বঙ্গবন্ধুকে অবলোকন : আনিসুজ্জামান

সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০১৬

স্বনামধন্য ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত ১৯৪৩ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। আট দশক (কলকাতা, ১৯৮৮; তৃতীয় মুদ্রণ ১৯৯৫) নামে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথায় তখনকার কথা বলেছেন এভাবে : ‘ছাত্ররা আমাদের অত্যন্ত সমাদরে গ্রহণ করেছিলেন। আমরা মুসলমান নই বলে যেন কোনো আঘাত না পাই তারও চেষ্টা করতেন। প্রায় সব ছাত্রই অবশ্য লীগপন্থী। পাকিস্তানকামী। মুসলমান শিক্ষকরাও তাই। তবে কলেজ ইউনিয়নের নির্বাচনে দুটো দল হতো- একটা বাংলাভাষীর দল আর অন্যটা উর্দুভাষীর দল। উর্দুভাষীরা নিজেদের একটু বেশি কুলীন মনে করতেন। কিন্তু বাংলাভাষীদের সংখ্যা ছিল বেশি। এই বাংলাভাষী দলের নেতা ছিল একটি কৃশকায় ছেলে- নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তার নীতি শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিতই ছিল। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে সফল হয়েছিলেন। ইসলামিয়ার ছাত্ররা যে আমাদের জন্য কতটা করতে পারত তার প্রমাণ পেলাম ১৯৪৬-এর রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়। বালিগঞ্জ থেকে ইসলামিয়া কলেজের রাস্তায় পদে পদে বিপদ। এই রাস্তা আমাদের ছাত্ররা পার করে দিত। ওল্ড বালিগঞ্জের কাছে অপেক্ষা করত আর সেখান থেকে ওয়েলেসলি স্ট্রিটে কলেজে নিয়ে যেত। আবার সেভাবেই ফিরিয়ে দিয়ে যেত।’ (পৃ. ১১৭)

বইয়ের অন্যত্র তিনি আবার উল্লেখ করেছেন দাঙ্গার সেই দিনগুলোর কথা :

‘এখানে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি ইসলামিয়া কলেজের সেইসব মুসলমান ছাত্রদের যাঁরা আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে বিপজ্জনক এলাকাটা পার করে দিতেন। এইসব ছাত্রের একজনের নাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমান।’ (পৃ. ১৭৭)

ভবতোষ দত্তের এই কথাগুলোই আমার প্রবন্ধের ভূমিকা।

শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল মুসলিম লীগের কর্মীরূপে। মুসলিম লীগের তখনকার রাজনীতির মূলকথা ছিল দুটি : দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্রগঠন আর ভারতের প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন লাভ। সেই নতুন রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা যখন দেখা দিলো, মাউন্টব্যাটেন তখন স্পষ্টই বললেন জিন্নাহকে, তাঁর যুক্তি মেনে নিয়ে ভারত ভাগ করতে হলে পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশকেও ভাগ করতে হবে। জিন্নাহ প্রতিবাদ করে বললেন, তা কী করে হয়? ওরা তো আগে পাঞ্জাবি ও বাঙালি, পরে হিন্দু বা মুসলমান; তারা একই ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে। মাউন্টব্যাটেন বললেন, সেকথা তো সকল ভারতবাসী সম্পর্কেই বলা হচ্ছে। অগত্যা জিন্নাহ চুপ করে গেলেন। (ল্যারি কলিনস ও ডোমিনিক লাপিয়ের, ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’, নয়াদিল্লি, ১৯৭৬, পৃ. ১০৪)। তবে তাঁর এই বক্তব্যই বোধহয় দ্বিজাতিতত্ত্ব থেকে প্রথম সরে আসা। এরপরে সরে এলেন শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ও আবুল হাশিম একদিকে, অন্যদিকে শরৎচন্দ্র বসু ও কিরণশঙ্কর রায় এক ভাষাভাষী রাষ্ট্র হিসেবে সার্বভৌম ও অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। তারপর পাকিস্তান গণপরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে জিন্নাহ বললেন, এখন থেকে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না, মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, সবাই হবে পাকিস্তানের নাগরিক, ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার, তার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার সম্পর্ক থাকবে না। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সর্বশেষ অধিবেশনে সোহরাওয়ার্দী যখন প্রস্তাব করলেন যে, পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পরে রাজনৈতিক দলের দ্বার মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করা দরকার, জিন্নাহ তখন সম্মত হলেন না। এমনকি, সোহরাওয়ার্দী যখন নতুন রাজনৈতিক দল করলেন, তারও নাম দিলেন জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ।

লাহোর প্রস্তাবে মুসলমানদের দুটো পৃথক রাষ্ট্র দাবি করা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে আইনসভার মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের সম্মেলনে তা বদলে একটা রাষ্ট্র করে দেয়া হলো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে দেশের কর্ণধাররা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কথা একেবারেই ভুলে গেলেন।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণপরিষদে শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ বলেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মনে করছে যে, ওই অঞ্চলকে দেখা হবে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে। তার কয়েকদিন পরে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করেন বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। মার্চ মাসে দেশের প্রথম বাজেট আলোচনার সময় একাধিক সদস্য পূর্ব বাংলার স্বতন্ত্র স্বার্থের কথা বলেন এবং মাহমুদ হুসেন দেশের প্রদেশগুলোর জন্য ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’ দাবি করেন।

এ সত্ত্বেও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, রাষ্ট্রভাষা, নাগরিক অধিকার ও সুশাসনের মতো বিষয়ে দেশবাসীর মধ্যে নানারকম দ্বিধাদ্ব›দ্ব ছিল। এসব সংশয় দূর করেই কেবল যথাযথ লক্ষ্যে যাত্রা শুরু হতে পারতো। সেই সম্ভাবনা প্রথম দেখা দেয় ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। শেখ মুজিবুর রহমান এই আন্দোলনের একজন নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন এবং সেই সূত্রেই তিনি প্রথমবারের মতো কারাভোগ করেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে মুসলিম লীগের যেসব নেতা ও কর্মীর মোহভঙ্গ হয়েছিল, তাঁরা যখন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি করে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন, তখন কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানকে তার একজন যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এ থেকে অনুমান করা যায়, সেই ১৯৪৯ সালেই রাজনীতি ক্ষেত্রে তিনি কী রকম মর্যাদা লাভ করেছিলেন। মুক্তিলাভ করে শেখ মুজিব সর্বক্ষণ ব্যয় করেন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কাজে। তবে কারাগারে যাওয়া তাঁর পক্ষে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবু নিজের বিশ্বাস ও কর্তব্যবোধ থেকে তিনি এতটুকু সরে আসেননি এবং নিজের পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কেও উদ্বিগ্ন হননি। বাইরে আন্দোলন করেছেন, জনমত গঠন করেছেন; সংগঠনকে আওয়ামী মুসলিম থেকে আওয়ামী লীগ করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন; আবার গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে বক্তৃতা করেছেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক নাম দিতে, যুক্ত নির্বাচন প্রথার পক্ষে ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে। গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের বিতর্ক পাঠ করলে এসব বিষয়ে তাঁর অনেকগুলো স্মরণীয় বক্তৃতার সন্ধান পাওয়া যাবে। যখন তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রী, তখনো তিনি কথা বলেছেন অকুতোভয়ে- কেন্দ্রীয় সরকার কী ভাববে, পরিণাম কী হবে, সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ করেননি। তার জন্য তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছে, কিন্তু সেইসঙ্গে জনগণের হৃদয়েও তাঁর স্থান হয়েছে বেশি করে।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে আসসালামু আলাইকুম বললেন। তারপর স্বায়ত্তশাসন ও সামরিক জোটে পাকিস্তানের যোগদানের প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতবিরোধের ফলে আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করলেন। তিনি নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে দল গড়লেন, সমাজতন্ত্র চাইলেন, জোর দিলেন পররাষ্ট্র নীতির উপরে এবং সেই সূত্রে সমর্থন দিলেন সামরিক শাসক আইয়ুব খানকে। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা। সোহরাওয়ার্দী সংখ্যাসাম্য মেনে নিয়েছিলেন এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ছিলেন নমনীয়। শেখ মুজিব পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা বললেন, সংখ্যার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি জানালেন এবং জোর দিলেন স্বায়ত্তশাসনের ওপর। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ সকলকে দেখিয়ে দেয় যে, পূর্ব বাংলা ছিল অরক্ষিত। তাতে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের মানুষের ক্ষোভ বাড়ে। শেখ মুজিব উপস্থাপন করেন ছয়দফা দাবিনমা। বামপন্থী রাজনীতিকরা বললেন, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা। সরকার বললো, এতে পাকিস্তানের সমূহ সর্বনাশ। কিন্তু পূর্ব বাংলায় মুজিবের নেতৃত্বে ও সংগঠন ক্রমশ সংহত হতে থাকলো। আইয়ুব খান রুজু করলেন ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। ওতেই কাজ হলো। শেখ মুজিবকেই মানুষ পূর্ব বাংলার একমাত্র স্বার্থরক্ষক হিসেবে দেখলো। সে আন্দোলনকে মওলানা ভাসানী সমর্থন করলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব বিদায় নিলেন, মুজিব বঙ্গবন্ধু হলেন। আইয়ুবের উত্তরাধিকারীরা পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানতে বাধ্য হলেন এবং পাকিস্তানের ইতিহাসে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

নির্বাচনও নির্বিঘ্নে হয়নি। ‘ভোটের আগে ভাত’ চেয়েছিলেন অনেকে, বলেছিলেন ব্যালট বাক্সে লাথি মারতে। তাতে সামরিক শাসন প্রলম্বিত হবে জেনেও তাঁরা উদ্বিগ্ন হননি। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল আঘাত সহ্য করে পূর্ব বাংলা ভোট দিল বঙ্গবন্ধুকে। তাঁর সমালোচকরাও বললেন, এবারে মুজিব আপস করবেন।

আপস তিনি করেননি বরঞ্চ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের চব্বিশ দিনে পৃথিবী দেখেছিল এক অবিস্মরণীয় অসহযোগ আন্দোলন- এক নেতার ডাকে মাথা তুলে দাঁড়ালো পূর্ব বাংলা। এই সময়টা ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় সময়, আবার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষারও সময়। অনেকগুলো বিকল্প থেকে তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে ছয়দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচনার পথ তিনি খুঁজেছিলেন কিন্তু তিনি ক্রমশই উপলব্ধি করছিলেন যে, সংকট সমাধানের সাংবিধানিক উপায় ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে তিনি এও জানতেন যে, দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। পাকিস্তান ভাঙার এবং তার ফলে সম্ভাব্য রক্তপাতের দায়িত্ব তিনি নিতে চাইছিলেন না, আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী হবে (একপক্ষীয় স্বাধীনতা ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিরোধিতা করবে, তবে ভারত সমর্থন করবে, এটুকুই জানা ছিল), সে সম্পর্কেও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তাই আলোচনার পথ খোলা রাখছিলেন। আবার ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ আহ্বান কারো কাছেই অস্পষ্ট থাকেনি। তিনি কখনো আত্মগোপনের রাজনীতি করেননি, তাই তিনি ২৫ মার্চ রাতে বাড়িতেই রয়ে গেলেন- যদিও জানতেন যে, পাকিস্তনিরা তাঁকে মেরে ফেলতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত কিন্তু তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। এমনকি, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে অংশটি পাকিস্তানের সঙ্গে আপসরফা করতে চেয়েছিল, তারাও বলতো, বঙ্গবন্ধুর প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টাই তারা করছে। তাদের সে প্রয়াস সফল হয়নি। বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক চাপে স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান।

দেশে ফিরে এসে তিনি সম্মুখীন হয়েছিলেন পর্বতপ্রমাণ সমস্যার। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের পুনর্গঠন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, প্রাদেশিক সরকারকে জাতীয় প্রশাসনযন্ত্রে রূপান্তরিত করা, ঘাতক-দালালদের বিচার, যুদ্ধবন্দিদের বিচারের প্রশ্ন একদিকে, অন্যদিকে যুদ্ধবন্দিরা মুক্তি না পেলে পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের ছাড়া হবে না বলে ভুট্টোর হুমকি, ঘাতক-দালাল-সংক্রান্ত আইন বাতিল করার দাবি, আটক বাঙালিদের পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের পরিবারের দাবি- এসব পরস্পরবিরোধী স্রোতের মধ্য দিয়ে তাঁকে চলতে হচ্ছিল। ১৯৭১ সালে দেশের যে তিনটি নীতি ঘোষিত হয়েছিল- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা- তার সঙ্গে তিনি জাতীয়তাবাদ যোগ করলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করালেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব স্পষ্ট গোচর করাবার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করালেন। নয় মাসে আমাদের সংবিধান প্রণীত হলো, আঠারো মাসের মাথায় সাধারণ নির্বাচন হলো। দেশের অবকাঠামো যতটা সম্ভব পুনর্গঠন করা গেল। বহু দেশের স্বীকৃতি পাওয়া গেল।

তবে সময়টা আগের মতো ছিল না। দেশের সর্বত্র অস্ত্রশস্ত্র ছড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি হয়েচিল। তাঁর সমর্থক ছাত্রদের একটি বড় অংশ তাঁর আশীর্বাদ লাভে ব্যর্থ হয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালো। বাংলাদেশ বিরোধীরা মুক্তিযোদ্ধা হত্যা থেকে পোস্ট অফিস লুণ্ঠন প্রভৃতি কাজে লিপ্ত হয়ে গেল। তাঁর অনুসারীদের সামলানোও অনেক সময়ে কঠিন হয়ে পড়লো। এই সমস্ত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো তাঁর সঙ্গে তাজউদ্দিনের দূরত্ব সৃষ্টি করতে একদল মানুষের সাফল্য। তাঁর প্রশাসনের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবিচ্ছিন্ন বিরূপতার কথাও এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সাফল্যের তালিকা দীর্ঘতর করা যেতে পারে, ওই বৈরী পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যর্থতা বা ভুল সিদ্ধান্তের তালিকাও তৈরি করা যেতে পারে। তিনি মানুষ ছিলেন- ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। বাকশাল গঠনের মতো তাঁর কোনো কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে তাঁর অনুরাগীদের অনেকে উত্তেজিত হয়ে যান। তাঁরা মনে করেন, এসব সমালোচনা বুঝি সপরিবারে বঙ্গবন্ধু-হত্যার মতো নিষ্ঠুরতম কাজের সাফাই। তা কখনো হতে পারে না। হত্যাকারীদের কাছে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরদের একমাত্র অপরাধ ছিল বাংলাদেশের সৃষ্টি। এ কথা যাঁরা বোঝেন না, তাঁদের বোঝাতে চাওয়া বৃথা। যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার চেষ্টা করেন কিংবা আরো বড় করতে গিয়ে ছোট করে ফেলেন, তাঁদের জানতে হবে, ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু অমরতা লাভ করেছেন, তিনি যা তিনি তাই, তাঁর আসন ধূলিমলিন হওয়ার নয়। হ

কবীর চৌধুরী সম্পাদিত ‘চিরঞ্জীব শেখ মুজিব’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত।

জাতীয় শোক দিবস : বিশেষ সংখ্যা ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj