আমি বাঙাল, আমাকে থামিয়ে রাখা যাবে না! : প্রবীর বিকাশ সরকার

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

যেহেতু জাপানে থাকি তাই অনেক বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজন জাপানি নাগরিক। গত শনিবার কয়েকজনের ফোন পেয়েছি। মনে হয়েছে, কর্মস্থলে জাপানি সহকর্মীদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারব না কিছুদিন। এই জাপানে বিগত ৩০ বছর ধরে বাংলাদেশের সুনাম আর শোনার ভাগ্য হলো না আমার! মাঝখানে ড. ইউনূস স্যার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল জাপানি সমাজ ও গণমাধ্যমে। আশান্বিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে, বাংলাদেশ এবার আলোর দিকে যাবে। না, সে গুড়ে বালি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষকের ইমেজ ¤øান হয়ে যেতে সময় নিল না। জাপানিরা সব খবর রাখে। তাদের মুখ থেকেই জানতে পেলাম গ্রামীণ ব্যাংকের নানা সমস্যার কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের চিন্তাকেই তিনি চুরি করে পর্বতসমান সুদের ব্যাংক-ব্যবসা ফেঁদেছেন মাত্র- এমন কথাও জাপানি গবেষকের কাছে শুনেছি। তাছাড়া বাংলা ভাষায়ও কেউ কেউ এই বিষয়ে লিখেছেন; সেগুলোও পাঠ করার সৌভাগ্য (?) হয়েছে!

মনে আছে মহামান্য এরশাদের দুর্নীতির কাণ্ডকারখানা সেই ‘মারুবেনি বোট ক্রয় কেলেঙ্কারি’র ঘটনা- কী বিশাল বিরূপ তরঙ্গ তুলেছিল জাপানি সমাজে- জাপানি সংসদে পর্যন্ত বিষয়টি উঠেছিল! বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে প্রবাসীদের বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়েছিল। এই ঘটনায় অনেক দিন মুখ দেখাতে পারিনি জাপানিদের কাছে। এখনো জ্বলজ্বল করে মনের পাতায় সেই আশি-নব্বই দশকের জ্বালাময় স্মৃতি। প্রতিদিন বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও কিছু অঘটন ঘটছে তার ছবি ও খবর প্রকাশ করে জাপানি মিডিয়া বাংলাদেশের যে ‘বদ-ইমেজ’ তৈরি করেছিল তা আজো মুছে যায়নি। গুলশানের ঘটনা এবং ৭ জন জাপানি নাগরিকের নির্মম মৃত্যু আমাকে মানসিকভাবে উন্মাদ করে দিয়েছে! এই ধকলটা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় নেবে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই হিন্দু-বৌদ্ধ পুরোহিত এবং নিরপরাধ নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে প্রায় প্রকাশ্যে এবং কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না ফলে মনমরা হয়ে গিয়েছি। এবার গুলশানের ঘটনা মধ্যে যতটুকু অবশিষ্ট প্রাণরস ছিল সেটাও শুষে নিয়েছে যেন! কোনো কাজেই মন বসাতে পারছি না। দেশের জন্য প্রাণ হু হু করে কাঁদছে কাউকে দেখাতে পারছি না! অসুস্থ মায়ের মুখ, চিন্তাগ্রস্ত ছোটবোনের শুষ্কমুখ, বন্ধু, শুভাকাক্সক্ষীদের করুণ মুখগুলো কেবলি মনে পড়ছে। স্বস্তি পাচ্ছি না, শান্তি পাচ্ছি না। বাংলাদেশে কারো কোনো নিরাপত্তা নেই তাহলে সেটা মানবভূমি হলো কী করে? এটা নরক! এর জন্য নোংরা রাজনীতি দায়ী, সরকার দায়ী, শিক্ষক দায়ী, আইনপ্রয়োগকারী দায়ী, আইনজীবী দায়ী, বুদ্ধিজীবী দায়ী, সংবাদপত্র দায়ী, সর্বোপরি পরিবার এবং অভিভাবক দায়ী।

বিগত ৪৫ বছরেও সুজাতি গঠনের কোনো পদক্ষেপ কোনো সরকার নিতে পারেনি। ফলে দিনে দিনে একমাত্র অবহেলা, খামখেয়ালির কারণে আজকে সন্ত্রাসের, জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এই দেশটি। অথচ এই ছোট্ট ভূখণ্ডটিকে স্বাধীন করার জন্য লাগাতার কমপক্ষে ৫০০ বছরের সংগ্রাম, লড়াই আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে বহিরাগত শাসক-শোষকের সঙ্গে। ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করে এই দেশকে স্বাধীন করেছে অথচ এই দেশটি স্বাধীনতার পর এমন হওয়ার কথা ছিল না! লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, আদর্শ কোথায় গেল? কারা নষ্ট করলো এই প্রাচীন আধ্যাত্মিক শান্তি আর প্রাকৃতিক শক্তি সাধনার সমাজটিকে? কারা ধ্বংস করলো হাজার বছরের সুপ্রাচীন বাঙালির সাংস্কৃতিক সনাতন সম্প্রীতিকে? কারা বিপর্যস্ত করলো শত-শত বছরের প্রাচীন অসাম্প্রদায়িক লোকাচারকে? মাত্র কতিপয় মানুষ। তারাই দায়ী স্বাধীনতার পর থেকে আজকের এই হযবরল অবস্থার জন্য! তারাই দায়ী শান্তিবাদী বাংলাদেশের কপালে মানুষ নিধনের কলঙ্কতিলক পরিয়ে দেবার জন্য! এরা স্রেফ বিদেশি শক্তির তাঁবেদার। এরা বাঙালি নয়, বাঙালও নয়! এরা বাঙালি জাতির চিরশত্রু। সমগ্র মানবজাতির চিরঅমঙ্গল। বাঙালির উচিত এদের এখন খুঁজে বের করে শূলে চড়ানো প্রকাশ্যে। এরা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। কী সাংঘাতিক জঘন্য কাজ ভাবতেই পারি না- এমন ধর্মীয় সংযমের মাসে, পবিত্র সিয়াম সাধনার দিনে কীভাবে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে! কোনো ধর্মই হত্যার কথা বলেনি। কোনো সর্বজনমান্য ঈশ্বরের দূত, পয়গাম্বর এবং ধর্মীয় মনীষী ধর্মের নামে মানুষ হত্যার কথা প্রচার করেননি। তাহলে কারা ধর্মকে বিকৃত করছে? কারা স্বসৃষ্ট হিংসাত্মক মানববিদ্বেষী ধর্ম তৈরি করে কোমলমতি তরুণ-তরুণীকে সন্ত্রাসী, জঙ্গি, খুনি বানাচ্ছে?

মোদ্দা কথা, তারা ধর্মের নামে বিভ্রান্ত মানুষ টাকার জন্য অমানুষে পরিণত বিকৃত মস্তিষ্কধারী রাজনীতিকে ব্যবহার করছে, রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করে নিচ্ছে রাষ্ট্র, সরকার আর সচেতন জনগণের দুর্বলতার সুযোগে। এই দুর্বলতা দূর করা জরুরি। খুঁজে বের করা জরুরি নাটের গুরুগুলো কারা, কোথায় থাকে, কোথা থেকে কলকাঠি নাড়ছে? রাষ্ট্র, সরকার, সেনা ও পুলিশ এসব সুযোগ সন্ধানী শিকারিদের চিনবে না, জানবে না, খবর রাখবে না- এটা ভাবা মানে আমাদের বোকা বানানো! তাহলে আর রাষ্ট্রের দরকার কী? তাহলেই প্রশ্ন এসে যাচ্ছে অবহেলা আর চরম খামখেয়ালিপনার। তাই নয় কী?

দৃশ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন করে আর এই জাতিকে ফাঁকি দেয়া যাবে না যতক্ষণ না পাশাপাশি মানসিক, মানবিক উন্নয়নের জন্যও রাষ্ট্র, সরকার, সেনা, পুলিশ এবং বুদ্ধিজীবীরা ভূমিকা না রাখবেন! জাপানিরা বলেন, রোগ নয়, রোগের উৎস, কারণটা আগে অনুসন্ধান করে মূলটা তুলে ফেলতে হবে পরিষ্কারভাবে। যে রাজনীতি মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, তরুণ প্রজন্মকে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনে অনুপ্রাণিত করতে পারে না; যে রাজনীতি দুর্নীতি আর নিপীড়নের কারখানা তাকে আমাদের দরকার নেই। সন্ত্রাসী, জঙ্গি, খুনির পয়দা আমরা চাই না। সরকারকে সাধারণ মানুষের উষ্মা ও ক্ষোভ শুনে নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা নিতে হবে। এর বিকল্প নেই রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে।

এই ইন্টারনেটের যুগে এখন আর রাজপথে নেমে দাবি আদায়ের বিপ্লব সংঘটনের মানসিকতা কারো নেই, মোবাইল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের বিপ্লব শুরু হোক নতুন সমাধান খোঁজার। সমস্যা আছে, সমাধানও আছে। যুগে যুগে মানবিক বিপর্যয় বার বার এসেছে এবং বার বারই সমাধান করে ছেড়েছে মানবজাতি। সেই আশায় এই লেখা। আমি যুক্তিতে বিশ্বাসী, বিদ্বেষে বিশ্বাসী নই। আমি এই অঞ্চলের জলবায়ুসৃষ্ট আধ্যাত্মিক শক্তিতে বিশ্বাসী- শাক্ত; আমি অনুপম আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী- বৈষ্ণব; আমি চিরআশাবাদী, আনন্দসন্ধানী। সুতরাং জয় আমার হবেই।

আমি বাঙাল বিজয়ী আমাকে হতেই হবে! আমাকে থামিয়ে রাখা যাবে না!

প্রবীর বিকাশ সরকার : জাপান প্রবাসী লেখক ও গবেষক।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj