তু ১৯৮৭ সালের বই মেলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র থেকে একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায় বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের এবং রাজাকারদের উপর গ্রন্থ রচনায় আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এবং দেখা যায় যে, ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের সংখ্যা ৩৫০টির মতো হলেও পরবর্তীকালে তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৯২ সালের ২৬মার্চ গণআদালতে গোলাম আযমের বিচারের পর মানুষের মনে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

তখন ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই প্রকাশ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই রচনা বৃদ্ধি পায়। ১৯৯২ সালে গণআদালতে গোলাম আযমের বিচারের পর বিভিন্ন সংগঠন গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রসারের জন্য। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন ’৭১ এর যাত্রী, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’, ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ চর্চা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে বই প্রকাশ বৃদ্ধি পায়।

সরকারি উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের সংগ্রহের উদাসীনতা লক্ষ করে কিছু ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পুনর্গঠনের কাজে এগিয়ে আসেন। এই উদ্যোগগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রণোদনা দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগসমূহ হলো- মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন ’৭১ এর যাত্রী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘হেরিটেজ: বাংলাদেশের ইতিহাসের আর্কাইভস’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা ইত্যাদি। এসব সংগ্রহশালা, পরিষদ থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই, আলোকচিত্র, দলিলপত্র, পত্রপত্রিকা ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হয় যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবদীপ্ত অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনুসন্ধান, অনুধ্যান, গবেষণা ও পর্যালোচনার গুরুত্ব অপরিসীম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থমালা ক্রমবিকশিত হয়ে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রকাশনা থেকে সেটা বোঝা যায়। এসবের মধ্যে দিয়ে নতুন আলোকে উদ্ভাসিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা লাভের পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই ব্যাপক হারে প্রকাশিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার জন্য তা করা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সমাজ ও রাষ্ট্রে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন শুরু হয়। তাই এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই প্রকাশ তেমন হয়নি। যা হয়েছে তা খুবই স্বল্প পরিসরে। ১৯৮৭ সালে একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায় গ্রন্থটি রচনার সময় দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বইয়ের সংখ্যা সর্বসাকূল্যে ৩৫০টি। গবেষণা ভিত্তিক ও তথ্য সম্বলিত বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের উপর ভিত্তি করে আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন বাংলাদেশ : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জী নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইতে মোট ৮৮২টি মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের তালিকা দেয়া হয়েছে। এরপর মে মাসে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু চর্চা নামে তিনি একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক ৩৫০টি বইয়ের তালিকা এবং ৭০-৮০টি উল্লেখযোগ্য বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি রয়েছে। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধের বই শিরোনামে ১৯৯৮ সালে ৮২৯টি বইয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ১৯৯৯ সালে জাতীয় গ্রন্থপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থপঞ্জি শিরোনামে ১২০০ বই এর তালিকা প্রণয়ন করে। ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থেকে প্রকাশিত হয় ৪০০০ হাজার বইয়ের তালিকা সম্বলিত মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থপঞ্জি।

বিএনপি জামায়াত জোটের শাসনামলে রচিত কিছু উপন্যাসে তৎকালীন অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে ‘মৌচাকে ঢিল’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় আনিসুল হকের অন্ধকারের এক শ’ বছর নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় ধারাবাহিকভাবে। এই উপন্যাসে দুটি প্রধান চরিত্র আতিউর রহমান মিজানী ও বেগম ওয়াহিদা রহমান। উপন্যাসের কাহিনীতে দেখানো হয়, ‘দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শত্র“পক্ষের প্রত্যক্ষ সহযোগী আতিউর রহমান মিজানী স্বাধীনতার প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর পর স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী বেগম ওয়াহিদা রহমানের নেতৃত্বাধীন দলের সাথে যৌথভাবে সরকার গঠন করে। সরকারে ওয়াহিদা রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং মিজানী একজন মন্ত্রী হন। তিন চার বছরের মাথায় আতিউর রহমান মিজানী গভীর ষড়যন্ত্র করে প্রধানমন্ত্রী ওয়াহিদা রহমানকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হন এবং দেশ এক শ’ বছরের জন্য অন্ধকার যুগে নিপতিত হয়। এই উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের তৎকালিন অবস্থা ও রাজাকারদের পুনর্বাসন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পর রচিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বইগুলোর মধ্যে কয়েকটি বইয়ের উল্লেখ করা হলো। এই বইগুলো যুদ্ধাপরাধীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে। মুনতাসীর মামুনের সেই সব পাকিস্তানী, রাজাকার সমগ্র, রাজাকারের মন, মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র, মুক্তিযুদ্ধ কোষ (১২ খণ্ড), শান্তি কমিটি ১৯৭১, বীরাঙ্গনা, শাহরিয়ার কবিরের একাত্তরের ঘাতক দালালেরা কে কোথায়, গণআদালতের পটভূমি, আবদুল গাফফার চৌধুরীর বাঙালির অসমাপ্ত যুদ্ধ, আমীরুল ইসলামের আমি মুক্তিযোদ্ধা হতে চাই, কামাল আহমেদের ’৭১ চেতনায় অ¤øান, এম এম আলির আজকের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশ গড়ার ডাক, নূহ-আলম লেনিনের, মুক্তিযুদ্ধ ও উত্তরকাল, বদরুদ্দীন উমরের, গণআদালত অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের জের, বদিউজ্জামান, মুক্তির চেতনায় প্রভৃতি। এই বইগুলোর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের নৃশংস কর্মকাণ্ড এবং পুনর্বাসনের ইতিহাস জানতে পারে। এর ফলে তাদের মনে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পর্কে ঘৃণার সৃষ্টি হয়। এবং দেখা যায় যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে মত দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে নির্বাচিত করে। এই জাগরণ সম্ভব হয়েছে তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। আর এই সচেতনতা বৃদ্ধিতে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বইগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ২০১৩ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কিছু প্রামাণ্যচিত্র, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়। এই চলচ্চিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ এবং যুদ্ধাপরাধী রাজাকার, আলবদর ও শান্তিকমিটির সদস্যদের মুখোশ উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রামাণ্যচিত্রগুলোতে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশিয় দোসরদের নির্মম গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া দেশাত্মবোধক গানগুলোর মাধ্যমে মানুষকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করা হয়। পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থা এবং মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হয়েছে। কয়েকটি চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে কিভাবে যুদ্ধাপরাধীরা ক্রমশ বাংলাদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে। কিছু কিছু চলচ্ছিত্র যুদ্ধারপাধীদের মুখোশ উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে প্রামাণ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যুদ্ধারপাধীদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১জন’ (১৯৭২), সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৭২), খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (১৯৭৩), আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), নারায়ন ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ (১৯৭৪), হুমায়ুন আহমদের ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪), খান আতাউর রহমানের ‘এখনও অনেক রাত’ (১৯৯৭), চাষী নজরুল ইসলামের ‘হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড’ (১৯৯৭) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ (১৯৮৪) ও ‘নদীর নাম মধুমতি’ (১৯৯৫), নাসির উদ্দিন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’ (১৯৯৩), এনায়েত করিম বাবুলের ‘পতাকা’, মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’ (১৯৮৪) ও ‘শরৎ একাত্তর’ (২০০০), খান আখতার হোসেনের ‘দূরন্ত’, সুমন আহমেদের ‘ধূসর যাত্রা’, হারুনুর রশিদের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’, তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিনা মাসুদের ‘নরসুন্দর’ উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়েছে কয়েকটি। এরমধ্যে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ (১৯৭১) ও ‘এ স্টেইট ইন বর্ন’, তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিনা মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫) ও ‘মুক্তির কথা’ (১৯৯৯) এবং তানভীর মোকাম্মেলের ‘স্মৃতি ’৭১’ (১৯৯১) উল্লেখযোগ্য। এই চলচ্চিত্রগুলোর কাহিনী থেকেই বোঝা যায় যে এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থা এবং রাজাকারদের নৃশংস কর্মকাণ্ড কতটা ভয়াবহ ছিল। এর মাধ্যমে রাজাকারদের আসল চরিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম এই চলচ্চিত্রগুলো দেখে রাজাকারদের ঘৃণ্য কর্মকা সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে। (সংক্ষেপিত)

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj