ঈদ বাণিজ্যে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হবে দেড় লাখ কোটি টাকা

সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

মরিয়ম সেঁজুতি : দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমান সম্প্রদায়ের এ উৎসবের মূল অনুষঙ্গ পশু কুরবানি। এ ছাড়া পোশাক, খাদ্য, ভ্রমণ, বিনোদনসহ নানা খাতে বেড়ে যায় অর্থের প্রবাহ। এদিকে পবিত্র হজ পালন, চামড়া বাণিজ্য, মসলাপাতি ও পরিবহন খাত মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে এবার যোগ হবে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি।

কুরবানির ঈদ উপলক্ষে বাড়তি কেনাকাটায় বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। টাকা উত্তোলন ও ফান্ড স্থানান্তরে ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথে মানুষের ভিড় বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও পোস্ট অফিস সেবায় পরিবার-পরিজনের কাছে টাকা পাঠানো বেড়েছে। প্রবাসীরাও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। মূলত শহর থেকে গ্রাম- সর্বত্রই ঈদকেন্দ্রিক বাড়তি লেনদেনে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এতে চাঙ্গা হয়ে উঠছে অর্থনীতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরই দেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে জাতীয় ও মাথাপিছু আয়। এর অর্থ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাপকাঠি। কারণ যে দেশের মাথাপিছু আয় যত বেশি, সে দেশের জীবনযাত্রার মানও তত উন্নত বলে ধরে নেয়া হয়। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী থাকায় জাতীয় আয় বৃদ্ধির সুফল সব শ্রেণির মানুষই ভোগ কম-বেশি করছেন।

হজ পালন উপলক্ষে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুলসংখ্যক অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৫৭৬ জন হজে গেছেন। প্রতিজনে গড়ে ৪ লাখ টাকা ব্যয় নির্বাহ করলে এ খাতে মোট অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৩১৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা, বৈদেশিক মুদ্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। হাজিদের যাতায়াতসহ সেখানকার ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রাতেই নির্বাহ হবে। এর সঙ্গে এই হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবাসূত্রে ব্যয় বেড়েছে।

কুরবানির পশুসহ অন্যান্য কেনাকাটায় বাড়তি খরচের কথা মাথায় রেখে এবার নতুন-পুরনো মিলে ৩০ হাজার কোটি টাকার নোট সরবরাহের ব্যবস্থা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে একদম নতুন নোট ১৫ হাজার কোটি টাকা। এদিকে ঈদের আগে ও পরে টানা ছয় দিন ব্যাংক বন্ধ থাকবে। এ কারণে এটিএম বুথে পর্যাপ্ত টাকা রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ঈদের সময় দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। শহর থেকে গ্রামমুখী হচ্ছে টাকার প্রবাহ। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়ে উঠছে। এ সময় পশুসহ অন্য সব খাতেই লেনদেন অনেক বাড়ে। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা ছিল, সেটা কেটে যাবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি কম থাকায় ঈদে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।

ঈদের সময় সাড়ে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস

২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ হিসেবে ঈদ অর্থনীতে যোগ হবে। এর বাইরে প্রবাসীরা তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে বাড়তি অর্থ পাঠাচ্ছেন। গত জুলাইয়ের চেয়ে আগস্ট মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এ মাসে প্রবাসীরা ১১৮ কোটি ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের মাসে ছিল ১০০ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ১৭ কোটি ৮১ লাখ ডলার বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, ঈদের আগে মানুষের খরচ বেড়ে যায়। এ সময় পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে বেশি অর্থ পাঠান বিদেশিরা। এ ধারাবাহিকতায় আগস্টে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো গতি পাবে বলেও জানান তিনি।

কুরবানিতে পশু জবাইকে কেন্দ্র করেই উদযাপিত হয় মূল উৎসব। এরই মধ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে জমতে শুরু করেছে পশুর হাট। পশু বেচাবিক্রি পুরোপুরি জমে উঠেছে বলে জানিয়েছেন পশু ব্যবসায়ীরা। এবার সারা দেশে ১ কোটির বেশি পশু কুরবানি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর পশু কুরবানি হয়েছিল ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন হাই এন্ড স্কিন মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের তথ্য মতে, প্রতি বছর দেড় থেকে ২ হাজার কোটি টাকার কুরবানির পশুর বাণিজ্য হয়। এর বেশির ভাগ রয়েছে মফস্বল ঘিরে। আর এসব পশুর চামড়া সংগ্রহ করতে গ্রামে গ্রামে আগাম বিনিয়োগ করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আগে যেখানে একটি পশু পাঁচ থেকে সাত ভাগে কুরবানি দেয়া হতো, এখন তা একজনেই কুরবানি দিচ্ছেন। এর অর্থ আগের চেয়ে মানুষের আয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চলতি মূল্যে মোট দেশজ আয় (জিডিপি) দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৮ হাজার ১৭২ টাকা; আগের অর্থবছরের যা ছিল ৯৬ হাজার টাকা। ১ বছরের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১২ হাজার ১৬৮ টাকা বা ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া মন্ত্রী, এমপিসহ রাজনৈতিক নেতারা ভোটারদের খুশি করতে একাধিক পশু কুরবানি দেন। এবারো অনেক মন্ত্রী, এমপি তাদের নিজ এলাকায় কুরবানি দেবেন বলে জানা গেছে। শুধু পশু ব্যবসায়ীরাই নন, কুরবানি উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট অন্য খাতের লেনদেনও চাঙ্গা হয়ে উঠছে।

কুরবানির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা। এগুলো ছাড়া কুরবানিই সম্ভব নয়। কুরবানির ঈদ সামনে রেখে কামাররা দা, বঁটি, চাকু, চাপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ খাতে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হবে বলে জানিয়েছেন সংশি¬ষ্টরা। এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে ছোটদের নতুন পোশাক, জুতা, সেন্ডেল কেনাকাটা হবে। এতে চাঙ্গা হবে অর্থনীতি। জানা গেছে, কুরবানিতে ব্যবহার হয় এমন পণ্য যেমন পেঁয়াজ, রসুন, আদা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতা প্রভৃতির মজুদ বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ টন এলাচ, ৭ হাজার ৬০০ টন দারুচিনি, ১৭০ টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ টন জিরা আমদানি করা হয়েছে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj