বিশ^ দরবারে বাঙালির মঙ্গল শোভাযাত্রা : মিঠুন মিয়া

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

বাঙালি সংস্কৃতি মানবতা, পারস্পরিক সম্প্রীত, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের সংস্কৃতি। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই বাংলা নতুন বছরের শুরু। পুরনো বছরের অতীতকে মুছে নতুনের প্রত্যাশায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়। পহেলা বৈশাখই হচ্ছে বাঙালির সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উৎসব। বাংলা ও বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির মূল বিষয়টি হলো, উৎসবের মধ্য দিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। যে উৎসবের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাস, লোকজ ঐতিহ্য ও গৌরব প্রকাশ পায় তা হলো এই পহেলা বৈশাখ। আর এই পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা। গত ৩০ নভেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো। সংস্থাটির ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ শাখায় মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইথিওপিয়ার আদ্দিসআবাবায় সংস্থার ইন্টার-গভর্নমেন্টাল কমিটির ১১তম সেশনে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়। সেখানে মঙ্গল শোভাযাত্রা সম্পর্কে বলা হয়েছে, বাংলা বছরের প্রথম দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এই শোভাযাত্রার আয়োজন করেন। এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বলা হয়, এর মাধ্যমে অপশক্তি দূরে থাকবে এবং উন্নত ভবিষ্যৎ পাওয়া যাবে।

এই শোভাযাত্রা বাংলাদেশের মানুষের লোক-সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে অপশক্তির বিরুদ্ধে তাদের লড়াই করার ক্ষমতা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার সাহসকেও প্রকাশ করে। ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটে বলা হয়, মঙ্গল শোভাযাত্রা গণতন্ত্রের জন্য সংহতি, বিভিন্ন সম্প্রদায়, ধর্ম, লিঙ্গভেদে দেশের মানুষের ঐক্যও প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে বিশ^ দরবার আবার নতুন করে পরিচিতি লাভ করলো আমাদের সংস্কৃতি। এটি নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতির একটি বড় অর্জন। দেশ যখন সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন সংস্কৃতি উন্নয়ন একান্ত কাম্য। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ^ ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালির সংস্কৃতি আরো উচ্চ আসনে আসীন হলো। আমরা সাংস্কৃতিকভাবেও অগ্রসরমান জাতি এর প্রমাণ মিলল মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ^ ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কোর প্যারিসে অবস্থিত সদর দপ্তরে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন করে। সরকারের সক্রিয় ক‚টনৈতিক চেষ্টায় মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে ইউনেস্কো। ২ বছর আগে এই তালিকায় মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা শুরু হয় বাংলা একাডেমির প্রস্তুত করার প্রস্তাবনা ইউনেস্কোর কাছে হস্তান্তর করার মাধ্যমে। এরপর সেই মনোনয়নের প্রস্তাবনা কয়েকটি সংশোধনীর মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনেস্কোর কমিটিতে বিষয়টি অনুমোদিত হলো। ইতোপূর্বে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের বাউল গান ও ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে জামদানি, বয়ন শিল্প ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি লাভ করে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর সিলেটের শীতল পাটি বয়ন শিল্পকে ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছে যা ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বিবেচিত হবে। বাঙালির বর্ষবরণের আনন্দ আয়োজনে অন্তরঙ্গভাবে মিশে আছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সত্য, সুন্দর ও মুক্তির সন্ধানে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন হয়। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। থাকে বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানান প্রতীকী উপকরণ, রঙবেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। জানা যায়, বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রথম শুরু হয়েছিল যশোরে। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন মাহবুব জামাল শামীম। শামীম এবং তার বন্ধুরা মিলে যশোরে ‘চারুপীঠ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার চাপাকলে বাংলা সংস্কৃতি হুমকির সম্মুখীন হয়। সেই সময়ে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী সব নিদর্শন যেমন পাপেট, মুখোশ ইত্যাদি নিয়ে তারা একটা শোভাযাত্রা করবেন। চারুপীঠ থেকে শুরু হওয়া সেই শোভাযাত্রাটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম নববর্ষের শোভাযাত্রা। এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।

১৯৮৯ সালে সামরিক শাসনে হতাশ ছাত্রসমাজ একটি উন্নত ভবিষ্যতের চিন্তায় বাংলাদেশের মানুষকে একস্থানে জমায়েত করতে চেয়েছিল। সেই থেকে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রায় থাকে বিশালাকার চারুকর্ম পাপেট, হাতি ও ঘোড়াসহ বিচিত্র সাজসজ্জা। থাকে বাদ্যযন্ত্র। ১৯৯১ সালে চারুকলার শোভাযাত্রায় নতুন মাত্রা লাভ করে। সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, দেশবরেণ্য লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা অংশ নেয়। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরাও স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে এগিয়ে আসে। তারাও এতে আনন্দে অংশ নেয়। ফলে শোভাযাত্রার ব্যাপকতা আরো বৃদ্ধি পায়। সে শোভাযাত্রায় বিশালাকার হাতি, বাঘের প্রতিকৃতি ছিল। ১৯৯২ সালের শোভাযাত্রায় সামনের সারিতে রঙবেরঙের পোশাক পরিহিত শিক্ষার্থীর কাঁধে ছিল বিরাট আকারের কুমির। বাঁশ এবং বহু বর্ণের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কুমিরটি। ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া, বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। চারুকলার সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় দিয়ে শিশু একাডেমি হয়ে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সব শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশ নেয়। বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অনাচে-কানাচে মঙ্গল শোভাত্রার আয়োজন করা হয়। এর মূল নেতৃত্বে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে পুরান ঢাকাবাসীদের সঙ্গে নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। তবে বাংলাদেশে এখনো ভিন্নপন্থার লোকজন মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন। নানা সময় বাঙালির এই সংস্কৃতি নস্যাৎ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ধর্মীয়ভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে দেখার প্রয়াস নতুন নয়। ইউনেস্কোর ঘোষণার মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য বহু অংশে বেড়ে গেল। আগামী দিনগুলোতে আরো ব্যাপক পরিসরে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।

লেখক : প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj