ত্রিপক্ষীয় চুক্তি, পাকিস্তানের চুক্তি ভঙ্গ ও বাংলাদেশের অবস্থান : আল নোমান শামীম

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

পাকিস্তান মুখে দোষ স্বীকার করেনি, চুক্তিতে দোষ স্বীকার করেছে। তারা মুখে বলছে ১৯৭১-এ যা হয়েছিল তা ১৯৭৪-এর চুক্তিতে তামাদি হয়ে গেছে। তারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থার শক্তিতে তারা অসহায় বোধ করেছে, নিজামী-মোল্লা-সাকা-মুজাহিদের ফাঁসিতে মানসিকভাবে নিজেদের বিপর্যস্ত ভেবেছে কিন্তু মুখে দোষ স্বীকার করেনি। এটা হতে পারে নিজ দেশের জনমানুষের সামনে তারা নিজেরদের বাঘ হিসেবে দেখাতে চায়, পরাজিত ইঁদুর হিসেবে নয়। তারা পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে বলেনি, ১৯৭১-এ পাকিস্তানের অন্য অংশে তারা যুদ্ধাপরাধ করে এসেছে আরেক মুসলমান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। তারা বিশ্বকে বলেনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেসব জঘন্য কাজ করেছে তাতে তারা মানুষ নামের অযোগ্য বা এই নিন তাদের লিস্ট, আপনারা বিচার করুন আল্লাহর নামে, আমরা সহায়তা করব। তারা পাকিস্তানের মানুষকে বলেনি, একটি ভূখণ্ডে হাবিয়া দোজখ নামিয়ে তারা খোদার সঙ্গে খোদকারি করেছিল, তারা একটি জাতির পরিচয় বদলে দিতে চেয়েছিল। বরং তারা মুখে চিৎকার করে, গলার রগ উঁচিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যে বলেছে, তারা কোনো অন্যায় করেনি, কোনো অন্যায় সংঘটিত হয়নি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। আবার তারা এটা বলেছে, ১৯৭১-এর ‘অন্যায়’ (যা চুক্তিতে স্বীকার করেছে, নিচের অনুচ্ছেদ দেখুন) ১৯৭৪-এর চুক্তিতে তামাদি হয়েছে, বাংলাদেশ শুধু শুধু সেই সময় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে। পাঠক, খেয়াল করুন, তারা বলছে ১৯৭১-এ কোনো অন্যায় হয়নি, আবার বলছে, ১৯৭১-এর সংঘটিত অন্যায় ১৯৭৪-এর চুক্তিতে মাফ হয়ে গেছে। আচ্ছা, পাকিস্তানের সমস্যাটা কোথায়? তারা কি মিথ্যার আগে মিথ্যা বলে, নাকি মিথ্যার পরে মিথ্যা বলে? নাকি জেনেশুনেই সত্য গোপন করে?

আসুন দেখি, তারা যে চুক্তিটির বাহানা দেখিয়েছে, ১৯৭৪-এর ত্রিপক্ষীয় সেই দিল্লি (যা সিমলা চুক্তি, ১৯৭২-এর আলোকে বলে দাবি করেছে) চুক্তি কি বলে? ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ১৩ আর্টিকেলে পরিষ্কার বলা আছে, The Minister of State for Defense and Foreign Affairs of the Government of Pakistan said that his Government condemned and deeply regretted any crimes that may have been committed. আর এটা স্বাক্ষর করেছেন পাকিস্তানেরই তৎকালীন প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমেদ। যেখানে বাংলাদেশ, ভারতসহ পাকিস্তানের পক্ষে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী মন্ত্রী আজিজ আহমেদ পরিষ্কার বলেছেন, ‘his Government condemned and deeply regretted any crimes that may have been committed.’ তিনিতো স্বীকারই করেছেন, বাংলাদেশে পাকিস্তান অপরাধ সংঘটন করেছে। সেখানে এই ২০১৫-১৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই পাকিস্তানেরই ১৯৭১-এর অপরাধ অস্বীকার কি আরেকটি অপরাধের মধ্যে পড়ে যায় না, যাকে বলে ‘ডিনায়াল ওফ ক্রাইম’! তারা বলছে, সেই দিল্লি চুক্তিটি নাকি বাংলাদেশ ভঙ্গ করেছে? আমি মনে করি, দিল্লি চুক্তিটি যদি কেউ ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে সে আর কেউ না, স্বয়ং পাকিস্তান নিজেই। যেমন, আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াটা চুক্তিতে থাকলেও পাকিস্তান তা আর পূর্ণ করেনি; (১) এই চুক্তির ১০, ১১, ১২ আর্টিকেল অনুযায়ী তারা বাংলাদেশে অবস্থানরত অন্য পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নিলেও পাকিস্তানি বিহারিদের আর ফিরিয়ে নেয়নি, পাকিস্তান শর্ত পূরণ করেনি এবং সেই সূত্রে চুক্তিটি পাকিস্তান কর্তৃক অকার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা যেতে পারে।

(২) গত নভেম্বর, ২০১৫তে পাকিস্তান বাংলাদেশকে অফিসিয়ালি বলেছে যে, ১৯৭১-এর অপরাধের সঙ্গে তাদের পরোক্ষভাবে জড়িত করাও ভুল, অমূলক। এটাও কি ১৯৭৪ সালের সেই দিল্লি চুক্তিকে অফিসিয়ালি অস্বীকার করা হয়ে যায় না? তাহলে আমার প্রশ্ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে নিজে এসে ‘কোন’ অপরাধে ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন চুক্তির আর্টিকেল ১৩-এ, The Ministers further noted that following recognition, the Prime Minister of Pakistan had declared that he would visit Bangladesh in response to the invitation of the Prime Minister of Bangladesh and appealed to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past in order to promote reconciliation. এখানে পরিষ্কার বলা হলো, ‘Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past’, বাংলাদেশ তাদের ক্ষমা করবে, কোন অপরাধের ক্ষমা করবে বাংলাদেশ? এখন পাকিস্তান কেন অস্বীকার করছে তাদের অপরাধকে? ‘ডিনায়াল ওফ ক্রাইম’ নিজেই আরেকটা অপরাধ। পাকিস্তান শুধু বাংলাদেশের সঙ্গেই চুক্তি ভঙ্গ করেনি, তারা দ্বিপক্ষীয় সিমলা চুক্তিটি পর্যন্ত স্পষ্ট ভেঙেছে ১৯৯৯ সালে ভারতের কারগিলে সৈন্য প্রবেশ করিয়ে।

(৩) ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে সরাসরি জেনোসাইডে জড়িত ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈনিক ও অফিসারদের বিরুদ্ধে ‘বাংলাদেশে’ কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না বা বাংলাদেশ কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেবে না বলে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। অথচ সত্য হলো, এই চুক্তিবদ্ধ ওয়াদাটিও পাকিস্তান নিজেই ভঙ্গ করেছে, বাংলাদেশ না। বঙ্গবন্ধুকে দেয়া আশ্বাসটি ছিল এইরকম, পাকিস্তান ‘নিজ দায়িত্বে’ এই ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈনিক ও অফিসারদের বিচার করবে। পরিষ্কার বোঝা যায়, বিদেশে নিজেদের সৈনিক ও অফিসারদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তানের জনগণ সেই দেশের সরকার আর সেনাবাহিনীর চামড়া রাখবে না। বেকায়দায় পড়ে তারা হাঁটু গেড়ে বসে বাংলাদেশ আর ভারতের সামনে, দয়া চায়, করুণা চায় নিজের চামড়া বাঁচানোর। দীর্ঘ আলোচনার পর পাকিস্তান কর্তৃক ‘নিজ দায়িত্বে’ সেই ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈনিক ও অফিসারদের বিচারের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা বাংলাদেশ ও ভারতকে চুক্তির মাধ্যমে দেয়ার পরই বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গ্রেপ্তারকৃত বিপুল পাকিস্তানি সৈন্য ও অফিসারদের সৈন্যদের পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়, যা ছিল ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অন্যতম শর্ত এবং বাংলাদেশ চুক্তির শর্ত পালন করে। পাকিস্তান সরকার এই বিষয়ে সেই সময় একটা স্টেটমেন্টও দেয়, Pakistani government rejects the right of the authorities in Dacca to try any among the prisoners of war on criminal charges, because the alleged criminal acts were committed in a part of Pakistan by citizens of Pakistan. But Pakistan expresses its readiness to constitute a judicial tribunal of such character and composition as will inspire international confidence to try the persons charged with offenses. এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘Pakistan expresses its readiness to constitute a judicial tribunal of such character and composition as will inspire international confidence to try the persons charged with offenses’। পাকিস্তান সরকার একটি আন্তর্জাতিক মানের ট্রাইবুনালের মাধ্যমে পাকিস্তানের পূর্ব অংশে তাদের সেনাবাহিনীকৃত অপরাধের বিচার (তাতে এখানেও পাকিস্তান অপরাধ স্বীকার করে নিল) করবে। যদিও বাংলাদেশ বলে, যা বাংলাদেশের সংবিধানেও আছে, ২৬ মার্চ ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা হয় এবং ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে দেখা গেল, পাকিস্তান তার সেনাবাহিনীর সদস্যদের এই বিচার করল না, আইনের আওতায় আনল না। এভাবে তারা আবারো ওয়াদা বরখেলাপ করলো, চুক্তি ভঙ্গ করল।

জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ক্ষমা করা যায় না আর এই মামলা বা এর বিচার কখনো তামাদি হয় না, যাতে স্বাক্ষর করা রাষ্ট্র হিসেবে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতও আছে। আর বাংলাদেশে এই বিচার নিয়ে পাকিস্তান তাদের নাক গলিয়ে দুঃসাহস দেখানোটা অনেকটা ১৯৭৩ সালের ২৭ মে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর হুমকির মতোই, ‘Public opinion will demand trials [of Bangladeshis] here … We know that Bangalis passed on information during the war. There will be specific charges. How many will be tried, I cannot say. ভুট্টো ভয় পেয়েছিলেন, তিনি চাননি ১৯৭১-এর লজ্জাজনক পরাজয়ের পর তার ও তার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচার হোক, বাংলাদেশ বা ভারতে তো নয়ই। সেই বিচার ঠেকাতে পাকিস্তানে আটকে পড়া একদম সাধারণ বাঙালিদের কোনো ধরনের জেনোসাইড বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন উপমহাদেশের সবচেয়ে ধূর্ত এই পাকিস্তানি রাজনীতিক। ১৯৭২ ও ১৯৭৪ সালে খত লিখে স্বীকার করা জঘন্য অপরাধীদের বিচারে পকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের আজকের অবস্থা সম্পূর্ণ দ্বিমুখী, তারা মুখে বলে এক, করে আরেক। ইসলামে এই ধরনের চরিত্রের মুসলমানের সম্পর্কে ব্যাখ্যা ও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।

এদিকে আসি জামায়াত প্রসঙ্গে; দিল্লি ও সিমলা চুক্তির কোথায়ও বলা নেই, ১৯৭১-এর পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর অধীনে সংঘটিত জঘন্য হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িত হওয়া এদেশীয় রাজাকারদের কি হবে? সাকা, মুজাহিদ, নিজামী, গোলাম আজম, কাদের মোল্লারা কেউ পাকিস্তানের নাগরিক নয়, বাংলাদেশের। তাদের বিচার তো বাংলাদেশেই হবে, সেটা কবে থেকে পাকিস্তানের নাক গলানোর বিষয় হলো, এটা তাকেই ব্যাখ্যা করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ জানতে চায়, কেন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধপরাধের সঙ্গে জড়িতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে না? ১৯৭১-এর অপরাধের সঙ্গে জড়িত শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী ও বিচারাধীন অপরাধীদের নিজ ও পারিবারিক সম্পত্তি যেমন বাজেয়াপ্ত করা দরকার, তেমনিভাবে পাকিস্তানের কাছে ১৯৭১ সালে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করাও এখন সময়ের দাবি। আর পাকিস্তানের কাছ থেকে আদায় করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বণ্টনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাকিস্তান যদি ত্রিপক্ষীয় দিল্লি চুক্তি বারবার ভঙ্গ করে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের উচিত, পাকিস্তানের হাই কমিশনারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে পাকিস্তান ও তার সেনাবাহিনীকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। আর পাকিস্তান যদি এই ব্যাপারটি জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যেতে চায়, বাংলাদেশের উচিত তা সানন্দে গ্রহণ করা। সেইসঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ও অফিসার এই ১৯৫ জন অপরাধী, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বাংলাদেশের এবং সভ্য দুনিয়ার মানুষ জানতে চায়। বঙ্গবন্ধুর আমলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া গেলেও আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন বলেই এই দাবি এখন গণদাবি, যুগোপযোগী তো বটেই।

অপরাধ করে পার না পেলে অপরাধকে অস্বীকার করা নতুন কোনো ব্যাপার নয়। সব অপরাধীই এই কাজ করে, উকিল-মোক্তার ধরে। আর সমাজ তথা দুনিয়ার কাজ হচ্ছে, সব শক্তি নিয়ে সেই অপরাধীর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সাজা নিশ্চিত করা। এই সময়ে সমাজ এটাও লক্ষ রাখে আইনজীবী ছাড়া কারা কারা সেই অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ায় এবং দাঁড়ালে তাদেরও শাস্তি নিশ্চিত করা। সুষম সমাজ, দেশ আর কল্যাণময় পৃথিবী গড়তে এর কোনো বিকল্প নেই, যুদ্ধ সময়কার সেই গানটিকে আজো মনে রাখতে হবে, ‘সারা বিশ্বের শান্তি বাঁচাতে আজকে লড়ি’।

অস্ট্রেলিয়া নিবাসী লেখক

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj