দুর্গাপূজার বহুমাত্রিকতা : অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী

সোমবার, ১০ অক্টোবর ২০১৬

দুর্গাপূজা বিশেষ করে কেবল মহিষমর্দিনী দুর্গার পূজা শুধু বাংলাদেশ ও ভারতে নয়, বহির্বিশ্বেও প্রচলিত ছিল স্মরণাতীতকাল থেকেই। মৃত্তিকা, প্রস্তর, ধাতু ও পট বিভিন্ন উপকরণে দেবী দুর্গার প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে। মহিষমর্দিনী দুর্গা প্রতিমাটিতে আমরা দেখতে পাই, দেবী দুর্গা ত্রিনয়নী, ভ্রæকুটি ভীষণলোচনা, দশভুজা, দশভুজে দর্শপ্রহরণধারিণী। তিনি দণ্ডায়মানা, তাঁর এক পা উপবিষ্ট মহিষাসুরের স্কন্ধে, অন্য পা (বাঁ পা) সিংহের পৃষ্ঠদেশে স্থাপিত। তিনি মহিষাসুরের বক্ষে ত্রিশূল বিদ্ধ করেছেন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দেবী যখন মহিষাসুরকে বধ করছিলেন, ঠিক তখনকার অবস্থার একটি ‘স্থিরচিত্র’ প্রতিমায় রূপায়িত করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিমায় মহিষমর্দিনী দেবী দুর্গাকে অষ্টাদশ ভুজা রূপেও দেখা যায়।

শ্রী শ্রী চণ্ডীতে (মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশবিশেষ) কাহিনীটি নিম্নরূপ :

একবার মহিষাসুর দেবতাদের স্বর্গরাজ্য অধিকার করে নিয়েছিল। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র, চন্দ্র, বরুণ প্রভৃতি দেবগণ। তখন শিব ও ব্র?হ্মাকে অগ্রবর্তী করে দেবগণ গেলেন শ্রীবিষ্ণুর কাছে। দেবগণের রাজ্যচ্যুতির ঘটনা শুনে বিষ্ণু রুষ্ট হলেন। ক্রোধে জ্বলে উঠলেন সব দেবতা। তখন তাঁদের ক্রোধ থেকে সৃষ্টি হলো এক আলোর পুঞ্জ। আর তা রূপ নিল এক দেবীতে। এই দেবীই শ্রী শ্রী দুর্গা। এই শ্রী শ্রী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেন এবং দেবতারা ফিরে পান তাঁদের স্বর্গরাজ্য। ওই যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তটিই মহিষমর্দিনী দেবী দুর্গার মূল প্রতিমা। বৃহত্তর ভারতবর্ষে এবং ভারতবর্ষের বাইরে এই দেবীই পূজিত হয়ে আসছেন।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে যে দুর্গা প্রতিমার পূজা করা হয়, তাতে দেখা যায়, মহিষমর্দিনী দুর্গা প্রতিমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ধনসম্পদের দেবী লক্ষী, বিদ্যার দেবী সরস্বতী, সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং বীর কার্তিক। এছাড়া যুক্ত হয়েছেন শিব। একটি কাঠামোতে এবং একটি পশ্চাৎপটের সম্মুখে উল্লিখিত দেব-দেবীর মূর্তিগুলো স্থাপিত হয়েছে। বাংলার ইতিহাসে উল্লিখিত হয়েছে, রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ (সম্রাট আকবরের শাসনামলে) দেবী দুর্গার পূজা করবেন বলে স্থির করেন। তিনি স্মার্ত রঘুনন্দনকে দায়িত্ব দেন ধর্মীয় সব আয়োজনের। অপরাপর দেবদেবীসহ মহিষমর্দিনী প্রতিমাটির পরিকল্পনা নাকি পণ্ডিত রঘুনন্দনের মস্তিষ্কপ্রসূত।

ইতিহাসবিদরাই এর সত্য যাচাই করবেন। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমি বলতে চাই, দুর্গা প্রতিমার এই যে রূপ, এর দার্শনিক ও সামাজিক যে তাৎপর্য রয়েছে, তা প্রণিধানযোগ্য। দেবতারা ঈশ্বর নন। ঈশ্বরের কোনো গুণ বা ক্ষমতা যখন কোনো আকার পায়, তখন তাকে দেবতা বলে। দেবতাদের পূজা করলে ঈশ্বর খুশি হন এবং মানুষের-জীবের মঙ্গল করেন। দেবী দুর্গা শক্তির দেবী। তিনি আদ্যাশক্তি। সৃষ্টির মূলে রয়েছে পুরুষ ও প্রকৃতি। দেবী দুর্গা সেই পরমা প্রকৃতি। শক্তির দেবী মানুষকে শক্তি দেন। সুতরাং সর্বব্যাপী এনার্জিকে যদি প্রতিমায় রূপ দেয়া যায়, তাহলে তিনিই হবেন আদ্যাশক্তি মহামায়া এবং তাঁরই একটি রূপ হচ্ছে দেবী দুর্গা। তাই তো শ্রী শ্রী চণ্ডীতে বলা হয়েছে :

যা দেবী সর্বভুতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ \ (৫/৩২-৩৪)

এই শক্তি বলতে কেবল ক্ষাত্রশক্তি বা পেশিশক্তির কথা বলা হয়নি। এ শক্তি বিশ্বের প্রাণশক্তি- সজীবতাসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রের প্রেরণা ও কল্যাণের প্রতিমা। তাই দেবী দুর্গাকে বলা হয়েছে বিষ্ণমায়া। তিনি রৌদ্রা, নিত্যা, ধাত্রী, তিনি গৌরবর্ণা বলে গৌরী, জ্যোতি স্বরূপ, চন্দ্ররূপা ও পরমানন্দ-রূপা। তিনি কল্যাণী বৃদ্ধি ও সিদ্ধি (সাফল্য) রূপা দুর্গতি থেকে ত্রাণ করেন বলে তিনি দুর্গা। দেবী দুর্গার দুই রূপ অতিসৌম্য এবং অতি ভীষণা (রৌদ্রা)। তিনিই চেতনা, বুদ্ধি, নিদ্রা, ক্ষুধা তৃষ্ণা, ক্ষান্তি (ক্ষমা) এবং শান্তি। তিনি লজ্জা, তিনিই শ্রদ্ধা, তিনি কান্তি, তিনি লক্ষী, তিনি বৃত্তি, তিনি স্মৃতি, তিনি দয়া, তুষ্টি। আবার তিনি মা। তিনিই চৈতন্য স্বরূপা একই ঈশ্বর বা নিরাকার পরম ব্র?েহ্মর শক্তি। আর এগুলোই যখন প্রমূর্ত হয়, তখনই তা ‘শক্তি’ রূপে প্রকাশ পান। সেখানে ব্র?হ্ম আর শক্তির কোনো পার্থক্য থাকে না- একাকার হয়ে যায়। তাই তো দেবী দুর্গাকে বলা হয় ব্র?হ্মাস্বরূপিণী।

দেবী দুর্গার সঙ্গে অন্যান্য দেবদেবীর যে পূজা করা হয়, তার একত্মচৈতন্যের প্রকাশ ঘটেছে। অর্থাৎ রূপে আলাদা হলেও মূলে তার এক ব্রহ্মের বা ঈশ্বরের শক্তি। ক্ষাত্রশক্তি, সিদ্ধি, ধন, বিদ্যা, মঙ্গল (শিব) সবই তো জীবনের মিলিত প্রয়োজন। দুর্গা প্রতিমায় ম্মার্ত রঘুনন্দন সেই ‘সর্বব্যাপিতা’ ফুটিয়ে তুলেছেন, ভালোই করেছেন। এ জন্য বছরে দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে অন্য দেবদেবীর পূজাও হয়ে যায়।

দেবী দুর্গা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রামের প্রতীকায়িত রূপ। আমাদের তা এই শিক্ষাই দেয়, সমাজে যদি কোনো অন্যায় সংঘটিত হয়, তাহলে তার প্রতিবাদ করতে হবে। তাকে প্রতিরোধ করে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এমনকি নিজের মধ্যে যদি কোনো অসুর অর্থাৎ অন্যায় ইচ্ছা জেগে ওঠে, তাহলে সেগুলো দমন করাও এক ধরনের দুর্গাপূজা। তাই যখন কোনো ব্যক্তি কোনো অন্যায় ইচ্ছা দমন করেন, প্রদর্শন করেন সংযম, তখন তার নিজের অন্তরেই দুর্গাপূজা হয়ে যায়। এ দুর্গাপূজা বিশেষ সময়ের নয়, এ দুর্গাপূজা প্রতি দিনের, প্রতি মুহূর্তেরও।

আবার নৃতাত্তি¡ক দিক থেকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর যে প্রাধান্য স্বীকৃত, তার সঙ্গে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে মতৃদেবতার পূজা প্রচলন ঘটেছে- প্রাগার্য সংস্কৃতির সঙ্গে আর্য সংস্কৃতির সংঘাতের পর সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যে নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে ভারতবর্ষে শক্তির দেবীর পূজার মধ্য দিয়ে তার পরিচয় দীপ্যমান হয়ে রয়েছে দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে এক সার্বজনীন উৎসব উদযাপিত হয়। ভক্তির আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজ-চেতনা, সামাজিক ঐক্য ও সংহতি। যুক্ত হয় ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে শিল্প ও সংস্কৃতি-চেতনা।

দুর্গা প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে শিল্পীর মৌলিক শিল্প চেতনার প্রকাশ ঘটে। প্রতিমার এই বৈচিত্র্যময় রূপায়ণের মধ্য দিয়ে মৃৎশিল্প ও ধাতব শিল্পীর প্রস্তর শিল্পের- এক কথায় ভাস্কর্যের যে বিকাশ ঘটেছে, তা বাংলার ঐতিহ্যে পরিণত। শুধু ঐতিহ্য নয়, তা প্রতিনিয়ত প্রকাশ করছে আধুনিক শিল্প-চেতনা।

দুর্গাকে ঘরের মেয়ে রূপে দেখা হয়েছে। শ্বশুর বাড়ি থেকে মেয়ে যেমন নাইয়রে আসে, কয়েকদিন বাবার বাড়িতে থাকে তারপর নিজে কেঁদে এবং মা-বাপ, ভাই-বোনদের কাঁদিয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যায়, তেমনি দেবী দুর্গা আসেন এবং কয়েকদিন থেকে চলে যান। এ নিয়ে ‘আগমনী গান’ নামে এক শ্রেণির গানের সৃষ্টি হয়েছে। দেবী দুর্গার তাত্তি¡ক ও কন্যা রূপকে নিয়ে রচিত হয়েছে শাক্ত সঙ্গীত। ‘কলা বউ’ নামে পরিচিত যে নবপত্রিকার পূজা করা হয়, তা আসলে কলা বা গণেশের বউ নয়, তা হচ্ছে নানাপ্রকার শস্যের সম্মিলন। কলা গাছ, বেল, প্রভৃতি নয়টি বৃক্ষ-ফলের সমাহার। এর মধ্য দিয়ে শস্য অর্থাৎ কৃষির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রচ্ছন্নভাবে আদিবাসীদের পর্ণশর্বরীর পূজার প্রকাশও এর দ্বারা ঘটে। ঐক্য, মিলন, উৎসব ও ভক্তির মিলিত প্রকাশ দুর্গাপূজা। যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী নন, তাঁদের জন্যও দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে উৎসবের আধার। দুর্গাপূজা উপলক্ষে যে মেলা বসে, তার ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে সব ধর্মের লোকই থাকে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে যে স্মরণিকাগুলো প্রকাশিত হয়, দৈনিক পত্রিকায় যে প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হয়, সেগুলোর সাহিত্যমূল্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যও কম নয়। মোটকথা দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে ঘটে বহুমাত্রিক জীবন চেতনার বর্ণোজ্জ্বল প্রকাশ।

শারদীয় আয়োজন ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj