প্রতি মাসেই ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের সুদহার কমছে

বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

মরিয়ম সেঁজুতি : প্রতি মাসেই ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের সুদহার কমছে। গত ডিসেম্বর মাস শেষে দেশের ব্যাংকগুলোয় আমানতের গড় সুদহার ছিল ৫.২২ শতাংশ, যা নভেম্বর মাসে ছিল ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। সুদহার কমানোর প্রবণতায় আমানতকারীরা অনেক বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন। সেই তুলনায় ঋণগ্রহীতারা লাভবান হচ্ছেন না। এই অবস্থায় আমানতের সুদহার কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া আমানতের সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে গত মঙ্গলবার এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে দায়-সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে, যা বাঞ্ছনীয় নয়। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, আমানতের সুদহার আর কমানো না গেলে ঋণের সুদ কমানো যাচ্ছে না। এখন ব্যাংকের বাহুল্য খরচ বেড়েছে, খেলাপি ঋণ বাড়ায় এই খাতে প্রভিশন রাখার হার বেড়েছে। ফলে ব্যাংকের মোটা অঙ্কের তহবিল আটকে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত আমানতের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫.২২ শতাংশ এবং বিতরণ করা ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯.৮৩ শতাংশ। ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) দাঁড়িয়েছে ৪.৬১ শতাংশীয় মাত্রায়। অন্যদিকে গত জানুয়ারি শেষে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫.১৫ শতাংশ এবং পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৫৭ শতাংশ। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঋণের সুদের হার কমাতে আমানতের সুদহার কমিয়ে এনেছে ব্যাংকগুলো। তা ছাড়া ঋণের চাহিদা কম থাকায় আমানত সংগ্রহেও আগ্রহ পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। তাই আমানতের সুদের হার কমতে কমতে এখন মূল্যস্ফীতির কাছাকাছি চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুদহার কমানোর প্রবণতায় আমানতকারীরা ব্যাপক হারে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেই তুলনায়

ঋণগ্রহীতারা লাভবান হচ্ছেন না। আমানতের সুদহার কম এবং ঋণের সুদহার বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়ছে। ঋণের সুদহার কমানোয় ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড কমানো প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ বাড়ায় কস্ট অব ফান্ড বেড়ে গেছে। যে কারণে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার কমাতে পারছে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আমানতের তুলনায় ঋণের সুদহার কমানোর ব্যবধান ১৫ থেকে ২০ ভাগ। বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলো ২০১২ সালে আমানতের বিপরীতে সুদহার প্রায় ৭২ শতাংশ কমিয়ে দেয়। অথচ ঋণের সুদহার কমায় মাত্র ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর পরের বছর ২০১৩ সালে আমানতের বিপরীতে ৬৬ শতাংশ কমিয়ে আনে ব্যাংকগুলো। অথচ ওই বছর ঋণের সুদহার কমে মাত্র ৪ শতাংশ। ২০১৪ সালেও ঋণের তুলনায় আমানতের বিপরীতে সুদহার কমার পরিমাণ ৬ গুণেরও বেশি। ২০১৪ সালে আমানতের সুদহার ৭৬ শতাংশ কমলেও ঋণের বিপরীতে কমে মাত্র ১২ শতাংশ। ২০১৫ সালে ঋণের বিপরীতে সুদহার কমে ১১ শতাংশ, যেখানে আমানতের বিপরীতে কমানো হয় ৫৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে ঋণের বিপরীতে সুদহার কমে ১০ শতাংশ, যেখানে আমানতের বিপরীতে কমানো হয় ৬৫ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, ঋণের সুদ কমাটা ব্যবসার জন্য ভালো। তবে শুধু ঋণগ্রহীতার কথা চিন্তা না করে ঋণের জোগানদাতা আমানতকারীদের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তিনি মনে করেন, আমানতের গড় সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নামায় আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের ব্যাংকবিমুখতা তৈরি হতে পারে। যদিও শেয়ারবাজার পরিস্থিতিসহ নানা কারণে এখন মানুষ চাইলেও অন্যদিকে যেতে পারছে না। তাদের সুরক্ষার বিষয়টি সবাইকে ভাবতে হবে।

জানা গেছে, আমানতের মুনাফার হার অব্যাহতভাবে কমানোয় ঠকে যাচ্ছেন সঞ্চয়কারীরা। এখন যে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে উৎসে কর, ভ্যাট, আফগারি শুল্ক ও ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ কেটে রাখার পর যে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে তা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। ফলে ব্যাংকে টাকা জমা রেখে এখন সঞ্চয়কারীদের মুনাফার পরিবর্তে টাকা আরো ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে আমানতের সুদহারের তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি। এতে গ্রাহকের মূল অর্থ ক্ষয় হচ্ছে। ঋণের সুদহার কমাতে আমানতের সুদহার আরো কমানোর প্রয়োজন নেই। এ জন্য ব্যাংকগুলোয় বাহুল্য যেসব খরচ আছে সেগুলো কমিয়ে আনতে হবে। নিয়মনীতি মেনে ঋণ বিতরণ করে তা আদায় নিশ্চিত করে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে। তা হলে ঋণের সুদহার কমবে।

আমানতের সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত বাংলাদেশ ব্যাংকের : আমানতের সুদহারের নিম্নগামী প্রবণতা রোধের বিষয়ে সক্রিয় থাকার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত মঙ্গলবার থেকে সঞ্চয়প্রবণতা ক্ষুণœ হওয়ার শঙ্কার কথা উল্লেখ করে নতুন এক সার্কুলার জারি করে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের পাঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। যেখানে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া আমানতের সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়, ঋণের সুদহার নিম্নগামী ধারায় রাখার জন্য মধ্যবর্তী ‘স্প্রেড’ সংকোচন করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার কম রাখার জন্য আমানতের সুদহার না কমিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়সহ ব্যবস্থাপনা দক্ষতার বিভিন্ন দিকে নজর রেখে আমানতের সুদহার ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান কমিয়ে আনতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে কৃষি, রপ্তানি খাতসহ কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে আমানত বা ঋণের সুদহার নির্ধারণে ব্যাংকগুলোকে স্বাধীনতা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ঋণ ও আমানতের সুদহারের মধ্যে কমপক্ষে ৫ শতাংশীয় মাত্রা ব্যবধানের একটি নির্দেশনা রয়েছে ব্যাংকগুলোর জন্য। জারি করা সার্কুলারে এই মাত্রা কমানোর সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকলেও ঋণের তুলনায় আমানতের সুদহার যেন খুব কম না হয় সে বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj