অটিজম মোকাবেলায় অভূতপূর্ব সাফল্য : সৈয়দ ফারুক হোসেন

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

অটিজমকে এক সময় পাপ বা অভিশাপ ভাবা হতো। বলা হতো, অটিস্টিক শিশুরা সমাজের বোঝা। পরিবারের কাছেও তারা ছিল অবহেলিত। অটিস্টিক শিশুদের সুষ্ঠু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ছিল না যথাযথ পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যবস্থাপনা। কিন্তু বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার তনয়া সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অটিজম মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দক্ষ-অভিজ্ঞ প্রশিক্ষিতদের তত্ত্বাবধান, বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচির ব্যবস্থা, প্রত্যেক শিশুর বিশেষ চাহিদা পূরণ, বিকলাঙ্গ শিশুদের আর্থিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং মানসিক ও শারীরিক উভয় ধরনের অটিস্টিক শিশুদের উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। অটিজম শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে গৃহীত মা-মেয়ের নানা কার্যক্রম জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে পেয়েছে স্বীকৃতি এবং অর্জন করেছে প্রশংসা।

চিকিৎসকদের মতে, অটিজম কোনো মানসিক রোগ নয়, মস্তিষ্কের একটি বিকাশগত সমস্যা। যেটা একটি শিশুর তিন বছরের মধ্যেই প্রকাশ পায়। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের অটিস্টিক হবার সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বয়সের তুলনায় পিছিয়ে থাকে। একই ধরনের আচার-আচরণ তারা বারবার করে। অটিজমের অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে বংশগত সমস্যা। এর বাইরে পরিবেশ দূষণ, রাসায়নিক মেশানো খাদ্যগ্রহণ এসবও অটিজমের জন্য দায়ী। বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, অটিজম চিকিৎসায় ওষুধের কোনো ভূমিকা নেই। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। তবে প্রতিটি অটিস্টিক শিশুই আলাদা হওয়ায় তাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারটি একজনের চেয়ে আরেকজনেরটা আলাদা। যত আগে অটিজমের বিষয়টা উপলব্ধি করে চিকিৎসা শুরু করা যায় ততই ভালো। সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে প্রতিটি অটিস্টিক শিশুই উন্নতি করে। এমনকি অনেকে সাধারণ স্কুলে যাওয়ার মতোও হয়ে ওঠে।

অটিজম আক্রান্তদের অধিকার না দেয়ার অর্থ মানবাধিকার লঙ্ঘন। তারাও মেধাবী। তাদের মেধা ও শ্রমকে সব কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মূলত এই সব বিষয় নজরে রেখে অটিজম শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মেয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ঢাকার মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে বিভিন্ন সেবা দেয়া হচ্ছে। এখানে অটিস্টিকসহ প্রতিবন্ধী মানুষদের একসঙ্গে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘প্রয়াস’ নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় এর শাখা করার কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রতিটি সেনানিবাসে শাখা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল বই দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ৩০ মিনিট দেয়া হয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলা একাডেমি ব্রেইল প্রকাশনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অটিজমে আক্রান্তদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে থেরাপিউটিক, কাউন্সেলিং ও অন্যান্য সেবা এবং সহায়ক উপকরণ দেয়া হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩৯টি উপজেলায় মোট ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে যা থেকে প্রায় ২৪ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সেবা গ্রহণ করেছেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ ১৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করে অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল সমস্যাজনিত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে অটিজম আক্রান্তদের শনাক্ত করে তাদের কাউন্সিলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো-ডিজঅর্ডার এন্ড অটিজম’-এর মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআরবির মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের প্রাথমিক পরিচর্যাকারী হিসেবে মায়েদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অটিজম ও স্নায়ু-বিকাশজনিত সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার জন্য বিশেষজ্ঞ গ্রুপের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের উপযোগী করে স্ক্রিনিং টুলস প্রণয়ন কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অটিস্টিক শিশুদের আঁকা ছবি দিয়ে ২০০৯ সাল থেকে ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দিবসের কার্ড’ তৈরি হয়।

অটিজম মোকাবেলায় আরো কতকগুলো কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। অটিজম আক্রান্তদের স্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষায় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ও সেখানে তিন হাজার একশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কাজেই বলা যায়, প্রতিবন্ধীদের প্রতিপালনে রাষ্ট্রের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করছে সরকার। সরকার পরিবর্তন হলেও সেবামূলক এই কার্যক্রম যেন অব্যাহত থাকে সেজন্য ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সরকার সহযোগিতা, কাজেই প্রতিবন্ধীদের সহায়তা’য় এ খাত সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার জন্য সরকার থেকে আহ্বান জানানো। প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারায় আনতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাডেমি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার স্থাপনের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার হচ্ছে। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী ‘বিশেষ সফটওয়্যার’ তৈরি করে অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। এ ছাড়াও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রত্যেক শিশুকে শিগগিরই ‘প্রিভিলেজ কার্ড’ দেয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। সেবা-সহযোগিতায় বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে এমন কার্ডের অধিকারীরা। যাতে চিকিৎসা, কেনাকাটা, শিক্ষা, গাড়ি পার্কিংসহ সবক্ষেত্রে তারা বিশেষ সুবিধা পাবেন। তারপরও সরকার ব্যাপক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এ সমস্যা মোকাবেলায় বেসরকারিভাবেও নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। বেসরকারি পর্যায়ে অনেক আগে থেকেই অটিজম বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে ঢাকায় অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা দেয়ার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ঢাকার বাইরেও রয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান।

‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ উপলক্ষে শুক্রবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘অটিজম মোকাবেলা : এসডিজি’র আলোকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কৌশল’ শীর্ষক এ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের। জাতিসংঘে বাংলাদেশ, ভারত, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মিশনের সহায়তার অটিজম স্পিকস এ আলোচনার আয়োজন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সায়মা ১২ মিনিটের বক্তব্যের শুরুতে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তার মা শেখ হাসিনার অবদানকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, অটিজমের বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ যা কাজ করেছে, তা গর্ব করার মতো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মডেল অনন্য। নানা ক্ষেত্রে নানামুখী কাজ হচ্ছে সেখানে। এটা সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং সংশ্লিষ্টদের সাড়ায়। ‘সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও’ জাতীয় উন্নয়নে অটিজম আক্রান্তদের সম্পৃক্ত করতে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকন্যা বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অটিজম ও অন্যান্য এনডিডি আক্রান্তদের জন্য পুরো এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আর্লি চাইল্ডহুড সেন্টারগুলোতে অন্তত দুজন প্রতিবন্ধী শিশু ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল অটিজম এন্ড এনডিডি একাডেমি স্থাপন করেছে। জাতীয় পর্যায়ের নাটক, সিনেমা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অটিজম আক্রান্তদের সুযোগ দেয়ারও একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে একযোগে কাজ করছে জানিয়ে তিনি প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ ‘আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রæতি’কে ‘গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ৯০ দশকের মাঝামঝি বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সর্বপ্রথম জাতীয় নীতি নেয়া হয়। ১৯৯৯ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা, যা পরে জেপিইউএফ-এ পরিণত হয়।

২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় প্রথম আইন প্রণয়ন ও ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্ক ফোর্স’ গঠন করে। এ ছাড়া অটিজমসহ এনডিডি (নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার) আক্রান্তদের চিকিৎসাসহ যাবতীয় অধিকারের সুরক্ষা আইনের আওতায় আনতে ২০১৩ সালে ‘ডিজএবিলিটি ওয়েলফেয়ার অ্যাক্ট’ ও ‘দ্য ন্যাশনাল নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার প্রটেকশন ট্রাস্ট অ্যাক্ট’ করা হয়। প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করা অল্প ক’টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম উল্লেখ করে সায়মা বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী ‘সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক’ গঠিত হয়, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দৈহিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের সমাজের অংশ বলে গণ্য করার জোর প্রচার চলছে। অটিজমে আক্রান্তসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের আর্থসামাজিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় তাদের পরিবার ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যে রেজুলেশন গৃহীত হয় তাও বাংলাদেশ উত্থাপন করেছিল বলে জানান তিনি। অটিজম মোকাবেলায় এসডিজি’র আলোকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কৌশল’ শীর্ষক এ আলোচনায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুল জাতিসংঘ মহাসচিবের স্ত্রী বান সুন-টেক অটিজম আক্রান্তদের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

অটিজমের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে ২০০৮ সালে ২ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। পরের বছর থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিগত অটিজম দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেধা বিকাশের সুযোগ পেয়ে অটিজমে আক্রান্তরাও যেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে, সেজন্য সবাইকে আরো উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘এদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা আছে। সেটাই বিকশিত করে দেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, যেন মেধা বিকাশের মাধ্যমে তারাও সমাজকে কিছু উপহার দিতে পারে।’ অটিজমে আক্রান্ত হিসেবে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, চার্লস ডারউইন, আইজ্যাক নিউটনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অটিস্টিক শিশুরা যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তারাও মানুষ। তারাও আমাদের সমাজের অংশ, তাদের জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে। একটা দেশকে উন্নত করতে হলে সবাইকে নিয়ে করতে হবে, কাউকে অবহেলা করে না। আমাদের দেশে আগে অটিজম নিয়ে কোনো সচেতনতাই ছিল না। কোনো সন্তান অটিস্টিক থাকলে বাবা-মা সেটা লুকাতেন। সমাজের কাছে বলতে পারতেন না। মাত্র কিছুদিন থেকে এ সচেতনতার ব্যাপারটা সামনে চলে এসেছে।’ প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারায় আনতে সরকার ‘কাজ করে যাচ্ছে’ মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা তাদের জন্য ‘সুন্দর পরিবেশ’ সৃষ্টির প্রতিশ্রæতি দেন। অটিজমের বিরুদ্ধে নিজের মেয়ের জোরাল ভূমিকার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিসিয়েটিভ ইন বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা হোসেনের প্রচেষ্টায় দেশ ও বিদেশে অটিজমের গুরুত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তার উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অটিজম আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারের জন্য আর্থ-সামাজিক সহায়তা শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।’

সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম এবং স্নায়বিক জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়। প্রথমে নিজ দেশ বাংলাদেশে এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থায় তিনি কাজ করেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুতুলকে ‘হু অ্যাক্সিলেন্স’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পুনম ক্ষেত্রপাল সিংয়ের উদ্যোগে এই অঞ্চলের ১১টি দেশের জন্য এ পুরস্কার চালু করা হয়। এর আওতায় জনস্বাস্থ্যে অবদানের জন্য প্রতি বছর একজন ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়। মনস্তত্ত্ববিদ সায়মা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অটিজম স্পিকস’-এর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। তিনি ২০১৩ সালের জুন থেকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ‘বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেলে’ অন্তর্ভুক্ত আছেন। পুতুলের উদ্যোগেই ২০১১ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় অটিজম নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের পর গড়ে ওঠে সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক। সংগঠনটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অটিস্টিক শিশুদের স্বাস্থ্য, সামাজিক ও শিক্ষা সহায়তা দেয়ার জন্য অবকাঠামো গড়তে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যার উদ্যোগেই অটিজম সচেতনতায় বাংলাদেশের একটি প্রস্তাব বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। ২০০৮ সালের পর থেকে সায়মা ওয়াজেদ অটিজম সমস্যার উন্নয়নে কাজ করার জন্য অনেক অ্যাওয়ার্ড পান। অটিজম আন্দোলন ও বিশ্বস্বাস্থ্যে অবদান রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি ইউনিভার্সিটি ডিসটিংগুইসড অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ডস প্রদান করে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলকে। ফ্লোরিডার মায়ামিতে ব্যারি ইউনিভার্সিটি মিলনায়তনে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়। সায়মা ওয়াজেদ হোসেন ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি, ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি এবং ২০০৪ সালে স্কুল সাইকোলজির ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তার গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত হয়।

একটি রাষ্ট্র তখনই কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন প্রত্যেক নাগরিকের জন্য যথাযথ সুযোগ-সুবিধা বজায় থাকে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত। উন্নয়নের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশের সবার অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আমাদের অটিজম শিশু এবং প্রতিবন্ধীরা সঠিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে। এক সময় তারা দেশের উন্নয়নে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল অটিস্টিক শিশুদের জন্য যে অবদান রেখে যাচ্ছেন, তাতে মানবতার জয় নিশ্চিত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তে যে মানব ভালোবাসা এবং মুক্তির বারতা বহমান ছিল, তার প্রমাণ মেয়ে এবং নাতি-নাতনিদের এগিয়ে চলা।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj