আনন্দধারা বহিছে : মাহবুবা ফারুক

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

ষাট পেরিয়ে এসে তার মনে হলো আর বুঝি পারছেন না। দুনিয়ার সেরা মুখরা স্ত্রী নিয়ে আর চলতে পারছেন না। কথায় কথায় ঝগড়া, জবাবদিহিতা জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ব্লুাড প্রেশার, ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা- কি নেই? তারপরও মুখ বুজে সয়ে সয়ে জীবনটা চুইয়ে চুইয়ে চলছিল। হাজার শাসনের মধ্যে নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে রেখে মানিয়ে চলার ভান করছিলেন। তাতে স্ত্রী ও সন্তানরা খুশি থাকে। শুধু তার একার কষ্ট দিয়ে যদি ওই চারটা প্রাণী সুখী হয়- মন্দ কি! বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বিদেশে থাকে। দুটো ছেলে বাবা-মার সাথে। শাহাদাৎ সাহেব দেশের সেরা একটি প্রতিষ্ঠানে বড় পদে আছেন। যা-তা করেও ফেলতে পারেন না। নিজের একটা ইমেজ আছে। আবার স্ত্রী-সন্তানকেও ছোট করতে পারেন না। সেই দায়ভারও তার আছে। তাহলে হঠাৎ হলো কি? লোকে তো তাকে শান্ত-ভদ্র-ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে জানে। ঘরের খবর কাউকে বলেন না বলে লোকে সুখীও মনে করে। আর স্ত্রীর কাছে এত হিসাব দিয়ে চলার কারণও কেউ জানে না। এসব কোনো অতীত ঘটনার ফলাফল কি না তাও জানা নেই। জীবনে কোনো ভুল করেই কি এই হিসেবের খাতায় উঠেছেন? নাকি স্ত্রীর স্বভাবই তা- এটা কেউ বলতে পারে না। ঘরের খবর ঘরেই ছিল। কিন্তু এই নিয়মটা আর চলছে না। কেন? সবার যা হয় তাই হয়েছে। মানুষ একসময় ধৈর্য রাখতে পারে না হয়তো। নিজের জন্যে একটু আড়াল খুঁজে। জীবন তো একটাই, তাও বয়স ষাট পেরুলো। কিছু স্বস্তি পেলে ক্ষতি কি? কিন্তু উপায়? স্ত্রীর কানে কোনোভাবে খবরটা যাওয়া মানে বাকি জীবন ভর্তা ভর্তা। একেবারে ঢেঁকি ছাঁটা করে ছেড়ে দিবে। সে চাকরি ছেড়েছে শুধু শাহাদাৎ সাহেবকে সময় দেয়ার জন্যেই। সময়ের মধ্যে আছে সারাদিনের ফোন কল চেক করা, শাহাদাৎ সাহেবের মুখে সারাদিনের কাজের সাথে তা মিলানো। পরদিনের প্রোগ্রাম জেনে নেয়া। খুঁটিনাটি বিষয়সহ প্রতিটি সেকেন্ডের হিসেব মিললে তবে থামা। সে যাই হোক। এবার তিনি মনে মনে বেশ সাহসী হয়ে উঠলেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকলে যা হয় আর কি। একটা বন্ধু পেলে তিনি বন্ধুত্ব করবেন। মেয়ে বন্ধু। প্রেম করতেও আপত্তি নেই। তবে আবার বিয়ের কথা তিনি মোটেই ভাবছেন না। এটা তিনি করতে চান না। এতে ফ্যামিলির সবাইকে লজ্জা এবং কষ্ট পেতে হবে। এ কাজ তিনি করতে পারেন না। আর যেই ভাবা সেই কাজ। ভোরবেলা হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একজন বান্ধবী পাওয়া গেল। ভাগ্যের শিকে এত তাড়াতাড়ি ছিঁড়বে ভাবেননি। এত বছর ধরে শাহাদাৎ সাহেব এইখানে মর্নিং ওয়াক করেন। কত লোকের সাথে কথা হয়। কেউ বন্ধু হয়নি। আর আজ কিনা মেয়ে বন্ধু। এতদিন হলো না কেন? আসলে তিনি তো সেভাবে কারো দিকে তাকাতেনই না। আর মহিলা হলে তো একশ হাত দূরে থাকুন মনে মনে সাইনবোর্ড লাগানো থাকতো।

মহিলা এই এলাকায় নতুন। হাঁটাহাঁটিও নতুন শুরু করেছেন। তাই আগে দেখা হওয়ার সুযোগ ছিল না।

প্রতিদিন হাঁটতে হাঁটতে কথা হয়। বসে কথা হয়। আস্তে আস্তে দুজনই দুজনকে পছন্দ করে ফেলেন। খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বন্ধুত্ব পেরিয়ে প্রেম হলো। তারপর সময় যেন টিনএজ হয়ে গেল। খালি কেমন উড়ু–উড়ু–-অস্থির ভাব। শাহাদাৎ সাহেব কাব্য করে কথা বলেন। ভাবে রসে খুব সুন্দর করে কথা বলেন। বান্ধবী মরজিনা বেগম শুধু অবাক হয়ে শুনেন। এত সুন্দর করে তার স্বামী জীবনে কোনো দিন যদি একটা কথাও বলতে পারতেন। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। যেন একসাথে থাকার জন্যে থাকতে হচ্ছে। রং বর্ণহীন জীবন চলা। চলতে চলতে সব সুর হারিয়ে গেছে। নতুন সুর তার কাছে ভালো লাগতেই পারে। মেয়ে দুটো বড় হয়েছে। যে যার ভার্সিটি এবং কলেজ সামলাতেই ব্যস্ত। মরজিনা বেগম এখন নিজেকে নিয়ে একটু ভাবতেই পারেন। কিন্তু লোকে কি বলবে? শাহাদাৎ সাহেবের সাথে মরজিনা বেগমের যখন বন্ধুত্ব গভীর হয়ে গেল তখন লোক-সমাজের কথা ভেবেই কি হবে?

একটা উপায় শুধু দরকার। তাছাড়া তারা কারও ক্ষতি তো করছেন না। কিন্তু এভাবে চললে হতো। হঠাৎ করে ছয় মাস যেতেই শাহাদাৎ সাহেব বিয়ে করতে চাইলেন মরজিনা বেগমকে। আর সেটার জন্যে মরজিনা বেগমের ওপরই সব দায়িত্ব দেয়া হলো। উপায় বের করতে পারলে বিয়ে হবে। খুব কঠিন কাজ। কারণ প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তো দ্বিতীয় বিয়ে হবে না। অনুমতির উপায় কি? তার চেয়ে বাঘের কাছে প্রাণ দেয়া ভালো। দুজনে অনেক ভেবে বুদ্ধি করলেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হবে।

উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। সঙ্গত কারণে দ্বিতীয় বিবাহে ইচ্ছুক। সুন্দরী, অবিবাহিতা, শিক্ষিতা, ধার্মিক ইচ্ছুক মিষ্টি মেজাজের পাত্রীগণ যোগাযোগ করুন। ঠিকানা…। শাহাদাৎ সাহেবের স্ত্রীর নাম ও ঠিকানা দেয়া হলো। তিনি আঁতকে উঠে বললেন, সর্বনাশ! বাঘিনীর হাতে আমাকে ছাড়ছো কেন? মরজিনা বেগম বললেন, এতে তাকে জানানোর জন্যে আর কাউকে লাগবে না। তারপরের ব্যবস্থা তিনিই করবেন। তুমি শুধু গোবেচারা সেজে থাকবে।

: না না এটা আমি পারবো না। অন্য কোনো উপায় বের কর।

: পালাবে?

: না।

: তাহলে এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়। তুমি দেখে নিও। এতে তোমার আমার সম্পর্কটা চিরস্থায়ী হবে। তোমার উনিও ঝামেলা করবেন না। শাহাদাৎ সাহেব প্রশ্ন চোখে তাকালেন।

: আহহা, ভেবো না তো। আমি তো আছিই।

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন যখন শাহাদাৎ সাহেবের স্ত্রী রিজিয়া বেগম দেখলেন। বারবার পড়লেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। আবারও পড়লেন। নাহ্ কোনো ভুল নেই। তার স্বামীর ব্যাপারেই এই বিজ্ঞাপন। আর ঠিকানা-নাম সব তার সাথে মিলছে। দজ্জাল মূর্তি ধরে শাহাদাৎ সাহেবের অফিস যাবার সময় পত্রিকাটি মেলে ধরে জানতে চাইলেন, “এটা কি?” শাহাদাৎ সাহেব নিরুত্তর। আবারও প্রশ্ন। আবারও নীরবতা। চিৎকার করে বললেন, এর একটা চরম শিক্ষা না দিয়ে আমি ছাড়বো না। তুমি ঘুঘু দেখেছ- এবার তোমার ফাঁদ দেখার পালা। তোমার সাথে অনেক কষ্ট করে তিরিশ বছর কাটিয়েছি। ন্যাকা কোথাকার। সরীসৃপ। মেরুদণ্ডহীন গুইসাপ। তোমার সাধ একশভাগ পূর্ণ করব সোনার চাঁদ। বলতে না বলতেই মোবাইলে পাত্রীদের ফোন আসা শুরু হলো। রিজিয়া বেগম সবাইকে সাক্ষাৎকারের সময় দিয়ে দিলেন। শাহাদাৎ সাহেব বুকে ধড়ফড় হাতুরি পেটা নিয়ে অফিস করলেন। প্রেমিকার সাথেও কথা বলতে পারেননি। বাসায় ফেরার আগে নামাজ পড়ে বুকে ফুঁ দিলেন। আল্লাহকে ডাকলেন যেন মিডিয়ার হাতে ধরা না পড়েন। পাবলিক এই খবর যা খাবে তা কল্পনা করতেই জিহ্বা, গলা, বুক শুকিয়ে সেগুন কাঠ হয়ে যায়। প্রেমে পড়ে মানুষ ছাগল হয় তিনি তার প্রমাণ। কেন এত বড় ঝুঁকিতে গেলেন বুঝতে পারছেন না। প্রেমিকা ফোনে সাহস দিলেন। আরে প্রেম করলে কিছু তো কষ্ট সহ্য করতেই হবে। না হলে প্রেমের আর মজা কি? এত ভয় পেলে প্রেম জয় করা যাবে? বোবার মতো বাড়ি যাও। দুই লাইন গানও গেয়ে শোনালেন নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে – – -।

আসলে শাহাদাৎ সাহেবের জবাব দেবার কোনো ভাষা নেই। কি যে হতে যাচ্ছে। তিনি বোবা সেজেই আছেন। মেয়ে ফোনে কেঁদে কেঁদে বলেছে- বাবা তুমি এই বয়সে এটা কি করলে? আমাদের এত ছোট না করলে হতো না? ছেলে দুটো বললো, বাবা, তোমার এখন বিয়ে করার সময়? নাকি আমাদের? এত কথা সহ্য করতে না পেরে তিনি বললেন, তোদের কে মানা করেছে বিয়ে করতে? তোরাও করবি। তাই বলে আমার জন্যে নিষেধাজ্ঞা কেন? যখন তোদের মা আমার কলজেটা কাবাব বানায়, ফালি ফালি করে আচারের মতো রোদে শুকায় তখন তোদের খুব ভালো লাগে তাই না? আমি কত অসহ্য হয়ে মুক্তির উপায় খুঁজছি আমার চেয়ে তোদেরও কম জানার কথা নয়। আর সারাজীবন আমাকে আগুন খেয়ে অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে কাটাতে হবে এমন তো কথা নেই। আমার একটা মন আছে- একটা জীবন আছে এটা তোরা সবাই ভুলে গেছিস। পোষা রামছাগল পেয়েছিস? কষ্ট পাওয়ার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নাকি?

: আমরা খুব লজ্জা পাচ্ছি-কষ্ট পাচ্ছি বাবা।

: আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। না হলে পৃথিবীর কোনো লোকই এটা করতো না। আমি নতুন কিছু করছি না।

সারাদিন ধরে রিজিয়া বেগম ইন্টারভিউ নিয়ে ক্লান্ত। সন্ধ্যায় সব লোক বিদায় করে ঘরে এসে ছেলে দুটোকে ডাকলেন।

বিজ্ঞাপনে এত সাড়া পাওয়া যাবে বুঝিনি। ভেবেছিলাম কেউ না এলে হাবরা-বুড়োটাকে খুব করে ছেঁচনি দেয়া যাবে। কিন্তু অবাক কাণ্ড। এত মেয়ে এলো ইন্টারভিউ দিতে। দেশে ভালো পাত্রের অভাব রে!

: তবে যা-ই বল মা আইডিয়াটা নতুন। বড় ছেলে বলে। মা রেগে তাকান।

পরদিন সকাল। শাহাদাৎ সাহেব নিশ্চিত মনে অফিসে গেলেন। কারণ স্ত্রী এবং অন্যদের অবস্থা যতটা ভয়ঙ্কর হবে ভেবেছিলেন তা হয়নি। সুতরাং এ ধাপে আর ঝামেলা নেই।

রিজিয়া বেগম রীতিমতো ইন্টারভিউ নিলেন। ছেলেমেয়েদের কোনো কথাই শুনলেন না। বরং বললেন- তোর বাবার ভীমরতি দেখছিস না? নিয়মিত জিমে যাওয়া, নতুন নতুন জামাকাপড় কেনা, বারবার ফোন করা, ভুঁড়ি কমানোর জন্যে খাওয়া কমানো। আর কি গুন গুন সুরে উদাস হওয়া। আর কটা বলবো? আমাকে দেখলে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। এই দোষ ওই দোষ বলে আজকাল আমাকে দোষের ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলেছে। যে কিনা কথার জবাব দিতে পর্যন্ত জানতো না। আমাকে বলতো- তুমি কত সুন্দর-কত ভালো। তুমিই আমার লক্ষী। হুহ। শয়তানি। দেখাচ্ছি তোর ভড়ংবাজির মজাটা। তবু ছেলেরা বলে, মা আরেকবার ভেবে দেখ। কাজটা ঠিক হচ্ছে না, ততটাই রেগে রিজিয়া বেগম বলেন- ঠিক হচ্ছে। একশ ভাগ ঠিক হচ্ছে। একটা লেসন দিয়ে তবে থামবো।

প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিয়ে শাহাদাৎ সাহেব একটু সাহসী হয়ে উঠলেন। খোলস ছেড়ে আর একটু বের হচ্ছেন। দু/তিন দিন প্রেমিকাকে সময় দিতে পারেননি। আজ মন ফুরফুরে। আগের মতো দুপুরে খাওয়ার পর আজ একটু সময় মর্জিনা বেগমের সাথে কথা বলতে ফোন হাতে নেন।

: হ্যালো সুইটি কেমন আছ?

: ভালো। তুমি?

: ভালোই মনে হয়। ক’দিন পর আজ মনটা চাপ-মুক্ত। তোমার প্ল্যানটাই ঠিক আছে। কারণ বাড়ির আবহাওয়া বেশ ভালো দেখে এলাম।

: শোনো ইন্টারভিউয়ে আমি টিকে গেলাম। তোমার বউ যা কঠিন ইন্টারভিউ নিয়েছে, খুব বুদ্ধিমতী বউ তোমার। এ-ই তোমাকে ভীমরতিতে পেয়েছে- তাই না?

শাহাদাৎ সাহেব মনে মনে বললেন, ভীমরতি না। রিজিয়া বুঝবে তার উপযুক্ত শিক্ষা হয়েছে।

আনন্দে আজ কথা বলা হলো না। একটু কেমন যেন পিছুটানও লাগছে। ফোন রেখে দিলেন শাহাদাৎ। আজ মর্জিনার জন্যে কিছু কিনতে যাবেন। মর্জিনাকে সাথে যেতে বলেন না। সারপ্রাইজ দিবেন। কাল ভোরে হাঁটতে গেলেই তো দেখা হবে। দেখা হতেই হবে।

আজকাল হাঁটার চেয়ে কথা হয় বেশি। মর্জিনা বেগমের অনেক স্বপ্নের কথা শুনেন- যা মর্জিনা বেগমের পাওয়া হয়নি। স্বামীকে বিদেশে রেখে তাই তিনি দুটো মেয়ে নিয়ে চলে এলেন নিজের দেশে। বলেছেন আর যাবেন না। শাহাদাতের মতো এমন বন্ধু- আহা বন্ধু কি? বর পেলে কে যায় অন্য গ্রহে? বলতো শাহাদাৎ সরি শাহানশাহ- আমি তোমার কে?

: আমার সুইটহার্ট। আমার বুক পকেট।

: নাগো-আমি তোমার ভীমরতির ভীমরুল।

: বাহ! কী সুন্দর করে বলো। তাইতো তোমাকে এত ভালো লাগে। আমার সুখের জানালা।

: দেখো-তোমার বয়স আরও কমে যাবে।

: কত হবে?

: এই ধর ত্রিশের কাছাকাছি। দুজনেই অকারণ শব্দ করে হাসেন।

রিজিয়া বেগম মহা উৎসাহে ছেলেদের ডেকে বিয়ের তারিখ ঠিক করছেন। ছেলেদের একজন বলে তার জন্মদিনের তারিখটা হোক। আরেকজন বলে তারটা। রিজিয়া বেগম বলেন, না, আমি চাই এটা হবে আগামী চার নভেম্বর। ছেলেরা বলে, এই তারিখটা কেন? মা বলেন, আমার ইচ্ছা। ঠিক আছে? মায়ের ইচ্ছাকে সবাই মেনে নেয়। রিজিয়া বেগম বিয়ের কেনাকাটা করার জন্যে বেশ টাকাপয়সা নিচ্ছেন শাহাদাতের কাছ থেকে। ঘরদোর সাজানো, লোকজন দাওয়াত দেয়া সব কিছু খুব উৎসাহ নিয়ে করছেন। শাহাদাৎ সাহেব অবাক হচ্ছেন। মজা দেখছেন। আবার মন খারাপও হচ্ছে। কত পুরোনো স্মৃতি। দিন তো কম গেল না। রিজু হঠাৎ এমন ভালো হয়ে গেল কেন? কোনো রাগ-ঝগড়া নেই। বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই। কি করবেন শাহাদাৎ? বিয়েটা ভেঙে দিবেন? তাহলে মর্জিনা? সে কষ্ট পাবে। আর তিনি তো মর্জিনাকে ভালোবেসেছেন। তাকে ভোলা যাবে না। তখন তার নিজের কষ্ট হবে। সে কষ্ট কে ভুলাবে? মর্জিনার মতো বউ পেলে বাকি জীবনটা সুখে কাটবে। সে তো আদরের ভীমরুল। থাক। আর দুই মন করবেন না। রিজুর কাছে যখন সবই ওপেন হয়ে গেল তখন আর পিছুটান কেন? রিজুর একটু শিক্ষা হওয়া দরকার। জীবনে কখনো ভালো কথা বলেছে ও? যন্ত্রণা কত প্রকার- উদাহরণসহ বলে দিতে পারবেন শাহাদাৎ। তবে শোধ না নিলেও পারতেন। কিন্তু জীবন তো একটাই। তারও বেশির ভাগ চলে গেছে। তাহলে কি করবেন? কি আর? বিয়ে হচ্ছে হোক। মর্জিনার সাথে একদিন কথা না হলে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। অস্থির হয়ে যান। মর্জিনা তার অক্সিজেন। কই? রিজিয়ার বেলায় তো এমন হয় না? সেটা কি শুধু প্রেমিকা আর স্ত্রী বলেই এমন তফাৎ? না। তা হবে কেন? ব্যক্তি মানুষের যে পার্থক্য থাকে এটা তাই। জীবন তো শুধু খাওয়া পরা নয়।

তিনি একান্ত বাধ্য ভেড়া মার্কা গৃহপালিতই ছিলেন। মর্জিনার সাথে দেখা না হলে তা-ই থাকতেন। রিজু এই রকম পেয়েও এত অত্যাচারী ছিল। এবার বুঝুক শাহাদাৎও শক্ত হতে জানেন।

ছেলেরা কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। মেয়ে আগে কান্নাকাটি করে ফোন করতো। তা-ও বন্ধ হয়ে গেছে। রিজিয়া বেগম কার সাথে ফোনে ফিসফিস করে কথা বলেন। আর কাজ করেন। অনেককে নাকি দাওয়াত দিয়েছেন। রিজিয়া বেগম শাহাদাৎকে বলেছেন বিয়ে করতেই হবে। চোখে চোখে রাখছেন তাকে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা হলো। এসব দেখে শাহাদাতের ভালোই লাগছে। ভালোলাগার ভাবসাব দেখে রিজিয়া বেগম আগুন চোখে তাকান। আর মুখে বলেন তুমি আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়ে গেছো দেখছি। অনেকটা স্মার্ট।

ঘন চুলের কারণে শাহাদাৎ সাহেবের বয়স একটু কমই দেখায়। তার ওপর সুঠাম সুন্দর শরীর। হাসিটাও মিষ্টি। আজকাল যোগ হয়েছে ফ্যাশন আর স্মার্টনেস। বাকি জীবনটা এভাবে গেলে কে-না খুশি হয়? শারীরিক টুকটাক সমস্যার জন্যে ডাক্তার দেখালেই হলো। এ বয়সে একটু শীতলতা আসতেই পারে। সেজন্য হাসি-খুশি আর আনন্দময় জীবন দরকার। এত হিসেব-নিকেশ কষে এত জবাবদিহি করে জীবন আর চালাতে চান না তিনি।

রিজিয়া বেগম মনে মনে রাগে জিদে ক্ষয়ে যাচ্ছেন। শাহাদাৎকে একটা কথাও বলতে ইচ্ছে করে না তার। শাহাদাৎ একটা খোলা বই। খুব ভালো করে তার পড়া হয়েছে। চেনা হয়েছে। সংসারে শান্তির জন্যে বিয়ে করতে যাচ্ছে। আর কোনো সমাধান খুঁজে পেল না। বুড়ো হাবরা- কোথাকার। ভীমরতি হয়েছে। ক’দিনের পরিচয় মাত্র। তার জন্যে এত পরিবর্তন? স্বামীর এমন বিদ্রোহ তিনি ভাবতেও পারেন না। ভেড়া মার্কাটার হঠাৎ টাইগার হয়ে ওঠা কে বুঝতে পেরেছিল? স্বল্পভাষী। খুব অল্পে সন্তুষ্ট থাকা মানুষ। রিজিয়া ভাবছেন- আহা! বিয়ের পরে কী সুন্দর দিনগুলো ছিল। স্বামী কত ভালোবেসেছেন তাকে। কত দুর্ব্যবহার নীরবে সহ্য করেছেন। রিজিয়ার মতের বাইরে কিছুই করতেন না। সেই মানুষটার এমন রং বদলে যাবে ভাবা যায়? নিজের ওপর রাগ হচ্ছে রিজিয়ার। সারাজীবন স্বামীর ক্ষমতা, গাড়ি-বাড়ি-সম্মান-প্রতিপত্তি তিনি ভোগ করেছেন। কখনো কোনো কষ্টটি করতে হয়নি। রানী রানী ভাব। তার আরামের জন্যে শাহাদাৎ কী করেননি? তাহলে এত খারাপ ব্যবহার কেন করতেন রিজিয়া? সারাক্ষণ মেজাজ চড়ে থাকে। কখনও একটু রোমান্টিক কথা বলেননি। শাহাদাৎ সাহেবের অফিসের প্রোগ্রামগুলোতেও তিনি যান না। বিরক্ত হন খুশির পরিবর্তে। এখন মর্জিনাই যাক। সব পাক। এখন? রিজিয়ার এত আরাম-আয়েশ, খবরদারি, কোথায় যাবে? তার মাথা ঘুরছে। বমি বমি লাগছে। চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। গা ঘামছে। আর ভাবতে পারছেন না। চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। এই দৃশ্য সবার চেনা। তিনি কাঁদছেন- কেন এমন হলো? এখন কি হবে? আমি কি করে এর মুখ দেখব? এত নাটক সিনেমা কপালে ছিল? এত বড় প্রতিশোধ? আমার অনেক শিক্ষা হয়েছে। একদম বদলে যাব। ওকে বুঝার চেষ্টা করবো। বুড়োটার যে এখন ফোনে ফুসুর ফুসুর করার অভ্যেস হয়ে গেছে- তার কি করবো? মহিলা দেখলেই গলে পড়ে। এখন আমি কি করি?

কান্না শুনে বাড়ির সব এসে জড়ো হলো তার পাশে। স্বভাবসুলভ রাগে চিৎকার করে তিনি বললেন, এখানে কি? মজা দেখছ? আমি কি মরে গেছি? যাও-যার যার কাজে যাও সব। আমার কান্নায়-চোখে জল আসে না। এসিড আসে বুঝেছ? পুড়ে মারব সব কটাকে। যা-ও সব।

হঠাৎ এর মধ্যেই একদিন শাহাদাৎ সাহেব রিজিয়া বেগমকে খালি ঘরে পেয়ে হাত ধরে বললেন, রিজু যা হয়েছে-অনেক হয়েছে। এবার থামো। এসব পাগলামো বন্ধ কর। আমি এসব সহ্য করতে পারছি না।

: মানে? কি বলছ তুমি?

: আমি তোমাদের সবাইকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই। প্লিজ।

: আমার সাথে শান্তিতে থাকা? এমন অসম্ভব কথা তোমার মুখে? তুমি না বল আমি একটা নিরুত্তাপ, বদমেজাজী। বয়সের চেয়েও বেশি বয়স্ক। নিরানন্দ সংসারে আমার সাথে থাকার চেয়ে জঙ্গলে থাকা অনেক ভালো। তুমি না সাইবেরিয়া চলে যেতে চাও? এখন সুন্দরী কমবয়সী বউ এনে দিচ্ছি। আমার সামনে তোমাকে সুখী দেখতে চাই। আধুনিক সুন্দরী চৌকস বউ হবে একটা। আমি ঠাণ্ডা। একটু উষ্ণতার স্বাদ নাও। ঝাঁঝিয়ে উঠলেন।

: প্লিজ। প্লিজ। এসব বলো না। আমার জীবন ফ্রাই ফ্রাই হয়ে গেছে। তোমার এসব যন্ত্রণা আমার সয়ে গেছে। এভাবেই থাকতে পারবো। আমি সব কিছুর জন্যে ক্ষমা চাচ্ছি। প্লিজ-রক্ষা কর।

পারিবারিক সভা ডাকা হলো। ছেলেদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো। ছেলেরা বলল, মা আমরা বাবার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। বাবাকে ক্ষমা করা যায় না?

: রিজিয়া বেগম শক্ত কণ্ঠে বললেন, এখন আর ক্ষমার সুযোগ নেই। মেয়াদ শেষ। লোকজন দাওয়াত দেয়া হয়ে গেছে। বুড়োর একটা ট্রিটমেন্ট দরকার। মনে মনে বললেন- কত রঙ্গ জানো বুড়া।

শাহাদাৎ সাহেব বললেন, ঠিক আছে। জীবনে কোনোদিন তোমার কথার বাইরে কাজ করিনি। আজও করবো না। তুমি যদি চাও তাহলে তাই হবে। আর-আর আমি তো মর্জিনাকে ভালোইবেসেছি। রিজিয়া বেগম দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছেন। মনে মনে বললেন, দেখাচ্ছি তোমার ভালোবাসার টিনএজগিরি। ভড়ংবাজি। উনার হৃদয়ের চৌবাচ্চা থেকে ভালোবাসা উপচে পড়েছে।

শাহাদাৎ ভাবছেন, এবার হামবড়াটা যদি একটু কমে। অহংকারের প্রেশারটা একটু বেশি হাই। আর আমাকে বলে ছাগল। তো ভালোই। ছাগলের আবার বয়স কি? সব বয়সেই ছাগল।

নভেম্বরের চার তারিখ সন্ধ্যা। রিজিয়া বেগম পার্লার থেকে সেজে এসেছেন। কড়া আদেশে ছেলেদের তৈরি করে নিলেন। শাহাদাৎ সাহেবকে নিজের হাতে বিয়ের পোশাক পরিয়ে বারবার দেখলেন। শাহাদাতের খারাপ লাগছে। বাঘিনী এমন নরম কি করে হলো?

রিজিয়া বললেন, তুমি একটু পরে আসবে। গাড়ি সাজানো আছে।

: এতসব করেছ রিজু? দ্বিতীয় বিয়েতে কেউ- ভেবে দেখ।

: বিয়ে তো বিয়েই। অংকের হিসাবে তার মূল্যায়ন চলে না। তোমাকে নিজের হাতে বর সাজালাম- আমার ভালোই লাগছে। শোনো আর আধা ঘণ্টা পরে তুমি চলে এসো। আমরা অপেক্ষা করবো।

: আমার খুব খারাপ লাগছে।

: নানা মন খারাপ করার কিছু নেই। হাসিখুশি এসো।

চলে গেলেন। আধ ঘণ্টা যেন শাহাদাৎ সাহেবের কাটে না। একটু মর্জিনার সাথে কথা বললে কেমন হয়?

: হ্যালো-

: হ্যালো-বল। কি খবর? কেমন লাগছে?

: কেমন লাগছে? আর বলতে পারছি না। খুব নার্ভাস লাগছে। এখন কথা বলতে পারছি না। আসছি একটু পর। ছাড়লাম- বাই।

: বাই।

সাজানো গাড়ি থেকে নামলেন শাহাদাৎ সাহেব। ছেলেরা এসে বাবাকে এগিয়ে নিল হাসিমুখে। বললেন, কিরে, তোরাও দেখছি হাসিখুশি। পালাবো নাকি? পালাই- চারদিকে দেখেন। অনেক চেনা লোকজন। আত্মীয়। কিছু একটা করার কথা ভাবছেন।

কমিউনিটি সেন্টারে ঢোকার পথে দু’পাশে ফুলের তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে রিজিয়া বেগম ও মর্জিনা বেগম। হাসতে হাসতে দুজন এগিয়ে এসে শাহাদাৎকে বরণ করলেন। দুজনে দুইহাতে ধরে নিয়ে গেলেন ভেতরে। সুন্দর সাজানো রুমে এসিতে থেকেও শাহাদাৎ ঘামছেন দর দর করে। কিছু বুঝতে পারছেন না। পিলে চমকে উঠেছে তার। অ্যাঁ-মর্জিনা রিজুর পরিচিত নাকি? বরের মতো তাকে বসিয়ে পাশে রিজিয়া বেগম বসেন।

রিজিয়া বললেন, দেখ। মর্জিনা আমার ছেলেবেলার বন্ধু। বহু বছর দেশের বাইরে থাকায় দেখা হয়নি। আমার চেয়ে একটু ছোট হবে। শাহাদাৎ ভাবছেন-ওহ! স্ট্রোক করে ফেলবেন নাকি? এসব কি বলছে রিজু। মর্জিনা ওর বন্ধু। আর কি শোনার বাকি আছে? আমি কি সার্কাসের ঘোড়া? এসব কি হচ্ছে? উহ-রিজুর কি দাঁত কেলানো হাসি। কতদিন পর এমন করে হাসছে। বুক ভরা হাসি। আহা! এই হাসি জীবনেও দেখিনি। রাগে-অহংকারে যার মাটিতে পা পড়ে না তার কি বিগলিত হাসি! তাহলে …. শুধু আমার নয়, রিজুরও শিক্ষা হয়েছে।

রিজিয়া আর মর্জিনা একসাথে বললেন- শুভ বিয়ে বার্ষিকী। শাহাদাৎ সাহেবের যেন একের পর এক শুধু বিস্ময় আর ঘোর লাগা ব্যাপার ঘটছে। আজ তার বিয়ে বার্ষিকী একটুও মনে ছিল না। মর্জিনা বললেন, আজ আপনাদের একত্রিশতম বিয়ে বার্ষিকী। ভুলে গেছেন? এই জন্যেই রিজু রাগ করে। বাঁকা চোখে শাহাদাৎ তাকে দেখলেন। কিছু বললেন না।

রিজিয়া বেগম বললেন, মর্জিনা কেক কাটার আগেই তোমার মেয়ে দুটোকে ডাক। এই চাঁদ-সূর্য কোথায় গেলি? ছেলে দুটো মায়ের কাছে এলো।

: যাও তো বাবারা এক্ষুনি বর সেজে এসো। আমি কাজী সাহেবকে খবর দিয়ে রেখেছিলাম। মর্জিনা আন্টির মেয়েদের সাথে তোমাদের বিয়ে দেব।

: এখনি? ছেলেরা একসাথে জানতে চায়।

ঃ হ্যাঁ। এখনি। শুভ কাজ তাড়াতাড়ি করতে হয়।

শাহাদাৎ সাহেব ভাবলেন, মর্জিনার সাথে বিয়ে না হোক মর্জিনা খুব ভালো। রিজুও ভালো। আমার ছেলেগুলোও ভালো। আর প্রেমের ফলাফলও ভালো। প্রেম জিন্দাবাদ। কিন্তু এটা হলোটা কি? রিজু আসোলেই একটা চিজ। রিজিয়া বেগম স্বামীর হাত ধরে বললেন, আর বিয়ে করতে হবে? সবাই একসাথে হেসে উঠলো। হ

ঈদ আয়োজন ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj