হঠাৎ একদিন

শনিবার, ৮ অক্টোবর ২০১৬

** নয়ন কান্তি দাশ **

আজ এতো বছর পর হঠাৎ দেখা তার সঙ্গে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর তার সঙ্গে এই দেখাটা না হলে আমার অজানা থেকে যেতো অনেক কিছু। অজানা থেকে যেতো আমারও একটা অতীত ছিল। আমাকে কখনো কেউ ভালোবেসে ছিল।

আমি তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ভালো ছাত্র বা মনোযোগী ছাত্র যাকে বলে আমি কখনো ছিলাম না। মেসে থাকতাম। তাই শাসন করার কেউ ছিল না। ক্যাম্পাসে যেতাম। আর টইটই করে ঘুরে বেড়াতাম সারাদিন। বাসায় ফিরতাম রাত ১২-১টায়।

একদিন মেসের বড় ভাই দেবুদা আমাকে বললো, ‘তোকে একটা টিউশনি করতে হবে।’ ‘টিউশনি’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

-হ্যাঁ। একটা মেয়েকে অ্যাকাউন্টিং পড়াতে হবে।

-কোন ক্লাসে পড়ে।

-ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার।

টিউশনি করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। আবার দেবুদার অনুরোধ উপেক্ষা করার সাহসও আমার ছিল না। তাই রাজি হলাম।

সে দিন কি বার ছিল মনে নেই। সূর্যটা যখন আস্তে আস্তে পশ্চিম দিকে যেতে শুরু করেছে। আলো আঁধারি নেমে এসেছে ধরণি জুড়ে। সারাদিন কিচিরমিচির করা পাখিরা যখন তাদের আপন নীড়ে ফিরে যাচ্ছে, তখন আমি দেবুদার সঙ্গে রওনা দিলাম আমার টিউশনির উদ্দেশ্যে।

তিনতলা বাড়ির একদম ওপরের তলায় উঠলাম আমরা। দেবুদা কলিংবেল দেয়া মাত্র দরজা খুললো। আমরা ডয়িংরুমে গিয়ে বসলাম।

কিছুক্ষণ পর ফর্সা চেহারার দোহারা গড়নের একটি মেয়ে আমাদের সামনে এলো। নীল রঙের একটি জামা পরেছে সে। সঙ্গে লাল রঙের একটি ওড়না। স্বভাবত আমি খুব অবাক হলাম। কারণ সাধারণত মেয়েরা জামার সঙ্গে ওড়না ম্যাচিং করে পরে। আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম মেয়েটির মুখে প্রসাধনীর চিহ্নমাত্র নেই।

আমার ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে দেবুদা বললো, ‘এই হচ্ছে তোমার ছাত্রী।’

মেয়েটি আমাকে সালাম দিলো।

‘তোমার নাম কি’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

‘ইপ্তি’ জবাব দিলো সে।

এভাবে ইপ্তি নামক মেয়েটিকে আমার পড়ানো শুরু হলো। মেয়েটিকে পড়াতে গিয়ে খেয়াল করলাম মেয়েটি মেধাবী। কিন্তু পড়ালেখায় ঠিক যেন তার মন নেই।

তবুও হাসিখুশি ভরা মেয়েটিকে পড়াতে আমার ভালো লাগতো। এভাবে সময় কেটে যাচ্ছিল…।

একদিন ৪টা। আমি সময়টাকে কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। কারণ সময়ের হিসাবে সেটা বিকাল বলে কিন্তু রোদের তেজ আর তীব্র গরমকে সঙ্গে নিয়ে দুপুর জানান দিচ্ছিল তার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এমন সময় আমি তাকে পড়াতে গেলাম। একবার কলিংবেল দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। দেখি কোনো সাড়াশব্দ নেই। তাই বিরক্তির সঙ্গে দ্বিতীয়বার কলিংবেল চাপলাম।

এবার দরজা খুললো ইপ্তি। ঘামে একাকার মেয়েটি। আমি তাই স্বভাবত উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলাম। তোমাকে এমন লাগছে কেন? তুমি কি অসুস্থ? অন্যদের দেখা যাচ্ছে না কেন? তারা কোথায়?

-স্যার। আপু আর মা খালার বাড়িতে বেড়াতে গেছে।

-তাহলে আমাকে আসতে বারণ করোনি কেন? কোনো জবাব না দিয়ে ভেতরে চলে গেলো সে। কিছুক্ষণ পর সে একটা বাটিতে করে কিছু পিঠা নিয়ে এসে বললো, ‘স্যার আপনি না একবার বলেছিলেন তেলের পিঠা খুব পছন্দ করেন। তাই আপনার জন্য তেলের পিঠা বানাচ্ছিলাম। খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে।’

হঠাৎ কেন জানি ওইদিন আমার প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল। কিন্তু কেন? অনেক দিন পরও আমি ঐ রাগের কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। আমি তাকে বলেছিলাম ‘এটা তোমার বাড়াবাড়ি। তোমার উচিত ছিল আমাকে না আসতে বলা। কয়েকদিন পর না পরীক্ষা, কে বলেছে না পড়ে পিঠা বানাতে। এতো পাকামি ভালো না।’

আমি চলে এসেছিলাম। পেছনে ফিরেও তাকাইনি। তাই বুঝতে পারিনি সে কেঁদেছিল কিনা।

শুধু মনে আছে তার মা পরের দিন ফোন করে বলেছিল, ‘স্যার ইপ্তির খুব জ্বর।’

দুদিন পর তাকে পড়াতে গিয়ে বললাম, ‘সরি ইপ্তি আমি পিঠা না খাওয়াতে বুঝি তুমি কষ্ট পেয়েছো? সে মুখে কিছু বলেনি কিন্তু তার চোখের জল আর চাহনী অনেক কিছু বলে দিয়েছিল।

কেটে গেলো অনেকগুলো দিন। দেখতে দেখতে তার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। ভালো রেজাল্টও করলো। সেদিন সে আমাকে একটা কাগজ দিয়ে বললো, ‘স্যার এটা বাসায় গিয়ে পড়বেন।’

সারাদিন ধরে কালো মেঘগুলো আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি এলো। সঙ্গে ছাতা ছিল না। তাই ভিজে ভিজে বাসায় ফিরলাম। বাসায় ফিরে কাগজটা বের করলাম। দেখলাম সেটা ভিজে গেছে। কিন্তু কি লেখা আছে তাতে? তা জানার দুর্নিবার আকর্ষণ থেকে সেই কাগজের ভাঁজটা খুলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না, সেটা ছিঁড়ে গেছে।

কিন্তু কি লিখেছিল সে? সেকি আমাকে ভালোবাসে বলতে চেয়েছে? না তা হতে পারে না।

আরো কিছুদিন ছিল প্রশ্নটা। তারপর জীবনের ব্যস্ততায় ভুলে গেলাম সব। ভুলে গেলাম ইপ্তির কথাও।

তারপর আজ দীর্ঘ ১৫ বছর পর তার সঙ্গে দেখা না হলে কখনো মনে পড়তো না। ইপ্তি নামক একটা মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল।

আমি এখন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ব্যাংক কর্মকর্তা স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে যাচ্ছিলাম ছুটি কাটাতে। হঠাৎ স্টেশনে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। এতোটুকু বদলায়নি সে। ঠিক আগের মতোই আছে। আমাকে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল।

হয়তো আমার মুখোমুখি হতে চায় না। আমি ডাকলাম ‘ইপ্তি শোনো।’ সে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে আমাকে আর আমার স্ত্রীকে সালাম করলো। আমার স্ত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ আগে ঘোষকের কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, ‘অনিবার্য কারণে ট্রেন আসতে বিলম্ব হবে।’ তাই বসে বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার স্ত্রী ও তার মধ্যে দারুণ ভাব হয়ে গেলো।

আর দুষ্ট টোটনটার ফেভারিট আন্টিও হয়ে গেলো। একপর্যায়ে আমার স্ত্রী তাকে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কি বিয়ে করোনি ইপ্তি?’ সে কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু ¤øান হাসলো, তাতে অনেক কিছু বুঝে ফেললাম আমি…।

:: সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj