প্রবীণদের সঞ্চয় বিনিয়োগে ব্যাংকের থাবা : এম এ রশীদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

দেশে বর্তমানে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ শতাংশ লোক বয়সে প্রবীণ। বয়স ও স্বাস্থ্যগত কারণে এ প্রবীণরা সাধারণত কোনো আয়-রোজগারের কাজে নিয়োজিত নয়। তারা অতীত উপার্জনের সঞ্চিত অংশের ওপর নির্ভর করে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রবীণদের কিছু সংখ্যক আবার উপার্জনশীল পুত্র-পরিজনের ভরণপোষণের ওপর নির্ভরশীল। এসব কথা কেবল গ্রাম্য পরিবেশে বসবাসরত প্রবীণদের বেলায় অধিকতর প্রযোজ্য। কিন্তু শহুরে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বেশ কিছু সংখ্যক সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তারা মাসিক যতকিঞ্চিৎ পেনশন পেয়ে থাকে। কিন্তু বেসরকারি খাতে চাকরি করে যারা প্রবীণের পর্যায়ে পৌঁছেছেন তারা এক হিসেবে সম্পূর্ণ উপার্জনহীন-কেননা বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পেনশন প্রযোজ্য নয়। অতীতের আয়-উপার্জন থেকে কিছু সঞ্চয় করে থাকলে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়ে এর ওপর নির্ভর করে কায়ক্লেশে বাকি জীবনটা চালিয়ে নেয়। শহরবাসী সরকারি পেনশনভোগী এবং অন্য সব প্রবীণ জনগোষ্ঠী সারা জীবনে যা কিছু সঞ্চয় করে তা এফডিআর ও সরকারি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে তা থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ দ্বারা বর্তমানে সংসারের যাবতীয় প্রয়োজন মেটায়।

২। বর্তমানে যারা প্রবীণ কর্মক্ষম থাকাকালে তারা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে সে প্রতিষ্ঠানে সমাজে ও বৃহত্তর জাতীয় ক্ষেত্রে তারা অবশ্যই কিছু অবদান রেখেছে। এ অবদান রাখতে গিয়ে তারা নিজেদের জীবনীশক্তি ক্ষয় করেছে। ফলে প্রবীণ বয়সে পৌঁছে তারা পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হয়েছে। বোঝা হওয়ার মূল কারণ তাদের স্বাস্থ্যহীনতা ও উপার্জনহীনতা। তবে তাদের মধ্যে যারা নিজেদের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ বিষয়ে দৃষ্টি রেখেছে তারা বিভিন্ন উপায়ে কিছু না কিছু অর্থ সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলেছে। এখন প্রবীণ অবস্থায় না আছে তাদের কোনো উপার্জন, না আছে কারো ওপর নির্ভরশীলতার সুযোগ। অবশ্য পরিবার প্রধান হিসেবে তাদের কিন্তু দায় রয়ে গেছে। যেসব সন্তানদের শিক্ষা জীবন এখনো শেষ হয়নি বা যাদের বিয়ে-শাদি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি তাদের সে দায় মেটানো কর্তব্য। এ ধরনের বৃহত্তর দায় মেটানোর প্রশ্ন স্থগিত রেখে প্রবীণদের বর্তমান সাধারণ জীবিকা ও জীবনযাত্রা নির্বাহের প্রতি আমরা অধিকতর গুরুত্ব দেব। কর্মময় জীবনে আয় উপার্জন থেকে সীমিত ব্যয়ের মাধ্যমে সংসার পরিচালনা করে তারা যে সামান্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করে রাখতে সমর্থ হয়েছেন আজকের প্রবীণরা তা সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর স্কিমে বিনিয়োগ করে প্রাপ্ত লভ্যাংশ দ্বারা কায়ক্লেশে তাদের বর্তমান সংসারের ব্যয়ভার নির্বাহ করে চলছে।

৩। সাম্প্রতিককালে সার্বিক অর্থনৈতিক খাত বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের অর্থনীতি বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তা/ব্যবসায়ীদের অনুক‚লে লগ্নিকৃত অর্থের ওপর অতি উঁচু হারে সুদ ধার্য করে থাকে। বিধায় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা প্রায়ই লাভজনক হয় না। ফলে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে উদ্যোক্তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। এর অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ পড়ে থাকা। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ শিল্প ও বাণিজ্যে নিয়োজিত না হওয়ায় জাতীয় আয়ের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায়। জানা যায় যে, আমাদের দেশে ব্যাংক লগ্নির ওপর ধার্র্যকৃত সুদের হার ন্যূনপক্ষে ১৭ শতাংশ। পক্ষান্তরে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ও দূরবর্তী দেশগুলোতে সুদের হার ১০-১২ শতাংশের ঊর্ধ্বে নয়। উচ্চ সুদের হারের প্রবক্তাদের দাবি ব্যাংকগুলোকে এফডিআর-এর ওপর ১২ শতাংশ হারে সুদ গুনতে হয়। তাছাড়া গ্রামগঞ্জে স্থাপিত ব্যাংক শাখাগুলো অনেক সময়ই লাভজনক হয় না। অধিকন্তু ১০ টাকার বিনিময়ে কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খুলতে দেয়া এবং স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রভৃতি পরিচালনা ব্যাংকের আয়ের রাশ টেনে ধরে। অপর যে বিষয়টি উপেক্ষা করা হয় তা হচ্ছে বিভিন্ন কারণে এ দেশে ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয় আয়ের ৪৪ শতাংশ অথচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এ ব্যয় ৩০ শতাংশের ঊর্ধ্বে নয়।

৪। ব্যাংক সুদের হার হ্রাস উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ লাভজনক করবে এ যুক্তিতে সারা দেশে ব্যবসায়ী/উদ্যোক্তাদের মধ্যে সুদের হার হ্রাস করার পক্ষে ঐকমত্য গড়ে ওঠে। এ লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো প্রথমে সঞ্চয়ী আমানতের ওপর সুদের হার ৬ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে হ্রাস করে। পরে এফডিআর-এর ওপর দেয় সুদের হার ১২ শতাংশ থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনে ব্যাংকিং খাতের সুদের এহেন ক্রমহ্রাসমান প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের সরকার ও স্বীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রয়ে সুদের হার ১৩ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ব্যাংক কর্তৃক আমানতকারীদের দেয় সুদের হার এত হ্রাস করা সত্ত্বেও ব্যাংক তাদের লগ্নিকৃত ঋণের ওপর ধার্যকৃত সুদের হার পূর্বাবস্থায় (অর্থাৎ ১৭ শতাংশে) বহাল রেখেছে। এককথায় বলা যায় যে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে প্রকারান্তরে ব্যাংকগুলো তাদের ধার্যকৃত সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে নিজেদের মুনাফা বাণিজ্য বৃদ্ধির পথ আরো প্রশস্ত করে নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী/উদ্যোক্তারা আদৌ সুদ হার হ্রাসের সুবিধা তো পেলই না- পক্ষান্তরে প্রবীণ জনগোষ্ঠী ইতিপূর্বে মেয়াদি আমানত, এফডিআর ও সরকারি সঞ্চয়পত্র থেকে যে হারে লভ্যাংশ পাচ্ছিল- তা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হলো। এটাই হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অতি অমোঘ প্রক্রিয়া। অথচ কে না জানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের আয় উপার্জন বৃদ্ধির বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ ব্যতীত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ভিন্ন কোনো আয়ের উৎস একেবারেই নেই।

৫। এখন কিন্তু ব্যবসায়ী/উদ্যোক্তারা ব্যাংক সুদের হার হ্রাস করার কথা ঘন ঘন উচ্চারণ করে না। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর লভ্যাংশ হ্রাস প্রাপ্তিতে বিনিয়োগ কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জাতীয় আয় প্রবৃদ্ধিতে এর অবদান কতটুকু তা আর এখন তেমন কেউ বিশ্লেষণ করে না। প্রবীণদের কল্যাণে অনেক কিছু করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক শোরগোল শোনা যায়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, প্রবীণদের সঞ্চয় বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য লভ্যাংশ চলে যাচ্ছে ব্যাংক নামীয় পুঁজিবাদী লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের পকেটে। এ এক রকমের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

লেখক : সাবেক যুগ্ম সচিব, কলামিস্ট

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj