আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী : মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সোমবার, ১০ অক্টোবর ২০১৬

‘আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে।’ নির্মলা মিশ্রের গানটিতে যে দুর্গার প্রতি আহ্বান, তার মধ্যে একদিকে আছে শাস্ত্রীয় বাচার, অন্যদিকে দিকদিশাহীন আনন্দের বার্তা। প্রায় পাঁচ-ছ’শ বছরের ঐতিহ্য বঙ্গদেশে দুর্গাপূজার। আর তার সঙ্গে ধ্রæপদিয়ানা যেমন, তেমন মিশেছে লোকায়তিক ভাবনা।

বাংলার সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে আছে বাংলার দেবতা ও দেবীরা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়রে দেবতা।’ দেবতাকে প্রিয় করতে গিয়েই দশভুজা দেবী দুর্গা, মহিষাসুর মর্দিনীরূপে যার অন্যতর পরিচয়, উপনিষদে যাকে আদ্যাশক্তি, মহামায়া বলা হয়েছে, সে আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে গেছে। কৈলাশ থেকে তিনদিনের জন্য দুর্গা নেমে আসেন মর্ত্য,ে আবার তিনদিন পরে তিনি চলে যান কৈলাশের শিবনিবাসে। এর সঙ্গে বাঙালি মিলিয়েছে তার ঘরে বিবাহিতা কন্যার পিতৃগৃহে আগমনের সঙ্গে। দেবী দুর্গা একেক বছর একেক বাহনে আসেন। তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এক, আর লৌকিক ব্যাখ্যা অন্য। কোনোবার দেবীর আগমন ঘোড়ায় চড়ে। শাস্ত্রমতে এর ফল ছত্রভঙ্গ। দেবীর দোলায় আগমন শাস্ত্রীয় মতে মড়কের লক্ষণ। কিন্তু এই যে দেবীর দোলায়, হাতিতে, ঘোড়ায় অথবা নৌকোয় আসা, এহেন কল্পনা কীসের উৎসজাত? মেয়ে বাপের বাড়ি আসে এসব বাহনে চড়ে, এই জন্যই দেবীকে এসব বাহনে কল্পনা করা হয়েছে।

বাঙালিসমাজে হিন্দুদের মধ্যে কতকগুলো নিষ্ঠুর সামাজিক প্রথা রয়েছে, যার সবগুলোর গতিমুখই অসহায় নারী সমাজের মর্মন্তুদ জীবনধারণে পরিণতি পায়। তার অন্যতম হচ্ছে গৌরীদান। শাস্ত্রকাররা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে শব্দটি আমদানি করেছেন।

গৌরী, কিনা দুর্গা। মধ্যযুগ থেকে গোটা উনিশ শতক এবং বিশ শতকেরও কিছু অংশজুড়ে যে কৌলিন্যপ্রথার দাপট দেখা গেছে, সেখানে আট বছর বয়স হওয়ার পূর্বেই মেয়েকে পাত্রস্থ করার নিদান ছিল। যাকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘গৌরিদান’ বলে। মুকুলি কানয়ন্তিনী প্রায়-শিশু এইসব মেয়েরা পিতৃগৃহ থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে কোন অজানা-অচেনা ভূখণ্ডে অপরিচিত মানুষের মধ্যে অতঃপর তার দিনানিপাত। হয়তো কোনোদিনই তার আর পিতৃগৃহে বাবা-মা-ভাই-বোনের স্নেহ ছায়ায় আসা হবে না। বৎসরান্তে দুর্গার আগমন হয়, আত্মজার হয় না। নিজ কন্যার জন্য যে আকুতি তার মায়ের, তারই প্রতিফলন আগমনী গানের মধ্য দিয়ে। বড় বেদনামাখা কাব্য!

‘এবার আমার উমা এলে, আর উমায় ফিরাব না। বলে বলুক জামাই মঙ্গ’- এই হাহাকারের যে নির্যাস, মেয়েকে স্বগৃহে দেখবার যে তীব্র ইচ্ছে, তা মাতৃহৃদয়ের সকরুণ বাসনায় গাথা হয়ে আছে। অন্য এক গাথায় মেয়েকে দেখতে মায়ের ব্যাকুলতার কী অনবদ্য ছবি,- ‘আমার উমা এলো বলে রানী এলোকেশে ধায়।’

অনেক সময় মাতা-কন্যার এই বিচ্ছেদ মিলন (কল্পিত ও বাস্তব) যশোদা-কৃষ্ণের পরস্পর সম্পর্কের বিনির্মাণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই একদিকে আমরা যশোদার এহেন বিলাপধ্বনি পাই, ‘শুন ব্রজরাজ স্বপনেতে আজ, দেখা দিয়ে গোপালে কোথায় লুকালে। যেন সে চঞ্চল চাঁদে অঞ্চল ধরি কাঁদে, জননী যে ননী বলে’, যা কিনা আগমনীর বেদনাবিধুরতার সমলয়ে স্থাপিত হয়ে ওঠে, ‘উমা আমার এসেছিল। স্বপ্নে দেখা দিয়ে, চৈতন্য করিয়ে, চৈতন্যরূপিণী কোথায় লুকাল।’ দীনেশচন্দ্র সেন এ প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করেন তা প্রণিধানযোগ্য, ‘ইহা গৃহস্থের ধূলিমাখা আঙিনার কথা, কিন্তু ইহার সুস্পষ্ট ইঙ্গিতে নির্মল স্বর্গের প্রতি- কারণ স্বার্থশূন্য পবিত্র স্নেহ? পৃথিবীর কথা হইয়াও স্বর্গের কথা।’

শরৎ ঋতুর অপার মাধুর্য আছে। কাশফুল আর শিউলি, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, এসবের শাশ্বত আবেদন উপনিষদকারকে দিয়ে পর্যন্ত লিখিয়ে নিয়েছে, ‘জীবেমশরদ শতম্।’ একশ গ্রীষ্ম বর্ষা হেমন্ত নয়, একশ শরৎ বাঁচবার কামনা ঋতুর মধ্যে শরতের অভিনন্দনীয়তার কথা মনে পড়ায়। সেই ঋতুতে তিনদিনের শারদোৎসব অন্যতর দ্যোতনা নিয়ে আসে তো আগমনী গানের মধ্য দিয়েও। ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা বড় দুঃখে রয়েছে,’ মেনকার এই স্নেহপ্রসূত আশঙ্কা যেকোনো বাঙালি মায়েরই তা বেদনা! শিবের প্রতি আস্থাহীনতাও শাশুড়ি মেনকার মধ্যে তীব্র। শ্মশানচারী কপর্দকহীন শিব, জামাতা হিসেবে কোন শাশুড়ির কাছেই বা গ্রহণীয়? তাই মায়ের আশঙ্কা, ‘উমার যতেক বসনভূষণ ভোলা সব বুঝি বেঁচে খেয়েছে।’

রামপ্রসাদ সেন-ই আগমনীর প্রথম গীতিকার। তারপর একাধিক কবির হাত ধরে নানান আঙ্গিকে তা আরো বিকশিত হয়েছে। উমার জন্য বেদনা নয়, শরতের আবাহনী গেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ এইভাবে, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা। নবীন ধানের মঞ্জরি দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।’ আগমনী-অনুষদে কন্যার জন্য হাহাকার কিন্তু তিনি নিয়ে এসছেন কাবুলিওয়ালায়। গল্পের শেষ পর্বে মিনির বিয়ে। ‘আর একটি শরৎকাল আসিয়াছে। আমার মিনির বিবাহের সম্বন্ধ স্থির হইয়াছে। পূজার ছুটির মধ্যেই তাহার বিবাহ হইবে। কৈলাসবাসিনীর সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘরের আনন্দময়ী পিতৃভবন অন্ধকার করিয়া পতিগৃহে যাত্রা করিবে।’ এও আগমনীর বিনির্মাণ, উমার সঙ্গে মিনিকে জুড়ে দিয়ে। তবে এখানে একটি চমৎকারিত্ব রয়েছে। উমা শরতে পিতৃগৃহে আসে, আর মিনি পিতৃগৃহ ছেড়ে যাবে। যদিও পুরান প্রকল্প বা ধৎপযবঃুঢ়ব-এর সঙ্গে মেলাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ খেয়াল করেননি, আশ্বিন মাসে বাঙালির বিয়েশাদি হয় না। সম্ভবত ব্রাহ্মণদেরও না।

মধুসূদনেও পাই আগমনীর কথা, তাঁর সনেটে। ‘সু-শ্যামাঙ্গ বঙ্গ এবে মাহব্রতে রত।/এসেছেন ফিরে উমা, বৎসরের পরে।’ আর আজ তাঁর সুবিখ্যাত ‘বিজয়া দশমী,’ যেখানে লিখছেন তিনি,

‘যেয়োনা, রজনি, আজি লয়ে তারাদলে!

গেলে তুমি, দয়াময়ি, এ পরান যাবে!

কিন্তু এতো আগমনী নয়, বিজয়ার গান।

নিদয়া নবমী নিশির প্রতি ভর্ৎসনা ও প্রার্থনার গান। উমাকে ফিরে যেতে হবে, অথচ ‘নবমীর নিশা-শেষে গিরীশের রানী’ মেনকা চাননা এই বিচ্ছেদ। তবু নবমী নিশি ভোর হয় আর ‘ডম্বুর গুরু গুরু ঐ শোনা যায়। ভোলানাথ এলো বুঝি নিতে গিরিজায়।’ বড়ই বেদনার এ সঙ্গীত!

শারদীয় আয়োজন ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj