জন্মদিনের শুভেচ্ছা : মুহম্মদ শফিকুর রহমান

বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

মিলিটারি শাসক জিয়াউর রহমানের পতনের পর একদল তরুণ সংবাদপত্রের মাধ্যমে মিলিটারি কালো দানবের মোকাবিলা করার ব্রত নিয়ে ‘দৈনিক আজকের কাগজ’ ‘সাপ্তাহিক কাগজ’ প্রকাশে নিজেদের নিয়োজিত করে, কাল পরিক্রমায় ছিটকে এদিক-ওদিক চলে গেলেও সাংবাদিকতা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। বরং একেকজন আজ এক একটি পত্রিকার সম্পাদক, প্রধান সম্পাদক বা সিনিয়র সাংবাদিক বা মালিক হয়ে দাপটের সাথে বিচরণ করছেন। তাদের মধ্যে নাঈমুল ইসলাম খান একটার পর একটা কাগজ বের করছেন, সর্বশেষ ‘আমাদের অর্থনীতি’ ‘আমাদের নতুন সময়’ ‘ড়ঁৎ ঃরসব ও ‘আমাদের সময় ডটকম’ এই ৪টি পত্রিকা সম্পাদনা করে চলেছেন। শ্যামল দত্ত দৈনিক ‘ভোরের কাগজ’ সম্পাদনা করছেন। আমান উদ-দৌলা বিদেশে চলে গেলেও সাংবাদিকতা ছাড়েনি। সৈয়দ বোরহান কবির সংবাদ-সংশ্লিষ্ট ক্রিয়েটিভ কাজ করছে এবং মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু বেশ কিছুকাল আমেরিকা কাটিয়ে এখন ডিবিসি টেলিভিশনের এডিটর ইন চিফ এÐ সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রয়েছেন স্বদেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক জনকণ্ঠ, এবার একুশে পদককে ভ‚ষিত হয়েছেন। রয়েছেন জাফর ওয়াজেদ, বর্তমানে দৈনিক জনকণ্ঠের সিনিয়র এ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর ও কলামিস্ট। বলা যায় এই জেনারেশনটি আমাদের সংবাদপত্র জগতে আধুনিক একটা ধারার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই ধারা সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ-বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রির পাশাপাশি বিশ্বাসে অবিচল এবং সাহসী।
অবশ্য পাকিস্তান আমলে যেমন কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের অনেকে আÐারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে এসে দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক প্রভৃতি পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন মওলানা আকরম খাঁ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবদুস সালাম, জহুর হোসেন চৌধুরী প্রমুখ। একইভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মুক্তিযুদ্ধ ফেরত একটি দল আমাদের সংবাদপত্রকে গতি দিয়েছেন। আর আজতো দেশব্যাপী ৭/৮ শ দৈনিক কাগজ রয়েছে। এরমধ্যে ৯৫% ই আÐারগ্রাউÐ (মূলত এই সব আÐারগ্রাউÐ নিউজ পেপার হল বিজ্ঞাপন, ক্রোড়পত্র, হান্টিং, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বø্যাক মেইলিং-এর অভিযোগও শোনা যায়। তবে ইলেট্রনিক মিডিয়াও (টেলিভিশন, বেতার) পাঠককে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করছে। সবচে’ ঝ্ু্ঁিকর ব্যাপার হল অনলাইন পোর্টাল তথা সোস্যাল মিডিয়া। এর সংখ্যা নাকি ২০,০০০-এর কাছাকাছি। এখন পর্যন্ত এর কোনো নীতিমালাও তৈরি হয়নি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি নীতিমালা হওয়া দরকার।
শ্যামল দত্ত সম্পাদিত ভোরের কাগজের ২৫ বছর পূর্তি বা রজতজয়ন্তীর কেক কেটে এই লেখাটি লিখছি। এর সাথে আমার একটা সম্পর্ক আছে। এটি যখন বের হয় তখন দৈনিক ইত্তেফাকে-এ কাজ করি। বন্ধুদের আমন্ত্রণে ভোরের কাগজে বেশ কিছু কলাম লিখেছিলাম। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সুযোগে ভোরের কাগজ ও বন্ধুদের স্মরণ করছি। এখন বসন্ত। গাছে গাছে নতুন পাতা নানান রংয়ের ফুল প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তুলেছে। একুশের সঙ্গে সঙ্গে ফাল্গুনের মিলটা আত্মার। ভোরের কাগজের প্রতিষ্ঠাতারা এই বসন্তে পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি বাংলা ভাষা আন্দোলনের রক্ত ঝরা মাস। কৃষ্ণচ‚ড়ার রংয়ের মতো লাল রক্ত ঢেলে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা, সেও ৬৫ বছর আগের কথা।  এর মধ্যে অনেক কিছু আমরা যেমন অর্জন করেছি তেমনি কিছু অর্জন হারিয়েও যাচ্ছে। আমাদের অন্যতম প্রধান অর্জন বাংলা একাডেমি-রমনা ঘিরে বাঙালির প্রাণের বইমেলা। রাজধানীর বাইরেও অসংখ্য মেলা হচ্ছে, নতুন নতুন বই আসছে মেলায়, নতুন নতুন লেখকের আবির্ভাব হচ্ছে। কিন্তু হারিয়ে যেতে বসেছে একুশে ফেব্রæয়ারি-কেন্দ্রিক সংকলন-সাহিত্য। একটা সময় ছিল যখন গ্রাম, শহর, গঞ্জ সর্বত্র একুশে সংকলন প্রকাশিত হত-হাজার হাজার। শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছাত্র সংগঠন নিজেরা চাঁদা দিয়ে সংকলন প্রকাশ করত। যাদের অর্থাৎ যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের ম্যাগাজিন আকারে প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না তারাও দেয়াল পত্রিকা আকারে প্রকাশ করত। যাদের পাকা দেয়াল ছিল না তারাও হার্ড বোর্ড দিয়ে দেয়াল বানিয়ে প্রকাশ করত। কচি-কাঁচাদের হাতে কবিতা, ছোট গল্প, সবগুলোর শিল্পমূল্য হয়তো কম ছিল। কিন্তু কচি মনে অধিকার সচেতনতার যে বীজ রোপন হত কালে তা সোনালি ফসলে রূপ নিত। একুশের সংকলন প্রকাশে নেতৃত্ব দিত ছাত্র সংগঠনগুলো। তারা আজ সংকলন সাহিত্য চর্চার মতো এক বায়বীয় কাজের চেয়ে বস্তুগত লাভ-লোকসানের হিসেবের খাতা চর্চায় ব্যস্ত। কিছু কিছু সামাজিক সংগঠন রয়েছে যাদের সংকলন প্রকাশের মূল টার্গেট চাঁদা এবং বিজ্ঞাপন হান্টিং। অর্থনৈতিক ও প্রাযুক্তিক সমৃদ্ধির সাথে গ্রামগুলো না শহর না গ্রাম এমনি এক ক্লীব সমাজে পরিণত হয়েছে। একুশের শহীদ দিবস পালন, পয়লা বৈশাখের মেলা এসব এখন গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে আসন গেড়েছে। কিন্তু গ্রামের মেলা-পার্বনে যে প্রাণ ছিল তা এখন নেই। শোনা যায় এখন বাংলাদেশ সোস্যাল মিডিয়ার সংখ্যা ২০,০০০-এর কাছাকাছি। তরুণ সমাজ এখন সেদিকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। কারো কারো ধারণা এই সোস্যাল মিডিয়ার দাপটে প্রিন্ট মিডিয়া একদিন হারিয়ে যাবে। তাই কি? আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা এবারের বাংলা একাডেমির বইমেলা উদ্বোধনকালে প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন “সোস্যাল মিডিয়া সমৃদ্ধ হচ্ছে ভালো, কিন্তু নতুন বই-এর মিষ্টি গন্ধ নিতে নিতে পাতা উল্টিয়ে পড়ার মজাই আলাদা।”
সর্বশেষ যে কথাটি বলতে চাই, জাতীয় প্রেসক্লাব জন্মলগ্ন (১৯৫৪) থেকে নিয়মিত একুশে সংকলন প্রকাশ করে চলেছে। মানের দিকটা পাঠক বিচার করবেন কিন্তু আমরা ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছি যদিও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অযাচিত হস্তক্ষেপ কখনো কখনো এর আত্মম্ভরিতায় আঘাত হানার অপচেষ্টা হয়েছে, কিন্তু ‘মাথা নত না করা’র নীতিতে আমরা অটল। সংকল্পবদ্ধ। কবি বলেছেন, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। এ কোনো কথার কথা নয়, এটি একটি প্রতিজ্ঞা একটি শপথ। পিতা পাকিস্তান, চীন, আমেরিকার মতো বিশ্ব মোড়লদের লুটেরা হাত ভেঙ্গে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ গড়ে দিয়ে গেছেন আর কন্যা সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-আইএমএফ-এর শয়তানির নেকাব উন্মোচন করে দিয়ে নিজের শক্তিতে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ দ্রæততার সাথে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। একই সঙ্গে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কর্পোরেট পুঁজির দানবদের কোমরে দড়ি বেঁধে সাইড লাইনে ঠেলে দিয়েছেন, খুনি যুদ্ধাপরাধী জঙ্গিবাদের বিষবৃক্ষগুলোকে একে একে উপড়ে ফেলে সুন্দর চেহারার আড়ালে দাঁতাল শূয়রের দলকে শিক্ষা দিয়ে চলেছেন। তিনিইতো কাÐারি।

১লা ফালগুন ১৪২৩
লেখক-সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj