সাক্ষাৎকার > সেই গোড়া থেকেই বইমেলার সঙ্গে পরিচয় : মোরশেদ শফিউল হাসান

বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭


কাগজ প্রতিবেদক : মুক্তধারার প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহা যেবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে পাটি পেতে বই সাজিয়ে বসেছিলেন, সেই গোড়া থেকেই বইমেলার সঙ্গে আমার পরিচয়। আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ অনার্সের ছাত্র। তারপর বহু বছর গেছে, প্রতি ফেব্রæয়ারি মাসের বিকেল থেকে রাত অবধি আমাদের মেলা প্রাঙ্গণেই কেটেছে। মাঝে দু-এক বছর নিজেরাও মেলার খোলা জায়গায় টেবিল পেতে লিটল ম্যাগাজিন বিক্রি করেছি। ছাত্র জীবনের শেষে, কর্মজীবনে প্রবেশ করার পরও, বহু বছর পর্যন্ত একুশে মেলা চলাকালীন এমন দিন খুব কমই গেছে, যখন ঢাকায় থাকলে একবার বইমেলায় হাজিরা দিইনি। কিন্তু ইদানীং কয়েক বছর হলো নানা কারণে তা আর হয়ে ওঠে না। তবু এখনো বেশ কদিন যাই, যদিও খুব ভিড়ের দিনগুলো এড়িয়ে চলি। মেলা প্রসঙ্গে ভোরের কাগজের এক প্রশ্নের জবাবে সদ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন।
তিনি বলেন, এই নিয়ে তৃতীয় দিন বইমেলায় এলাম। কয়েকজন লেখক ও প্রকাশক বন্ধুর সঙ্গে খোলা জায়গায় বসে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিলাম। নানা বিষয়ে আলোচনা হলো। লেখালেখি, প্রকাশনা, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার হাল-অবস্থা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে দলবাজি, মিডিয়ার ভ‚মিকা ইত্যাদি। অনেকদিন পর মন খুলে কথা বলতে পেরে আমার নিজের খুব ভালো লেগেছে। তবে গ্রন্থপ্রেমী বা ক্রেতা সমাগমের দিক থেকে মেলা এখনো তেমন জমে ওঠেনি বলে মনে হয়। শিশু চত্বরেই যা একটু ভিড় লক্ষ্য করলাম। কয়েকজন অভিযোগ করলেন সেখানে নাকি দেদার পাইরেটেড বই বিক্রি হচ্ছে। এতে শিশু ও তাদের অভিভাবকরা কম দামে বই কিনতে পারছেন সত্যি। কিন্তু নৈতিকতা ও আইনের দিক থেকে ব্যাপারটা মোটেও অনুমোদনযোগ্য নয়। গ্রন্থমেলার নীতিমালাও নিশ্চয়ই এর ফলে লঙ্ঘিত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এ বিষয়ে নজর দেয়া।
সম্প্রসারিত মেলা প্রসঙ্গে এই লেখক বলেন, মেলা সম্প্রসারণ না করে উপায় ছিল না। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারে মেলায় ঘোরাফেরা ও স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখার সুযোগ আশা করি বাড়বে। তবে শহরের লোকসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, বাড়ছে প্রকাশকের সংখ্যাও, তাতে কয়েক বছর পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও স্থান সংকুলান হবে কিনা সন্দেহ।
হ্যাঁ, আগে বইমেলাটাকে মনে হতো একান্তভাবে লেখক-পাঠকদেরই মিলনমেলা। এখন বিশেষ বিশেষ দিনে বইমেলা তার চরিত্র হারিয়ে ফেলে বলে মনে হয়।
এক সময় মেলায় নিজের নতুন বই প্রকাশের দিনটি ছিল খুব আনন্দের। আজ বেরুবে, কাল বেরুবে করতে করতে অবশেষে যেদিন মেলায় প্রকাশকের স্টলে গিয়ে সত্যি সত্যি নিজের নতুন বইটি হাতে পেতাম, সেদিন মনে হতো মেলার স্বার্থকতা যেন ওতেই, আমার ওই বই প্রকাশেই। আজও নবীন বা তরুণ লেখকরা নিশ্চয়ই বই প্রকাশের দিন তেমন আনন্দ নিয়েই ঘরে ফেরেন।
মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকের মতো আমিও মনে করি, বাংলা একাডেমির অতঃপর বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়া উচিত। তাতে তারা তাদের করণীয় ও অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ অন্যান্য কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করতে পারবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সহযোগিতায় প্রকাশকরাই আগামীতে এই মেলা অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে পারেন। তাতে প্রথম প্রথম হয়ত কিছু সমস্যা দেখা দেবে। কিন্তু দু-দিন আগেপরে তাদের এই চ্যালেঞ্জটা নিতেই হবে। অবশ্য বর্তমানে গ্রন্থকেন্দ্রের যে অবকাঠামো ও জনবল, তাতে এই প্রতিষ্ঠানটি বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ভ‚মিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। এমনিতেও এই প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বের কোনো যৌক্তিকতা বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যায় না। সরদার জয়েনউদ্দিন যখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন, সেই সময়টির কথা বাদ দিলে, প্রতিষ্ঠানটি ক্রমান্বয়ে নিষ্ক্রিয়তার পঙ্কে নিমজ্জিত হচ্ছে। এ অবস্থায় হয় প্রতিষ্ঠানটির সামর্থ্য বৃদ্ধি করা নয়ত তাকে বিলুপ্ত করার কথা সরকারকে ভাবতে হবে। আগামীতে বইমেলার শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থেও ভুঁইফোড় বা মৌসুমি প্রকাশকদের মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বারিত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রকৃত প্রকাশকরা নিশ্চয়ই এটা মনে মনে চান। কিন্তু আমাদের সমাজের আর দশটা ক্ষেত্রের মতো এখানেও সমিতির ভোটের রাজনীতি উচিত কথার গলা চেপে ধরে। বইমেলায় প্রবেশের জন্য আগামীতে নামমাত্র মূল্যের হলেও টিকিট চালু করা উচিত। তা অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে। একুশের চেতনা বা আবেগের কথা বলে অতীতে যারা এই টিকিট চালুর প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন, তারা কিন্তু একুশে কেন্দ্রিক অন্যান্য বাণিজ্যে পিছিয়ে নেই।
নিজের বই প্রকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি ‘নজরুল জীবনকথা’ নামে কবি নজরুল ইসলামের সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রামাণ্য বা নির্ভরযোগ্য একটি জীবনী আমি লিখেছি। সর্বসাধারণের পাঠোপযোগী করে লেখা এই বইটি মেলার আগেই বাজারে এসেছে। বইটির প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন। এ ছাড়া ‘প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ’ নামে মুক্তিযুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে গত তিরিশ বছর ধরে লেখা আমার প্রবন্ধ-নিবন্ধের একটি সংকলন প্রকাশ করেছে অনুপম প্রকাশনী। এটিও মেলার কদিন আগে বেরিয়েছে। তাছাড়া বইমেলাকে সামনে রেখে কিছুদিন আগে দুই খন্ডে আমার ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। মেলা চলাকালীন প্রকাশিত হবে আমার দুটি পুরনো বইয়ের নতুন সংস্করণ। এর একটি জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই নাম ‘জীবনের শত্রæমিত্র’। দ্বিতীয়টি কিশোরদের জন্য লেখা ‘জানতে হলে পড়তে হবে’। এ দুটি বইয়ের প্রকাশকও অনুপম প্রকাশনী।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj