জামাই শাশুড়ি

শনিবার, ১ অক্টোবর ২০১৬

** মরিয়ম আক্তার বেলা **

আমি জামাই বাড়ি যাচ্ছি। আমার বয়স আটাশ বছর হলেও কোনো সাজগোজ করিনি। আমি যে শাশুড়ি। আমার সঙ্গে আরো তিনজন আছে। আমার দুই জা আর জায়ের একটা মেয়ে। একটা রিজার্ভ ভ্যান নিয়ে আমরা যাচ্ছি।

সঙ্গে নিয়েছি দু’রকমের চার কেজি মিষ্টি। দুই টিন মুড়ি পাঁচ কেজি আতপ চাল। এক ঘণ্টা লাগল বাড়ি পৌঁছাতে। ভ্যানওয়ালা বাড়ি চেনে। আমি চিনি বেয়ান বাড়ির সবাইকে।

বেলা বারোটা বাজে আমার বেয়ান গোবরের ঘুটে বানাচ্ছে। খড়ির খুব অভাব হয়তোবা, বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখলাম চুলার পাশে ৫টা কুকুরের বাচ্চা শুয়ে আছে। উঠোনে অজস্র ময়লা।

ঘরে গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ কারো সাড়াশব্দ নেই। আমার মেয়েটা আমার সামনে ঘোরাঘুরি করছে আর ছটফট করছে। অনেকক্ষণ পর বেয়ান এল। একটা করে মিষ্টি আর একটু করে মুড়ি খেতে দিল। বিকেল ৫টার সময় বয়লারের মাংস দিয়ে ভাত খেতে দিল।

ভাত খাওয়ার পর দিল সেমাই। ভাত খাওয়ার সময় বেয়ানকে খাওয়ার জন্য খুব অনুরোধ করলাম, শুনল না।

সেমাই খাওয়ার সময় তো আর বেয়ানকে রেখে খেতে পারি না। বেয়ানকে যতই অনুরোধ করি বেয়ান কিছুতেই রাজি হয় না। জোর করে খাওয়াতে গেলে বেয়ান আমার চেঁচিয়ে ওঠে। বেয়ান বলল, দুই দিন হলো গাই বিয়াইছে, এই গাইয়ের দুধ আমি খাই না। আমার ঘিন্না লাগে। বেয়ানের কথা শুনে লোকমা তোলা আমার হাত পড়ে গেল। সবার খাওয়া থেমে গেল।

আমার পেটের খাবারগুলো উপরে উঠে আসতে চাইল। কারোরই বাকিটা আর খাওয়া হলো না। জামাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। জামাই আমার, তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে কোথাও গিয়েছে।

জামাই জানে আমরা তাকে নিতে এসেছি। বিয়ের বয়স এক বছর হলেও জামাই দেশে ফিরেছে দশ দিন। মোবাইলে বিয়ে হয়েছিল। জামাই ফিরে আসার দুইদিন পর হঠাৎ করে মেয়েকে নিয়ে এসেছে। আজ তাই বলা যায়, জামাই মেয়ের আঠোরা।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। জামাইয়ের কোনো খোঁজ-ই নেই। মেয়ে আমার আমরা আসার পর থেকেই মোবাইল করছে। ১২টার সময় থেকে একই কথা শুনছি এই তো এখনি আসছে। আমি বেয়ানকে বললাম, রাত হয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল জামাই মেয়েকে পাঠিয়ে দিবেন। বেয়ান আমার কথায় রেগে আগুন। আমাদের নাকি কোনো জ্ঞান-বুদ্ধি নাই।

আমরা খুব খারাপ। জামাই রেখে বাড়ি যেতে চাই। জীবনেও সে তার ছেলে-বৌকে আমাদের বাড়িতে পাঠাবে না। সেদিন আর বাড়ি ফেরা হলো না। রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম।

বেয়ানের কাছে শুনলাম জামাই রাত দেড়টায় বাড়ি ফিরেছে। জামাই ঘুম থেকে উঠল সকাল দশটায়। জামাই বয়সে আমার দু’বছরের বড় হলেও তার মুখে মা ডাক শুনতে আমার একটুও আপত্তি নেই।

লজ্জাও নেই বরং বলা যায় এই ডাকটার জন্য আমি আশা করেই আছি। জামাই আমায় ডাকল না।

এই বাড়ি আসার পর থেকেই বিন্দু বিন্দু করে অনেক কষ্ট জমা হয়ে গেছে। অনেক কষ্ট নিয়ে জামাই মেয়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরলাম। জামাই বিদেশ থেকে কিছু নগদ টাকা নিয়ে এসেছে। নিজস্ব জমিও আছে ১০-১২ বিঘা। ওদের কাছে আমরা অত্যন্ত গরিব মানুষ। তাদের কাছে তাই আমাদের কোনো মূল্যায়ন নেই।

আমাদের সম্পদ বলতে বাড়ির ৫ শতাংশ জমি একটা থাকার ঘর আর একটা রান্নাঘর। আমার স্বামী দিনমজুর। আমি ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষিকা। আমার মনে আধুনিকতার ছোঁয়া আমার বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বিছানাপত্র সাজানো গোছানো। হরেক রকমের খাবারের ব্যবস্থা করলাম।

জামাইকে খেতে দিয়ে সামনে বসলাম। জামাই বলল আপনি বাইরে যান আমি আপনার সামনে খেতে পারব না। আমি বাইরে গেলাম জামাই মেয়ে খাওয়া শেষ করে আমায় ডাকল। আমি ভেতরে গেলাম। ভাবলাম জামাই আমার লজ্জা পাচ্ছে, লজ্জাটা ভাঙানো দরকার।

বললাম বাবা তুমি আমার ছেলে আর আমি তোমার মা, লজ্জা করলে চলবে না। তুমি যদি নিজেকে গুটিয়ে রাখ আমি কষ্ট পাব। জামাই হাসল। কোনো কথা বলল না।

মেয়ের সঙ্গে তার খুব ভাব হয়ে গেছে। এবার আমাদের সঙ্গে ভাবটা জমাতে পারলেই সব চুকে যায়। আমি মেয়েকে নিয়ে বসলাম। খোলামেলা আলোচনা করলাম। বাড়ির নোংরা পরিবেশের জন্য মেয়েকেই দায়ী করলাম। খুব দ্রুত এর পরিবর্তন আনার জন্য মেয়েকে শাসিয়ে দিলাম।

আমার মেয়েটা দেখতে খুব সুন্দরী কবির কবিতা লেখার জন্য যেমন সৌন্দর্য প্রয়োজন। যে দেখবে কবি না হলেও কবিতা লেখার বাসনা জাগবে। মেয়েকে বললাম মা তুমি জামাইয়ের সঙ্গে একবেলা কথা বলো না।

ওকে একটু এড়িয়ে চলো। মেয়ে কারণ জানতে চাইল। আমি বললাম পরে জানাবো। মেয়ে আমার কথায় কষ্ট পেল। তবে আমার কথা রাখল কিন্তু মুখটা শুকিয়ে গেছে। আমি কড়া নজর রাখছি। আরো কিছুটা সময় পার হয়ে গেল।

জামাইয়ের সাদা মুখটা লাল হয়ে গেল। আমি জামাইকে গিয়ে বললাম বাবা মেয়েটা তো আমার খুব ছোট। ও যেতে চাইছে না। তুমি বাড়ি যাও। ক’দিন পর এসে নিয়ে যেও। জামাইয়ের সব লজ্জা যেন নিমেষেই শেষ।

বলল, না মা ওকে একটু বুঝিয়ে-সুজিয়ে পাঠিয়ে দিন। আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারব না। যাক আমায় তাহলে মা ডেকেছে, এবার মেয়ের বাবাকে বাবা ডাকানো দরকার।

আমি বললাম মেয়ে আমার বড় বাবা-ভক্ত।

বাবার কথায় ওঠে আর বসে, ওর বাবা যা বলে তাই শোনে। জামাই দৌড়ে গিয়ে মেয়ের বাবাকে বাবা ডাকল। করুণ কণ্ঠে প্রার্থনা করল। আমি মেয়েকে জামাইয়ের কাছে যেতে বললাম।

জামাই-মেয়ের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে জামাই শাশুড়ির সম্পর্কের উন্নতি ঘটালাম। আমার মেয়েকে ভালোবাসবে আর আমাদের দূরে সরিয়ে রাখবে তা হতে পারে না। আমি বয়সে ছোট হলেও তো তার শাশুড়ি মা।

:: পাবনা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj