বৈষ্ণব পদাবলী : মানবপ্রেমের বৈজয়ন্তী : ফখরুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ধর্মাসক্ত, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। ধর্মীয় সংশ্রব থাকলেও তাতে মানুষ, তার নানা অনুভূতি, সমাজ ও সামাজিক সত্য নানা উপায়ে বিধৃত হয়েছে। ধর্মের একদিকে যেমন তত্ত্ব অন্যদিকে তেমন তার প্রায়োগিকতা। প্রয়োগ প্রসঙ্গে মানুষই সার্বভৌম। কেননা ধর্ম তো মানুষেরই জন্য। মধ্যযুগের সাহিত্যের মধ্যে বৈষ্ণব পদাবলী মানুষকে তার স্বমূল্যে অভিষিক্ত করেছে। গধহ রং ঃযব সবধংঁৎব ড়ভ ধষষ ঃযরহমং প্রোটাগোরাসের ওই অমর বাণীর সাযুজ্য দেখি চণ্ডীদাসের প্রবাদপ্রতিম পদে- ‘শুনহ মানুষ ভাই/সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার পরে নাই’।

আমরা জানি পদাবলীতেই আছে ‘রাধা ছাড়া সাধা নাই, কানু ছাড়া গীত নাই’ তবে এ পর্যন্ত জানলেই সবটা জানা হয়ে যায় না। পদাবলীর অন্তরে যদি ‘রাধে-কানু’ ব্যতীত আর কোনো রসের প্রবর্তনা আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে রয়ে যায় তবে তার সীমাবদ্ধতাও নিতান্তই আমাদের। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমরা ওই দোষে অনেকটা দুষ্ট। মনে হয় আমাদের অবস্থা কল্পনা করেই চণ্ডীদাস লিখেছেন, মরম না জানে ধরম বাখানে

এমন আছয়ে যারা।

কাজ নাই সখি তাদের কথায়

বাহিরে রহুন তারা।।

মানুষের চিরকালীন প্রেমই বিচিত্ররূপে চিত্রিত হয়েছে পদাবলী সাহিত্যে। এ প্রসঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সোনার তরী কাব্যের ‘বৈষ্ণব’ কবিতায় লিখেছেন,

শুধু বৈকুণ্ঠের তরে বৈষ্ণবের গান/পূর্বরাগ, অনুরাগ, মান, অভিমান,

অভিসার, প্রেমলীলা, বিরহ-মিলন/বৃন্দাবন গাথা এই প্রণয় স্বপন

শ্রাবণের শর্বরীতে কালিন্দীর ক‚লে/চরিচক্ষে চেয়ে দেখা কদম্বের মূলে

শরমে সম্ভ্রমে- এ কি শুধু দেবতার। / এ সঙ্গীত রসধারা নহে মিটাবার

দীন মর্তবাসী এই নরনারীদের/প্রতি রজনীর আর প্রতি দিবসের

তপ্ত প্রেমতৃষ্ণা।

বৈষ্ণব একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয় একটি বিশেষ সামাজিক বাস্তবতায়- শাস্ত্রীয় ধর্মের সীমাবদ্ধতা ও ক্ষেত্রবিশেষে বাড়াবাড়ির প্রতিক্রিয়ায়। ধর্মীয় বাতাবরণের মধ্যেই মানুষে মানুষে উঁচু-নিচু ভেদ, জাতি-পাতির বাছ-বিচার যখন মনুষ্যত্বের অবমাননায় লিপ্ত তখন প্রেমের উদার ক্ষেত্রে সর্ববিধ সংস্কারমুক্ত মানুষের এক হবার বাসনা থেকেই প্রতিবাদী ধর্মান্দোলন হিসেবে বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তনা। পৌরাণিক বা শাস্ত্রীয় বৈষ্ণবান্দোলন থেকে ক্রমে চৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব এবং আরো পরে সহজিয়া বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। লালনের গানে যে বলা হয়েছে, ‘জাত দেয় সে অজাতের দৌড়ে গিয়ে’ এ তারই সাক্ষ্যবাহী।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’- চণ্ডীদাসের এ কথায় বৈষ্ণবধর্মের সারকথা প্রকাশিত। বৈষ্ণব পদাবলী এক অর্থে বৈষ্ণবদের সাধন সঙ্গীত তা সত্ত্বেও তারই মাধ্যমে মানুষের প্রেমানুভূতি ও তার মুক্তির আকাক্সক্ষা, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার রূপকে প্রকাশিত হয়েছে। ভগবান কৃষ্ণের অবতার বিষ্ণুই বৈষ্ণবদের আরাধ্য। ‘কৃষ্ণ’ শব্দটির দুটো অংশ। এক অংশ ‘কৃষ্ণ’ যার অর্থ আকর্ষণ করা অপর অংশ ‘ণ’ যা দ্যোতিত কার আনন্দ তথা পরমসুখকে। বৃহৎ সংহিতায় বলা হয়েছে- ‘ঈশ্বর পরম কৃষ্ণ সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ’। সচ্চিদানন্দ শব্দটি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় কৃষ্ণের স্বরূপ শক্তির তিন গুণকে- সৎ, চিৎ ও আনন্দ। সৎ হলো অস্তিত্ব, চিৎ হলো চেতনা এবং আনন্দ অভিব্যঞ্জিত করে পরমানন্দকে। কৃষ্ণের স্বরূপ শক্তির বিকাশ ও প্রকাশ হয় তিনটি পৃথক শক্তিকে অবলম্বন করে। সে শক্তিত্রয় হলো, সন্ধিনী, সংবিৎ ও হ্লাদিনী। সত্তার অস্তিত্ব প্রকাশ করে সন্ধিনী, চেনা বিধায়ক শক্তি সংবিৎ। পরম প্রেমের অন্য অর্থে পরমের প্রেমজাত আনন্দ যা পরমানন্দ রূপে বিবেচিত হয়, তার প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা ঘটে হ্লাদিনী শক্তির মারফতে। কৃষ্ণের স্বরূপ শক্তির সারভূতা শক্তি হলো হ্লাদিনী শক্তি। আনন্দ স্বরূপিনী শ্রীরাধার দেহ হলো হ্লাদিনী শক্তির সারভূত বিগ্রহ। শ্রীভগবানের লীলা থেকে প্রেম ও ভক্তিরসের উৎসারণ ঘটে। প্রেমরূপিনী রাধার দ্বারাই কৃষ্ণের স্বরূপানুভব সম্ভব হয়। প্রেম ভক্তি রূপে রাধার ভগবৎ কোটি ও জীব কোটি উভয় কোটিতেই বিস্তার। আমাদের আলোচনার প্রবেশক হিসেবে ওপরের সামান্য আলোচনা। রাধার জীব কোটির অংশটিই মূলত আমাদের আলোচ্য সেখানে আমরা নিজেদেরই নানারূপে আবিষ্কার করি।

বৈষ্ণব ধর্ম প্রেম-ধর্ম। বৈষ্ণবীয় ধারণায় বিশ্ব হলো পরম প্রেমের প্রকাশ। কৃষ্ণলীলার মধ্য দিয়েই প্রেমের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটেছে। মানবপ্রেমের মতোই কৃষ্ণলীলায় ঐশ্বর্য ও মাধুর্যের অনুভব রয়েছে। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ এ বলা হচ্ছে, ‘আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম/কৃষ্ণোন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম’। মানুষ যখন তার নিজের ইন্দ্রিয় সুখ সন্ধান করে তখন সে প্রেমকে পায় না, কামের গণ্ডিতেই সে তখন ঘুরপাক খায়। কৃষ্ণ তথা অপরের সুখ বিধানে সচেষ্ট হলেই কেবল প্রেমের দেখা মেলে। এ কারণে প্রেমকে চৈতন্যদেব পুরুষার্থের পঞ্চমবর্গ রূপে বর্ণনা করেন।

আমরা জানি বৈষ্ণব পদাবলী বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের রসভাষ্য। তা সত্ত্বেও পদকর্তাদের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি একে ‘ধর্মেই ধর্মের শেষ’ বলে পরিগণিত করেনি। এ প্রসঙ্গে গবেষক ক্ষেত্রগুপ্তের একটি মন্তব্য স্মরণ করা যায়, ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও দর্শনের চৌহদ্দীতে যে কবি-সম্প্রদায় গড়ে ওঠে তাঁদের সৃষ্টিতে রূপময় জগতের গন্ধ-রস-প্রাণ লেগেছিল, কারণ তাঁদের দর্শন জীবন আর জগৎকে নস্যাৎ করে দেয়নি; তাকে শাশ্বত না বললেও মায়া বলেনি, ভ্রান্তি বলেনি;…’। চর্যাকারগণ স্পষ্টতই জগৎ-জীবনকে মায়া-ভ্রান্তিরূপে চিত্রিত করেছেন, এখানেই পদাবলী তার পৃথকত্ব রচনা করেছে। জীবনের সঙ্গে জীবন যোগ হবার যে ব্যাপারটি আমাদের সাহিত্যের কারবারিদের কাছে আরাধ্য, বৈষ্ণবীয় প্রেমকথায় তারই আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে;

পিরীতি পিরীতি সব জন কহে / পীরিতি সহজ কথা

বিরিখের ফল নহে পিরীতি / নাহি মিলে যথা তথা।।

পিরীতি অন্তরে পিরীতি মন্তরে, / পিরীতি সাধল যে।

রিপীতি রতন লভিল যে জন। / বড় ভাগ্যবান সে।।

পিরীতি লাগিয়া আপন ভুলিয়া / পরেতে মিশিতে পারে।

পরকে আপন করিতে পারিলে / পিরীতি মিলয়ে তারে।।

বৈষ্ণব পদাবলী প্রেমের কবিতা হিসেবে শ্রেষ্ঠ। পদকর্তাগণ প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ের বিবিধ ভাবতরঙ্গরাশি কবিতায় ধরে রেখেছেন। প্রেম বৈষ্ণবদের পরম পুরুষার্থ। যদিও এই প্রেম সর্বাংশে মর্ত্যলোকের নয় তবুও তাতে মানব প্রেমলীলার সাদৃশ্য রয়েই যায়। কবিগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেমানুভূতির চিত্র আঁকতে মর্ত্যরে নর-নারীর প্রেমচিত্রেরই সাহায্য নিয়েছেন। তাই মান-অভিমান অভিসার মাথুর ভাবসম্মিলন এ সব রসপর্যায় যতটা বৈষ্ণবীয় ঠিক ততটাই মানবীয়ও বটে। তাই কবি যখন বলেন, ‘কহে চণ্ডীদাস শুন বিনোদিনী / সুখ দুখ দুটি ভাই। / সুখের লাগিয়া যে করে পীরিত / দুখ যায় তার ঠাঁই’ তখন তা মানবভাগ্যের পরিণতিকেই ইঙ্গিত করে।

প্রেমের চিরায়ত নায়ক কৃষ্ণ। প্রেমের মন্দিরে পৌঁছতে প্রথম দরজাটি হলো রূপানুরাগের। কথায় যে বলে ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি’ বৈষ্ণবীয় প্রেমকথা তারই অনুসরণে। তাই মুসলমান কবি মীর ফয়জুল্লাহ লিখেছেন, ‘কপালে চন্দন মদন মোহন/মজাইল গোকুল দেশ’। আবার কৃষ্ণের রূপ জাদুতে মুগ্ধ জ্ঞানদাসের রাধার অনুভব :

রূপ লাগি আঁখি করে গুণে মন ভোর।

প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।

হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।

পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বান্ধে।।

বৈষ্ণব পদাবলী বৃহদর্থে মানবিক অনুভূতির কাব্যরূপ। প্রেমে পড়লে রমণী হৃদয়ে যে চাঞ্চল্য জাগে তা তার ভাবভঙ্গি, আচারে প্রতিফলিত হয়- রাধার অবস্থা ঠিক তদ্রƒপ :

ঘরের বাহিরে দণ্ডে শতবার / তিলে তিলে আইসে যায়।।

মন উচাটন নিশ্বাস সঘন / কদম্ব-কাননে চায়।।

…… …… …… ……

সদাই চঞ্চল বসন অঞ্চল / সস্বরণ নাহি করে।

বসি থাকি থাকি উঠয়ে চমকি / ভূষণ খসায়া পরে।।

স্খলন-পতন-ত্রুটি মানব চারিত্রেরই অংশ। পদাবলী যে প্রেমকথাকে অঙ্গীকার করেছে তার যে কাহিনীধারা, ভিন্ন ভিন্ন কবি ‘রাধাভাবে’ ভাবিত হয়ে সে ধারায় রসসিঞ্চন করেছেন। মানব চরিত্রের যে কথা বলা হয়েছে কাহিনীধারায় রাধা-কৃষ্ণের চারিত্রে তার সাক্ষ্য মেলে যেমন,

নাম পরতাপে যার ঐছন করল গো / অঙ্গের পরশে কিবা হয়।

যেখানে বসতি তার নয়নে দেখিয়া গো / যুবতী-ধরম কৈছে রয়।

পদাবলীতে, প্রেমের ক্ষেত্রে স্থ‚ল দেহধর্মের প্রকাশ মানবীয়, সূ² অনুভূতির প্রকাশ সে দাবিতেই। যদিও পদাবলীতেই আছে, ‘কানুর প্রেম নিকষিত হেম কামগন্ধ নাহি তাহে।’ তবু প্রেম যে কামকে একেবারে বাদ দিয়ে তা তো নয়। রাধার অন্তর্যাতনা ও উপলব্ধি লক্ষ করলে তাতে স্পষ্টতই সাধারণ নারীর পরিচয়ই ফুটে উঠবে। যেমন, এই পদটি-

সই, কে বলে পিরীতি ভালো / হাসিতে হাসিতে পিরীতি করিয়া

কান্দিতে জনম গেল। / কুলবতী হইয়া কুলে দাড়াঞা

যে ধনী পিরীতি করে / তুষের অনল যেন সাজাইয়া

এমতি পুড়িয়া মরে।।

এ প্রসঙ্গেই অধ্যাপক শশিভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর ‘শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ : দর্শনে ও সাহিত্যে’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ভারতীয় সাহিত্যের ভেতর দিয়া রাধা প্রেমের যে প্রথম প্রকাশ তাহা রসবিদগ্ধ কবিগণের প্রেম-কবিতার ভেতরেই। সেই প্রেম কবিতার ভেতরে প্রকৃত প্রেম এবং অপ্রকৃত প্রেম লৌহ এবং স্বর্ণের ন্যায় স্বরূপ- বিলক্ষণ ছিল না।… সাহিত্যের দিক হইতে তাই বিচার করিলে আমরা রাধার পরিচয়ে বলিতে পারি, রাধা হইল ভারতীয় কবিমানস- ধৃত নারীরই একটি বিশেষ রসময় বিগ্রহ।’

বাঙালি নারীর যে রূপ চিরন্তন, রাধার মধ্যে আমরা তাকেই খুঁজে পাই। নিরবলম্ব, অসহায় পল্লীবালার দুঃখগাথা যেন দ্বিজ চণ্ডীদাসের এই পদটি-

কি মোহিনী জান বঁধু কি মোহিনী জান।। / অবলার প্রাণ নিতে নাহি তোমা হেন।।

ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর। / পর কৈনু আপন, আপন কৈনু পর।।

রাতি কৈনু দিবস, দিবস কৈনু রাতি। / বুঝিতে নারিনু বন্ধু তোমার পিরীতি।।

কোন বিধি সিরজিল সোতের শেঁওলি। / এমন ব্যথিত নাই ডাকি বন্ধু বলি।।

পদকর্তাদের একটা প্রকাশ্য লক্ষ্যই ছিল কবিতায় তত্ত্বের প্রকাশ। এবং এটা চৈতন্যদেবের সময় হতে পরবর্তীকালেও প্রবহমান ছিল। প্রেমতত্ত্ব, পরকীয়া তত্ত্ব, যুগল তত্ত্ব, কৃষ্ণ তত্ত্ব, রাধা তত্ত্ব, প্রভৃতির প্রবর্তনা সে প্রসঙ্গেই। কিন্তু যেটা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের সেটা হলো কবিরা যেমন তত্ত্ব-সাগরে পুরোপুরি নিমজ্জিত হননি, তদ্রƒপ কবিতাও। শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘পরবর্তীকালে গৌড়ীয় গোস্বামীগণ কর্তৃক যখন রাধাতত্ত্ব দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হইল তখনো সাহিত্যের ভেতরে রাধা তাহার ছায়া সহচরী মানবী নারীকে একেবারে পরিত্যাগ করিতে পারে নাই; কায়া ও ছায়া অবিনাবদ্ধভাবে একটা মিশ্ররূপের সৃষ্টি করিয়াছে।’ যেমন বিদ্যাপতির নিম্নোক্ত পদটিতে রাধার যে দুঃখ বর্ণিত তা নিতান্ত মানবীয় :

এ সখি হামার দুখের নাহি ওর / এ ভরা বাদর / মাহ ভাদর /

শূন্য মন্দির মোর। / কান্ত পাহুন / কাম দারুণ/

সঘনে খর শর খন্তিয়া/……. মত্ত দাদুরী। ডাকে ডাহুকী

ফাটি যাওত ছাতিয়া।।

নর-নারীর প্রেম ব্যাপারটিকে সমাজ কখনই ভালো চোখে দেখেনি। এজন্য প্রেমিক-প্রেমিকারা সব সময়ই ব্যাপারটিকে গোপন রাখতে সচেষ্ট। এর অন্যথা হলে লজ্জার সীমা থাকে না। তাই রাধা বলেছে ‘গুরুজন জ্বালায় প্রাণ করয়ে বিকলি’। গৃহকর্মে নিরত নারীটির কাছে দয়িতের আহ্বান পৌঁছলে যে অবস্থা ঘটে-

অসময়ে বাজাও বাঁশী পরাণ মানে না।।

যখন আমি বৈসা থাকি গুরুজনের মাঝে।

তুমি নাম ধইরা বাজাও বাঁশী আমি মইরি লাজে।।

এ প্রসঙ্গে শাশুড়ি-ননদীর ভয়ের কথা প্রায়শই উচ্চারিত হয়েছে। তাদের সদাজাগ্রত চোখকে ফাঁকি দিয়ে তবেই না প্রেমের অবসর-

ঘরে গুরুজন ননদী দারুণ / বিলম্বে বাহির হৈনু।

আহা মরি মরি সঙ্কেত করিয়া / কত না যতনা দিনু।।

বঁধুর পিরীতি আরতি দেখিয়া / মোর মনে হেন করে।

কলঙ্কের ডালি মাথায় করিয়া / আনল ভেজাই ঘরে।।

চণ্ডীদাসের উপর্যুক্ত পদটির মতো বাস্তবতার অধীন রাধাকে পাওয়া যায় জ্ঞানদাসের আরেকটি পদে-

কাঁদিতে না পাই বঁধু, কাঁদিতে না পাই,

নিশ্চয় মরিব তোমার চাঁদ মুখ চাই।।

শাশুড়ি ননদী কথা সহিতে না পারি।……

প্রেমের আকুতি, বিরহের বেদনা প্রভৃতি ব্যক্তি মানুষের হৃদয়ে যেভাবে আলোড়ন তোলে তারই রূপায়ণ ঘটেছে চণ্ডীদাসের এই পদটিতে-

এমন পিরীতি কভু দেখি নাই শুনি

পরাণে পরাণ বান্ধা আপনা-আপনি।

দুঁহু কোরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া

আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।

পদাবলীর এক একটি কবিতা মানুষের এক একটি মনোভাবের বাহন। ব্যক্তির গড়ফব অনুযায়ী পরিবেশ সৃজন এবং তার মাধ্যমে অনুভূতির প্রকাশই পদাবলীর লক্ষ্য। যেমন রাধার প্রেমের জ্বালা বা প্রেম সম্পর্কিত টানাপড়েনকে কবি চিত্রিত করছেন এভাবে-

কানুর পিরীতি কহিতে শুনিতে / পরাণ ফাটিয়া উঠে

শঙ্খ বণিকের করাত যেমন / আসিতে যাইতে কাটে।

পদাবলীতে রূপায়িত গার্হস্থ্য জীবনের নানা অনুষঙ্গ বারবার আমাদের এর মানবীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রেমিক-প্রেমিকার কপট মান-অভিমানের পালা জীবনে যেমন রমণীয় পদাবলীতেও তেমনটি-

এই মন বনে দানী হইয়াছ / ছুঁইতে রাধার অঙ্গ।

রাখাল হইয়া রাজবালা সনে / কিসের রভস রঙ্গ।

এমন আচার নাহি করে ডর / ঘনাইয়া আসিছ কাছে।

গুরুবর আগে করিব গোচর / তখন জানিবে পাছে।।

প্রেমের পথ সর্বদায় কণ্টকাকীর্ণ। এই দুস্তর পথের ভ্রামণিকদের সব সময়ই নানা দুর্বিপাক অতিক্রম করতে হয়। ব্যক্তিগত কষ্ট স্বীকার তো আছেই সঙ্গে সঙ্গে জাতকুল মান ত্যাগের মতো বিষয়ও-

জাতি-কুল-শীল সব হেন বুঝি গেল।

ভুবন ভরিয়া মোর ঘোষণা রহিল।।

কুলবতী হইয়া দু’কুলে দিলুঁ দুখ।

দয়িতের বিরহে নারী মনের যে গোপন দুঃখ তা সুযোগমতো প্রকাশিত হয়। বিরহদান যদি ইচ্ছাকৃতও হয়, সেটা বোঝার পরও প্রেমিকা শুধু আক্ষেপ প্রকাশ করে, কোনো ভর্ৎসনা কিংবা অভিশাপ দেয় না এবং আরো যেটা লক্ষণীয় তখনো প্রেমিকার চিন্তা, অন্তর্ধানকালে তার প্রেমিকটি কুশলে ছিল তো। এ বাস্তবতা রমণী হৃদয়ের স্বধর্মেই সুলভ :

বহুদিন পর বুঁধুয়া এলে। / দেখা না হইত পরাণ গেলে।।

এতেক সহিল অবলা বলে। / ফাটিয়া যাইত পাষাণ হ’লে।।

দুখিনীর দিন দুখেতে গেল। / মথুরা নগরে ছিলেতো ভালো।

প্রেমপথের যে কষ্টের কথা পূর্বে বলা হলো সে কষ্টযাপনের চিত্র ‘অভিসার’ পর্যায়ের পদে খুব স্পষ্টরূপে ধরা পড়েছে। যেমন,

কণ্টক গাড়ি কমল-সম পদতল

মঞ্জীর চিরহী ঝাঁপি,

গাগরি-বারি ঢারি করি পিছল

চলতহি অঙ্গুলি চাপি।

এটি অন্ধকার, বৃষ্টি ভেজা পথ অতিক্রমণের জন্য রাধার অনুশীলনের চিত্র। রাধা হাতের কাঁকনের বিনিময়ে ওঝার নিকট সর্পবশমন্ত্র শিখছে যাতে রাতে বনপথে চলতে ভয় না লাগে এমন চিত্রও পদাবলীতে সুলভ। এসবই পদাবলীর মানবীয় অভিপ্রায়ের স্মারক। আরেকটি অভিসারের পদে দেখা যায় রাধা অন্ধকারের মধ্যে একটি আলোক দেখতে পেয়ে হাত দিয়ে আলোক উৎসটিকে আড়াল করতে যায়, কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারে ওটি সাপের মাথার মণি। সে মুহূর্তে রাধার অবস্থাটি-

‘দেখি ফণি-মণি দীপ জলু জানি

বাম কর দেই ঝাঁপি রে।

জানি যুবতী এহি ফণি-পতি

সঘনে তনু উঠে কাঁপিরে।।

‘কৃষ্ণভজনে নাই জাতিকুলাদি বিচার’- জাতিভেদে বিবিক্ত মানুষকে মনুষ্যত্বের উদারলোকে আহ্বান করেছিল বৈষ্ণবরা। তাদের সাধন-ভজন মানুষকে নিয়ে এবং মানুষেরই জন্য। মানবকেন্দ্রিকতা এর অনন্য গুণ। তাই পদাবলীতে বৈষ্ণবীয়তার আড়ালে মানুষ এবং মানুষের প্রতি মানুষের প্রেমের চিত্রই বারবার অঙ্কিত হয়েছে। মধ্যযুগের ধর্ম সম্পৃক্ত মানস কাঠামোর মধ্যে এমন মানব-মাহাত্ম্যের প্রকাশ, এই নিরিখেই, বিস্ময়কর।

লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj